যেসব কারণে জেঁকে বসেছে বন্যা, করণীয় কী?
jugantor
যেসব কারণে জেঁকে বসেছে বন্যা, করণীয় কী?

  যুগান্তর রিপোর্ট  

২৬ জুলাই ২০২০, ২৩:১৭:৪৯  |  অনলাইন সংস্করণ

নাটোরের সিংড়ার সারদানগর ভাগনাগরকান্দি স্কুল এলাকার নতুন সড়ক ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। ছবি: যুগান্তর

গত এক মাস সময়ের মধ্যে ৩ দফা বন্যার কবলে পড়েছে দেশের বিভিন্ন জেলা। বিষয়টি নিয়ে ভাবিয়ে তুলেছে বিশেষজ্ঞদের। এবারের বন্যার গতি-প্রকৃতি ‘কিছুটা ব্যতিক্রম’ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলছেন, প্রচুর রাস্তাঘাট আর অবকাঠামোগত উন্নয়ন হওয়ায় নদীর মুখ অনেক জায়গা ভরাট হয়ে গেছে। তাতে বন্যা আর আগের মত বেশি এলাকায় না ছড়িয়ে অববাহিকায় আটকে থাকছে, তাতে বন্যার স্থায়িত্ব বাড়ছে।

তিনি বলেন, ‘এবারের বন্যায় বেশ কিছু নতুন চিত্র আমরা দেখতে পাচ্ছি। আগে বন্যা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ত। এখন বন্যার গতিপথও আগের চেয়ে কিছুটা বদলে গেছে বলে মনে হচ্ছে।’

বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের সিনিয়র গবেষক ড. মোহন কুমার দাশ যুগান্তরকে বলেন, উত্তরবঙ্গের অনেক জেলা বন্যা প্রবণ আবহমান কাল ধরে। সেখানে চরাঞ্চলে অজানা সংখ্যক মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করে। যাপিত জীবনের মৌলিক অধিকার সেখানে প্রশ্নবিদ্ধ।

তিনি বলেন, বন্যা, অসুস্থতা বা অন্য কোনো দুর্যোগ-বিপদ থেকে বাঁচার জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্গম। মোবাইল নেটওয়ার্ক থাকে না; ইলেক্ট্রিসিটি, নৌ অ্যাম্বুলেন্স এগুলো দূরাশা মাত্র।

এ গবেষকের মতে, নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া (বিশেষ করে মহিলা ও শিশু), নৌ দুর্ঘটনা, সাপের ছোবলে মৃত্যু প্রতিবারের মতো এবারের বন্যায় ও হচ্ছে। উত্তোরণের ব্যবস্থা হিসেবে জনসচেতনতা, উন্নতমানের নৌ ব্যবস্থাপনা, কার্বলিক এসিড, এন্টিভেনম থাকা দরকার।

ড. মোহন কুমার দাশ বলেন, বন্যা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় বিভিন্ন অধিদফতরের মধ্যে আরও বেশি সমন্বয়ের প্রয়োজন। বন্যার আগাম পূর্বাভাস ও সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও জন দুর্ভোগ ও ভোগান্তির সঠিক কারণ অনুসন্ধান করে যথাযথ কার্যকরী পদক্ষেপ একান্ত প্রয়োজন।

বন্যা ও নদী ভাঙন অব্যবস্থাপনার কারণ

ঢাকাসহ বিভিন্ন বড় শহরগুলো থেকে পানি নেমে যাওয়ার স্কোপ নেই। নদীর তলদেশ ভরে যাচ্ছে। সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টর দিকে জোর দিতে হবে। যেখানে সেখানে আমরা ময়লা ফেলছি। নির্মাণ সামগ্রী রাস্তায় পড়ে থাকছে।

সিনিয়র গবেষক ড. মোহন কুমার দাশের মতে, নদী দখল, বাঁধের ওপর ঘরবাড়ি-মার্কেট নির্মাণ, বালুমহল ইজারা, কালভার্ট প্রভৃতির সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ না করা এগুলো অন্যতম। যেকোনো দুর্যোগ যেন একশ্রেণির সুবিধাভোগীদের মুনাফা লাভের ব্যবসা।

তিনি বলেন, ‘সার্বিক জনসচেতনতা, সঠিক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা ও প্রয়োগ কমাতে পারে জনদুর্ভোগ ও ভোগান্তি’।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার পশ্চিমের খালগুলো খেয়ে ফেলেছে। খালগুলো স্বাভাবিকতা রেখে, জলাধার রেখে কাজ করতে হবে। না হয় জলবদ্ধতা সমস্যা বাড়বে।

এ বিষয়ে অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, এবার দেখা যাচ্ছে, অনেক জায়গায় যদি বাঁধ না ভাঙত, সেসব জায়গায় পানি ঢুকত না। খুব কম জায়গা রয়েছে বাঁধ উপচে পানি ঢুকেছে। অনেক জায়গায় ভালো, কিছু জায়গায় নড়বড়ে অবস্থা। অনেক জায়গায় বাঁধ করা হয়েছে নদীর খুব কাছাকাছি। বাঁধের বিষয়ে সরকারের চিন্তাভাবনা করতে হবে।

এবারের বন্যার ধরণ

চলতি মৌসুমে বন্যা শুরু হয়েছিল গত ২৬ জুন। প্রথম ধাপে অন্তত ১০টি জেলায়, দ্বিতীয় ধাপে আরও আটটি জেলায় বিস্তার ঘটে বন্যার। ২৬ জুলাই পর্যন্ত সব মিলিয়ে দেশের ৩১ জেলার নিম্নাঞ্চল তিন ধাপে প্লাবিত হয়েছে বলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, ১৯৮৮, ১৯৯৮ ও ২০০৭ সালে দেশে বড় বন্যা হয়েছে। সেগুলোর তুলনায় এবারের বন্যার ধরনে ভিন্নতা রয়েছে বেশ কিছু দিক দিয়ে।

দেশের নদ-নদীগুলোতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১০১টি পর্যবেক্ষণ স্টেশনের মধ্যে ৪৪টি পয়েন্ট রোববারও পানি বাড়ছে; কমছে ৫৪টি পয়েন্টে। ১৮টি নদীর ২৮টি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার উপরে বয়ে যাচ্ছে।

যেসব কারণে জেঁকে বসেছে বন্যা, করণীয় কী?

 যুগান্তর রিপোর্ট 
২৬ জুলাই ২০২০, ১১:১৭ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
নাটোরের সিংড়ার সারদানগর ভাগনাগরকান্দি স্কুল এলাকার নতুন সড়ক ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। ছবি: যুগান্তর
নাটোরের সিংড়ার ভাগনারকান্দি এলাকায় ৩টি পয়েন্টে পাকা সড়ক ভেঙে বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। ছবি: সাইফুল ইসলাম

গত এক মাস সময়ের মধ্যে ৩ দফা বন্যার কবলে পড়েছে দেশের বিভিন্ন জেলা। বিষয়টি নিয়ে ভাবিয়ে তুলেছে বিশেষজ্ঞদের। এবারের বন্যার গতি-প্রকৃতি ‘কিছুটা ব্যতিক্রম’ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলছেন, প্রচুর রাস্তাঘাট আর অবকাঠামোগত উন্নয়ন হওয়ায় নদীর মুখ অনেক জায়গা ভরাট হয়ে গেছে। তাতে বন্যা আর আগের মত বেশি এলাকায় না ছড়িয়ে অববাহিকায় আটকে থাকছে, তাতে বন্যার স্থায়িত্ব বাড়ছে।   

তিনি বলেন, ‘এবারের বন্যায় বেশ কিছু নতুন চিত্র আমরা দেখতে পাচ্ছি। আগে বন্যা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ত। এখন বন্যার গতিপথও আগের চেয়ে কিছুটা বদলে গেছে বলে মনে হচ্ছে।’

বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের সিনিয়র গবেষক ড. মোহন কুমার দাশ যুগান্তরকে বলেন, উত্তরবঙ্গের অনেক জেলা বন্যা প্রবণ আবহমান কাল ধরে। সেখানে চরাঞ্চলে অজানা সংখ্যক মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করে। যাপিত জীবনের মৌলিক অধিকার সেখানে প্রশ্নবিদ্ধ।

তিনি বলেন, বন্যা, অসুস্থতা বা অন্য কোনো দুর্যোগ-বিপদ থেকে বাঁচার জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্গম। মোবাইল নেটওয়ার্ক থাকে না; ইলেক্ট্রিসিটি, নৌ অ্যাম্বুলেন্স এগুলো দূরাশা মাত্র।

এ গবেষকের মতে, নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া (বিশেষ করে মহিলা ও শিশু), নৌ দুর্ঘটনা, সাপের ছোবলে মৃত্যু প্রতিবারের মতো এবারের বন্যায় ও হচ্ছে।  উত্তোরণের ব্যবস্থা হিসেবে জনসচেতনতা, উন্নতমানের নৌ ব্যবস্থাপনা, কার্বলিক এসিড, এন্টিভেনম থাকা দরকার।

ড. মোহন  কুমার দাশ বলেন, বন্যা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় বিভিন্ন অধিদফতরের মধ্যে আরও বেশি সমন্বয়ের প্রয়োজন। বন্যার আগাম পূর্বাভাস ও সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও জন দুর্ভোগ ও ভোগান্তির সঠিক কারণ অনুসন্ধান করে যথাযথ কার্যকরী পদক্ষেপ একান্ত প্রয়োজন।

বন্যা ও নদী ভাঙন অব্যবস্থাপনার কারণ

ঢাকাসহ বিভিন্ন বড় শহরগুলো থেকে পানি নেমে যাওয়ার স্কোপ নেই। নদীর তলদেশ ভরে যাচ্ছে। সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টর দিকে জোর দিতে হবে। যেখানে সেখানে আমরা ময়লা ফেলছি। নির্মাণ সামগ্রী রাস্তায় পড়ে থাকছে।

সিনিয়র গবেষক ড. মোহন কুমার দাশের মতে, নদী দখল, বাঁধের ওপর ঘরবাড়ি-মার্কেট নির্মাণ, বালুমহল ইজারা, কালভার্ট প্রভৃতির সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ  না করা এগুলো অন্যতম। যেকোনো দুর্যোগ যেন একশ্রেণির সুবিধাভোগীদের মুনাফা লাভের ব্যবসা।  

তিনি বলেন, ‘সার্বিক জনসচেতনতা, সঠিক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা ও প্রয়োগ কমাতে পারে জনদুর্ভোগ ও ভোগান্তি’।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার পশ্চিমের খালগুলো খেয়ে ফেলেছে। খালগুলো স্বাভাবিকতা রেখে, জলাধার রেখে কাজ করতে হবে। না হয় জলবদ্ধতা সমস্যা বাড়বে।

এ বিষয়ে অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, এবার দেখা যাচ্ছে, অনেক জায়গায় যদি বাঁধ না ভাঙত, সেসব জায়গায় পানি ঢুকত না। খুব কম জায়গা রয়েছে বাঁধ উপচে পানি ঢুকেছে। অনেক জায়গায় ভালো, কিছু জায়গায় নড়বড়ে অবস্থা। অনেক জায়গায় বাঁধ করা হয়েছে নদীর খুব কাছাকাছি। বাঁধের বিষয়ে সরকারের চিন্তাভাবনা করতে হবে।

এবারের বন্যার ধরণ

চলতি মৌসুমে বন্যা শুরু হয়েছিল গত ২৬ জুন। প্রথম ধাপে অন্তত ১০টি জেলায়, দ্বিতীয় ধাপে আরও আটটি জেলায় বিস্তার ঘটে বন্যার। ২৬ জুলাই পর্যন্ত সব মিলিয়ে দেশের ৩১ জেলার নিম্নাঞ্চল তিন ধাপে প্লাবিত হয়েছে বলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, ১৯৮৮, ১৯৯৮ ও ২০০৭ সালে দেশে বড় বন্যা হয়েছে। সেগুলোর তুলনায় এবারের বন্যার ধরনে ভিন্নতা রয়েছে বেশ কিছু দিক দিয়ে।

দেশের নদ-নদীগুলোতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১০১টি পর্যবেক্ষণ স্টেশনের মধ্যে ৪৪টি পয়েন্ট রোববারও পানি বাড়ছে; কমছে ৫৪টি পয়েন্টে। ১৮টি নদীর ২৮টি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার উপরে বয়ে যাচ্ছে।

 

ঘটনাপ্রবাহ : বন্যা ২০২০