সমন্বিত ব্যবস্থাপনার তাগিদ
সরকারি হাসপাতালের ৬১ অক্সিজেন প্ল্যান্টে মিলছে না সেবা
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪৮ পিএম
ছবি- সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে স্থাপিত ৯৯টি মেডিকেল অক্সিজেন প্ল্যান্টের মধ্যে ৬১টিই অর্থাৎ ৬০ শতাংশ রোগীদের কাজে আসছে না। এর মধ্যে ৩১টি কারিগরিভাবে নষ্ট। আর ৩০টি প্ল্যান্ট কারিগরিভাবে কার্যক্ষম হলেও নিয়মিত চালানো হচ্ছে না। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে স্থাপিত অবকাঠামো থাকলেও এর বড় অংশ থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না রোগীরা।
সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরস ডিপো (সিএমএসডি)-এর মাধ্যমে এগুলো স্থাপন করা হয়।
শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি) মিলনায়তনে শুরু হওয়া দুই দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ অক্সিজেন সামিট ২০২৬’-এর প্রথম দিনে এ তথ্য জানানো হয়।
সামিটে ‘ফ্রম অক্সিজেন প্ল্যান্টস টু রিলায়েবল অ্যাকসেস’ শীর্ষক প্রবন্ধে এ তথ্য তুলে ধরেন ইউএনওপিএস বাংলাদেশের সিনিয়র অ্যানালিস্ট মারুফ হাসান। তার উপস্থাপনায় আরও দেখা যায়, গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়নে ইউএনওপিএসের সরাসরি ব্যবস্থাপনায় স্থাপিত ২৯টি অক্সিজেন প্ল্যান্ট বর্তমানে ফাংশনাল ও অপারেশনাল। একই দেশে, একই ধরনের চিকিৎসা অক্সিজেন অবকাঠামোর ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ধারাবাহিকতার পার্থক্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তথ্যটি তা সামনে এনেছে।
সামিটে ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ কমিশন অন মেডিকেল অক্সিজেন সিকিউরিটির কো-চেয়ার ও আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ড. আহমেদ এহসানুর রহমান বলেন, দেশে বছরে প্রায় ১৯ লাখ মানুষের জরুরি অক্সিজেন প্রয়োজন হয়। অস্ত্রোপচার ও দীর্ঘমেয়াদি রোগসহ আরও প্রায় ৫৬ লাখ রোগীর চিকিৎসায় মেডিকেল অক্সিজেন প্রয়োজন হয়। নিউমোনিয়া, হৃদরোগ, সেপসিস, আঘাত, নবজাতকের জটিলতা ও ডেঙ্গুর মতো রোগের চিকিৎসায় অক্সিজেনের প্রয়োজন বিশেষভাবে বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, শুধু অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপন বা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ালেই রোগীর কাছে অক্সিজেন নিশ্চিত করা যায় না। উৎপাদন থেকে সংরক্ষণ, পরিবহণ ও বিতরণ হয়ে হাসপাতালের রোগীর শয্যা পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। এর সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, প্রশিক্ষিত জনবল, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ এবং কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আলমগীর হোসাইন বলেন, অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় গুণগত মান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে একটি সমন্বিত বা হলিস্টিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ, মনিটরিং এবং ইভ্যালুয়েশনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকা জরুরি। শুধু একটি অংশ বিবেচনায় নিয়ে পুরো ব্যবস্থার গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, অক্সিজেন প্রকল্প বা সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো তৈরির শুরু থেকেই নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সম্পৃক্ত করতে হবে। প্রকল্পের কনসেস্টুয়াল লে-আউট থেকে বিস্তারিত স্ট্রাকচারাল লে-আউট পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে যাচাই প্রয়োজন। বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ও ফার্মাসিউটিক্যালস-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কারিগরি সাবকমিটি করা যেতে পারে। বাস্তবায়নে সময় বেশি লাগলেও গুণগত মানের সঙ্গে আপস করা যাবে না।
অক্সিজেন উৎপাদন ও সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইনগত ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় আনার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
হাসপাতালের অক্সিজেন পাইপলাইন ব্যবস্থাপনাকে বিশেষায়িত অবকাঠামো উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি সাধারণ কোনো সিভিল ওয়ার্ক নয়। হাসপাতাল নির্মাণের সময়ই অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থার নকশা, নির্মাণ ও তদারকিতে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ এবং নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের যথাযথ সম্পৃক্ততা থাকতে হবে। অক্সিজেনে কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ও আর্দ্রতাসহ বিভিন্ন ইমপিউরিটি নির্ধারিত মাত্রার মধ্যে আছে কিনা, তাও যথাযথভাবে পরীক্ষা প্রয়োজন।
সম্মেলনে বক্তারা বলেন, কোভিড-১৯ মহামারির পর দেশে মেডিকেল অক্সিজেন অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বেড়েছে। অক্সিজেন প্ল্যান্ট, তরল অক্সিজেন সংরক্ষণাগার, কনসেনট্রেটর ও হাসপাতালের পাইপলাইন ব্যবস্থাও সম্প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু স্থাপিত অবকাঠামো সচল রাখা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ জনবল এবং বিতরণব্যবস্থায় এখনো ঘাটতি রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, কোথায় কত অক্সিজেন প্রয়োজন, কোন প্ল্যান্ট কতটা উৎপাদন করছে, কোনটি বন্ধ এবং কেন বন্ধ—এসব তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। রোগীর রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা নিয়মিত পরিমাপ, লিপিবদ্ধকরণ ও প্রতিবেদন তৈরির ব্যবস্থাও জোরদার করা প্রয়োজন। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে পালস অক্সিমিটার, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, চিকিৎসাগত নির্দেশনা ও কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তারা।
বাংলাদেশ অক্সিজেন নেটওয়ার্ক এবং ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের সহযোগিতায় সেন্টার ফর হেলথ, ইমপ্লিমেন্টেশন অ্যান্ড পলিসি সায়েন্সেস (চিপস) এ সম্মেলনের আয়োজন করেছে। প্রথম দিনের আলোচনায় স্বাগত বক্তব্য দেন চিপসের পরিচালক ড. এসএম মোয়াজ্জেম হোসাইন।
অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইইউবির উপাচার্য অধ্যাপক এম, তামিম ও ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মালালী আহমাদজি।
দুই দিনের সম্মেলনে চিকিৎসা অক্সিজেনের চাহিদা ও সরবরাহ, অন-সাইট ও অফ-সাইট উৎপাদন, নিরাপদ মেডিকেল অক্সিজেন ও ডিভাইস, অবকাঠামো ও বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং, অক্সিজেন-সংক্রান্ত তথ্যব্যবস্থা, গবেষণা এবং স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণ নিয়ে বিভিন্ন অধিবেশন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

-6ac102c860bee.jpg)