jugantor
জীবনবাদী কথানির্মাতা সুচিত্রা ভট্টাচার্য

  ফজলুল হক সৈকত  

১৫ মে ২০১৫, ০০:০০:০০  | 

সমকালীন বাংলা সাহিত্যের শক্তিশালী ও জনপ্রিয় কথানির্মাতা সুচিত্রা ভট্টাচার্য জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন কলকাতায়। শহরের মধ্যবিত্ত জীবন, সংসারের টানাপড়েন, দাম্পত্য সংকট ও সম্ভাবনা, নারীর সামাজিক অবস্থান, মানুষের মানুষে সম্পর্ক, নারীর সঙ্গে নারীর মিত্রত্ব-শত্র“তা, সমকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাত, কিশোরদের রহস্যাচ্ছন্ন মন, নারী-পুরুষের প্রেম, জীবনের বিচিত্র জটিলতা, বয়স্কদের পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যা তার কথাসাহিত্যের বিষয়-আশয়। লেখালেখি শুরু করেছেন কম বয়সে। আমৃত্যু চালিয়ে গেছেন সেই চর্চা। বিয়ের পর সামান্য বিরতি ছিল বটে।- এমনটা বাঙালি নারীর জন্য একেবারেই স্বাভাবিক। নতুন পরিবেশের মানুষদের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে খানিকটা সময় লাগে। অনেককে আবার পড়তে হয় প্রবল প্রতিকূলতার মধ্যেও। কিন্তু মনে-প্রাণে লেখক সুচিত্রা ভট্টাচার্য প্রাতিস্বিকতা থেকে দূরে সরে যাননি। ২০০৪ সাল থেকে তো সরকারি চাকরি ছেড়ে পূর্ণকালীন লেখকজীবন পার করেছেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার পর সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। হয়েছিলেন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও। কিন্তু লেখকসত্তা তাকে চাকরিতে স্থিত হতে দেয়নি। নব্বইয়ের দশকে কলকাতাসহ সারা ভারতে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেন কথাসাহিত্যিক সুচিত্রা। বাঁচতে চেয়েছেন সাহিত্য-সাধনার ভেতর দিয়ে। তবে মৃত্যুচিন্তা তার সাহিত্য ভাবনায় প্রবেশ করেছে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে। ‘আত্মজা’ নামক গল্পের শুরুটি পাঠ করে তার মৃত্যুচিন্তা সম্বন্ধে আমরা একটা ধারণা নিতে পারি- ‘মা আজ চলে গেল। একটু আগে বৈদ্যুতিক চুল্লির গহ্বরে ঢুকে গেছে মা। পুড়ছে। পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে দ্রুত। আমার যেন এখনও ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না।’- সুচিত্রার মৃত্যুর অব্যবহিত পরে ভারতের অনেক নামি-দামি শিল্পী-সাহিত্যিক-মিডিয়াকর্মী-অভিনেতা-নির্মাতা প্রায় একই সুরে বলেছেন- ‘তার মৃত্যুটা বিশ্বাস করতে পারছি না।’

মোট ২৪টি উপন্যাস এবং ২ শতাধিক ছোটগল্প লিখেছেন সুচিত্রা ভট্টাচার্য। পাঠকপ্রিয় গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘কাছের মানুষ’, ‘দহন’, ‘হেমন্তের পাখি’, ‘নীলঘূর্ণি’, ‘অলীক সুখ’, ‘ভাঙনকালে’, ‘তিনকন্যা’, ‘এখন হৃদয়’, ‘অন্য বসন্ত’, ‘ভালো মেয়ে খারাপ মেয়ে’, ‘পালাবার পথ নেই’, ‘অচিন পাখি’, ‘জোনাথনের বাড়ির ভূত’, ‘মেঘ পাহাড়’, ‘প্রেম-অপ্রেম’, ‘অর্ধেক আকাশ’, ‘গভীর অসুখ’, ‘চার দেয়াল’, ‘১০১ প্রেমের গল্প’, ‘কেরালায় কিস্তিমাত’, ‘পরবাস’, ‘ঝাও ঝিয়েন হত্যারহস্য’, ‘জলছবি’, ‘আয়নামহল’, ‘একা’, ‘শেষবেলায়’। ‘তিন মিতিন’ তার জনপ্রিয় গোয়েন্দাকাহিনী। কাহিনীর গোয়েন্দা চরিত্র ‘মিতিন মাসি’ পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করতে পেরেছে। সমকালের সরব কণ্ঠস্বর সুচিত্রা ভট্টাচার্যের রচনা ভারতের বিভিন্ন ভাষা- হিন্দি, তামিল, তেলেগু, মালায়লাম, ওড়িয়া, মারাঠী, গুজরাটি, পাঞ্জাবিসহ ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে।

সুচিত্রা ভট্টাচার্যের সাহিত্যিক জীবন দায় আর দায়িত্বের আবর্তে ঘেরা। লেখক পরিচিতি ধারণ করে তিনি কখনও কোনো সামাজিক সুবিধা নিতে চাননি। বরং সমাজে প্রবাহিত করতে চেয়েছেন ইতিবাচক পরিবর্তনের হাওয়া। প্রসঙ্গত, তুরস্কের কথানির্মাতা ওরহান পামুকের নোবেল ভাষণ থেকে খানিকটা অংশ উদ্ধৃত করছি-‘লেখক এমন একজন যে বছরের পর বছর ধৈর্য ধরে তার নিজের ভেতরের দ্বিতীয় সত্তা আবিষ্কারের চেষ্টায় থাকে এবং সেই সত্তাই তাকে নিরূপণ করে সে আসলে কে? কোনোকিছু লেখার কথা বলি যখন প্রথমেই যা মনে আসে আমার তা কোনো উপন্যাস, কবিতা বা সাহিত্যিক প্রথা নয়। বরং সেই লোকটিই আবির্ভূত হয় যে নিজেকে একটি ঘরে বন্দি রেখে টেবিলে বসে সব ধরনের অন্ধকারের মাঝে নিজের অন্তরটা আলগা করে, শব্দের পর শব্দ গেঁথে নতুন এক বিশ্ব সৃষ্টি করে।... মাঝে মধ্যে টেবিল থেকে উঠে দাঁড়িয়ে জানালা ছাড়িয়ে দূরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে পারে যেখানে হয়তো রাস্তায় ছেলেরা খেলা করছে বা ভাগ্যবান হলে গাছ-গাছালি বা অন্য কোনো দৃশ্য অথবা কালো কোনো দেয়ালের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে পারে।... লেখালেখির কাজ হচ্ছে অন্তর্নিহিত দৃষ্টিকে শব্দে রূপ দেয়া, বিশ্বকে নিরীক্ষণ করা যেখানে ব্যক্তি নিজেকে নিজের কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং ধৈর্য ও উৎফুল্ল মনে কাজটি করে।’ (‘বাবার সুটকেস’, অনুবাদ : ইরফান বাবুন, নোবেল ভাষণ : বাক্ থেকে পামুক : পাঁচ মহাদেশের দশ সাহিত্যরথী, ভূমিকা ও সম্পাদনা : হায়াৎ মামুদ, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ : ২০০৮, পৃষ্ঠা- ১১৮)-পামুকের এ চিন্তার সঙ্গে সুচিত্রার সাহিত্য-সাধনার যোগসূত্র রয়েছে। তিনি জীবনকে দেখেছেন একটি বিশেষ দর্শন থেকে এবং তা প্রকাশ করতে চেয়েছেন নিজের অনুভবকে সচেতন পাঠকের কাছে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য। সাধারণের কাছে চিন্তার শক্তি পৌঁছে দেয়াও তার একটি অভিলক্ষ্য বটে। পরিচিতি-সুনাম কিংবা পুরস্কারের মোহ তার ছিল না। কেবল ছিল সমাজকে ঠিকঠাকমতো কাজ করতে দেয়ার রাস্তা বাতলে দেয়ার অভিপ্রায়।

বৈঠকী মেজাজ আর হাসিখুশি মুখের মানুষ সুচিত্রা ভট্টাচার্য রাজনৈতিক-সামাজিক ঘটনাতেও সরব ছিলেন। এটি ছিল তার সামাজিক দায়বোধের প্রকাশ। তিনি কলম ও মুখ চালিয়েছেন সমানতালে- সাহসের সঙ্গে। আমরা তাকে পেয়েছি কাগজে ও রাস্তায়- চরিত্রসৃষ্টির উন্মাদনায়, মিছিলে-সমাবেশে, মানববন্ধনে কিংবা আলোচনার টেবিলে ও টেলিভিশনের পর্দায়। নারী সমাজের প্রতিনিধি হয়ে নারীর জীবনকে সুচিত্রা সাহিত্যে তুলে ধরেছেন শৈল্পিক আবহে। ভারতে নারীর অবস্থান এখনও ঠিক মর্যাদার জায়গাটা খুঁজে পায়নি। নানানভাবে নারীরা বঞ্চনার শিকার। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে কোনো কোনো নারী ভারতে বেশ প্রভাবের সঙ্গে বিচরণ করলেও প্রান্তিক পর্যায়ে নারীসমাজ ভয়ানকভাবে অনগ্রসর। বিশেষ করে পরিবারে নিজের অবস্থান এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর সামাজিক স্থান আজও নির্ধারিত হয়নি। তারা যেন পুরুষের হাতের ক্রীড়নক মাত্র। নারীর সামাজিক মর্যাদা-বিষয়ে সুচিত্রা ভট্টাচার্যের সরব সাহিত্য ‘দহন’, ‘রামধনু, ‘অলীক সুখ’ প্রভৃতি পাঠকপ্রিয় কাহিনী নিয়ে রচিত হয়েছে চলচ্চিত্রও। ধর্ষণের শিকার এক নারীর জীবন-যন্ত্রণার সাহিত্যিক-শৈল্পিক দলিল তার ‘দহন’। ভারতে ধর্ষণ একটি নৈমিত্তিক ব্যাপার। বাড়িতে, চলন্ত বাসে, পথে-ঘাটে নারীরা ধর্ষিত হচ্ছে। এ চিত্র সুচিত্রাকে ভাবিয়ে তুলেছে। ‘আমি রাই কিশোরী’ সুচিত্রার নারীবাদী চিন্তার উজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ। ‘কাঁচের দেয়াল’ আরেকটি পাঠকপ্রিয় রচনা, যেটি কলকাতার বিখ্যাত নাটকের দল ‘থিয়েটারওয়ালা’ প্রথম নাট্য-প্রযোজনা হিসেবে মঞ্চস্থ করেছে। মানুষের দিকে সুচিত্রার আন্তরিক নিবিড় দৃষ্টি সবসময়ই নিবদ্ধ ছিল। জীবনের বাঁক আর উত্থান-পতনের ছবি তাকে আকৃষ্ট করেছে। তার সমগ্র সাহিত্যে নাটকীয়তা একটি বিশেষ গুণ। কাহিনীগুলো প্রায় সবই মঞ্চায়নের দাবি রাখে। জীবননাট্যের এক জীবন্ত শিল্পী যেন তিনি। সুচিত্রার দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রকাশশৈলী অত্যন্ত সরল ও প্রাণবন্ত। এ-প্রসঙ্গে কলকাতার স্বনামখ্যাত নাট্য-অভিনেত্রী বিদীপ্তা চক্রবর্তী মন্তব্য করেছেন- ‘ওঁর যে কোনো লেখা পড়েই মনে হতো, এটা থেকে নাটক হতে পারে।’ (সূত্র: ‘শেষযাত্রায় সুচিত্র’, আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ১৩ মে ২০১৫) প্রখর চোখে মানুষের জীবন-নাটক থেকে উপাদান সংগ্রহ করেছেন সুচিত্রা। মানুষকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করার লড়াইয়ে নিয়োজিত এ শিল্পী সাহিত্যচর্চার জন্য জাতীয় ও গুরুত্বপূর্ণ অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

নিজের কালের এক নীরব বিপ্লবী প্রতিনিধি সুচিত্রা সমকালকে সমালোচনা করেছেন তীব্রভাবে। পাঠকের মনোরঞ্জনের জন্য একেবারেই লেখেননি সুচিত্রা। তিনি তার সময়ের মানুষের চিন্তার উঠানে বিচরণ করেছেন চেতনা ও পরিবর্তনের বারতা নিয়ে। মানুষকে জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছেন। উপলব্ধির জায়গাটায় টানতে চেয়েছেন একটা মৃদু কিংবা প্রবল আঁচড়। আধুনিকতার সব মাল-মশলার সরব-স্বচ্ছ উপস্থিতি ছিল তার চিন্তায় ও কর্মে। সাহসী এ নারীর কাহিনীতে মুখ্য চরিত্রও নারী। অশিক্ষা, অনগ্রসরতা আর অসচেতনতা যে মানুষের জীবনে অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়, তা সুচিত্রা অনুভব করেছেন। সুন্দরভাবে সেই অনুভূতি সবার জন্য লিখে প্রকাশও করেছেন। ‘আত্মজা’ গল্পটি শেষে কথক তার মৃত মায়ের কণ্ঠস্বর শুনতে পায়। কাহিনীর শেষটা তুলে দিচ্ছি- ‘বাবলু...? মার গলা। মারই গলা! এও কি বিভ্রম? আমার পা মাটিতে গেঁথে গেল। সম্মোহিতের মতো বলে উঠেছি- কী হল মা? কিছু বলবে! চেনা স্বর কেমন দুলে দুলে গেল, আমায় মাপ করে দিস বাবলু! মৃত্যুটা যে আমার হাতে ছিল না রে!’

সুচিত্রার গলা আর আমরা শুনব না, আগামী পুজো সংখ্যায় তার কোনো লেখা প্রকাশ হবে না। হয়তো কিছু অপ্রকাশিত লেখার খোঁজখবর পাওয়া যাবে। চেনা স্বরের এ মানুষটিকে কি আমরা কেবল মাপ করেই ক্ষান্ত হব?- নাকি মনেও রাখব কিছুকাল? মরণ কি চিরতরে থামিয়ে দেবে তার সারা জীবনের সাধনা ও সংগ্রাম?


 

সাবমিট

জীবনবাদী কথানির্মাতা সুচিত্রা ভট্টাচার্য

 ফজলুল হক সৈকত 
১৫ মে ২০১৫, ১২:০০ এএম  | 

সমকালীন বাংলা সাহিত্যের শক্তিশালী ও জনপ্রিয় কথানির্মাতা সুচিত্রা ভট্টাচার্য জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন কলকাতায়। শহরের মধ্যবিত্ত জীবন, সংসারের টানাপড়েন, দাম্পত্য সংকট ও সম্ভাবনা, নারীর সামাজিক অবস্থান, মানুষের মানুষে সম্পর্ক, নারীর সঙ্গে নারীর মিত্রত্ব-শত্র“তা, সমকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাত, কিশোরদের রহস্যাচ্ছন্ন মন, নারী-পুরুষের প্রেম, জীবনের বিচিত্র জটিলতা, বয়স্কদের পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যা তার কথাসাহিত্যের বিষয়-আশয়। লেখালেখি শুরু করেছেন কম বয়সে। আমৃত্যু চালিয়ে গেছেন সেই চর্চা। বিয়ের পর সামান্য বিরতি ছিল বটে।- এমনটা বাঙালি নারীর জন্য একেবারেই স্বাভাবিক। নতুন পরিবেশের মানুষদের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে খানিকটা সময় লাগে। অনেককে আবার পড়তে হয় প্রবল প্রতিকূলতার মধ্যেও। কিন্তু মনে-প্রাণে লেখক সুচিত্রা ভট্টাচার্য প্রাতিস্বিকতা থেকে দূরে সরে যাননি। ২০০৪ সাল থেকে তো সরকারি চাকরি ছেড়ে পূর্ণকালীন লেখকজীবন পার করেছেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার পর সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। হয়েছিলেন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও। কিন্তু লেখকসত্তা তাকে চাকরিতে স্থিত হতে দেয়নি। নব্বইয়ের দশকে কলকাতাসহ সারা ভারতে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেন কথাসাহিত্যিক সুচিত্রা। বাঁচতে চেয়েছেন সাহিত্য-সাধনার ভেতর দিয়ে। তবে মৃত্যুচিন্তা তার সাহিত্য ভাবনায় প্রবেশ করেছে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে। ‘আত্মজা’ নামক গল্পের শুরুটি পাঠ করে তার মৃত্যুচিন্তা সম্বন্ধে আমরা একটা ধারণা নিতে পারি- ‘মা আজ চলে গেল। একটু আগে বৈদ্যুতিক চুল্লির গহ্বরে ঢুকে গেছে মা। পুড়ছে। পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে দ্রুত। আমার যেন এখনও ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না।’- সুচিত্রার মৃত্যুর অব্যবহিত পরে ভারতের অনেক নামি-দামি শিল্পী-সাহিত্যিক-মিডিয়াকর্মী-অভিনেতা-নির্মাতা প্রায় একই সুরে বলেছেন- ‘তার মৃত্যুটা বিশ্বাস করতে পারছি না।’

মোট ২৪টি উপন্যাস এবং ২ শতাধিক ছোটগল্প লিখেছেন সুচিত্রা ভট্টাচার্য। পাঠকপ্রিয় গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘কাছের মানুষ’, ‘দহন’, ‘হেমন্তের পাখি’, ‘নীলঘূর্ণি’, ‘অলীক সুখ’, ‘ভাঙনকালে’, ‘তিনকন্যা’, ‘এখন হৃদয়’, ‘অন্য বসন্ত’, ‘ভালো মেয়ে খারাপ মেয়ে’, ‘পালাবার পথ নেই’, ‘অচিন পাখি’, ‘জোনাথনের বাড়ির ভূত’, ‘মেঘ পাহাড়’, ‘প্রেম-অপ্রেম’, ‘অর্ধেক আকাশ’, ‘গভীর অসুখ’, ‘চার দেয়াল’, ‘১০১ প্রেমের গল্প’, ‘কেরালায় কিস্তিমাত’, ‘পরবাস’, ‘ঝাও ঝিয়েন হত্যারহস্য’, ‘জলছবি’, ‘আয়নামহল’, ‘একা’, ‘শেষবেলায়’। ‘তিন মিতিন’ তার জনপ্রিয় গোয়েন্দাকাহিনী। কাহিনীর গোয়েন্দা চরিত্র ‘মিতিন মাসি’ পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করতে পেরেছে। সমকালের সরব কণ্ঠস্বর সুচিত্রা ভট্টাচার্যের রচনা ভারতের বিভিন্ন ভাষা- হিন্দি, তামিল, তেলেগু, মালায়লাম, ওড়িয়া, মারাঠী, গুজরাটি, পাঞ্জাবিসহ ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে।

সুচিত্রা ভট্টাচার্যের সাহিত্যিক জীবন দায় আর দায়িত্বের আবর্তে ঘেরা। লেখক পরিচিতি ধারণ করে তিনি কখনও কোনো সামাজিক সুবিধা নিতে চাননি। বরং সমাজে প্রবাহিত করতে চেয়েছেন ইতিবাচক পরিবর্তনের হাওয়া। প্রসঙ্গত, তুরস্কের কথানির্মাতা ওরহান পামুকের নোবেল ভাষণ থেকে খানিকটা অংশ উদ্ধৃত করছি-‘লেখক এমন একজন যে বছরের পর বছর ধৈর্য ধরে তার নিজের ভেতরের দ্বিতীয় সত্তা আবিষ্কারের চেষ্টায় থাকে এবং সেই সত্তাই তাকে নিরূপণ করে সে আসলে কে? কোনোকিছু লেখার কথা বলি যখন প্রথমেই যা মনে আসে আমার তা কোনো উপন্যাস, কবিতা বা সাহিত্যিক প্রথা নয়। বরং সেই লোকটিই আবির্ভূত হয় যে নিজেকে একটি ঘরে বন্দি রেখে টেবিলে বসে সব ধরনের অন্ধকারের মাঝে নিজের অন্তরটা আলগা করে, শব্দের পর শব্দ গেঁথে নতুন এক বিশ্ব সৃষ্টি করে।... মাঝে মধ্যে টেবিল থেকে উঠে দাঁড়িয়ে জানালা ছাড়িয়ে দূরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে পারে যেখানে হয়তো রাস্তায় ছেলেরা খেলা করছে বা ভাগ্যবান হলে গাছ-গাছালি বা অন্য কোনো দৃশ্য অথবা কালো কোনো দেয়ালের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে পারে।... লেখালেখির কাজ হচ্ছে অন্তর্নিহিত দৃষ্টিকে শব্দে রূপ দেয়া, বিশ্বকে নিরীক্ষণ করা যেখানে ব্যক্তি নিজেকে নিজের কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং ধৈর্য ও উৎফুল্ল মনে কাজটি করে।’ (‘বাবার সুটকেস’, অনুবাদ : ইরফান বাবুন, নোবেল ভাষণ : বাক্ থেকে পামুক : পাঁচ মহাদেশের দশ সাহিত্যরথী, ভূমিকা ও সম্পাদনা : হায়াৎ মামুদ, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ : ২০০৮, পৃষ্ঠা- ১১৮)-পামুকের এ চিন্তার সঙ্গে সুচিত্রার সাহিত্য-সাধনার যোগসূত্র রয়েছে। তিনি জীবনকে দেখেছেন একটি বিশেষ দর্শন থেকে এবং তা প্রকাশ করতে চেয়েছেন নিজের অনুভবকে সচেতন পাঠকের কাছে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য। সাধারণের কাছে চিন্তার শক্তি পৌঁছে দেয়াও তার একটি অভিলক্ষ্য বটে। পরিচিতি-সুনাম কিংবা পুরস্কারের মোহ তার ছিল না। কেবল ছিল সমাজকে ঠিকঠাকমতো কাজ করতে দেয়ার রাস্তা বাতলে দেয়ার অভিপ্রায়।

বৈঠকী মেজাজ আর হাসিখুশি মুখের মানুষ সুচিত্রা ভট্টাচার্য রাজনৈতিক-সামাজিক ঘটনাতেও সরব ছিলেন। এটি ছিল তার সামাজিক দায়বোধের প্রকাশ। তিনি কলম ও মুখ চালিয়েছেন সমানতালে- সাহসের সঙ্গে। আমরা তাকে পেয়েছি কাগজে ও রাস্তায়- চরিত্রসৃষ্টির উন্মাদনায়, মিছিলে-সমাবেশে, মানববন্ধনে কিংবা আলোচনার টেবিলে ও টেলিভিশনের পর্দায়। নারী সমাজের প্রতিনিধি হয়ে নারীর জীবনকে সুচিত্রা সাহিত্যে তুলে ধরেছেন শৈল্পিক আবহে। ভারতে নারীর অবস্থান এখনও ঠিক মর্যাদার জায়গাটা খুঁজে পায়নি। নানানভাবে নারীরা বঞ্চনার শিকার। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে কোনো কোনো নারী ভারতে বেশ প্রভাবের সঙ্গে বিচরণ করলেও প্রান্তিক পর্যায়ে নারীসমাজ ভয়ানকভাবে অনগ্রসর। বিশেষ করে পরিবারে নিজের অবস্থান এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর সামাজিক স্থান আজও নির্ধারিত হয়নি। তারা যেন পুরুষের হাতের ক্রীড়নক মাত্র। নারীর সামাজিক মর্যাদা-বিষয়ে সুচিত্রা ভট্টাচার্যের সরব সাহিত্য ‘দহন’, ‘রামধনু, ‘অলীক সুখ’ প্রভৃতি পাঠকপ্রিয় কাহিনী নিয়ে রচিত হয়েছে চলচ্চিত্রও। ধর্ষণের শিকার এক নারীর জীবন-যন্ত্রণার সাহিত্যিক-শৈল্পিক দলিল তার ‘দহন’। ভারতে ধর্ষণ একটি নৈমিত্তিক ব্যাপার। বাড়িতে, চলন্ত বাসে, পথে-ঘাটে নারীরা ধর্ষিত হচ্ছে। এ চিত্র সুচিত্রাকে ভাবিয়ে তুলেছে। ‘আমি রাই কিশোরী’ সুচিত্রার নারীবাদী চিন্তার উজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ। ‘কাঁচের দেয়াল’ আরেকটি পাঠকপ্রিয় রচনা, যেটি কলকাতার বিখ্যাত নাটকের দল ‘থিয়েটারওয়ালা’ প্রথম নাট্য-প্রযোজনা হিসেবে মঞ্চস্থ করেছে। মানুষের দিকে সুচিত্রার আন্তরিক নিবিড় দৃষ্টি সবসময়ই নিবদ্ধ ছিল। জীবনের বাঁক আর উত্থান-পতনের ছবি তাকে আকৃষ্ট করেছে। তার সমগ্র সাহিত্যে নাটকীয়তা একটি বিশেষ গুণ। কাহিনীগুলো প্রায় সবই মঞ্চায়নের দাবি রাখে। জীবননাট্যের এক জীবন্ত শিল্পী যেন তিনি। সুচিত্রার দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রকাশশৈলী অত্যন্ত সরল ও প্রাণবন্ত। এ-প্রসঙ্গে কলকাতার স্বনামখ্যাত নাট্য-অভিনেত্রী বিদীপ্তা চক্রবর্তী মন্তব্য করেছেন- ‘ওঁর যে কোনো লেখা পড়েই মনে হতো, এটা থেকে নাটক হতে পারে।’ (সূত্র: ‘শেষযাত্রায় সুচিত্র’, আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ১৩ মে ২০১৫) প্রখর চোখে মানুষের জীবন-নাটক থেকে উপাদান সংগ্রহ করেছেন সুচিত্রা। মানুষকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করার লড়াইয়ে নিয়োজিত এ শিল্পী সাহিত্যচর্চার জন্য জাতীয় ও গুরুত্বপূর্ণ অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

নিজের কালের এক নীরব বিপ্লবী প্রতিনিধি সুচিত্রা সমকালকে সমালোচনা করেছেন তীব্রভাবে। পাঠকের মনোরঞ্জনের জন্য একেবারেই লেখেননি সুচিত্রা। তিনি তার সময়ের মানুষের চিন্তার উঠানে বিচরণ করেছেন চেতনা ও পরিবর্তনের বারতা নিয়ে। মানুষকে জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছেন। উপলব্ধির জায়গাটায় টানতে চেয়েছেন একটা মৃদু কিংবা প্রবল আঁচড়। আধুনিকতার সব মাল-মশলার সরব-স্বচ্ছ উপস্থিতি ছিল তার চিন্তায় ও কর্মে। সাহসী এ নারীর কাহিনীতে মুখ্য চরিত্রও নারী। অশিক্ষা, অনগ্রসরতা আর অসচেতনতা যে মানুষের জীবনে অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়, তা সুচিত্রা অনুভব করেছেন। সুন্দরভাবে সেই অনুভূতি সবার জন্য লিখে প্রকাশও করেছেন। ‘আত্মজা’ গল্পটি শেষে কথক তার মৃত মায়ের কণ্ঠস্বর শুনতে পায়। কাহিনীর শেষটা তুলে দিচ্ছি- ‘বাবলু...? মার গলা। মারই গলা! এও কি বিভ্রম? আমার পা মাটিতে গেঁথে গেল। সম্মোহিতের মতো বলে উঠেছি- কী হল মা? কিছু বলবে! চেনা স্বর কেমন দুলে দুলে গেল, আমায় মাপ করে দিস বাবলু! মৃত্যুটা যে আমার হাতে ছিল না রে!’

সুচিত্রার গলা আর আমরা শুনব না, আগামী পুজো সংখ্যায় তার কোনো লেখা প্রকাশ হবে না। হয়তো কিছু অপ্রকাশিত লেখার খোঁজখবর পাওয়া যাবে। চেনা স্বরের এ মানুষটিকে কি আমরা কেবল মাপ করেই ক্ষান্ত হব?- নাকি মনেও রাখব কিছুকাল? মরণ কি চিরতরে থামিয়ে দেবে তার সারা জীবনের সাধনা ও সংগ্রাম?


 

 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র