¦
জলের সৌন্দর্য জলজ ফুল

ড. মোঃ শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া | প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০১৫

বাংলাদেশের অধিকাংশ ভূমিই সমতল প্লাবনভূমি। এ দেশে রয়েছে বহু নদী-নালা, খাল-বিল আর হাওর-বাঁওড়। এসব জলজ পরিবেশে যেসব ফুলগাছ জন্মায় সেগুলোর প্রায় সবই বাংলাদেশ আর ভারতের নিজস্ব উদ্ভিদ। এ অঞ্চলের জল-হাওয়া আর মৃত্তিকায় এদের উৎপত্তি ঘটেছে। সে কারণেই এরা আমাদের একেবারে নিজস্ব ফুল। এদের কোনো কোনো ফুলের শোভা মনোমুগ্ধকর।
জলজ উদ্ভিদ দু’রকমের। মাটির সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে তেমন জলজ উদ্ভিদ বেশি। এদের ভূ-আশ্রয়ী জলজ উদ্ভিদ বলা হয়। শাপলা-শালুক, লাল বা সাদা পদ্মফুল, রক্ত কমল, চাঁদমালা এসবই ভূ-আশ্রয়ী স্বভাবের জলজ ফুল। পানির ভেতর দিয়ে এদের নরম কাণ্ড চলে গেছে মাটির নিচ পর্যন্ত।
আমাদের বিল-ঝিল, পুকুর, খাল এসব জলাশয়ে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় যে ফুল সেটি হল শাপলা। নানা বর্ণের শাপলা রয়েছে- নীল, লাল, সাদা, নীল-সাদাটে ইত্যাদি। বর্ষার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে শাপলার নরম আর ফাঁপা কাণ্ডটিও। পানির ওপর দণ্ডায়মান শাপলাগাছের গোড়া কিন্তু থাকে পানির নিচে কাদার ভেতর। এরা পানির ওপর হৃৎপিণ্ড আকৃতির এক একটি বড় পাতা মেলে থাকে। অযত্ন-অবহেলায় বেড়ে ওঠে এ জলজ ফুলগাছটি। শাপলা বাংলাদেশের জাতীয় ফুল। খরিফ মৌসুমে এদের সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। শাপলার কলি বোঁটায় বসে থাকা লম্বাটে সরু মাথা ডিমের মতো হয়। অনেকগুলো সুগন্ধি পাপড়ির বিন্যাসে শাপলা ফুল। মাঝখানে সুন্দর হলুদ পরাগ স্তবক। সাদা রঙের শাপলা ফোটে রাতের স্নিগ্ধতায়। দিনের আলোয় আস্তে আস্তে এর পাপড়িগুলো বুজে যায়। এ কারণেই শাপলার আরেক নাম ‘কুমুদ’। শাপলা ফুলের জীবনকাল প্রায় সপ্তাহখানেক। মজার বিষয় হল- শাপলা ফুল সবসময় খোলা অবস্থায় থাকে না। প্রতিদিনই কিছু সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায় এর পাপড়ি। আর সবচেয়ে মজার বিষয় এই যে, কোনো ফুলের আজ যে সময় পাপড়ি মেলে, কাল পাপড়ি মেলবে ঠিক তার এক ঘণ্টা পর। আবার আজ যে সময় ফুলের পাপড়ি বন্ধ হয়েছে কাল সে ফুলের পাপড়ি বন্ধ হবে এক ঘণ্টা পর। শাপলা ফুল গোলাকার ফল বীজে ঠাসা থাকে। বীজ শুকিয়ে ভেজে নিলে সুন্দর খৈ হয়। শাপলার নলের তরকারি বেশ জনপ্রিয়। শহরেও রয়েছে এর কদর।
শাপলারই আর এক আত্মীয় হল নীল কমল। দেখতে অনেক মিল। নীল কমলের ফুলের বর্ণ হালকা নীল। শাপলার মতো দেখতে আর একটি জলজ উদ্ভিদ হল রক্ত কমল। ফুলগুলো ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার চওড়া। পাতাগুলো শাপলার পাতার চেয়ে একটু বড়।
বাংলাদেশের আরেকটি প্রধান জলজ সপুষ্পক উদ্ভিদ হল পদ্ম। এরা ভূ-আশ্রয়ী জলজ ফুল। পানির ওপর ফুল ফুটলেও মূল প্রোথিত থাকে মাটিতে। পাতা গোলাকার, ভেসে থাকে পানির খানিকটা ওপরেই। পদ্ম ফুলের বর্ণ হতে পারে লাল, নীল কিংবা সাদা। জলজ ফুলের রানী বলা হয় পদ্মকে। লাল দেখতে যে পদ্ম তার নাম লালপদ্ম বা রক্তপদ্ম। সাদা ফুলের পদ্মকে বলা হয় শ্বেতপদ্ম। কাশ্মীর আর ইরানের পদ্মফুল আবার নীল বর্ণের। পদ্ম ভারতের জাতীয় ফুল। ফুল ফোটে প্রধানত শরৎকালে। কখনও আবার বর্ষাকালেও পদ্মের দেখা মেলে। প্রজাতি ভেদে লম্বা বোঁটায় ফোটে লাল বা সাদা ফুল। সুগন্ধি আর অনেকগুলো পাপড়িতে সজ্জিত থাকে বলে পদ্ম মানুষের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। ফুলের বোঁটায় কাঁটার প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেদ করে তুলে আনতে হয় ফুল বা ফল। ফলের ভেতর বিদ্যমান বাদামি বীজগুলো খাবারযোগ্য। সূর্য ওঠার সময় ফোটে বলে এদের নাম হল পদ্ম। কাদার ভেতর থেকে ডগা বেরিয়ে আসে বলে এ ডগার নাম মৃণাল। কাদা থেকে মৃণাল পানির ওপরে উঠে এসে তৈরি করে পদ্মগাছ। এজন্য এর নাম কমলও।
ভিক্টোরিয়া রিজিয়া হল আরেক প্রজাতির পদ্ম। বিশাল বড় পাতা, ফুলও তাই। ফুল প্রায় প্রশস্তে এক ফুট আর পাতার প্রশস্ততা তিন থেকে চার ফুট। এ কারণেই বাংলায় এর আরেক নাম দেওপদ্ম। পাতার কিনারা এমনভাবে ঊর্ধ্বপানে উত্থিত, এটিকে দেখলে বিশাল থালার মতো মনে হয়। কণ্টকময় পাতা, বোঁটা এবং ফুলের বৃতাংশ। বড় গামলায় পানি ভরে একে লালন-পালন করা যায় নির্দিষ্ট একটা সময় পর্যন্ত।
মাখনা ছোট আকৃতির এক প্রজাতির জলজ গাছ। গাছটি অনাকর্ষণীয় হলেও ফুলগুলো বেশ আকর্ষণীয়। ছোট ছোট ফুল, চমৎকার নীল বা গোলাপি ফুল ভেসে থাকে পানির ওপর। ফোটে শীতের শেষে। এদের পাতাগুলো কিন্তু বেশ বড়। চওড়ায় ৪০ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার। ফলের বাইরে কাঁটার প্রতিরক্ষা। তারপরও ফলের বীজ বেশ লোভনীয় কারও কারও কাছে।
চাঁদমালা লতানো এক প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ। গোল গোল পাতা ভেসে থাকে পানির ওপর। ছোট সাদা ফুল আর গোল ফলগুলোতে দেখতে দারুণ লাগে চাঁদমালাকে। এটি এ দেশেরই জলজ উদ্ভিদ।
পানশূল হল আর এক প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ। সাদা শাপলার মতো ফুলের আকৃতি হলেও আকারে অনেকটা ছোট।
বর্ষাকালে বিল-পুকুর আর ডোবায় ফোটে বুনো কলমিলতা ফুল। কাদা পানির পরিবেশে কলমিলতার সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে। খুব দ্রুতই জায়গা দখল করে নেয় এ লতানো স্বভাবের জলজ গাছ। অনেক ফুল ফোটে একসঙ্গে। দেখতে তখন খুবই সুন্দর লাগে। বেগুনি রঙের নলাকার এ ফুলের খুব একটা সমাদর না থাকলেও সৌন্দর্য বিলিয়ে দিতে এরা কোনো কার্পণ্য করে না।
ব্রাজিল থেকে সৌখিন কোনো পুষ্পপ্রেমিকের হাত ধরে এদেশে চলে এসেছে কচুরিপানা। চমৎকার এর পুষ্পমঞ্জুরি। ডাঁটায় ফুটে থাকা হালকা বেগুনি ফুলগুলোর রূপ বেশ চোখ জুড়ানো। দ্রুত বাড়ে বলে পুকুর আর বিলে এর বেশ দাপট। ফসলের মাঠও এরা নষ্ট করে দেয়। তবে এদের অপকারী ভূমিকা ছাপিয়ে কিছু উপকারী ভূমিকাও রয়েছে। এদের পচিয়ে নিলে ভালো জৈব সার হয়। দেশের অনেক স্থানে কচুরিপানার পর কচুরিপানা রেখে তৈরি করা হয় ভাসমান ধাপ। তার ওপর চলে কাদামাটির আস্তরণ দিয়ে ভাসমান সবজি চাষ। কচুরিপানা দিয়ে সবজির মাঠে এখন পানি ধরে রাখার কাজ করা হয়। লাউ গাছের গোড়ায় দেয়া হয় যাতে পানি উবে না যেতে পারে। গবেষণা করলে হয়তো অরও অনেক উপকারে আসতে পারে এ জলজ উদ্ভিদটি।
স্থলে নয় জলেও হতে পারে চমৎকার উদ্যান। বড় বাগানের মাঝখানে একটি শান বাঁধানো পুকুর। পুকুরের স্বচ্ছ জলে শাপলা-শালুক, পদ্মগাছে ফুটে আছে সাদা, লাল কিংবা অন্য কোনো বর্ণের পদ্মফুল। শরৎকালে জলাভূমিতে ফুটে থাকা এসব ফুল মনের মধ্যে অন্যরকম এক অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। বাগানের মাঝে এরকম একটি জলোদ্যান একেবারে বিরল নয় আমাদের দেশে। একটুখানি ভালোবাসা, যত্ন আর মনোযোগ দিলে দেশের অনেক জলাশয়ে গড়ে তোলা যায় জলোদ্যান। সবচেয়ে কম খরচে একটুখানি মমতার পরশ তৈরি করতে পারে নান্দনিক শোভা।
লেখক : ফসল উন্নয়ন গবেষক, উদ্ভাবক ও লেখক
 

প্রকৃতি ও জীবন পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close