আবরার হত্যা

‘হল ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আরেকটু মনিটর করলে এ ঘটনা এড়ানো যেত’

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ০৩:৪৩ | অনলাইন সংস্করণ

আবরার হত্যা

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ২৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

তাদের মধ্যে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয় ১১ জন। ঘটনাস্থলে উপস্থিতি এবং অন্যভাবে সম্পৃক্ততার কারণে বাকি ১৪ জনকে অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

অভিযুক্ত সবাই বুয়েটের ছাত্র (১৯ জন সাময়িক বরখাস্ত)। এছাড়া তারা বুয়েট ছাত্রলীগের নেতাকর্মীও। তাদের ১২ জনকে ইতিমধ্যে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

বুধবার দুপুরে ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ চার্জশিট জমা দেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক ওয়াহিদুজ্জামান।

এরপর বিকালে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. কায়সারুল ইসলামের আদালতে চার্জশিটটি দাখিল করা হলে আদালত তা দেখেন।

মামলার বিচারের লক্ষ্যে শিগগিরই এ চার্জশিট ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হবে। হত্যা ঘটনার ৩৭ দিনের মাথায় আদালতে চার্জশিট দাখিল করল ডিবি।

ডিবি পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে- অভিযুক্তরা উচ্ছৃঙ্খল আচরণে অভ্যস্ত ছিল। তারা রাজনৈতিক পরিচয়কে শেল্টার হিসেবে ব্যবহার করে অছাত্রের মতো আচরণ করত।

বুধবার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম এ তথ্য জানান।

তিনি আরও বলেন, হল ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আরেকটু মনিটরিং করলে এ ঘটনা এড়ানো যেত। তদন্তে আমরা তাদের ব্যর্থতা দেখেছি।’

এ মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে চারজন পলাতক আর ২১ জন কারাগারে। তাদের মধ্যে ঘটনার দায় স্বীকার করে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন আটজন।

বাকি ১৩ জনের ১৬১ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করে গোয়েন্দা পুলিশ। পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার জসিম উদ্দীন জানান, চার্জশিটে ২১টি আলামত ও ৮টি জব্দতালিকা যুক্ত করা হয়েছে।

এদিকে আবরার ফাহাদ হত্যায় তদন্ত সংস্থা যে অভিযোগপত্র দিয়েছে, তা ‘নির্ভুল হয়েছে’ মন্তব্য করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন শিগগিরই এর বিচার হবে, আমরাও এটা আশা করছি।

আর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, সব আইনি বাধ্যবাধকতা শেষ করে আবরার হত্যা মামলার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে করা হবে। এদিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে চার্জশিট দেয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে আবরারের পরিবার। তারা এখন দ্রুত সময়ের মধ্যে খুনিদের শাস্তি দেখতে চান।

সংবাদ সম্মেলনে মনিরুল ইসলাম আরও বলেন, বুয়েটের শেরেবাংলা হলের আবাসিক ছাত্র ও তড়িৎ কৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে ৬ অক্টোবর রাতে ছাত্রলীগের এক নেতার কক্ষে নিয়ে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়।

পরদিন আবরারের বাবা ১৯ শিক্ষার্থীকে আসামি করে চকবাজার থানায় মামলা করেন। তদন্তে নেমে পুলিশ এজাহারের ১৬ জনসহ ২১ জনকে গ্রেফতার করে। তিনি জানান, আবরার ফাহাদকে হত্যায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন ১১ জন। তারাই তাকে কয়েক দফায় মারধর করেন। বাকি ১৪ জন বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্নভাবে এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন।

তিনি বলেন, চার্জশিটে ৩১ জনকে সাক্ষী রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে বাদী পক্ষের ৬ জন ছাড়াও বুয়েটের সাতজন শিক্ষক, ১৩ জন শিক্ষার্থী এবং ৫ জন কর্মচারী রয়েছেন।

তিনি বলেন, গ্রেফতার ২১ জনের মধ্যে ১৬ জনের নাম আবরারের বাবার করা হত্যা মামলার এজাহারে আছে। অন্য পাঁচজনের নাম তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। চার্জশিটভুক্ত ২৫ জনের মধ্যে চারজন পলাতক। তাদের মধ্যে জিসান, তানিম ও মোর্শেদের নাম মামলার এজাহারে আছে। আর এজাহারের বাইরে পলাতক আরেক আসামি রাফি।

অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, বুয়েটছাত্র আবরার ফাহাদকে কোনো একক কারণে হত্যা করা হয়নি। আবরার শিবির করেন কি না, হত্যার পেছনে এটি একটি মাত্র (অন্যতম) কারণ। কিন্তু যারা তাকে হত্যা করেছে, তারা এমন উচ্ছৃঙ্খল আচরণে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। কেউ তাদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করলে, সালাম না দিলে, তাদের সামনে হেসে দিলে ইত্যাদি কারণে নির্যাতন করত।

তিনি বলেন, আসামিদের ভাষ্যমতে, আবরার ফাহাদ দেখা হলে বড়দের সালাম দিত না। বিভিন্ন তির্যক মন্তব্য করত। আগে থেকেই তারা নানা কারণে আবরার ফাহাদের ওপর ক্ষিপ্ত ছিল। অনেক বিষয়ের সমষ্টিতেই আবরার ফাহাদকে পেটানো হয়।

একজনকে মেরে অন্যজনকে শিক্ষা দিতে কিংবা জুনিয়রদের মধ্যে ভয়ের রাজত্ব কায়েম করতে তারা দীর্ঘদিন র‌্যাগিংয়ের নামে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল। যার আচরণ অপছন্দ হতো, তাদেরই ডেকে এনে নানা নির্যাতন করা হতো। অন্য কেউ এমন অভিযোগ করলেও আমরা বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখব।

মনিরুল বলেন, অভিযুক্তরা র‌্যাগিংয়ের নামে নতুনদের আতঙ্কিত রাখতে এসব কাজ করত। এসব বিষয়ে আমরা আগে কোনো অভিযোগ পাইনি। তবে তদন্তে একজন সাক্ষী বলেছেন যে তিনি একজনকে সালাম দেননি বলে তাকে পেটানো হয়েছে। র‌্যাগিংয়ের নামে উচ্ছৃঙ্খল কর্মকাণ্ডের অভ্যস্ততার অংশ হিসেবেই আবরার হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে আমরা মনে করছি। তিনি বলেন, হল প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আগে থেকে মনিটরিং করলে এমন ঘটনা না-ও ঘটতে পারত। এটা তাদেরই মনিটরিং করার কথা।

মনিরুল ইসলাম বলেন, তদন্তে আমরা জানতে পেরেছি, রাত ১০টার পর থেকে আবরারের ওপর নির্যাতন শুরু হয়। ২টা ৫০ মিনিটের দিকে ডাক্তার তাকে দেখে মৃত ঘোষণা করেন। দীর্ঘ সময় তাকে পেটানো হয়। তাকে হয়তো একটু আগে হাসপাতালে নিয়ে গেলে এমন নৃশংস পরিণতি হতো না।

মনিরুল বলেন, বিশ্বজিৎ হত্যায় যারা রড দিয়ে পিটিয়েছিল, তাদের ফাঁসি হয়েছে। অভিযুক্ত কয়েকজন আবার খালাসও পেয়েছে। সেই মামলায় আমরা তেমনভাবে সিসিটিভি ফুটেজ পাইনি। এ ধরনের ঘটনা প্রমাণের জন্য ট্রেডিশনাল তদন্ত বা চাক্ষুষ সাক্ষীর সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। আবরার হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন, তদন্ত সহায়ক দল ছিল, সিসিটিভি ফুটেজ, পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ, ফেসবুক মেসেঞ্জার গ্রুপের তথ্য রয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের বিশ্লেষণ, পাশাপাশি ৮ জন আসামির বক্তব্যও হত্যাকাণ্ডের অনেক বিষয় প্রমাণ করে। যদিও এ ধরনের ঘটনায় চাক্ষুষ সাক্ষী থাকলেও সাক্ষ্য দিতে এগিয়ে আসে না। কিন্তু আমরা যেভাবে চার্জশিট প্রস্তুত করেছি, আশা করছি সবার সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হবে।

তিনি জানান, আবরারকে নির্যাতনে ব্যবহৃত পাঁচটি ক্রিকেট স্টাম্প, একটি স্কিপিং রোপ, দুটি সিসিটিভি ক্যামেরার ডিভিডি, পাঁচটি মোবাইল ফোন এবং একটি ল্যাপটপ এ মামলার আলামত হিসেবে রাখা হয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) আবদুল বাতেনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। সেদিন ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে একটি ভিডিও দেখানো হয় পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে।

ঘটনাপ্রবাহ : বুয়েট ছাত্রের রহস্যজনক মৃত্যু

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×