jugantor
চার বন্ধুর অস্ত্র বাণিজ্য
একসঙ্গে ওঠাবসা, একসঙ্গে কারাগারে

  সৈয়দ আতিক  

১৪ নভেম্বর ২০১৪, ০০:০০:০০  | 

যেখানে বেড়ে ওঠা সেখানেই রাজনীতি। যেখানে রাজনীতি সেখানেই চাকরি। আবার যেখানে চাকরি সেখানেই অবৈধ অস্ত্রের বাণিজ্য। অতঃপর আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ। বিনিসুতোয় গাঁথা মালার মতো সত্যিকার অর্থে এমন ঘটনাই ঘটেছে এক পুলিশ, দুই ছাত্রলীগ নেতা এবং এক রাজমিস্ত্রির জীবনে। লোভে পড়ে তারা অস্ত্র ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ধরা পড়েন র‌্যাবের জালে।

গত ১০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উপপরিদর্শক (এসআই) আসাদুজ্জামান আসাদকে অস্ত্র বিক্রির সময় হাতেনাতে গ্রেফতার করে র‌্যাব-১। অস্ত্র বিক্রির চক্রটিকে গ্রেফতারের অভিযানে র‌্যাব সদস্যরাই ক্রেতা সেজে যান। ওই অভিযানে পুলিশের এসআই আসাদ ও তার তিনবন্ধু- মশিউর রহমান, সাইফুল ইসলাম এবং মাহমুদুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়। এদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ব্যবসার অভিযোগ এনে ৮ অক্টোবর র‌্যাব আদালতে চার্জশিট প্রদান করে।

চাঞ্চল্যকর তথ্য হল- অভিযুক্ত চার বন্ধুর জম্ম ও বেড়ে ওঠা এবং রাজনীতি করাসহ সবকিছুই উত্তরা এলাকাতে। তুরাগের নয়ানগরে এসআই আসাদের, তুরাগের নলভোগ পূর্ব পাড়ায় সাইফুলের, নলভোগে মাহমুদুল ইসলামের ও উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টরে মশিউর রহমানের বাসা। আসাদ তুরাগে বেড়ে ওঠেন। তারপর স্কুল-কলেজের সিঁড়ি বেয়ে উত্তরা ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন। সেখানে ছাত্রলীগ কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। অন্য বন্ধুরা ছাত্রলীগের উত্তরা ইউনিভার্সিটি কমিটির বিভিন্ন পদে ছিলেন। আসাদ দুই বছর আগে পুলিশের চাকরিতে যোগ দেন। আর ঘটনাচক্রে তার কর্মস্থলও হয় উত্তরা এলাকা। র‌্যাব কর্মকর্তারা বলেন, নিজ এলাকায় বেড়ে ওঠা ও আধিপত্যের কারণে নির্বিঘেœ অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা করে আসছিল এসআই আসাদ ও তার বন্ধুরা। তারা সীমান্ত এলাকা থেকে অস্ত্র এনে ঢাকায় বিভিন্ন সিন্ডিকেটের কাছে বিক্রি করতেন। একেকটি অস্ত্র তারা ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায় কিনে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করতেন বলে জানা গেছে।

আসাদ, সাইফুল ও মশিউর একসঙ্গে উত্তরা ইউনিভার্সিটিতে পড়তেন। ছাত্রাবস্থাতেই তারা অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। একসময় তাদের দলে যুক্ত হন মাহমুদুল, যিনি পেশায় রাজমিস্ত্রি। ছোটবেলা থেকেই তারা পরস্পরের পরিচিত। তবে মাহমুদুল পারিবারিক কারণে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারেননি। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, উত্তরা এলাকায় বিভিন্ন অপরাধী চক্রের কাছে অস্ত্র যোগান দিত সাইফুল, মাহমুদুল ও মশিউর। কিন্তু তারা ছাত্রলীগের লেবাস ব্যবহার করত। এ কারণে কেউ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে পারত না। আর তাদের সঙ্গে একজন এসআই জড়িত থাকার বিষয়টি র‌্যাবের অভিযানের পরই ধরা পড়ে। এসআই আসাদই তাদের শেল্টার দিতেন। এ বাণিজ্য থেকে তারা বড় অংকের অর্থ আয় করতেন। সম্প্রতি উত্তরা এলাকা থেকে সজীব নামে এক যুবককে অস্ত্রসহ আটক করা হয়, যিনি অস্ত্র কেনেন এ চক্রের কাছ থেকে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, উত্তরা ও তুরাগ এলাকায় সীমান্তের একটি সিন্ডিকেট অস্ত্র সরবরাহ করে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের কবির মিয়ার একটি সিন্ডিকেট সাইফুলদের কাছে অস্ত্র সরবরাহ করে। বেশিরভাগ অস্ত্র প্রথম দফায় মাহমুদুলের হাতে আসে। তার হাত হয়ে কখনও মোটরবাইক ব্যবহার করে এসআই আসাদ নিরাপদ আস্তানায় চলে যায়। চাকরির সুবাদে এসআই আসাদকে চেকপোস্টেও তল্লাশি করা হতো না। এ সুযোগ তিনি ও তার বন্ধুরা কাজে লাগান। বর্তমানে পুলিশসহ চার বন্ধুর ঠিকানা- কারাগারে আছেন।

র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক (সিও) লে. কর্নেল তুহিন মোহাম্মদ মাসুদ যুগান্তরকে বলেন, এসআই আসাদ ও তার বন্ধুরা গ্রেফতার হওয়ার পর একে-অপরকে দোষারোপ করেন। কিন্তু তাদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেছে, তারা আগে থেকেই এ অবৈধ ব্যবসায় জড়িত। তাদের সঙ্গে আরও অনেকেই জড়িত আছে। র‌্যাবের অধিনায়ক বলেন, নিজ এলাকায় গ্রেফতারকৃতদের দাপট ছিল। স্থানীয় হওয়ায় তারা অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছিল। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সেদিন কৌশলে তাদের গ্রেফতার করা হয়। এদের সঙ্গে সীমান্তের অস্ত্র ব্যবসায়ীদের যোগসাজশের তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান যুগান্তরকে বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে র‌্যাব প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই নানা কৌশল অবলম্বন করে অভিযান চালিয়ে আসছে। এ বাহিনী অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে ব্যাপক সফলতা দেখিয়েছে।


 

সাবমিট

চার বন্ধুর অস্ত্র বাণিজ্য

একসঙ্গে ওঠাবসা, একসঙ্গে কারাগারে
 সৈয়দ আতিক 
১৪ নভেম্বর ২০১৪, ১২:০০ এএম  | 

যেখানে বেড়ে ওঠা সেখানেই রাজনীতি। যেখানে রাজনীতি সেখানেই চাকরি। আবার যেখানে চাকরি সেখানেই অবৈধ অস্ত্রের বাণিজ্য। অতঃপর আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ। বিনিসুতোয় গাঁথা মালার মতো সত্যিকার অর্থে এমন ঘটনাই ঘটেছে এক পুলিশ, দুই ছাত্রলীগ নেতা এবং এক রাজমিস্ত্রির জীবনে। লোভে পড়ে তারা অস্ত্র ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ধরা পড়েন র‌্যাবের জালে।

গত ১০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উপপরিদর্শক (এসআই) আসাদুজ্জামান আসাদকে অস্ত্র বিক্রির সময় হাতেনাতে গ্রেফতার করে র‌্যাব-১। অস্ত্র বিক্রির চক্রটিকে গ্রেফতারের অভিযানে র‌্যাব সদস্যরাই ক্রেতা সেজে যান। ওই অভিযানে পুলিশের এসআই আসাদ ও তার তিনবন্ধু- মশিউর রহমান, সাইফুল ইসলাম এবং মাহমুদুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়। এদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ব্যবসার অভিযোগ এনে ৮ অক্টোবর র‌্যাব আদালতে চার্জশিট প্রদান করে।

চাঞ্চল্যকর তথ্য হল- অভিযুক্ত চার বন্ধুর জম্ম ও বেড়ে ওঠা এবং রাজনীতি করাসহ সবকিছুই উত্তরা এলাকাতে। তুরাগের নয়ানগরে এসআই আসাদের, তুরাগের নলভোগ পূর্ব পাড়ায় সাইফুলের, নলভোগে মাহমুদুল ইসলামের ও উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টরে মশিউর রহমানের বাসা। আসাদ তুরাগে বেড়ে ওঠেন। তারপর স্কুল-কলেজের সিঁড়ি বেয়ে উত্তরা ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন। সেখানে ছাত্রলীগ কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। অন্য বন্ধুরা ছাত্রলীগের উত্তরা ইউনিভার্সিটি কমিটির বিভিন্ন পদে ছিলেন। আসাদ দুই বছর আগে পুলিশের চাকরিতে যোগ দেন। আর ঘটনাচক্রে তার কর্মস্থলও হয় উত্তরা এলাকা। র‌্যাব কর্মকর্তারা বলেন, নিজ এলাকায় বেড়ে ওঠা ও আধিপত্যের কারণে নির্বিঘেœ অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা করে আসছিল এসআই আসাদ ও তার বন্ধুরা। তারা সীমান্ত এলাকা থেকে অস্ত্র এনে ঢাকায় বিভিন্ন সিন্ডিকেটের কাছে বিক্রি করতেন। একেকটি অস্ত্র তারা ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায় কিনে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করতেন বলে জানা গেছে।

আসাদ, সাইফুল ও মশিউর একসঙ্গে উত্তরা ইউনিভার্সিটিতে পড়তেন। ছাত্রাবস্থাতেই তারা অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। একসময় তাদের দলে যুক্ত হন মাহমুদুল, যিনি পেশায় রাজমিস্ত্রি। ছোটবেলা থেকেই তারা পরস্পরের পরিচিত। তবে মাহমুদুল পারিবারিক কারণে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারেননি। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, উত্তরা এলাকায় বিভিন্ন অপরাধী চক্রের কাছে অস্ত্র যোগান দিত সাইফুল, মাহমুদুল ও মশিউর। কিন্তু তারা ছাত্রলীগের লেবাস ব্যবহার করত। এ কারণে কেউ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে পারত না। আর তাদের সঙ্গে একজন এসআই জড়িত থাকার বিষয়টি র‌্যাবের অভিযানের পরই ধরা পড়ে। এসআই আসাদই তাদের শেল্টার দিতেন। এ বাণিজ্য থেকে তারা বড় অংকের অর্থ আয় করতেন। সম্প্রতি উত্তরা এলাকা থেকে সজীব নামে এক যুবককে অস্ত্রসহ আটক করা হয়, যিনি অস্ত্র কেনেন এ চক্রের কাছ থেকে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, উত্তরা ও তুরাগ এলাকায় সীমান্তের একটি সিন্ডিকেট অস্ত্র সরবরাহ করে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের কবির মিয়ার একটি সিন্ডিকেট সাইফুলদের কাছে অস্ত্র সরবরাহ করে। বেশিরভাগ অস্ত্র প্রথম দফায় মাহমুদুলের হাতে আসে। তার হাত হয়ে কখনও মোটরবাইক ব্যবহার করে এসআই আসাদ নিরাপদ আস্তানায় চলে যায়। চাকরির সুবাদে এসআই আসাদকে চেকপোস্টেও তল্লাশি করা হতো না। এ সুযোগ তিনি ও তার বন্ধুরা কাজে লাগান। বর্তমানে পুলিশসহ চার বন্ধুর ঠিকানা- কারাগারে আছেন।

র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক (সিও) লে. কর্নেল তুহিন মোহাম্মদ মাসুদ যুগান্তরকে বলেন, এসআই আসাদ ও তার বন্ধুরা গ্রেফতার হওয়ার পর একে-অপরকে দোষারোপ করেন। কিন্তু তাদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেছে, তারা আগে থেকেই এ অবৈধ ব্যবসায় জড়িত। তাদের সঙ্গে আরও অনেকেই জড়িত আছে। র‌্যাবের অধিনায়ক বলেন, নিজ এলাকায় গ্রেফতারকৃতদের দাপট ছিল। স্থানীয় হওয়ায় তারা অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছিল। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সেদিন কৌশলে তাদের গ্রেফতার করা হয়। এদের সঙ্গে সীমান্তের অস্ত্র ব্যবসায়ীদের যোগসাজশের তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান যুগান্তরকে বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে র‌্যাব প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই নানা কৌশল অবলম্বন করে অভিযান চালিয়ে আসছে। এ বাহিনী অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে ব্যাপক সফলতা দেখিয়েছে।


 

 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র