নিরাপদ সড়ক আন্দোলন

তোমরা পথ বের করেছ, তোমাদের পথেই থাক: ড. ইউনূস

  যুগান্তর ডেস্ক    ০৬ আগস্ট ২০১৮, ১৯:১১ | অনলাইন সংস্করণ

তোমরা পথ বের করেছ, তোমাদের পথেই থাক: ড. ইউনূস

নিরাপদ সড়কের দাবিতে চলমান ছাত্র আন্দোলন নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সামাজিকমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড পেজে সোমবার বিকাল ৪টা ৩৪ মিনিটে তিনি নিজের বক্তব্যটি প্রকাশ করেন।

ড. ইউনূস তার বক্তব্যটি 'তুমিই বাংলাদেশ' শিরোনামে দুটি প্যারায় ভাগ করে লিখেছেন। তার বক্তব্যটি পাঠকের উদ্দেশে তুলে ধরা হলো।

এক. দুই সহপাঠীর অপঘাত মৃত্যুর প্রতিবাদে স্কুলের শিশু-কিশোররা রাস্তায় নেমেছে। রাস্তায় তারা শুধু শোক প্রকাশ করে থেমে থাকেনি- এ রকম শোক যাতে ভবিষ্যতে কাউকে করতে না-হয়, তার জন্য ব্যবস্থা চায় তারা। তারা নিরাপদ সড়ক চায়।

সড়ক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তারা প্রশাসনের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেছে শুধু তাই নয়, তারা নিজেরা এই ব্যবস্থাপনায় নেমে গিয়ে দেখাতে চেয়েছে যে, আইনের প্রয়োগের অভাবেই মূলত সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।

তারা বাংলাদেশের মূল রোগটাকে সবার সামনে নিয়ে এসেছে। তারা আইনের প্রয়োগ চায়। যে প্রয়োগের নমুনা দেখানোর জন্য তারা গাড়িচালকের লাইসেন্সের পেছনে লেগেছে। ফিটনেস সার্টিফিকেটের সন্ধানে লেগেছে।

আইনের প্রয়োগ করা যে সহজ বিষয় এবং সমাজে সবার সমর্থন পাওয়ার বিষয়, সেটাও তারা দেখিয়ে দিল। যারা আইনের প্রয়োগকারী তারা নিজেরাই যে আইন মানছে না সেটাও তারা দেখিয়ে দিল। তা-ও কোনো বাহাদুরি করার জন্য নয়। নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। আজ পর্যন্ত তাদের কারো মুখে বড়াই করতে শুনিনি, পত্রিকায় কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ গর্ব করে বলেনি যে আজ আমি এতজন লাইসেন্সবিহীন চালককে ধরতে পেরেছি।

তাদের শৃঙ্খলা দেখে হতবাক হয়েছি। বালখিল্যতার লেশমাত্র নেই কোথাও। প্রগাঢ় পরিপক্বতার চিহ্ণ সর্বত্র। বিভিন্ন স্থানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে লেখা প্ল্যাকার্ডগুলো ইতিহাসে স্থান পাওয়ার মতো।

তারা ম্যানেজমেন্ট থিউরির মূল প্রতিপাদ্যকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে সুশৃঙ্খলভাবে তাদের কাজ নিয়ে এগিয়ে গেছে নিজ নিজ উদ্যোগে, কেন্দ্রীয় কোনো উদ্যোগ ছাড়া।

তারা কোনো কমান্ড-কাঠামো তৈরি করেনি, কোনো কমিউনিকেশন চ্যানেল স্থাপন করেনি, কোনো প্রশিক্ষণের অপেক্ষায় থাকেনি, নীতিমালা তৈরি করার প্রয়োজন বোধ করেনি, কোনো কনসালটেন্টের শরণাপন্ন হয়নি। তারা তাদের মতো করে সুশৃঙ্খলভাবে একমনে কাজ করে গেছে।

সরকার তার সমস্ত বুদ্ধিমত্তা দিয়ে এখন শিশু-কিশোরদের হাত থেকে রাজপথমুক্ত করার কাজে লেগেছে একনিষ্ঠভাবে। সরকার একটা বিরাট সুযোগ হাতছাড়া করে ফেলল।

রাজপথ মুক্তির অভিযানে না-গিয়ে সরকার সুন্দরভাবে শিশু-কিশোরদের, তাদের বাবা-মাদের, দেশের সব মানুষের ক্ষোভমুক্তির কাজে নামলে রাজপথও মুক্ত হতো, শিক্ষার্থীরাসহ সব মানুষের বাহবা পেত।

লাইসেন্সবিহীন চালক এবং ফিটনেস সার্টিফিকেটবিহীন গাড়ি চিহ্ণিত করা কি এতই কঠিন কাজ?

রাস্তায় নামা শিশু-কিশোরদের দেখে সবাই অভিভূত হয়েছে। এই স্মৃতি জাতি কখনো ভুলবে না। তারা কান্নাকাটি করার জন্য বা শোকের মাতম করার জন্য রাস্তায় নামেনি। তারা সমাধান নিয়ে নেমেছে। অত্যন্ত পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে নেমেছে। সুশৃঙ্খলতার সঙ্গে তারা কাজ করে গেছে। কোনো গলাবাজি ছিল না, রাতব্যাপী নিজেদের মধ্যে বক্তব্য বা কর্তব্য স্থির করার জন্য বাগ্বিতণ্ডা হওয়ার কথা শুনিনি।

কারো মুখে এমন কোনো ভাব দেখিনি যাতে মনে হয়েছে যে, কিশোর-কিশোরী অজানা কাজের দায়িত্ব পেয়েছে বলে কোনো অনিশ্চয়তায় ভুগছে। তাকে যেখানেই যে কাজে দেখেছি মনে হয়েছে যেন একজন প্রশিক্ষিত দক্ষ কর্মকর্তা তার দায়িত্বপালন করেছে। তার হাতে কোনো ওয়াকিটকি নেই। অস্ত্র নেই। শুধু আছে বৃষ্টিতে ভেজা স্কুলের পোশাক, সারা দিন না খেতে পাওয়া শুকনা মুখ, পিঠে বইয়ের ব্যাগ।

এরা কারা? এরা কোন গ্রহের বাসিন্দা? এরা কি আমাদেরই সন্তান? এরা কি আমাদের মেরুদণ্ডহীন অস্তিত্বের পরিবেশে জন্ম নেয়া নতুন প্রজন্ম? বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয় না।

তাহলে কি আমাদের মেরুদণ্ড আসলে হারিয়ে যায়নি? শুধু কৌশলগত কারণে লুকিয়ে রেখেছি? তাহলে কি আমাদের শিশু-কিশোররা বড়দের এই মেরুদণ্ড লুকানোর খেলাটা বুঝতে পারার আগেই মা-বাবার দেয়া আনকোড়া নতুন মজবুত মেরুদণ্ড নিয়ে রাজপথে নেমে গেছে? তাদের দেখে চোখে আনন্দাশ্রু এসে পড়েনি এ-রকম মা-বাবা কি দেশে পাওয়া যাবে?

দুই. শিশু-কিশোরদের রাস্তায় নামার পর থেকে আমার কাছে নানাজনে অনুরোধ পাঠাচ্ছে তাদের উদ্দেশে কিছু বলুন, কিছু উপদেশ দিন, তাদেরকে দিকনির্দেশনা দিন। আমি তাদের দিকে তাকালে বুঝে উঠতে পারি না কী উপদেশ দেব?

পরে বুঝতে পারলাম কেন কোনো উপদেশ আমার মাথায় আসছে না। আমরা বড়রা তাদের উপদেশ দেয়ার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছি। আমরা গর্তের ভেতর থাকা মানুষ। গর্তের ভেতরে থেকে উপদেশ দেয়া যায় না।

তাদের প্রতি আমার একটাই পরামর্শ। তোমরা আমাদের উপদেশ শুনবে না। অন্ধ মানুষ চক্ষুষ্মানকে চলার উপদেশ দিতে পারে না।

তাদেরকে বলব, তোমরা আমাদের উপদেশ দেয়ার সুযোগ দিও না। যদি একবার এ সুযোগ দাও তাহলে তোমাদের টেনেহিঁচড়ে আমাদের গর্তে না ঢোকানো পর্যন্ত আমরা আর থামব না।

আমরা এখন আর চোখে দেখি না। চোখের ওপর একটা আস্তরণ টেনে দিয়েছি স্বেচ্ছায়। নানা ব্যাখ্যা দিয়ে আমাদের এই ইচ্ছাকৃতভাবে না-দেখাটা যাতে ধরা না-পড়ে আমরা তার নিরন্তর প্রচেষ্ঠায় থাকি। তোমরা আমাদের মতো স্বেচ্ছা অন্ধের কথায় কর্ণপাত কর না। কর্ণপাত কর না বলেই তোমরা রাস্তার দায়িত্ব নিতে পেরেছো। যারা নিজেরা পথ চেনে না, তারা পথ দেখাবে কী করে। আমাদের পরামর্শ নিলে তোমরাও গর্ত বানানোর কাজে লেগে যেতে।

তোমরা পথ বের করেছ। তোমরা তোমাদের পথেই থাক। তোমরা তোমাদের প্ল্যাকার্ডে অত্যন্ত সুন্দর করে তোমাদের সব কথা সবাইকে জানিয়ে দিয়েছ। তুমি বলেছ, “তুমি বাংলাদেশ।” সেটাই সবচয়ে খাঁটি কথা।

অন্য কোনো বাংলাদেশকে তুমি স্বীকার কর না। তোমার মতো করে তুমি তোমার বাংলাদেশকে বানিয়ে নাও।

তুমি বলেছ, “তুমি যদি ভয় পাও তবে তুমি শেষ, তুমি যদি রুখে দাঁড়াও তবে তুমি বাংলাদেশ।” তুমি রুখে দাঁড়িয়েছ, তাই তুমি বাংলাদেশ।

তুমি বলেছ, “আমরা যদি না-জাগি মা, ক্যামনে সকাল হবে।” তোমরা জেগেছো, এবার সকাল হবে।

আমরা যারা চোখে দেখেও দেখিনা তাদের চোখের পর্দা এই ভোরের জ্বলন্ত আলো দিয়ে কেটে দাও। আমাদের তোমাদের সঙ্গে থাকার উপযুক্ত করে নাও। তুমি যেমন বাংলাদেশ, আমাকে তোমার মতো করে বাংলাদেশ হওয়ার মতো উপযুক্ত করে নাও।

গর্তে গুঁজে থাকা আমাদের শীতল নিস্তেজ শরীরে তোমারা আগুন ছড়িয়ে দাও। যদি আগুনের কোনো ছিটেফোটা আমাদের শরীরে এবং মনে এখনো থেকে থাকে, তবে হয়তো তোমার আগুনে সেটা আবার উত্তাপ ফিরে পাবে।

তোমরা রাতের অন্ধকার থেকে জ্বলন্ত সকালকে টেনে বের করে আনার ব্রতে নেমেছ। তোমরাই পারবে আমাদের হিমশীতল অস্তিত্ব থেকে টগবগে বাংলাদেশকে বের করে আনতে।

তুমিই বাংলাদেশ!

তোমার চোখেই দেখতে চাই বাংলাদেশকে। তোমার মনের রং মেখে রাঙিয়ে দিতে চাই আমাদের মনগুলোকে।

ঘটনাপ্রবাহ : বিমানবন্দর সড়কে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter