jugantor
নিজেদের গুলিতে ফের রক্তাক্ত ছাত্রলীগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষে নিহত ১

  চট্টগ্রাম ব্যুরো/চবি প্রতিনিধি  

১৫ ডিসেম্বর ২০১৪, ০০:০০:০০  | 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড নিয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও ক্ষোভও দমাতে পারেনি বিবদমান দুই গ্রুপকে। থামেনি তাদের কোন্দল-সংঘাত। স্থানীয় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারাও ব্যর্থ হয়েছেন তাদের উগ্র অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণ করতে- যার করুণ পরিণতি দেখা দেয় রোববার। ক্যাম্পাসে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে নিহত হন ছাত্রলীগ কর্মী তাপস সরকার (২০)। তাপস সংস্কৃত বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। বেলা ১১টার দিকে কথাকাটাকাটিকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের ভিএক্স গ্রুপ ও সিএফসি গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। গ্রুপ দুটি মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী। নিহত তাপস সাবেক সহ-সভাপতি অমিত কুমার বসুর নেতৃত্বাধীন সিএফসির কর্মী। তার বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ থানার নিধিপুর গ্রামে। বাবার নাম বাবুল সরকার। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে তাপস তৃতীয়। তাপসের পরিবারের সদস্যরা তার বড় ভাইয়ের সঙ্গে নেত্রকোনা সদরের সাতপাই এলাকায় থাকেন বলে জানিয়েছেন তার মামাতো ভাই সুব্রত ভৌমিক।

সংঘর্ষে আরও তিন ছাত্রলীগ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। তারা হচ্ছেন- বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক আলাউদ্দিন আলম এবং ছাত্রলীগ কর্মী উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আল আমিন রিমন ও মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সাব্বির হোসেন। তাদেরকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

সংঘর্ষের ঘটনায় শাহজালাল হলে অভিযান চালিয়ে ৩২ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট পরিস্থিতি পর্যালোচনায় সন্ধ্যায় জরুরি বৈঠকে বসে। বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য, প্রভোস্ট ও প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আনোয়ারুল আজিমের সভাপতিত্বে বৈঠকে সহিংসতার ঘটনায় ছাত্রউপদেষ্টা ড. খান তৌহিদ ওসমানকে প্রধান করে ৫ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। সভায় আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, সকালে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিজীবী চত্বরে ফুল দিতে যায়। এ সময় সিএফসি ও ভিএক্স কর্মীদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। বেলা ১১টায় শাহ আমানত হলের সামনে ভিএক্সের কর্মীরা সিএফসির কর্মীদেরকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। এ সময় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ভিএক্সের কর্মীরা শাহজালাল হলের সামনে এবং সিএফসির কর্মীরা শাহ আমানত হলের সামনে অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষে সিএফসি কর্মী তাপসসহ দু’জন গুলিবিদ্ধ হন।

আহত তাপস সরকারকে চমেক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে তার অসংখ্য সহপাঠী সেখানে ভিড় জমায়। ঘণ্টাখানেক পর তাপস মারা যান। তার মরদেহ মর্গে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে হৃদয়বিধারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কান্না-আহাজারি করতে থাকে সহপাঠীরা। এ সময় অনেকে জ্ঞানও হারিয়ে ফেলেন। মর্গের আশপাশে বিপুল পুলিশ মোতায়েন ছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তাপস হত্যার বিচার ও চবি ভিসির পদত্যাগ দাবিতে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিল থেকে গাড়ি ভাংচুরের চেষ্টা করা হলে পুলিশ ও ছাত্রলীগ নেতারা তাদের নিভৃত করেন।

বেলা ২টার দিকে নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী লাশ দেখতে মর্গে যান। এ সময় তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, এ হত্যাকাণ্ড কখনও মেনে নেয়া যায় না। এটি একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড। যে খুনের শিকার এবং যারা খুন করেছে তারা সবাই আমার ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় এরকম ঘটনা চলতে দেয়া যাবে না। তদন্ত করে হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসবে পুলিশ। খুনি যেই হোক না কেন শাস্তি দেয়া হবে। তিনি বলেন, একটি চক্র আমার ছেলেদের নষ্ট করতে চক্রান্তে নেমেছে। সেই চক্রান্তের অংশ হিসেবেই এ হত্যাকাণ্ড। এ হত্যার বিচার না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পবিত্র জায়গায় হত্যাযজ্ঞ থামানো যাবে না।

মর্গের সামনে উপস্থিত তাপসের সহপাঠী ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্ররা ভিসির পদত্যাগ দাবি করে দফায় দফায় মিছিল বের করে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী এসে তাদের সান্ত্বনা এবং বিচারের আশ্বাস দেন।

মর্গের সামনে আহাজারি করতে থাকা শরিফ নামে তাপসের এক সহপাঠী কান্নাজড়িত কণ্ঠে যুগান্তরকে বলেন, সকাল থেকে আমরা এক সঙ্গে ছিলাম। এক সঙ্গে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা জানিয়ে ফিরছিলাম। তাপস নাস্তাও করেনি সকালে। আমরা পাশাপাশি হাঁটছিলাম। হঠাৎ দেখি তাপস পড়ে গেছে। দেখি তার গায়ে গুলি লেগেছে। পুলিশ পাশে দাঁড়িয়ে থাকলেও গুলিবর্ষণকারী ছাত্রলীগ ক্যাডারদের বিরুদ্ধে কোনো অ্যাকশনে যায়নি। শরিফ গুলিবর্ষণকারী হিসেবে আশরাফুজ্জামান আশা, রূপম, রুবেল দে, বিশ্বজিৎকে অভিযুক্ত করেন।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি ও সিএফসি গ্র“পের নেতা অমিত কুমার বসু বলেন, বুদ্ধিজীবী চত্বরে ফুল দেয়া নিয়ে কথাকাটাকাটি হয়। এ সামান্য ঘটনার জের ধরে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার হওয়া কর্মী আশরাফুজ্জামান আশা, জালাল, রুবেল দে, শফিক ও শুভর নেতৃত্বে হামলা হয়েছিল।

ছাত্রলীগ কর্মী তাপস সরকারের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা দেখা দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ১০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সিরাজ উদ দৌল্লাহ জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতেই এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

৩২ জন গ্রেফতার : বেলা ১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহজালাল হলে তল্লাশি চালিয়ে ৩২ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাদের সবাই ভিএক্স গ্রুপের সদস্য। বিকালে শাহজালাল হলে দ্বিতীয় দফা তল্লাশি চালিয়ে ভিএক্স গ্রুপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ থেকে ১টি পিস্তল, ১৪টি রাম দা, ২ রাউন্ড শটগানের গুলিসহ এক বস্তা পাথর উদ্ধার করেছে পুলিশ। চট্টগ্রাম উত্তর জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শহিদুল্লাহ বলেন, শাহজালাল ও শাহ আমানত হলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। অভিযান অব্যাহত আছে।

বিভিন্ন সংগঠনের নিন্দা : বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও ছাত্র হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট ও ছাত্র ফেডারেশন।

তাপসের গ্রামের বাড়িতে মাতম : সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান,

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নিহত তাপস সরকারের সহপাঠীদের কাছ থেকে মুঠোফোনে এ খবর জানতে পারেন তার কাকা বিন্দু সরকার। এরপর খবরটি দ্রুত পৌঁছে যায় তাপসের পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছেও। তারপরই পরিবারসহ পুরো গ্রামে নেমে আসে শোকের ছায়া। আহাজারি আর কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে এলাকা। নিহত তাপসের বাড়ি সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাঁক ইউনিয়নের প্রত্যন্ত পল্লী নিধিপুর গ্রামে। তার বাবা হতদরিদ্র কৃষক বাবুল সরকার (৫৫)। মা অঞ্জলী সরকার (৪৫)। তাদের ৫ সন্তানের মধ্যে তাপস ছিলেন তৃতীয়। অজপাড়াগাঁয়ে বেড়ে উঠা মেধাবী তাপস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য ভর্তি হওয়ার পর বাবা-মা এমনকি গোটা নিধিপুরসহ আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষ স্বপ্ন দেখতেন তাপস লেখাপড়া শেষ করে একদিন বড় চাকরি নিয়ে এলাকার মুখ উজ্জ্বল করবে। দিরাই উপজেলার নোয়াগাঁও পিসির বাড়িতে লজিং থেকে প্রাইমারি পর্যন্ত লেখাপড়া করে ট্যালেন্টপুল বৃক্তি লাভ করেন তাপস। এরপর নেত্রকোনার মদন উপজেলায় মামাবাড়িতে ফের লজিং থেকে কদমশ্রী এইচ খাঁ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। মেসে থেকে টিউশনি করে নেত্রকোনা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।


 

সাবমিট

নিজেদের গুলিতে ফের রক্তাক্ত ছাত্রলীগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষে নিহত ১
 চট্টগ্রাম ব্যুরো/চবি প্রতিনিধি 
১৫ ডিসেম্বর ২০১৪, ১২:০০ এএম  | 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড নিয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও ক্ষোভও দমাতে পারেনি বিবদমান দুই গ্রুপকে। থামেনি তাদের কোন্দল-সংঘাত। স্থানীয় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারাও ব্যর্থ হয়েছেন তাদের উগ্র অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণ করতে- যার করুণ পরিণতি দেখা দেয় রোববার। ক্যাম্পাসে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে নিহত হন ছাত্রলীগ কর্মী তাপস সরকার (২০)। তাপস সংস্কৃত বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। বেলা ১১টার দিকে কথাকাটাকাটিকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের ভিএক্স গ্রুপ ও সিএফসি গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। গ্রুপ দুটি মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী। নিহত তাপস সাবেক সহ-সভাপতি অমিত কুমার বসুর নেতৃত্বাধীন সিএফসির কর্মী। তার বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ থানার নিধিপুর গ্রামে। বাবার নাম বাবুল সরকার। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে তাপস তৃতীয়। তাপসের পরিবারের সদস্যরা তার বড় ভাইয়ের সঙ্গে নেত্রকোনা সদরের সাতপাই এলাকায় থাকেন বলে জানিয়েছেন তার মামাতো ভাই সুব্রত ভৌমিক।

সংঘর্ষে আরও তিন ছাত্রলীগ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। তারা হচ্ছেন- বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক আলাউদ্দিন আলম এবং ছাত্রলীগ কর্মী উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আল আমিন রিমন ও মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সাব্বির হোসেন। তাদেরকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

সংঘর্ষের ঘটনায় শাহজালাল হলে অভিযান চালিয়ে ৩২ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট পরিস্থিতি পর্যালোচনায় সন্ধ্যায় জরুরি বৈঠকে বসে। বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য, প্রভোস্ট ও প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আনোয়ারুল আজিমের সভাপতিত্বে বৈঠকে সহিংসতার ঘটনায় ছাত্রউপদেষ্টা ড. খান তৌহিদ ওসমানকে প্রধান করে ৫ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। সভায় আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, সকালে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিজীবী চত্বরে ফুল দিতে যায়। এ সময় সিএফসি ও ভিএক্স কর্মীদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। বেলা ১১টায় শাহ আমানত হলের সামনে ভিএক্সের কর্মীরা সিএফসির কর্মীদেরকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। এ সময় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ভিএক্সের কর্মীরা শাহজালাল হলের সামনে এবং সিএফসির কর্মীরা শাহ আমানত হলের সামনে অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষে সিএফসি কর্মী তাপসসহ দু’জন গুলিবিদ্ধ হন।

আহত তাপস সরকারকে চমেক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে তার অসংখ্য সহপাঠী সেখানে ভিড় জমায়। ঘণ্টাখানেক পর তাপস মারা যান। তার মরদেহ মর্গে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে হৃদয়বিধারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কান্না-আহাজারি করতে থাকে সহপাঠীরা। এ সময় অনেকে জ্ঞানও হারিয়ে ফেলেন। মর্গের আশপাশে বিপুল পুলিশ মোতায়েন ছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তাপস হত্যার বিচার ও চবি ভিসির পদত্যাগ দাবিতে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিল থেকে গাড়ি ভাংচুরের চেষ্টা করা হলে পুলিশ ও ছাত্রলীগ নেতারা তাদের নিভৃত করেন।

বেলা ২টার দিকে নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী লাশ দেখতে মর্গে যান। এ সময় তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, এ হত্যাকাণ্ড কখনও মেনে নেয়া যায় না। এটি একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড। যে খুনের শিকার এবং যারা খুন করেছে তারা সবাই আমার ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় এরকম ঘটনা চলতে দেয়া যাবে না। তদন্ত করে হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসবে পুলিশ। খুনি যেই হোক না কেন শাস্তি দেয়া হবে। তিনি বলেন, একটি চক্র আমার ছেলেদের নষ্ট করতে চক্রান্তে নেমেছে। সেই চক্রান্তের অংশ হিসেবেই এ হত্যাকাণ্ড। এ হত্যার বিচার না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পবিত্র জায়গায় হত্যাযজ্ঞ থামানো যাবে না।

মর্গের সামনে উপস্থিত তাপসের সহপাঠী ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্ররা ভিসির পদত্যাগ দাবি করে দফায় দফায় মিছিল বের করে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী এসে তাদের সান্ত্বনা এবং বিচারের আশ্বাস দেন।

মর্গের সামনে আহাজারি করতে থাকা শরিফ নামে তাপসের এক সহপাঠী কান্নাজড়িত কণ্ঠে যুগান্তরকে বলেন, সকাল থেকে আমরা এক সঙ্গে ছিলাম। এক সঙ্গে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা জানিয়ে ফিরছিলাম। তাপস নাস্তাও করেনি সকালে। আমরা পাশাপাশি হাঁটছিলাম। হঠাৎ দেখি তাপস পড়ে গেছে। দেখি তার গায়ে গুলি লেগেছে। পুলিশ পাশে দাঁড়িয়ে থাকলেও গুলিবর্ষণকারী ছাত্রলীগ ক্যাডারদের বিরুদ্ধে কোনো অ্যাকশনে যায়নি। শরিফ গুলিবর্ষণকারী হিসেবে আশরাফুজ্জামান আশা, রূপম, রুবেল দে, বিশ্বজিৎকে অভিযুক্ত করেন।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি ও সিএফসি গ্র“পের নেতা অমিত কুমার বসু বলেন, বুদ্ধিজীবী চত্বরে ফুল দেয়া নিয়ে কথাকাটাকাটি হয়। এ সামান্য ঘটনার জের ধরে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার হওয়া কর্মী আশরাফুজ্জামান আশা, জালাল, রুবেল দে, শফিক ও শুভর নেতৃত্বে হামলা হয়েছিল।

ছাত্রলীগ কর্মী তাপস সরকারের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা দেখা দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ১০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সিরাজ উদ দৌল্লাহ জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতেই এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

৩২ জন গ্রেফতার : বেলা ১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহজালাল হলে তল্লাশি চালিয়ে ৩২ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাদের সবাই ভিএক্স গ্রুপের সদস্য। বিকালে শাহজালাল হলে দ্বিতীয় দফা তল্লাশি চালিয়ে ভিএক্স গ্রুপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ থেকে ১টি পিস্তল, ১৪টি রাম দা, ২ রাউন্ড শটগানের গুলিসহ এক বস্তা পাথর উদ্ধার করেছে পুলিশ। চট্টগ্রাম উত্তর জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শহিদুল্লাহ বলেন, শাহজালাল ও শাহ আমানত হলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। অভিযান অব্যাহত আছে।

বিভিন্ন সংগঠনের নিন্দা : বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও ছাত্র হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট ও ছাত্র ফেডারেশন।

তাপসের গ্রামের বাড়িতে মাতম : সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান,

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নিহত তাপস সরকারের সহপাঠীদের কাছ থেকে মুঠোফোনে এ খবর জানতে পারেন তার কাকা বিন্দু সরকার। এরপর খবরটি দ্রুত পৌঁছে যায় তাপসের পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছেও। তারপরই পরিবারসহ পুরো গ্রামে নেমে আসে শোকের ছায়া। আহাজারি আর কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে এলাকা। নিহত তাপসের বাড়ি সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাঁক ইউনিয়নের প্রত্যন্ত পল্লী নিধিপুর গ্রামে। তার বাবা হতদরিদ্র কৃষক বাবুল সরকার (৫৫)। মা অঞ্জলী সরকার (৪৫)। তাদের ৫ সন্তানের মধ্যে তাপস ছিলেন তৃতীয়। অজপাড়াগাঁয়ে বেড়ে উঠা মেধাবী তাপস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য ভর্তি হওয়ার পর বাবা-মা এমনকি গোটা নিধিপুরসহ আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষ স্বপ্ন দেখতেন তাপস লেখাপড়া শেষ করে একদিন বড় চাকরি নিয়ে এলাকার মুখ উজ্জ্বল করবে। দিরাই উপজেলার নোয়াগাঁও পিসির বাড়িতে লজিং থেকে প্রাইমারি পর্যন্ত লেখাপড়া করে ট্যালেন্টপুল বৃক্তি লাভ করেন তাপস। এরপর নেত্রকোনার মদন উপজেলায় মামাবাড়িতে ফের লজিং থেকে কদমশ্রী এইচ খাঁ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। মেসে থেকে টিউশনি করে নেত্রকোনা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।


 

 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র