jugantor
বরিশালে আবারও অস্ত্রের ঝনঝনানি
মাটির নিচে অস্ত্র ভাণ্ডার হদিস নেই দেড় হাজার আগ্নেয়াস্ত্রের

  আকতার ফারুক শাহিন,বরিশাল ব্যুরো  

১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ০০:০০:০০  | 

ক্ষমতা পুনর্দখল এবং ধরে রাখার লড়াইয়ে আবার অশান্ত হয়ে উঠছে বরিশাল। এ লড়াইয়ে এগিয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপ। এদের মধ্যে কয়েক দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এতে ব্যবহৃত হয়েছে নানা ধরনের অস্ত্র। পুলিশের রেকর্ড থেকে হারিয়ে যাওয়া অস্ত্রগুলো সংঘর্ষে ব্যবহার হচ্ছে। মেয়র হিরনের মৃত্যুতে নগরে শান্তির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ফিরছে ১৩ বছর আগের সেই অস্ত্রের ঝনঝনানি। ফলে যে কোনো সময় বড় ধরনের সংঘর্ষে আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন নগরবাসী।

গত কয়েক মাসে ছাত্রলীগের দু’পক্ষের বিরোধে নগরীতে ঘটে বেশ কয়েকটি অপ্রীতিকর ঘটনা। এমনকি হিরনপত্নী বর্তমান সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা হিরনের উপস্থিতিতে তার বাসভবনের নিচেও ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এছাড়া বিএম কলেজসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘটে বেশ কয়েকটি সংঘর্ষের ঘটনা। মহানগর ছাত্রলীগের নেতৃত্ব নির্ধারণ নিয়ে মুখোমুখি দুই গ্রুপ। এসব ঘটনায় একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামার জন্য জমা করছে বিপুলসংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্র।

এক সময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো লুকানো ছিল মাটির নিচে। সেসব অস্ত্র এখন বেরিয়ে আসছে। বিভিন্ন গ্রুপের নেতাকর্মীদের হাতে এসব আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যে অস্ত্র দেখা যাচ্ছে তার মধ্যে এক সময় বৈধ ছিল এমন অস্ত্রও আছে। বৈধ অস্ত্রগুলো এক সময় থানায় জমা দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু এসবের মালিকরা কথা শুনেননি। ফলে এগুলোও এখন রয়েছে অবৈধের খাতায়। বরিশাল নগরীতে সাম্প্রতিক সময় যে অস্ত্র প্রদর্শন হচ্ছে তা এসব কথিত বৈধ এবং অবৈধ অস্ত্র বলেই মনে করছে সবাই।

সংঘর্ষ এবং আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার প্রসঙ্গে বরিশালের পুলিশ কমিশনার শামস্ উদ্দিন বলেন, ‘দেশের অন্যান্য মেট্রোপলিটন শহরগুলোর তুলনায় বরিশাল অনেক শান্ত। বিচ্ছিন্ন ভাবে দু-একটি ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, অস্ত্র উদ্ধার এবং সন্ত্রাসী গ্রেফতারে নিয়মিতভাবে চলছে পুলিশি অভিযান। বরিশালে অবৈধ অস্ত্রের প্রদর্শন খুব একটা হয় না। তারপরও আমরা সবদিক দিয়ে সজাগ রয়েছি। অস্ত্র উদ্ধারে একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনাও আমাদের রয়েছে।’ নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র যুগান্তরকে জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের দ্বন্দ্বসহ বেশ কয়েকটি ঘটনায় প্রদর্শিত আগ্নেয়াস্ত্র ১০/১১ বছরেও দেখা যায়নি বরিশালে। যে ৮ টপটেরর এক সময় নিয়ন্ত্রণ করত বরিশাল নগরী তাদের একজন শফিকুল্লাহ মোনায়েম বেশ কয়েক বছর ধরে নিখোঁজ। আরেকজন ফারুক আহম্মেদ ওরফে পানামা ফারুক নিহত হয়েছে বন্দুকযুদ্ধে। জোট শাসনামলের ছাত্রদল নেতা বিএম কলেজের সাবেক ভিপি মশিউল আলম সেন্টুও মারা গেছে ক্রসফায়ারে। এরা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও রয়ে গেছে এদের অস্ত্র ভাণ্ডার। আর সেই অস্ত্রই হয়তো এখন আবার আসতে শুরু করেছে প্রকাশ্যে। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ছাত্রলীগের এক নেতা যুগান্তরকে বলেন, ‘নিখোঁজ মোনায়েমের খুব ঘনিষ্ঠ এক ছাত্র নেতার কাছে রয়েছে বেশ কিছু অস্ত্র। বরিশাল কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক এজিএস ওই নেতা এর কয়েকটি প্রদর্শনও করেছে। একইভাবে চৌমাথা, আলেকান্দা কলোনি সাগরদী এলাকার কয়েকজনের কাছেও রয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র। প্রশাসন একটু খেয়াল করে অনুসন্ধান চালালেই এসব অস্ত্রের উৎস আর ভাণ্ডারের সন্ধান পেয়ে যাবে। তাছাড়া মালিকের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়া মানেই তো আর তার সম্পদ হারিয়ে যাওয়া নয়। বর্তমানে ছাত্রলীগের মধ্যে যে পরিস্থিতি চলছে তাতে চরম মুহূর্তে এসব অস্ত্রের ব্যবহারে বড় ধরনের অঘটন ঘটতে পারে।’

অবৈধের তালিকায় বৈধ অস্ত্র : বিশেষ একটি গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘পুরনো ফাইলপত্র ঘেটে যতদূর জেনেছি ২০০১’র পর গোপন সূত্রে প্রাপ্ত সংবাদের ভিত্তিতে নগরীর বর্মন রোড এলাকার বাসিন্দা অনুপ মালাকারের বাড়িতে হানা দিয়ে শটগান এবং বন্দুকসহ বেশ কিছু আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ। এসব অস্ত্র যে অনুপ মালাকারের নয় সে ব্যাপারে তখনই নিশ্চিত হওয়া গেছে। অনুপের বাড়ির কাছেই ছিল অন্ধকার সেই সময়ের কুখ্যাত এক টপটেররের বাসা। ২০০১’র পটপরিবর্তনের পর পালানোর প্রাক্কালে সে হয়তো এসব অস্ত্র ও গুলি অনুপের বাসায় রেখেছিল। তবে মামলা চলাকালীন একবারের জন্যও তার নাম বলেনি আসামি ও সাক্ষীরা। পরবর্তীতে ২০১১ সালে মাটির নিচ থেকে অস্ত্র উদ্ধার হওয়ার ঘটনাও ঘটে এখানে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, বিশাল সেই অস্ত্র ভাণ্ডার এখনও বরিশালেই আছে। মাটির নিচে কিংবা নিরাপদ কোনো জায়গায় তা লুকিয়ে রেখেছে সন্ত্রাসীরা। এর সঙ্গে আরও যোগ হয়েছে ২০০১ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত ৪ দলীয় জোট শাসনামলের ক্যাডারদের হাতে থাকা অস্ত্র। সবমিলিয়ে এসব অস্ত্রের সংখ্যা প্রায় ৭শ’। কেবল এসব অবৈধ অস্ত্রই নয়, জেলা প্রশাসন সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, নবায়ন না করা এবং অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় লাইসেন্স গ্রহণসহ নানা অভিযোগে বরিশাল জেলায় ১০ বছরে ৮০৯টি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করে কর্তৃপক্ষ। এসব লাইসেন্সের বিপরীতে বিভিন্ন জনের হাতে ৭ শতাধিক অস্ত্র থাকলেও তার একটিও জমা হয়নি প্রশাসনের মালখানায়। জেলা এবং পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে এসব অস্ত্র উদ্ধারে তেমন উদ্যোগও নেয়া হয়নি কখনও। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, বরিশাল থেকে ইস্যু হওয়া প্রায় সাড়ে ১৭শ’ লাইসেন্সের মধ্যে ২০০২ সালে অপারেশন ক্লিনহার্টের সময় যাচাই-বাছাই শেষে দেড়শ’ লাইসেন্স বাতিল হয়। একই কারণে পরবর্তী সময়ে বাতিল হয় আরও ৬৫৯টি লাইসেন্স। কেবল চলতি বছরেই ৬৫টি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল হয়েছে বলে জানা গেছে। বাতিলকৃত লাইসেন্সের নামে থাকা অস্ত্রগুলো উদ্ধারের নির্দেশ দেয়া হলেও আজ পর্যন্ত তা উদ্ধার হয়নি। এর কারণ ব্যাখ্যা দিয়ে ওই সূত্র জানায়, বাতিলকৃত লাইসেন্সের একটি তালিকা পুলিশের কাছে পাঠিয়েই দায়িত্ব শেষ করে জেলা প্রশাসন। এক্ষেত্রে লাইসেন্সধারীদের বিস্তারিত বর্ণনা এমনকি অনেকের ঠিকানা পর্যন্ত দেয়া হয়নি। কেবল অসম্পূর্ণ তালিকা প্রদানই নয়, বাতিল হওয়া লাইসেন্সের মালিকদের কোনো রকম নোটিশও দেয়নি প্রশাসন। ফলে মালিকদের হাতেই রয়ে গেছে অবৈধ বিবেচিত হওয়া ওইসব অস্ত্র। এগুলো এখন কি কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে তাও জানে না কেউ।

হাওয়ায় মিলিয়ে যায় সব, ব্যর্থ সব অভিযান : অস্ত্র ঝনঝনানির অসংখ্য ইতিহাস রচিত হয়েছিল ৯৬ থেকে ২০০১-এ। গোয়েন্দা সংস্থার কাছে থাকা তথ্যানুযায়ী নগরীর ৮ টপটেরর, ১২ সন্ত্রাসী গ্র“প এবং ৩৫টি উপ-গ্রুপের কাছে তখন ছিল কম করে হলেও ৪৯৩টি আগ্নেয়াস্ত্র। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, এক গ্রুপ নতুন একটি আগ্নেয়াস্ত্র আনলেই খবর পেয়ে অন্যরা আনত তার দ্বিগুণ। শক্ত ব্যাকিংয়ের কারণে তাদের কাছে তখন আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও ছিল অসহায়। ক্ষমতার প্রভাবের কারণে তখন কিছু করতে না পারলেও ক্যাডার বাহিনী আর অসংখ্য অবৈধ অস্ত্রের ব্যাপারে তক্কে তক্কে ছিল প্রশাসন। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য, ২০০১ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এসব অস্ত্রের একটিও উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। অপারেশন ক্লিনহার্টের মতো বড় অভিযানও ব্যর্থ হয় এক্ষেত্রে। পরে একই ব্যর্থতার গ্লানি ওঠে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের ঘাড়ে। অস্ত্রতো দূরের কথা ৫ রাউন্ড গুলি পর্যন্ত উদ্ধার হয়নি তখন। বেমালুম যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যায় সব। ২০০১ পরবর্তী টানা ২/৩ বছর ওই অস্ত্রের সন্ধানে তল্লাশি অভিযান চালায় র‌্যাব এবং পুলিশসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা। অস্ত্রের খোঁজে এক টপটেররের বাসার মেঝে পর্যন্ত খোঁড়ে বিশেষ বাহিনী। ২০০১ পরবর্তী সময়গুলোতে আসা অস্ত্রের ক্ষেত্রেও ঘটে একই ঘটনা। ক্রসফায়ারে একাধিক সন্ত্রাসীর মৃত্যু ঘটলেও তাদের অস্ত্র থাকে আড়ালে। এক পর্যায়ে অস্ত্রের সেই বিশাল ভাণ্ডারের কথা ভুলতে শুরু করে মানুষ। এরই মধ্যে ঘটে মাটির নিচে লুকোনো একটি অস্ত্রাগার আবিষ্কার হয়। ২০১১ সালের মে মাসে এই ঘটনা ঘটে নগরীর কাউনিয়া এলাকায়। ড্রেন নির্মাণ কাজের জন্য মাটি খুঁড়তে গিয়ে ৪টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ১০ রাউন্ড তাজা গুলি উদ্ধার করেন নির্মাণ শ্রমিকরা। পলিথিন এবং বাজারের ব্যাগ দিয়ে মোড়ানো অবস্থায় এগুলো পাওয়া যায়। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেন, আলোচিত এক টপটেররের বাসার খুব কাছ থেকে উদ্ধার হয় এসব অস্ত্র। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় ৯/১০ বছর আগে সেগুলো মাটি চাপা দেয়া হয়েছিল। তবে দক্ষভাবে সংরক্ষণ করায় এখনও সচল রয়েছে।

বরিশালের জেলা প্রশাসক শহিদুল আলম বলেন, ‘নানা কারণে বাতিল হয় অস্ত্রের লাইসেন্স। নবায়ন না করার কারণেও বাতিল হতে পারে তা। সেই সঙ্গে অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার, আর লাইসেন্সের মালিকের মৃত্যু ঘটলেও লাইসেন্স বাতিল করি আমরা। বিভিন্ন শহরে অস্ত্রের লাইসেন্সধারীদের তালিকা যেমন আমাদের কাছে থাকে তেমনি থাকে পুলিশ বিভাগের কাছেও। লাইসেন্স বাতিল হলে বিষয়টি তাদেরকে চিঠি দিয়ে জানাই আমরা। এরপর তো আর আমাদের কিছু করার থাকে না। বাতিল হওয়া লাইসেন্সের বিপরীতে থাকা অস্ত্র উদ্ধারের দায়িত্ব পালন করে সরকারের আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহীনি। তবে আমরা তাদের সর্বত সহায়তা দিই। এ ব্যাপারে কোন রকম কার্পণ্য থাকে না।’


 

সাবমিট

বরিশালে আবারও অস্ত্রের ঝনঝনানি

মাটির নিচে অস্ত্র ভাণ্ডার হদিস নেই দেড় হাজার আগ্নেয়াস্ত্রের
 আকতার ফারুক শাহিন,বরিশাল ব্যুরো 
১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৪, ১২:০০ এএম  | 

ক্ষমতা পুনর্দখল এবং ধরে রাখার লড়াইয়ে আবার অশান্ত হয়ে উঠছে বরিশাল। এ লড়াইয়ে এগিয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপ। এদের মধ্যে কয়েক দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এতে ব্যবহৃত হয়েছে নানা ধরনের অস্ত্র। পুলিশের রেকর্ড থেকে হারিয়ে যাওয়া অস্ত্রগুলো সংঘর্ষে ব্যবহার হচ্ছে। মেয়র হিরনের মৃত্যুতে নগরে শান্তির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ফিরছে ১৩ বছর আগের সেই অস্ত্রের ঝনঝনানি। ফলে যে কোনো সময় বড় ধরনের সংঘর্ষে আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন নগরবাসী।

গত কয়েক মাসে ছাত্রলীগের দু’পক্ষের বিরোধে নগরীতে ঘটে বেশ কয়েকটি অপ্রীতিকর ঘটনা। এমনকি হিরনপত্নী বর্তমান সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা হিরনের উপস্থিতিতে তার বাসভবনের নিচেও ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এছাড়া বিএম কলেজসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘটে বেশ কয়েকটি সংঘর্ষের ঘটনা। মহানগর ছাত্রলীগের নেতৃত্ব নির্ধারণ নিয়ে মুখোমুখি দুই গ্রুপ। এসব ঘটনায় একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামার জন্য জমা করছে বিপুলসংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্র।

এক সময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো লুকানো ছিল মাটির নিচে। সেসব অস্ত্র এখন বেরিয়ে আসছে। বিভিন্ন গ্রুপের নেতাকর্মীদের হাতে এসব আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যে অস্ত্র দেখা যাচ্ছে তার মধ্যে এক সময় বৈধ ছিল এমন অস্ত্রও আছে। বৈধ অস্ত্রগুলো এক সময় থানায় জমা দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু এসবের মালিকরা কথা শুনেননি। ফলে এগুলোও এখন রয়েছে অবৈধের খাতায়। বরিশাল নগরীতে সাম্প্রতিক সময় যে অস্ত্র প্রদর্শন হচ্ছে তা এসব কথিত বৈধ এবং অবৈধ অস্ত্র বলেই মনে করছে সবাই।

সংঘর্ষ এবং আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার প্রসঙ্গে বরিশালের পুলিশ কমিশনার শামস্ উদ্দিন বলেন, ‘দেশের অন্যান্য মেট্রোপলিটন শহরগুলোর তুলনায় বরিশাল অনেক শান্ত। বিচ্ছিন্ন ভাবে দু-একটি ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, অস্ত্র উদ্ধার এবং সন্ত্রাসী গ্রেফতারে নিয়মিতভাবে চলছে পুলিশি অভিযান। বরিশালে অবৈধ অস্ত্রের প্রদর্শন খুব একটা হয় না। তারপরও আমরা সবদিক দিয়ে সজাগ রয়েছি। অস্ত্র উদ্ধারে একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনাও আমাদের রয়েছে।’ নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র যুগান্তরকে জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের দ্বন্দ্বসহ বেশ কয়েকটি ঘটনায় প্রদর্শিত আগ্নেয়াস্ত্র ১০/১১ বছরেও দেখা যায়নি বরিশালে। যে ৮ টপটেরর এক সময় নিয়ন্ত্রণ করত বরিশাল নগরী তাদের একজন শফিকুল্লাহ মোনায়েম বেশ কয়েক বছর ধরে নিখোঁজ। আরেকজন ফারুক আহম্মেদ ওরফে পানামা ফারুক নিহত হয়েছে বন্দুকযুদ্ধে। জোট শাসনামলের ছাত্রদল নেতা বিএম কলেজের সাবেক ভিপি মশিউল আলম সেন্টুও মারা গেছে ক্রসফায়ারে। এরা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও রয়ে গেছে এদের অস্ত্র ভাণ্ডার। আর সেই অস্ত্রই হয়তো এখন আবার আসতে শুরু করেছে প্রকাশ্যে। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ছাত্রলীগের এক নেতা যুগান্তরকে বলেন, ‘নিখোঁজ মোনায়েমের খুব ঘনিষ্ঠ এক ছাত্র নেতার কাছে রয়েছে বেশ কিছু অস্ত্র। বরিশাল কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক এজিএস ওই নেতা এর কয়েকটি প্রদর্শনও করেছে। একইভাবে চৌমাথা, আলেকান্দা কলোনি সাগরদী এলাকার কয়েকজনের কাছেও রয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র। প্রশাসন একটু খেয়াল করে অনুসন্ধান চালালেই এসব অস্ত্রের উৎস আর ভাণ্ডারের সন্ধান পেয়ে যাবে। তাছাড়া মালিকের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়া মানেই তো আর তার সম্পদ হারিয়ে যাওয়া নয়। বর্তমানে ছাত্রলীগের মধ্যে যে পরিস্থিতি চলছে তাতে চরম মুহূর্তে এসব অস্ত্রের ব্যবহারে বড় ধরনের অঘটন ঘটতে পারে।’

অবৈধের তালিকায় বৈধ অস্ত্র : বিশেষ একটি গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘পুরনো ফাইলপত্র ঘেটে যতদূর জেনেছি ২০০১’র পর গোপন সূত্রে প্রাপ্ত সংবাদের ভিত্তিতে নগরীর বর্মন রোড এলাকার বাসিন্দা অনুপ মালাকারের বাড়িতে হানা দিয়ে শটগান এবং বন্দুকসহ বেশ কিছু আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ। এসব অস্ত্র যে অনুপ মালাকারের নয় সে ব্যাপারে তখনই নিশ্চিত হওয়া গেছে। অনুপের বাড়ির কাছেই ছিল অন্ধকার সেই সময়ের কুখ্যাত এক টপটেররের বাসা। ২০০১’র পটপরিবর্তনের পর পালানোর প্রাক্কালে সে হয়তো এসব অস্ত্র ও গুলি অনুপের বাসায় রেখেছিল। তবে মামলা চলাকালীন একবারের জন্যও তার নাম বলেনি আসামি ও সাক্ষীরা। পরবর্তীতে ২০১১ সালে মাটির নিচ থেকে অস্ত্র উদ্ধার হওয়ার ঘটনাও ঘটে এখানে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, বিশাল সেই অস্ত্র ভাণ্ডার এখনও বরিশালেই আছে। মাটির নিচে কিংবা নিরাপদ কোনো জায়গায় তা লুকিয়ে রেখেছে সন্ত্রাসীরা। এর সঙ্গে আরও যোগ হয়েছে ২০০১ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত ৪ দলীয় জোট শাসনামলের ক্যাডারদের হাতে থাকা অস্ত্র। সবমিলিয়ে এসব অস্ত্রের সংখ্যা প্রায় ৭শ’। কেবল এসব অবৈধ অস্ত্রই নয়, জেলা প্রশাসন সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, নবায়ন না করা এবং অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় লাইসেন্স গ্রহণসহ নানা অভিযোগে বরিশাল জেলায় ১০ বছরে ৮০৯টি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করে কর্তৃপক্ষ। এসব লাইসেন্সের বিপরীতে বিভিন্ন জনের হাতে ৭ শতাধিক অস্ত্র থাকলেও তার একটিও জমা হয়নি প্রশাসনের মালখানায়। জেলা এবং পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে এসব অস্ত্র উদ্ধারে তেমন উদ্যোগও নেয়া হয়নি কখনও। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, বরিশাল থেকে ইস্যু হওয়া প্রায় সাড়ে ১৭শ’ লাইসেন্সের মধ্যে ২০০২ সালে অপারেশন ক্লিনহার্টের সময় যাচাই-বাছাই শেষে দেড়শ’ লাইসেন্স বাতিল হয়। একই কারণে পরবর্তী সময়ে বাতিল হয় আরও ৬৫৯টি লাইসেন্স। কেবল চলতি বছরেই ৬৫টি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল হয়েছে বলে জানা গেছে। বাতিলকৃত লাইসেন্সের নামে থাকা অস্ত্রগুলো উদ্ধারের নির্দেশ দেয়া হলেও আজ পর্যন্ত তা উদ্ধার হয়নি। এর কারণ ব্যাখ্যা দিয়ে ওই সূত্র জানায়, বাতিলকৃত লাইসেন্সের একটি তালিকা পুলিশের কাছে পাঠিয়েই দায়িত্ব শেষ করে জেলা প্রশাসন। এক্ষেত্রে লাইসেন্সধারীদের বিস্তারিত বর্ণনা এমনকি অনেকের ঠিকানা পর্যন্ত দেয়া হয়নি। কেবল অসম্পূর্ণ তালিকা প্রদানই নয়, বাতিল হওয়া লাইসেন্সের মালিকদের কোনো রকম নোটিশও দেয়নি প্রশাসন। ফলে মালিকদের হাতেই রয়ে গেছে অবৈধ বিবেচিত হওয়া ওইসব অস্ত্র। এগুলো এখন কি কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে তাও জানে না কেউ।

হাওয়ায় মিলিয়ে যায় সব, ব্যর্থ সব অভিযান : অস্ত্র ঝনঝনানির অসংখ্য ইতিহাস রচিত হয়েছিল ৯৬ থেকে ২০০১-এ। গোয়েন্দা সংস্থার কাছে থাকা তথ্যানুযায়ী নগরীর ৮ টপটেরর, ১২ সন্ত্রাসী গ্র“প এবং ৩৫টি উপ-গ্রুপের কাছে তখন ছিল কম করে হলেও ৪৯৩টি আগ্নেয়াস্ত্র। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, এক গ্রুপ নতুন একটি আগ্নেয়াস্ত্র আনলেই খবর পেয়ে অন্যরা আনত তার দ্বিগুণ। শক্ত ব্যাকিংয়ের কারণে তাদের কাছে তখন আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও ছিল অসহায়। ক্ষমতার প্রভাবের কারণে তখন কিছু করতে না পারলেও ক্যাডার বাহিনী আর অসংখ্য অবৈধ অস্ত্রের ব্যাপারে তক্কে তক্কে ছিল প্রশাসন। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য, ২০০১ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এসব অস্ত্রের একটিও উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। অপারেশন ক্লিনহার্টের মতো বড় অভিযানও ব্যর্থ হয় এক্ষেত্রে। পরে একই ব্যর্থতার গ্লানি ওঠে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের ঘাড়ে। অস্ত্রতো দূরের কথা ৫ রাউন্ড গুলি পর্যন্ত উদ্ধার হয়নি তখন। বেমালুম যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যায় সব। ২০০১ পরবর্তী টানা ২/৩ বছর ওই অস্ত্রের সন্ধানে তল্লাশি অভিযান চালায় র‌্যাব এবং পুলিশসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা। অস্ত্রের খোঁজে এক টপটেররের বাসার মেঝে পর্যন্ত খোঁড়ে বিশেষ বাহিনী। ২০০১ পরবর্তী সময়গুলোতে আসা অস্ত্রের ক্ষেত্রেও ঘটে একই ঘটনা। ক্রসফায়ারে একাধিক সন্ত্রাসীর মৃত্যু ঘটলেও তাদের অস্ত্র থাকে আড়ালে। এক পর্যায়ে অস্ত্রের সেই বিশাল ভাণ্ডারের কথা ভুলতে শুরু করে মানুষ। এরই মধ্যে ঘটে মাটির নিচে লুকোনো একটি অস্ত্রাগার আবিষ্কার হয়। ২০১১ সালের মে মাসে এই ঘটনা ঘটে নগরীর কাউনিয়া এলাকায়। ড্রেন নির্মাণ কাজের জন্য মাটি খুঁড়তে গিয়ে ৪টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ১০ রাউন্ড তাজা গুলি উদ্ধার করেন নির্মাণ শ্রমিকরা। পলিথিন এবং বাজারের ব্যাগ দিয়ে মোড়ানো অবস্থায় এগুলো পাওয়া যায়। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেন, আলোচিত এক টপটেররের বাসার খুব কাছ থেকে উদ্ধার হয় এসব অস্ত্র। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় ৯/১০ বছর আগে সেগুলো মাটি চাপা দেয়া হয়েছিল। তবে দক্ষভাবে সংরক্ষণ করায় এখনও সচল রয়েছে।

বরিশালের জেলা প্রশাসক শহিদুল আলম বলেন, ‘নানা কারণে বাতিল হয় অস্ত্রের লাইসেন্স। নবায়ন না করার কারণেও বাতিল হতে পারে তা। সেই সঙ্গে অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার, আর লাইসেন্সের মালিকের মৃত্যু ঘটলেও লাইসেন্স বাতিল করি আমরা। বিভিন্ন শহরে অস্ত্রের লাইসেন্সধারীদের তালিকা যেমন আমাদের কাছে থাকে তেমনি থাকে পুলিশ বিভাগের কাছেও। লাইসেন্স বাতিল হলে বিষয়টি তাদেরকে চিঠি দিয়ে জানাই আমরা। এরপর তো আর আমাদের কিছু করার থাকে না। বাতিল হওয়া লাইসেন্সের বিপরীতে থাকা অস্ত্র উদ্ধারের দায়িত্ব পালন করে সরকারের আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহীনি। তবে আমরা তাদের সর্বত সহায়তা দিই। এ ব্যাপারে কোন রকম কার্পণ্য থাকে না।’


 

 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র