Logo
Logo
×

Advertisement

জাতীয়

এক্সপ্লেইনার

৯৭ শতাংশ কাজ শেষে কেন বাতিল হলো বিআরটি, এতে লাভ না ক্ষতি?

প্রকল্পটির অন্যতম ব্যর্থতা বিশেষ বাস সংগ্রহ করতে না পারা

Advertisement

আতাউর রহমান

আতাউর রহমান

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪৫ পিএম

৯৭ শতাংশ কাজ শেষে কেন বাতিল হলো বিআরটি, এতে লাভ না ক্ষতি?

৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর বিআরটি প্রকল্পটি বাতিল করেছে সরকার

Advertisement

  • বিশ্বের ১৯১টি শহরে বিআরটি ব্যবস্থা চালু আছে
  • ২০০০ সালের পর বিশ্বে বিআরটির সংখ্যা বৃদ্ধির হার ৩৮৩%
  • ব্যয় তিন দফায় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি, প্রায় ১০৯ শতাংশ
  • ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনায় নির্মাণকাজের কারণে ১৪ বছর ধরে ভোগান্তির শিকার গাজীপুর-উত্তরাবাসী 

বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট-বিআরটি, দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প। ৯৭ শতাংশ অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর গত ১৮ অক্টোবর প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অবকাঠামো সরিয়ে বিআরটিকে ছয় লেনের মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত দিয়েছে। এজন্য করিডোরে নির্মিত ২৫টি স্টেশন ও লেন বিভাজক অপসারণ করা হবে। এতে ব্যয় হবে ৪৫ কোটি টাকা। সড়কটি প্রশস্ত করতে চাওয়া হয়েছে আরও ২৭ কোটি টাকা। 

প্রকল্পটির অন্যতম ব্যর্থতা ছিল বিশেষ বাস সংগ্রহ করতে না পারা। প্রথমে স্বয়ংক্রিয় দরজাযুক্ত দীর্ঘ বাস চালুর পরিকল্পনা করা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। পরে বৈদ্যুতিক বাস কেনার উদ্যোগও কার্যকর হয়নি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের এপ্রিলে ১৩৭টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ডিজেলচালিত বাস কেনার দরপত্র আহ্বান করা হলেও শেষ পর্যন্ত বাস সংগ্রহ করা যায়নি। অন্যদিকে স্টেশনগুলোর নকশায় বাসের দরজার অবস্থান নিয়ে অসামঞ্জস্য ছিল। বাংলাদেশের প্রচলিত বাসের দরজা বাম পাশে থাকলেও বিআরটি স্টেশন তৈরি করা হয়েছিল ডান পাশে দরজাবিশিষ্ট বাসের কথা বিবেচনায় রেখে। ফলে বিশেষ বাস চালু হলেও বিদ্যমান গণপরিবহনের সঙ্গে সংযোগ নিয়ে জটিলতা তৈরির আশঙ্কা ছিল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিআরটি প্রকল্পটি বাতিল করে করিডোরটি অন্য সব বাহনের জন্য উন্মুক্ত করতে গেলেও বিআরটি স্টেশন, র্যাম্প এস্কেলেটর অপসারণ করতে হবে ও কন্ট্রাক্টরের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এ বাবদ দিতে হবে ১০০০-১২০০০ কোটি টাকা। অথচ এ প্রকল্পের অব্যবহৃত টাকা (১৪০০ কোটি টাকার বেশি) দিয়েই বাস কিনে বেসিক বিআরটি চালু করা সম্ভব। 

বিআরটি প্রকল্পটি বাতিল করে করিডোরটি অন্য সব বাহনের জন্য উন্মুক্ত করতে গেলেও বিআরটি স্টেশন, র্যাম্প এস্কেলেটর অপসারণ করতে হবে ও কন্ট্রাক্টরের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এ বাবদ দিতে হবে ১০০০-১২০০০ কোটি টাকা। অথচ এ প্রকল্পের অব্যবহৃত টাকা (১৪০০ কোটি টাকার বেশি) দিয়েই বাস কিনে বেসিক বিআরটি চালু করা সম্ভব। 

বিআরটি প্রকল্প বাতিল করার আগে প্রকল্পটির কারিগরি দিক পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি বিশেষজ্ঞ দল। তাদের পরামর্শ ছিল- গাজীপুর-বিমানবন্দর করিডরে বিআরটি প্রকল্প বাস্তবায়ন ছিল ভুল সিদ্ধান্ত।প্রকল্পটির সবচেয়ে ভালো বিকল্প হচ্ছে এটি বাতিল করা। তাদের যুক্তি ছিল-বিআরটি প্রকল্প চালু করলেও কয়েক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। এরফলে ওই করিডরটি যানজটে স্থবির হয়ে পড়বে। শিল্প-কলকারখানা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

প্রকল্পটি বাতিলের আগে মন্ত্রিসভায় চারটি বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়—১. প্রকল্পটি বাতিল করে দেওয়া। ২. অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করে বিআরটি বাস কিনে চলাচলের ব্যবস্থা করা। ৩. বিআরটি পথটি যেভাবে আছে সেভাবেই রেখে বিশেষ বাস ও বিদ্যমান বেসরকারি বাস চলতে দেওয়া। ৪. বিআরটি পথটিকে টোলের আওতায় এনে পরিচালনা করা।সরকার প্রথম বিকল্পটিই বেছে নিয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে- মাত্র ৩ শতাংশ কাজ বাকি থাকতে সরকার কেন এই সিদ্ধান্ত নিল? এই সিদ্ধান্ত কি দেশের জন্য কল্যাণকর নাকি ক্ষতিকর-এই প্রশ্নগুলো ঘুরে ফিরে সামনে আসছে। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দেখার চেষ্টা করবো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিআরটি প্রকল্পগুলো কতটা সম্প্রসারণ হচ্ছে, এর সুবিধা অসুবিধাগুলো কী।বাংলাদেশে এই প্রকল্প শেষ পর্যায়ে কেন মুখ থুবরে পড়ল। 

বিআরটি কী?

বিআরটি মানে আমরা সবাই জানি বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট। বাংলায় দ্রুতগতির গণপরিবহণ। নগর ও পরিবহণ পরিকল্পনাবিদদের, কাছে বিআরটি এর মানে Better Regeneration of Towns and Territories। নগর পরিকল্পনাবিদরা একে দ্রুত বর্ধনশীল, ঘনবসতিপূর্ণ ও অপেক্ষাকৃত কম আয়ের শহরের জন্য গেইম চেইঞ্জার মনে করেন। এটি নিছক একটি যোগাযোগ অবকাঠামো ও পরিবহণ সেবা নয়। বরং নগর পরিবহণের প্রথাগত অভিজ্ঞতার বিপরীতে কী নতুন সংযোজন করলো, সন্নিহিত নগর কেন্দ্র ও ভূমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কী নতুন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত উন্নয়ন সম্ভাবনা তৈরী করলো, আর কত কম খরচে এসব সম্ভাবনা তৈরী করলো তার ওপর।

কেন মুখ থুবড়ে পড়ল বিআরটি 

যানজট এড়িয়ে সড়ক পথে গণপরিবহণে গতি আনার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল বিআরটি প্রকল্প। পরিকল্পনা ছিল, ঢাকার বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কের মাঝখানে নির্দিষ্ট লেনে চলবে বিশেষ বাস। এতে যাতায়াতের সময় কমার পাশাপাশি বাড়ার কথা ছিল সড়কের সক্ষমতা। কিন্তু ১৪ বছরেও চালু করা যায়নি সে বাসসেবা। উল্টো নির্মাণকাজের দীর্ঘসূত্রতায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বেড়েছে যানজট, ভোগান্তি ও পরিবহণ ব্যয়। 

প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় তিন দফা সংশোধনের পর বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকায়। প্রাথমিক ব্যয়ের তুলনায় বৃদ্ধি পায় ২ হাজার ২২৮ কোটি টাকার বেশি, অর্থাৎ প্রায় ১০৯ শতাংশ। সওজ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পে ক্রমপুঞ্জীভূত ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। অনুমোদিত ব্যয়ের প্রায় ৬৬ শতাংশ খরচ হলেও যাত্রী পরিবহণের জন্য বিআরটি চালু করা সম্ভব হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালে প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হলেও তা অনুমোদন পায়নি।

বিশ্বের ১৯১টি শহরে বিআরটি ব্যবস্থা চালু আছে। এসব বিআরটিতে প্রতিদিন সোয়া তিন কোটি যাত্রী যাতায়াত করে। প্রতিবেশি ভারতে ১৩টি শহরে বিআরটি ব্যবস্থা চালু আছে। দেশটির ২২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এসব বিআরটি ব্যবস্থায় প্রতিদিন যাত্রী পরিবহণ করে প্রায় পাঁচ লাখ। চীনে বিআরটিতে চলে প্রায় ৪৪ লাখ এবং তাইওয়ানে চলাচল করে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ যাত্রী।

একটু পিছনে ফিরে তাকাই। আওয়ামী লীগ সরকার ২০১২ সালে শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। এর মধ্যে ১৫ দশমিক শূন্য ৭ কিলোমিটার হওয়ার কথা ছিল সড়কপথ, বাকিটা উড়ালপথ। সড়কের মাঝখানে দুটি পৃথক লেনে বিশেষ বাস চালানোর পরিকল্পনা ছিল। প্রকল্প চালু হলে দিনে প্রায় ২৫ হাজার যাত্রী অনায়াসে যাতায়াত করতে পারবেন বলে বলা হয়েছিল। বাসগুলো যানজট, সিগন্যাল কিংবা অন্য বাধায় আটকে থাকবে না—এমনটাই ছিল প্রত্যাশা।

পদে পদে ত্রুটিপূর্ণ এই প্রকল্প নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে সমালোচনা ছিল তীব্র। যদিও প্রকল্পটি নেওয়ার সময় উদ্দেশ্য ছিল কল্যাণকর। গাজীপুরবাসীসহ এই অঞ্চলের ১৮ জেলার মানুষ যেন যানজটবিহীন চলাচল করতে পারে।

সড়ক পরিবহণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে উত্তরা থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত আরেকটি বিআরটি পথ নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু গাজীপুর-বিমানবন্দর পথটি সময়মতো চালু না হওয়ায় দ্বিতীয় প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়। ফলে গাজীপুর-বিমানবন্দর অংশের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

যেসব কারণে প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে  

ভূমি অধিগ্রহণ, নকশা পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন সরানো, পানি নিষ্কাশন সমস্যা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতায় কাজ বারবার বাধাগ্রস্ত হয়। 

এছাড়া বিআরটি প্রকল্পের অন্যতম ব্যর্থতা হিসেবে বলা হয়েছে, বিশেষ বাস সংগ্রহ করতে না পারা। প্রথমে স্বয়ংক্রিয় দরজাযুক্ত দীর্ঘ বাস চালুর পরিকল্পনা করা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। পরে বৈদ্যুতিক বাস কেনার উদ্যোগও কার্যকর হয়নি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের এপ্রিলে ১৩৭টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ডিজেলচালিত বাস কেনার দরপত্র আহ্বান করা হলেও শেষ পর্যন্ত বাস সংগ্রহ করা যায়নি। 

অন্যদিকে স্টেশনগুলোর নকশায় বাসের দরজার অবস্থান নিয়ে অসামঞ্জস্য ছিল। বাংলাদেশের প্রচলিত বাসের দরজা বাম পাশে থাকলেও বিআরটি স্টেশন তৈরি করা হয়েছিল ডান পাশে দরজাবিশিষ্ট বাসের কথা বিবেচনায় রেখে। অবশ্য বিশ্বব্যাপী বিআরটি লেনে দরজা ডান দিকেই থাকে। ডান দিকে দরজাওয়ালা বাস চালু করলে ওই বাসগুলো গাজীপুর-বিমানবন্দরের বাইরে চলতে পারবে না।

বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই সিদ্ধান্তের আগে প্রকল্পটির কারিগরি দিক পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি বিশেষজ্ঞ দল। দলের নেতৃত্বে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক। 

তার প্রতিবেদনে প্রকল্পটিকে দেশের অবকাঠামো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ‘পদ্ধতিগত ব্যর্থতার’ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। 

বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান অধ্যাপক সামছুল হক প্রকল্প বাতিলের বিষয়ে বলেন, বিআরটি প্রকল্প নিয়ে সম্ভাব্য যতগুলো বিকল্প আছে, এর মধ্যে সবচেয়ে ভালো বিকল্প হচ্ছে প্রকল্পটি বাতিল করা। তিনি বলেন, বিআরটি বাস চালু হলে গাজীপুরবাসী শুধু বিমানবন্দর পর্যন্ত আসতে পারত। তাদের পুনরায় বাস বদল করার দরকার হতো, যা বাস্তবসম্মত নয়।

শুরু থেকেই পরিকল্পনায় ত্রুটি

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা ও নকশা শেষ হওয়ার আগেই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। নির্মাণকাজ শুরুর পর দেখা যায়, প্রকল্প এলাকায় যথাযথ পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই। ফলে পানি জমে থাকে। বিভিন্ন সেবা সংস্থার লাইন সরানোর পরিকল্পনাও আগে থেকে করা হয়নি। ব্যস্ত সড়কে নির্মাণকাজ চলার সময় যানবাহন সচল রাখার বিকল্প ব্যবস্থাও ছিল না।

যাত্রীদের ওঠানামার জন্য নির্মিত কয়েকটি পদচারী-সেতুতে চলন্ত সিঁড়ি ও লিফট রয়েছে। কিন্তু এসব স্থাপনার অনেকগুলোই ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কোথাও যন্ত্রপাতিতে জং ধরেছে, কোথাও অবকাঠামো ভেঙে পড়ছে। বিআরটি লেন আলাদা করতে সড়কের মাঝখানে সিমেন্টের প্রতিবন্ধক বসানো হয়েছে। কিছু স্থানে লোহার বেড়া দেওয়া হয়েছে। এসব কারণে সড়কের জায়গা কমেছে। কোথাও উড়ালপথ, কোথাও সমতল সড়ক, আবার কোথাও সরু লেন থাকায় যানবাহন চলাচলে সমস্যা হচ্ছে।

কোন কোন দেশে বিআরটি আছে

বিআরটি নিছক দ্রুত যাতায়াতের মাধ্যম না। এটি দ্রুত বর্ধনশীল, ঘনবসতিপূর্ণ ও অপেক্ষাকৃত কম আয়ের শহরের জন্য গেইম চেঞ্জার মনে করা হয়। বিআরটির যাত্রা ১৯৭৪ সালে ব্রাজিলের কুরিচিবা শহরে। ১৮৬৩ সালে লন্ডনে শুরু হবার পর এখন বিশ্বব্যাপী প্রায় ২০৫ টি শহরে MRT (মেট্রো রেল, টিউব, স্কাইট্রেন ইত্যাদি নানা নামে) রয়েছে। সংখ্যার বিচার নিসন্দেহে বিআরটি বৃদ্ধির হার বেশি। ২০০০ সালের পর বিআরটির সংখ্যা বৃদ্ধির হার ৩৮৩%। কেন? এর কারণ হলো সাশ্রয়ী ও দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভাব্যতা, বর্তমান রাস্তায় বড় কোনো অবকাঠামোগত নির্মাণ না করে করতে পারা, ভবিষ্যতে সহজে সম্প্রসারণ করা বা প্রয়োজনে এমআরটি বা এলআরটি স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ থাকা, স্থানীয় শিল্প সংযোগ ঘটানো ইত্যাদি। 

বিআরটির যাত্রা ১৯৭৪ সালে ব্রাজিলের কুরিচিবা শহরে। ১৮৬৩ সালে লন্ডনে শুরু হবার পর এখন বিশ্বব্যাপী প্রায় ২০৫ টি শহরে MRT (মেট্রো রেল, টিউব, স্কাইট্রেন ইত্যাদি নানা নামে) রয়েছে। সংখ্যার বিচার নিসন্দেহে বিআরটি বৃদ্ধির হার বেশি। ২০০০ সালের পর বিআরটির সংখ্যা বৃদ্ধির হার ৩৮৩%।

গ্লোবাল বিআরটি ডেটা নামে একটি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসারে, বিশ্বের ১৯১টি শহরে বিআরটি ব্যবস্থা চালু আছে। এসব বিআরটিতে প্রতিদিন সোয়া তিন কোটি যাত্রী যাতায়াত করে। প্রতিবেশি ভারতে ১৩টি শহরে বিআরটি ব্যবস্থা চালু আছে। দেশটির ২২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এসব বিআরটি ব্যবস্থায় প্রতিদিন যাত্রী পরিবহণ করে প্রায় পাঁচ লাখ। চীনে বিআরটিতে চলে প্রায় ৪৪ লাখ এবং তাইওয়ানে চলাচল করে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ যাত্রী।

আধুনিক বিআরটির বৈশিষ্ট্যগুলো কী

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) প্রতিবেদন মতে, আধুনিক বিআরটির বৈশিষ্ট্য হলো পাঁচটি— (১) বাসের জন্য নির্দিষ্ট লেন, (২) প্রিপেইড বোর্ডিং, (৩) প্ল্যাটফর্ম লেভেলে বোর্ডিং, (৪) উচ্চ ধারণক্ষমতা সম্পন্ন আর্টিকুলেটেড বাস এবং (৫) সমন্বিত ভূমি ব্যবহার ও পরিবহণ ব্যবস্থা। বিআরটি মেট্রো রেলের অর্ধেক যাত্রী বহন করতে পারে, মোটামুটি ঘণ্টা প্রতি ২০-৩৫ কিলোমিটার গতিবেগে চলে। কিন্তু নির্মাণ খরচ মেট্রো রেলের এক দশমাংশ। এ কারণে উন্নত দেশগুলোতে এর কদর বাড়ছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের এক গবেষণা মতে, দেশের ১টি শহরে (চট্টগ্রাম) বিআরটি overdue, ৬টিতে (রাজশাহী, বগুড়া, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, নোয়াখালী) এখনই দরকার, অদূর ভবিষ্যতে দরকার হবে আরো ১৩ টিতে। এ গবেষণা যখন করা হয় তখন ঢাকা গাজীপুর নারায়ণগঞ্জে বিআরটির এর কাজ চলমান ছিল। তাই এ তিন শহরকে এ গবেষণার আওতায় হতে বাদ রাখা হয়। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আজ দেশের প্রথম বিআরটি প্রকল্প ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর বন্ধ হয়ে গেল। এই প্রকল্প তো ২০১২ সালে শুরু হয়ে ২০১৬ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল।

বিশেষ বাস-ই কি সমস্যার মূলে?

বিআরটি প্রকল্পটি বাতিল করে করিডোরটি অন্য সব বাহনের জন্য উন্মুক্ত করতে গেলেও বিআরটি স্টেশন, র্যাম্প এস্কেলেটর অপসারণ করতে হবে ও কন্ট্রাক্টরের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এ বাবদ দিতে হবে ১০০০-১২০০০ কোটি টাকা।

অথচ এ প্রকল্পের অব্যবহৃত টাকা (প্রায় ১৪০০ কোটি) দিয়েই বাস কিনে বেসিক বিআরটি চালু করা সম্ভব। আরেকটু ভালো বাস কিনতে চাইলে দুই থেকে তিন শত কোটি টাকা অতিরিক্ত লাগবে। আর সবচেয়ে আধুনিক ইলেকট্রিক বাস ব্যবহার করলে লাগবে অতিরিক্ত হাজার কোটি টাকা। প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা খরচ করে করিডোর, ফ্লাইওভার, র‌্যাম্প এসব ঠিকই বানিয়ে ফেলেছি। আর বাধ সাধলাম বাস কেনার বেলায়, যা কেনার বরাদ্দ এখনও অব্যবহৃত আছে। 

কেন বিআরটি চালু করা দরকার

শুধু ঢাকা নয়, দেশের প্রথম বিআরটি হওয়া উচিত ঢাকা-গাজীপুর বিআরটি। কারণ গাজীপুর শুধু দেশের সবচেয়ে বড় সিটি কর্পোরেশন নয়, সবচেয়ে দ্রুত বর্ধিষ্ণু শহরও বটে। ঢাকা গাজীপুরের মধ্যে এখন প্রায় এক লাখ লোক যাতায়াত করে যাদের যাত্রার অর্ধেক পথ এ বিআরটির পথে পড়বে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, গাজীপুরে বিআরটি চালু হলে নিম্নে বর্ণিত সুবিধা পাওয়া যাবে— 

(১) মোট যাত্রার সময় ৩০শতাংশ হ্রাস, 

(২) করিডোর ও সন্নিহিত সড়কে রিকশা, কারসহ ছোট যানবাহনের ব্যবহার কমানো, 

(৩) জ্বালানি ব্যবহার এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, 

(৪) নারী ও বৃদ্ধদের জন্য আরামদায়ক-নিরাপদ বাহন, 

(৫) যাত্রী বীমা সুবিধা 

(৬) বিআরটি সম্পর্কিত কার্যক্রমে কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় অর্থনীতির বৃদ্ধি 

সরকারকে অনুরোধ জানানো হয়েছে, বাতিলের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে প্রকল্পটি চালু করতে। এটা করা গেলে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত ধারণাটি বাংলাদেশেও জনপ্রিয়তা পাবে। পাশাপাশি মানুষ সুবিধা ভোগ করবে। বিষয়টি সরকারকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। 

অধ্যাপক ড. মোসলেহ উদ্দীন হাসান

এ বিষয়ে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসলেহ উদ্দীন হাসান যুগান্তরকে বলেন, সরকারকে অনুরোধ জানানো হয়েছে, বাতিলের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে প্রকল্পটি চালু করতে। এটা করা গেলে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত ধারণাটি বাংলাদেশেও জনপ্রিয়তা পাবে। পাশাপাশি মানুষ সুবিধা ভোগ করবে। বিষয়টি সরকারকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। 

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

ধর্ষণে অন্তঃসত্ত্বা শিশুকে ওষুধ খাইয়ে গর্ভপাত...

ধর্ষণে অন্তঃসত্ত্বা শিশুকে ওষুধ খাইয়ে গর্ভপাত...

মাদানীর ওয়াজ মাহফিলে এমপিকে পাগড়ি পরিয়ে দিলেন আলেমরা

মাদানীর ওয়াজ মাহফিলে এমপিকে পাগড়ি পরিয়ে দিলেন আলেমরা

টঙ্গীতে গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণের ঘটনায় দুজনের মৃত্যু

টঙ্গীতে গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণের ঘটনায় দুজনের মৃত্যু

বনপাড়ায় ১২ মৃত্যু: সেই বাসটির ফিটনেস সনদের মেয়াদ ছিল না

বনপাড়ায় ১২ মৃত্যু: সেই বাসটির ফিটনেস সনদের মেয়াদ ছিল না

এবার বিআরটি ভাঙতে ব্যয় হবে ৪৫ কোটি টাকা

৯৭ শতাংশ কাজ শেষে প্রকল্প বাতিল এবার বিআরটি ভাঙতে ব্যয় হবে ৪৫ কোটি টাকা

‘১৪ বছর ধরে দুর্ভোগ পোহানো গাজীপুর-উত্তরার বাসিন্দাদের প্রতি সুবিচার করেনি সরকার’

‘১৪ বছর ধরে দুর্ভোগ পোহানো গাজীপুর-উত্তরার বাসিন্দাদের প্রতি সুবিচার করেনি সরকার’

আরও পড়ুন

দাম্মাম-রিয়াদে বিমানের সব ফ্লাইট স্থগিত

দাম্মাম-রিয়াদে বিমানের সব ফ্লাইট স্থগিত

ষড়যন্ত্র করে মানুষের হৃদয় জয় করা যায় না: টুকু

ষড়যন্ত্র করে মানুষের হৃদয় জয় করা যায় না: টুকু

লংমার্চ-রোডমার্চ করে সমাজে অশান্তি করতে দেওয়া হবে না: পানিসম্পদ মন্ত্রী

লংমার্চ-রোডমার্চ করে সমাজে অশান্তি করতে দেওয়া হবে না: পানিসম্পদ মন্ত্রী

এক্সপ্লেইনার ৯৭ শতাংশ কাজ শেষে কেন বাতিল হলো বিআরটি, এতে লাভ না ক্ষতি?

৯৭ শতাংশ কাজ শেষে কেন বাতিল হলো বিআরটি, এতে লাভ না ক্ষতি?

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম