দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ
চুয়াডাঙ্গায় ৪৫ সার ডিলারের মধ্যে ৪২ জনই বিএনপির নেতাকর্মী
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৪ এএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সার ডিলার নিয়োগ ঘিরে দেশের বিভিন্ন জেলায় অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও বরফকল, সিমেন্টের দোকান কিংবা মিষ্টির দোকানকে সার বিক্রয়কেন্দ্র বা গুদাম দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ, কোথাও একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে ডিলারশিপ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। আবার কোথাও নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতারা।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে খুলনার ডুমুরিয়ায় পুনঃতদন্তের দাবি জানিয়েছেন এক আবেদনকারী। লক্ষ্মীপুরে নিয়োগের সুপারিশ বাতিলের দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা। আর চুয়াডাঙ্গায় নতুন নিয়োগ পাওয়া ৪৫ জনের মধ্যে ৪২ জন বিএনপির নেতাকর্মী ও স্বজন বলে অভিযোগ করেছে জামায়াতে ইসলামী। ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
চুয়াডাঙ্গা ও দামুড়হুদা : জেলায় নতুন নিয়োগ পাওয়া ৪৫ জন বিসিআইসি সার ডিলারের মধ্যে ৪২ জন বিএনপির নেতাকর্মী ও তাদের স্বজন এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গ জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন জামায়াতের দুই সংসদ-সদস্য মাসুদ পারভেজ রাসেল ও মো. রুহুল আমিন।
বুধবার জেলা জামায়াতের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তারা দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলে নিয়োগ বাতিল করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পুনর্নিয়োগের দাবি জানান।
তাদের অভিযোগ, যোগ্য ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ আগে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না বলেও দাবি করেন তারা।
অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার বলেন, আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ মিথ্যা। উপজেলা পর্যায়ের কমিটি যাচাই-বাছাই করে সুপারিশ দেওয়ার পর নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়েছে।
খুলনা: ডুমুরিয়া উপজেলার রুদাঘরা ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগের তদন্ত নিয়ে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলেছেন ব্যবসায়ী পঙ্কজ কুমার মণ্ডল। জেলা প্রশাসক ও জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতির কাছে লিখিত আবেদনে তিনি নিরপেক্ষ পুনঃতদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
তার ভাষ্য, ২ সেপ্টেম্বর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর আবেদন করেন তিনি। ১০ সেপ্টেম্বর উপজেলা থেকে তিন কর্মকর্তা তার কাগজপত্র ও গুদাম পরিদর্শন করেন। ওই ইউনিয়নে ১১ জনের গুদাম পরিদর্শন করা হলেও শেষ পর্যন্ত ডিলার হয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম হালদার।
পঙ্কজের দাবি, যোগ্যতা ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে যাচাই না করেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ডুমুরিয়ার গুটুদিয়া ইউনিয়নে বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান খান মিন্টুর স্ত্রী লায়লাতুন্নাহারকে ডিলার নিয়োগ এবং সিমেন্টের দোকানে ‘জারিফ এন্টারপ্রাইজ’ নামে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে বিক্রয়কেন্দ্র দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। সদর ইউনিয়নের ডিলার গাজী হাফিজুর রহমান গুটুদিয়ার একটি বরফকলকে গুদাম হিসাবে দেখিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। মাগুরখালীতে আওয়ামী লীগ নেতা সুকৃতি মণ্ডলের মিষ্টির দোকানে সার বিক্রির সাইনবোর্ড এবং আটলিয়ায় বিএনপি নেতা আবদুল মালেক সরদারের ডিলারশিপ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
ডুমুরিয়ার ইউএনও সবিতা সরকার বলেন, আবেদনের তথ্যের সঙ্গে সরেজমিন পরিদর্শনের তথ্যের গরমিল আছে কিনা, তা যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভুল তথ্য দেওয়ার প্রমাণ মিললে বিধি অনুযায়ী ডিলারশিপ বাতিল করা হবে।
লক্ষ্মীপুর: লক্ষ্মীপুর পৌরসভায় ইফাজ এগ্রোকে সার ডিলার নিয়োগের সুপারিশ নিয়ে জেলা প্রশাসক ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ী হামিদুর রহমান ও ইয়াছিনুর রহমান।
তাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটিতে মুরগি, মাছ ও গরুর খাদ্য বিক্রি হয়। এর স্বত্বাধিকারী জাকির হোসেনের ভাই ইকবাল হোসেনও বিএডিসির সার ডিলার। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় ২৫ টন সার ধারণক্ষমতার জায়গা নেই এবং প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকা একতরফা ও বিধি বহির্ভূতভাবে সুপারিশ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ থাকা বাহার উদ্দিনের ডিলার নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ইফাজ এগ্রোর স্বত্বাধিকারী জাকির হোসেন বলেন, বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী আবেদন করেছেন, অন্য কেউ আবেদন করেননি। তার দাবি, সার ও পশুখাদ্যের দোকান আলাদা এবং তার ভাই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নয়, বিএডিসির ডিলার।
লক্ষ্মীপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জহির আহমেদ বলেন, এখনো চূড়ান্ত নিয়োগ হয়নি; সুপারিশের প্রক্রিয়া চলছে।
সাতক্ষীরা: বুধবার (১৪ অক্টোবর) দুপুরে সাতক্ষীরার ৭৮টি ইউনিয়ন ও তিনটি পৌরসভায় সার ডিলার নিয়োগে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
বক্তারা অভিযোগ করেন, সার ডিলার নিয়োগে প্রকৃত ব্যবসায়ী ও যোগ্য ব্যক্তিদের বঞ্চিত করে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তিদের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে কৃষকেরা সঠিক সময়ে ও ন্যায্য মূল্যে সার পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়বেন। বিতর্কিত নিয়োগ বাতিল করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নতুন করে সার ডিলার নিয়োগের জন্য জেলা প্রশাসনের প্রতি দাবি জানান তারা।
বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের অভিযোগ, সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনের তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের বঞ্চিত করে জনবিচ্ছিন্ন গুটি কয়েক মানুষের তৈরি করা তালিকার ভিত্তিতে জেলা প্রশাসনের সহায়তায় ডিলারশিপ চূড়ান্ত করা হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিবারের প্রভাব খাটিয়ে তাদের নিকটাত্মীয়, স্ত্রী-সন্তান ও শ্যালক-শ্যালিকার নামে একাধিক ডিলারশিপ দেওয়ার পাশাপাশি বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন করা হয়েছে। যারা কখনও সারের ব্যবসা বা কৃষির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, তাদেরও এই ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে।
সাতক্ষীরা জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি আব্দুস সামাদের সভাপতিতে ও পৌর বিএনপির সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল মামুনের সঞ্চালনায় এতে বক্তব্য রাখেন জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক কামরুজ্জামান ভুট্টো ও সদস্যসচিব শেখ শরিফুজ্জামান সজীব প্রমুখ।
