jugantor
রাধারমণ দত্ত আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার

  মরতুজা আহমদ  

২৩ নভেম্বর ২০১৫, ০০:০০:০০  | 

প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্যের অপূর্ব লীলাভূমি সুনামগঞ্জ। প্রকৃতির মতোই সরল এখানকার মানুষের জীবন। নদী, হাওর, বাঁওড় বেষ্টিত এ জনপদ আবহমানকাল ধরে সৃষ্টি করেছে সুরের দ্যোতনা। হিজল করচ, পারিজাই পাখি আর জীববৈচিত্র্যের আধার- ভাটির এ জনপদ নিজেদের সংস্কৃতির পাশাপাশি আমাদের জাতীয় জীবনের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারাকে আলোকিত করেছে। ধান ও গান সুনামগঞ্জের ঐতিহ্য। যুগ যুগ ধরে এ মাটিতে জন্মেছেন তত্ত্বসাহিত্যের অনেক কবি, খুব সহজে বললে বাউল। এ মাটি আবহমানকাল ধরে বাংলার লোকগীতিকে করেছে সমৃদ্ধ। ভৌগোলিক পরিবেশের স্বতন্ত্র আর ঋতুভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে এ অঞ্চল বাউল গান আর লোকসঙ্গীতের বিভিন্ন স্বতন্ত্রধারা প্রতিষ্ঠার এক অনন্য School of Thought হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দেশবরেণ্য অসংখ্য আউল-বাউলের জন্মভূমি হচ্ছে এ অঞ্চল।

এই ধারাবাহিকতায় এ জনপদে জন্মগ্রহণ করেছেন মরমি কবি হাসন রাজা, শাহ আবদুল করিম, রাধারমণ দত্ত, সৈয়দ শাহনুর, সৈয়দ হোসেন আলম, দূরবীন শাহ, কালাশাহ, ছাবাল শাহ, এলাহী বক্স মুন্সী, শাহ আছদ আলী, পীর মজির উদ্দিন, আফজল শাহ শীতালং শাহ, আরকুম শাহ এবং আরও অনেকে। তাদের সৃষ্ট বাউল গান, সারি গান, জারি গান, বিয়ের গান, মালজোড়া বা কবি গান, ভাটিয়ালি গান, ঘেঁটু গান, কীর্তন, গাজীর গান, ধামাইল আমাদের এ অঞ্চলকে এক বিশেষ উচ্চতায় আসীন করেছে। রাধারমণ দত্ত সেই লোকায়ত সমাজের শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি ও মহীরুহ।

বাংলার এ স্বনামধন্য বাউল রাধারমণ দত্ত ১৮৩৩ সালে (১২৪০ বঙ্গাব্দে) সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামে বিখ্যাত দত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম রাধারমণদত্ত পুরকায়স্থ। তিনি মরমি সাধক হাসন রাজার (১৮৫৪-১৯২২) অগ্রজ সমসাময়িক। তিনি শুধু লোকসঙ্গীত রচনাকার নন, গান রচনায় সংখ্যার দিক থেকে বাংলার সব লোককবিদের ছাড়িয়ে সবার ঊর্ধ্বে ঝলমলে এক নক্ষত্র। তত্ত্বসাহিত্যের দিকপাল এবং সর্বজনীন এ কবি ৩০০০-এর অধিক গান লিখেছেন। বাংলা লোকসঙ্গীতের ইতিহাসে ক’জন তার সমপরিমাণ গান লিখেছেন মোটাদাগে বলতে গেলে আমার জানা নেই।

রাধারমণ দত্তের পূর্বপুরুষের জন্মস্থান ভারতের বীরভূম জেলায়। তার পূর্বপুরুষের কেউ কেউ অবিভক্ত ভারতে ও ছোট ছোট খণ্ডরাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন। তার পিতা রাধামাধব দত্ত পুরকায়স্থ বাংলা সাহিত্যের কবি ছিলেন এবং তিনি সংস্কৃত ভাষায়ও সুপণ্ডিত ছিলেন। তিনি কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দ কাব্যের বাংলা অনুবাদ করেন। এছাড়া রাধামাধব দত্ত কৃষ্ণলীলা কাব্য, পদ্মপুরাণ, সূর্যব্রত পাঁচালি ও গোবিন্দভোগের গান রচনা করেছিলেন।

পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা এবং অনুপ্রেরণায় ছোটবেলা থেকেই রাধারমণ নিজ ধর্মের প্রতি অনুরাগী হয়ে পড়েন এবং উপাসনার প্রধান অবলম্বন হিসেবে আধ্যাত্মিক গান রচনায় মনোনিবেশ করেন। ১২৫০ বঙ্গাব্দে তিনি পিতৃহারা হন এবং মা সুবর্ণা দেবীর কাছে বড় হতে থাকেন। ১২৭৫ বঙ্গাব্দে মৌলভীবাজারের আদপাশা গ্রামে শ্রী চৈতন্যদেবের অন্যতম পার্ষদ সেন শিবানন্দ বংশীয় নন্দকুমার সেন অধিকারীর কন্যা গুণময়ী দেবীকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে চার ছেলে ছিল। কিন্তু ছেলে বিপিনবিহারি ছাড়া স্ত্রী ও বাকিরা মারা গেলে তিনি সংসার জীবন সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়েন। তার গানের মাঝেও পুত্রশোকের বিষয়টি কষ্ট প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে উঠে এসেছে।

১৮৮৩ সালে (১২৯০ বঙ্গাব্দে) সংসার-জীবনের বেড়াজাল ছিন্ন করে রাধারমণ দত্ত মৌলভীবাজারের অন্তর্গত ইটা পরগনার ঢেউপাশা গ্রামের প্রখ্যাত বৈষ্ণবসাধু রঘুনাথ ভট্টাচার্যের কাছে দীক্ষা লাভ করেন। অতঃপর তিনি নিজভূমে এসে জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওরের পাড়ে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। এ আশ্রমেই তার লৌকিক ক্রিয়াকর্ম, সাধন-ভজনার শুরু। তিনি রাতদিন এ আশ্রমে স্রষ্টার ধ্যানে-মগ্ন থাকতেন। এ বৈরাগ্য জীবনই তাকে আজকে এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। বৈরাগ্য ভাবনার খুঁটিনাটি বিষয় চিন্তা তার সঙ্গীত জগৎকে দ্যুতিময় করে তুলেছে। রাধারমণ দত্ত তার গানে বৈরাগ্য-জীবনের কথা উল্লেখ করেন, ‘আমার বন্ধু দয়াময়, তোমারে দেখিবার মনে লয়’, ‘অবলার মনের অনল গো সই নিভে না, প্রেম শেল বিন্দিল বুকে বাইরে আসে না’।

কষ্ট ও বিচ্ছেদের রূপচিত্র তার গানে ও ভণিতায় বিভিন্নভাবে ফুটে উঠেছে। ‘কারে দেখাব মনের দুঃখ গো আমি বুক চিরিয়া অন্তরে তুষের অনল জ্বলে গইয়া গইয়া’ কিংবা ‘আমি রব না রব না গৃহে বন্ধু বিনে প্রাণ বাঁচে না’ অথবা ‘পালিতে পালিছিলাম পাখি দুধ-কলা দিয়া, এগো যাইবার কালে বেইমানে পাইখ্যে না চাইলো ফিরিয়া’ ইত্যাদি। এছাড়া ‘শ্যাম কালিয়া প্রাণ বন্ধুরে নিরলে তোমারে পাইলাম না’, ‘মনে নাই গো, আমার বন্ধুয়ার মনে নাই’- ইত্যাদি গানের সঙ্গে আমাদের অনেক আবেগ মিশ্রিত।

রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থ শুধু একটি সুপরিচিত নাম নয়, একটি প্রতিষ্ঠান। তার সঙ্গীতের গাঁথুনিতে আমাদের বাস্তব জীবনের অনেক ছবি বাঙময় হয়ে ফুটে উঠেছে, তার গানে সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলের বর্ণনা ও জীবনাচার লক্ষ করা যায়- যা সমাজ বাস্তবতারই প্রতিফলন। ‘ভ্রমর কইও গিয়া শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে অঙ্গ যায় জলিয়া’ অথবা ‘কালায় প্রাণটি নিল বাঁশিটি বাজাইয়া’ অথবা ‘আজ কেন-রে প্রাণের সবুল রাই এলনা যমুনা-তে’ প্রভৃতি পদে বিরহ কাতর প্রাণের ভাব-কল্পনা বাস্তব রূপ লাভ করেছে। দু’পায়ের চেয়ে নৌকাই এখানে বেশি চলে, আর তাই, জল, নদী, নালা, নৌকা, হাল, বাদাম, পাল ইত্যাদির আধিক্য রাধারমণের গানে। এছাড়া, যমুনা, কদম্ব, কদম্বতলা, বাঁশি, মুরলী, রাধা, কৃষ্ণকুঞ্জ, বনমালী ইত্যকার শব্দ তার সঙ্গীতের শরীরের অবিচ্ছেদ্য মালমশলা।

লোকসঙ্গীত বাংলার চিরায়ত সঙ্গীত। এ সঙ্গীতে মিশে আছে অঞ্চলভেদে বাঙালির আত্মপরিচয় ও সংস্কৃতি। লোকসঙ্গীতর ভেতর দিয়ে গ্রামবাংলার মানুষের আর্থসামাজিক চিত্র বিবৃত হয়েছে। রাধারমণের রচনায় প্রার্থনা, গুরুতত্ত্ব, প্রেমতত্ত্ব দেহতত্ত্ব, লীলাবন্দনা বিষয়াদি স্থান পেয়েছে। ধামাইল গান তার এক উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি। এ ‘ধামাইল’ শব্দের অর্থ হিসেবে বলা হয়েছে এটি সুনামগঞ্জের রাধারমণ দত্তের ধামাইল গান। ধামাইল গান স্বকীয় সুরের ইন্দ্রজালে আবিষ্ট করে রেখেছে এই জনপদের নারী ও পুরুষকে। উনিশ শতকে রচিত হলেও বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে অনুশীলিত রূপে লোকসঙ্গীতের ধারাকে পরিপুষ্ট করেছে। ধামাইল গানের সঙ্গে ‘ভাইবে রাধারমণ বলে’ ধ্বনিটি অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে যা তার গানের স্বকীয়তার বাহক। ধামাইল নৃত্যে রাধারমণ ছাড়াও মহেন্দ্র গোসাই, দীন শরৎ, প্রমুখের গান গীত হয়। কিন্তু ৯৫ ভাগ ধামাইল গানই রাধারমণের।

ধামাইল সবচেয়ে জমে উঠে বিবাহ অনুষ্ঠানে। সুদীর্ঘ সময় ধরে মহিলারা ধামাইল গান ও নৃত্যে মুখর করে রাখতেন। ধামাইল নৃত্যে গ্রামের প্রান্তিক শ্রেণীর অংশগ্রহণই বেশি দেখা যায়। এক সময় ধামাইল গানের সুরে আর বাদ্যযন্ত্র, ঢোল-করতালের ঝানঝনানিতে মুখর হতো এ অঞ্চলের সব ধর্ম-বর্ণের আবাসস্থল। কিন্তু কালের পরিক্রমায় সে ঐতিহ্য অনেকাংশেই হারিয়ে যেতে বসেছে। মুসলিম বিয়ের অনুষ্ঠানেও এক সময় জলধামাইল প্রচলিত ছিল। এ ধামাইল গানের পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে আমরা আমাদের ঐতিহ্যকে জাগিয়ে তুলতে পারি, জাতীয় সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করতে পারি এবং পাশাপাশি রাধারমণ দত্ত তথা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে বিশ্ব আসরে পরিচিত করতে পারি।

স্বনামধন্য বাউল শাহ্ আবদুল করিম (১৯১৬-২০০৯) তার ছেলেবেলার কথা বলতে গিয়ে রাধারমণ দত্তের গানের প্রচলন ও সময়ের কথা উল্লেখ করেছেন। ১০ থেকে ১২ বছর উজানধল গ্রামের আখড়াতে তিনি নিজে রাধারমণ দত্তের ধামাইল গান গেয়েছেন। বিশিষ্ট গীতিকার, নাট্যকার ও শিল্পী দেওয়ান মহসিন রাজা চৌধুরী বলেন, ‘ধামাইল গান সম্প্রীতির গান, হিন্দু এবং মুসলিম বিয়েতে ধামাইল গানের প্রচলন সমধিক লক্ষ্য করা যায়। তার এ ধামাইল এখন আঞ্চলিক গণ্ডি অতিক্রম করে জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।’

সিলেট অঞ্চল হিন্দু-মুসলমানের ধর্ম ও কর্ম সাধনার তীর্থস্থান হিসেবে পরিগণিত। তারা অসাম্প্রদায়িক চেতনার বার্তা বাহক ও শিকড় রক্ষক। রাধারমণ যে অসাম্প্রদায়িক ছিলেন তা তার রচনার মধ্য দিয়ে ফুটে এসেছে। দুজন ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হলেও রাধারমণ দত্ত ও মরমি কবি হাসন রাজার মধ্যে আত্মার যোগাযোগ ছিল। তাদের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে কবিতার মাধ্যমে পত্রালাপ হতো। একবার হাসন রাজা রাধারমণের কুশল জানতে গানের চরণ বাঁধেন :

‘রাধারমণ তুমি কেমন, হাছন রাজা দেখতে চায়’।

উত্তরে রাধারমণ লিখেন : ‘কুশল তুমি আছো কেমন- জানতে চায় রাধারমণ’।

তাদের পারস্পরিক সোহার্দ্যবোধ আমাদের সুখী সুশৃংখল সমাজ গঠনে অনুপ্রাণিত করে।

রাধারমণ তত্ত্বসাহিত্যের দিকপাল, লৌকিক প্রেমের পূজারি এই তার চরম ও পরম পরিচয়। তাই রাধারমণ কোনো গোষ্ঠীর নন, তিনি সবার। ১৯১৫ সালে এ সাধক ইহলোক ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুরেই তাকে সমাহিত করা হয়।

একটা বিষয় অত্যন্ত উদ্বেগের যে, রাধারমণ আমাদের অনেকের চেনা-জানার মধ্যে নেই। সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হলে রাধারমণের স্থান বিশ্বফোকলোরে একটি বিশেষ জায়গা করে নিত; কিন্তু যথাযথ প্রচারের অভাব এবং চর্চা না থাকার কারণে তা হয়ে ওঠেনি। যদিও সম্প্রতি রাধারমণের একক গানের অডিও ক্যাসেট ও সিডি বের হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে রাধারমণের গানের চর্চা কখনোই ব্যাপকভাবে হয়নি। গবেষণার জায়গা থেকেও আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। প্রখ্যাত লেখক ও গবেষক মো. মনসুর উদ্দিন তার ১৩ খণ্ডের ‘হারামনি’র ৭ম খণ্ডে রাধারমণের ৫১টি গান অন্তর্ভুক্ত করেন। এছাড়া বিক্ষিপ্তভাবে অনেকেই রাধারমণের গান নিয়ে কাজ করছেন। সুখের বিষয় রাধারমণ দত্তের মৃত্যু শতবার্ষিকী উপলক্ষে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের শেষ দিন ভারতীয় লোক ব্যান্ড ‘দোহার’ আসবে যারা নিবিড়ভাবে রাধারমণকে নিয়ে কাজ করছে।

রাধারমণের গানের সুনির্দিষ্ট স্বরলিপি নেই। ফলে বিভিন্ন জন বিভিন্ন সুরে তার গান গাইছেন। কিছু কণ্ঠশিল্পী ও ক্যাসেট ব্যবসায়ীরা এ যুগশ্রেষ্ঠ কবির গানের সৃষ্টিকেও অস্বীকার করে চলছেন। বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি তথা কপিরাইট আইনের এ এক নির্লজ্জ লঙ্ঘন। ‘ভ্রমর কইও গিয়া/শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে/অঙ্গ যায় জ্বলিয়ারে’ গানটি রাধারমণের সৃষ্টি; কিন্তু অনেক ক্যাসেট এবং সিডিতে লেখা রয়েছে ‘শুধু সংগ্রহ’। এছাড়া কিছু লোক ভুয়া গান রচনা করে রাধারমণের অনাবিষ্কৃত গান বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে যা সঙ্গীত জগতের জন্য সুখের নয়। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য রাধারমণের গানের কথা চুরি করে, একটু-আধটু বদল করে নিজের নামে রচনা করে গান গাইছেন- এটাও সত্যিকার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নয়।

রাধারমণের গান গেয়ে বড় হয়েছেন, গান শুনে তৃপ্ত হয়েছেন, তার গান শোনানোর জন্য অনুরোধ আসে আসরে; কিন্তু এটা যে তার গান তা ওরা জানেনও না। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার কিংবা বিভিন্ন সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় রাধারমণের সঙ্গীত পরিবেশন করে অনেকেই বিখ্যাত হয়েছেন। বিভিন্ন বেসরকারি চ্যানেলে বিভিন্ন ধরনের গায়ক Hunting-এ রাধারমণের গান গেয়ে অনেকের বিভিন্ন পর্যায়ের উত্তরণ ঘটেছে। কিন্তু শিল্পী, কলা-কুশলী কিংবা দর্শকও অনেক ক্ষেত্রে এসব গান যে রাধারমণের সৃষ্টি সে বিষয় সম্পর্কে অবগত নন কিংবা জানার চেষ্টাও করেননি।

এমনকি তাজিকিস্তানের বিখ্যাত শিল্পী নইজা কারুমাতুল্ল ‘ভ্রমর কইও গিয়া’ গানটি আমাদের সুরে তাদের ভাষায় গেয়ে বিশ্ব আসর মাতিয়েছেন; কিন্তু রাধারমণ ভক্ত বা দেশবাসী অনেকেই তা জানেন না। গানটির প্রথম দুটি চরণ নিুরূপ :

খুজই, খুজই, খুজ, বারান্দাই, সিকাআস্তাবলে ....

রুই দোস্তয়া কিপরে ফিতা দুমুত মারমুদা

সুনামগঞ্জে রাধারমণকে নিয়ে যতটুকু কাজ হয়েছে বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তা হয়নি। সুনামগঞ্জবাসী এ কৃতিত্বের দাবিদার। রাধারমণের মৃত্যুশতবার্ষিকী অনুষ্ঠানটি সুনামগঞ্জ ছাড়া দেশের অন্য কোথাও উদ্যাপিত হচ্ছে মর্মে আমার জানা নেই। জাতীয়ভাবে ঢাকায় উদযাপন করলে রাধারমণকে আরও বিকশিত করার সুযোগ সৃষ্টি হতো বলে আমার বিশ্বাস। ৮ নভেম্বর প্রকাশিত ‘দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর’ পড়ে জানতে পারলাম ৯ নভেম্বর লন্ডনে রাধারমণের মৃত্যুশতবার্ষিকী উপলক্ষে রাধারমণ একাডেমি, ইউকে-এর উদ্যোগে ‘ভাইবে রাধারমণ বলে’ শীর্ষক সঙ্গীত সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়েছে। আয়োজকদের সাধুবাদ জানাই। আগামী দিনে আরও বড় পরিসরে ঢাকাসহ বিশ্বের বাঙালি অধ্যুষিত শহরগুলোতে এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে নিশ্চয়ই বিশ্বদরবারে আমরা রাধারমণকে পরিচিত করে তুলতে পারব। রাধারমণ দত্তের পরিচিতি বিশ্বদরবারে আমাদের আরও সমৃদ্ধ করবে। আমি বিশ্বাস করি, রাধারমণ আমাদের জাতীয় সম্পদ এবং সে সম্পদ রক্ষায় আমাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। রাধারমণ দত্ত ও তার গানকে বিশ্ব আসরে পরিচিত করতে বাংলাদেশে একটি একাডেমি স্থাপন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।

সাংবিধানিকভাবেও আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। মহান সংবিধানের ২৩ অনুচ্ছেদ মতে ‘রাষ্ট্র জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার রক্ষণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’ রাধারমণ আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার। একে রক্ষণ, লালন-পালন করা আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব; এতে আমাদের সংস্কৃতি, ঐহিত্য সমৃদ্ধ হবে। রাধারমণের মৃত্যুশতবার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও এটিএন নিউজ বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করছে। এটাও শুভ লক্ষণ বটে।

তবে ৮ নভেম্বর ‘দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর’-এর প্রথম পৃষ্ঠায় সবচেয়ে উদ্বেগের খবর ছিল ‘বৈষ্ণব কবির ৩০ একর জায়গাই বেদখল’। খবরে প্রকাশ, প্রভাবশালী দখলবাজদের হাত থেকে কবির সমাধি মন্দিরের জায়গা ছাড়া আর কিছুই রক্ষা পায়নি। সংবাদটি নিঃসন্দেহে উৎকণ্ঠার, চরম লজ্জার।

রাধারমণ আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ঐহিত্য, আমাদের গর্ব। মরমি এ সাধকের যে মাটিতে ছিল পদচারণা, ধ্যান-জ্ঞান, যেখান থেকে তার সব অমর সৃষ্টি সেটিই আজ বেহাত হয়ে গেছে। এ যেন শেকড়সহ উপড়ে ফেলা। এ জায়গা পুনরুদ্ধার করে সেখানে রাধারমণ একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা একটি গণদাবিতে পরিণত হয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে। আর এ দাবি পূরণে যার যার অবস্থান থেকে দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে আসা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। রাধারমণ দত্ত, আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার, সবাই এ যেন পারি বুঝিবার।

লেখক পরিচিতি : সচিব, তথ্য মন্ত্রণালয়




 

সাবমিট

রাধারমণ দত্ত আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার

 মরতুজা আহমদ 
২৩ নভেম্বর ২০১৫, ১২:০০ এএম  | 

প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্যের অপূর্ব লীলাভূমি সুনামগঞ্জ। প্রকৃতির মতোই সরল এখানকার মানুষের জীবন। নদী, হাওর, বাঁওড় বেষ্টিত এ জনপদ আবহমানকাল ধরে সৃষ্টি করেছে সুরের দ্যোতনা। হিজল করচ, পারিজাই পাখি আর জীববৈচিত্র্যের আধার- ভাটির এ জনপদ নিজেদের সংস্কৃতির পাশাপাশি আমাদের জাতীয় জীবনের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারাকে আলোকিত করেছে। ধান ও গান সুনামগঞ্জের ঐতিহ্য। যুগ যুগ ধরে এ মাটিতে জন্মেছেন তত্ত্বসাহিত্যের অনেক কবি, খুব সহজে বললে বাউল। এ মাটি আবহমানকাল ধরে বাংলার লোকগীতিকে করেছে সমৃদ্ধ। ভৌগোলিক পরিবেশের স্বতন্ত্র আর ঋতুভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে এ অঞ্চল বাউল গান আর লোকসঙ্গীতের বিভিন্ন স্বতন্ত্রধারা প্রতিষ্ঠার এক অনন্য School of Thought হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দেশবরেণ্য অসংখ্য আউল-বাউলের জন্মভূমি হচ্ছে এ অঞ্চল।

এই ধারাবাহিকতায় এ জনপদে জন্মগ্রহণ করেছেন মরমি কবি হাসন রাজা, শাহ আবদুল করিম, রাধারমণ দত্ত, সৈয়দ শাহনুর, সৈয়দ হোসেন আলম, দূরবীন শাহ, কালাশাহ, ছাবাল শাহ, এলাহী বক্স মুন্সী, শাহ আছদ আলী, পীর মজির উদ্দিন, আফজল শাহ শীতালং শাহ, আরকুম শাহ এবং আরও অনেকে। তাদের সৃষ্ট বাউল গান, সারি গান, জারি গান, বিয়ের গান, মালজোড়া বা কবি গান, ভাটিয়ালি গান, ঘেঁটু গান, কীর্তন, গাজীর গান, ধামাইল আমাদের এ অঞ্চলকে এক বিশেষ উচ্চতায় আসীন করেছে। রাধারমণ দত্ত সেই লোকায়ত সমাজের শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি ও মহীরুহ।

বাংলার এ স্বনামধন্য বাউল রাধারমণ দত্ত ১৮৩৩ সালে (১২৪০ বঙ্গাব্দে) সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামে বিখ্যাত দত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম রাধারমণদত্ত পুরকায়স্থ। তিনি মরমি সাধক হাসন রাজার (১৮৫৪-১৯২২) অগ্রজ সমসাময়িক। তিনি শুধু লোকসঙ্গীত রচনাকার নন, গান রচনায় সংখ্যার দিক থেকে বাংলার সব লোককবিদের ছাড়িয়ে সবার ঊর্ধ্বে ঝলমলে এক নক্ষত্র। তত্ত্বসাহিত্যের দিকপাল এবং সর্বজনীন এ কবি ৩০০০-এর অধিক গান লিখেছেন। বাংলা লোকসঙ্গীতের ইতিহাসে ক’জন তার সমপরিমাণ গান লিখেছেন মোটাদাগে বলতে গেলে আমার জানা নেই।

রাধারমণ দত্তের পূর্বপুরুষের জন্মস্থান ভারতের বীরভূম জেলায়। তার পূর্বপুরুষের কেউ কেউ অবিভক্ত ভারতে ও ছোট ছোট খণ্ডরাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন। তার পিতা রাধামাধব দত্ত পুরকায়স্থ বাংলা সাহিত্যের কবি ছিলেন এবং তিনি সংস্কৃত ভাষায়ও সুপণ্ডিত ছিলেন। তিনি কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দ কাব্যের বাংলা অনুবাদ করেন। এছাড়া রাধামাধব দত্ত কৃষ্ণলীলা কাব্য, পদ্মপুরাণ, সূর্যব্রত পাঁচালি ও গোবিন্দভোগের গান রচনা করেছিলেন।

পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা এবং অনুপ্রেরণায় ছোটবেলা থেকেই রাধারমণ নিজ ধর্মের প্রতি অনুরাগী হয়ে পড়েন এবং উপাসনার প্রধান অবলম্বন হিসেবে আধ্যাত্মিক গান রচনায় মনোনিবেশ করেন। ১২৫০ বঙ্গাব্দে তিনি পিতৃহারা হন এবং মা সুবর্ণা দেবীর কাছে বড় হতে থাকেন। ১২৭৫ বঙ্গাব্দে মৌলভীবাজারের আদপাশা গ্রামে শ্রী চৈতন্যদেবের অন্যতম পার্ষদ সেন শিবানন্দ বংশীয় নন্দকুমার সেন অধিকারীর কন্যা গুণময়ী দেবীকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে চার ছেলে ছিল। কিন্তু ছেলে বিপিনবিহারি ছাড়া স্ত্রী ও বাকিরা মারা গেলে তিনি সংসার জীবন সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়েন। তার গানের মাঝেও পুত্রশোকের বিষয়টি কষ্ট প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে উঠে এসেছে।

১৮৮৩ সালে (১২৯০ বঙ্গাব্দে) সংসার-জীবনের বেড়াজাল ছিন্ন করে রাধারমণ দত্ত মৌলভীবাজারের অন্তর্গত ইটা পরগনার ঢেউপাশা গ্রামের প্রখ্যাত বৈষ্ণবসাধু রঘুনাথ ভট্টাচার্যের কাছে দীক্ষা লাভ করেন। অতঃপর তিনি নিজভূমে এসে জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওরের পাড়ে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। এ আশ্রমেই তার লৌকিক ক্রিয়াকর্ম, সাধন-ভজনার শুরু। তিনি রাতদিন এ আশ্রমে স্রষ্টার ধ্যানে-মগ্ন থাকতেন। এ বৈরাগ্য জীবনই তাকে আজকে এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। বৈরাগ্য ভাবনার খুঁটিনাটি বিষয় চিন্তা তার সঙ্গীত জগৎকে দ্যুতিময় করে তুলেছে। রাধারমণ দত্ত তার গানে বৈরাগ্য-জীবনের কথা উল্লেখ করেন, ‘আমার বন্ধু দয়াময়, তোমারে দেখিবার মনে লয়’, ‘অবলার মনের অনল গো সই নিভে না, প্রেম শেল বিন্দিল বুকে বাইরে আসে না’।

কষ্ট ও বিচ্ছেদের রূপচিত্র তার গানে ও ভণিতায় বিভিন্নভাবে ফুটে উঠেছে। ‘কারে দেখাব মনের দুঃখ গো আমি বুক চিরিয়া অন্তরে তুষের অনল জ্বলে গইয়া গইয়া’ কিংবা ‘আমি রব না রব না গৃহে বন্ধু বিনে প্রাণ বাঁচে না’ অথবা ‘পালিতে পালিছিলাম পাখি দুধ-কলা দিয়া, এগো যাইবার কালে বেইমানে পাইখ্যে না চাইলো ফিরিয়া’ ইত্যাদি। এছাড়া ‘শ্যাম কালিয়া প্রাণ বন্ধুরে নিরলে তোমারে পাইলাম না’, ‘মনে নাই গো, আমার বন্ধুয়ার মনে নাই’- ইত্যাদি গানের সঙ্গে আমাদের অনেক আবেগ মিশ্রিত।

রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থ শুধু একটি সুপরিচিত নাম নয়, একটি প্রতিষ্ঠান। তার সঙ্গীতের গাঁথুনিতে আমাদের বাস্তব জীবনের অনেক ছবি বাঙময় হয়ে ফুটে উঠেছে, তার গানে সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলের বর্ণনা ও জীবনাচার লক্ষ করা যায়- যা সমাজ বাস্তবতারই প্রতিফলন। ‘ভ্রমর কইও গিয়া শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে অঙ্গ যায় জলিয়া’ অথবা ‘কালায় প্রাণটি নিল বাঁশিটি বাজাইয়া’ অথবা ‘আজ কেন-রে প্রাণের সবুল রাই এলনা যমুনা-তে’ প্রভৃতি পদে বিরহ কাতর প্রাণের ভাব-কল্পনা বাস্তব রূপ লাভ করেছে। দু’পায়ের চেয়ে নৌকাই এখানে বেশি চলে, আর তাই, জল, নদী, নালা, নৌকা, হাল, বাদাম, পাল ইত্যাদির আধিক্য রাধারমণের গানে। এছাড়া, যমুনা, কদম্ব, কদম্বতলা, বাঁশি, মুরলী, রাধা, কৃষ্ণকুঞ্জ, বনমালী ইত্যকার শব্দ তার সঙ্গীতের শরীরের অবিচ্ছেদ্য মালমশলা।

লোকসঙ্গীত বাংলার চিরায়ত সঙ্গীত। এ সঙ্গীতে মিশে আছে অঞ্চলভেদে বাঙালির আত্মপরিচয় ও সংস্কৃতি। লোকসঙ্গীতর ভেতর দিয়ে গ্রামবাংলার মানুষের আর্থসামাজিক চিত্র বিবৃত হয়েছে। রাধারমণের রচনায় প্রার্থনা, গুরুতত্ত্ব, প্রেমতত্ত্ব দেহতত্ত্ব, লীলাবন্দনা বিষয়াদি স্থান পেয়েছে। ধামাইল গান তার এক উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি। এ ‘ধামাইল’ শব্দের অর্থ হিসেবে বলা হয়েছে এটি সুনামগঞ্জের রাধারমণ দত্তের ধামাইল গান। ধামাইল গান স্বকীয় সুরের ইন্দ্রজালে আবিষ্ট করে রেখেছে এই জনপদের নারী ও পুরুষকে। উনিশ শতকে রচিত হলেও বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে অনুশীলিত রূপে লোকসঙ্গীতের ধারাকে পরিপুষ্ট করেছে। ধামাইল গানের সঙ্গে ‘ভাইবে রাধারমণ বলে’ ধ্বনিটি অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে যা তার গানের স্বকীয়তার বাহক। ধামাইল নৃত্যে রাধারমণ ছাড়াও মহেন্দ্র গোসাই, দীন শরৎ, প্রমুখের গান গীত হয়। কিন্তু ৯৫ ভাগ ধামাইল গানই রাধারমণের।

ধামাইল সবচেয়ে জমে উঠে বিবাহ অনুষ্ঠানে। সুদীর্ঘ সময় ধরে মহিলারা ধামাইল গান ও নৃত্যে মুখর করে রাখতেন। ধামাইল নৃত্যে গ্রামের প্রান্তিক শ্রেণীর অংশগ্রহণই বেশি দেখা যায়। এক সময় ধামাইল গানের সুরে আর বাদ্যযন্ত্র, ঢোল-করতালের ঝানঝনানিতে মুখর হতো এ অঞ্চলের সব ধর্ম-বর্ণের আবাসস্থল। কিন্তু কালের পরিক্রমায় সে ঐতিহ্য অনেকাংশেই হারিয়ে যেতে বসেছে। মুসলিম বিয়ের অনুষ্ঠানেও এক সময় জলধামাইল প্রচলিত ছিল। এ ধামাইল গানের পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে আমরা আমাদের ঐতিহ্যকে জাগিয়ে তুলতে পারি, জাতীয় সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করতে পারি এবং পাশাপাশি রাধারমণ দত্ত তথা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে বিশ্ব আসরে পরিচিত করতে পারি।

স্বনামধন্য বাউল শাহ্ আবদুল করিম (১৯১৬-২০০৯) তার ছেলেবেলার কথা বলতে গিয়ে রাধারমণ দত্তের গানের প্রচলন ও সময়ের কথা উল্লেখ করেছেন। ১০ থেকে ১২ বছর উজানধল গ্রামের আখড়াতে তিনি নিজে রাধারমণ দত্তের ধামাইল গান গেয়েছেন। বিশিষ্ট গীতিকার, নাট্যকার ও শিল্পী দেওয়ান মহসিন রাজা চৌধুরী বলেন, ‘ধামাইল গান সম্প্রীতির গান, হিন্দু এবং মুসলিম বিয়েতে ধামাইল গানের প্রচলন সমধিক লক্ষ্য করা যায়। তার এ ধামাইল এখন আঞ্চলিক গণ্ডি অতিক্রম করে জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।’

সিলেট অঞ্চল হিন্দু-মুসলমানের ধর্ম ও কর্ম সাধনার তীর্থস্থান হিসেবে পরিগণিত। তারা অসাম্প্রদায়িক চেতনার বার্তা বাহক ও শিকড় রক্ষক। রাধারমণ যে অসাম্প্রদায়িক ছিলেন তা তার রচনার মধ্য দিয়ে ফুটে এসেছে। দুজন ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হলেও রাধারমণ দত্ত ও মরমি কবি হাসন রাজার মধ্যে আত্মার যোগাযোগ ছিল। তাদের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে কবিতার মাধ্যমে পত্রালাপ হতো। একবার হাসন রাজা রাধারমণের কুশল জানতে গানের চরণ বাঁধেন :

‘রাধারমণ তুমি কেমন, হাছন রাজা দেখতে চায়’।

উত্তরে রাধারমণ লিখেন : ‘কুশল তুমি আছো কেমন- জানতে চায় রাধারমণ’।

তাদের পারস্পরিক সোহার্দ্যবোধ আমাদের সুখী সুশৃংখল সমাজ গঠনে অনুপ্রাণিত করে।

রাধারমণ তত্ত্বসাহিত্যের দিকপাল, লৌকিক প্রেমের পূজারি এই তার চরম ও পরম পরিচয়। তাই রাধারমণ কোনো গোষ্ঠীর নন, তিনি সবার। ১৯১৫ সালে এ সাধক ইহলোক ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুরেই তাকে সমাহিত করা হয়।

একটা বিষয় অত্যন্ত উদ্বেগের যে, রাধারমণ আমাদের অনেকের চেনা-জানার মধ্যে নেই। সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হলে রাধারমণের স্থান বিশ্বফোকলোরে একটি বিশেষ জায়গা করে নিত; কিন্তু যথাযথ প্রচারের অভাব এবং চর্চা না থাকার কারণে তা হয়ে ওঠেনি। যদিও সম্প্রতি রাধারমণের একক গানের অডিও ক্যাসেট ও সিডি বের হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে রাধারমণের গানের চর্চা কখনোই ব্যাপকভাবে হয়নি। গবেষণার জায়গা থেকেও আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। প্রখ্যাত লেখক ও গবেষক মো. মনসুর উদ্দিন তার ১৩ খণ্ডের ‘হারামনি’র ৭ম খণ্ডে রাধারমণের ৫১টি গান অন্তর্ভুক্ত করেন। এছাড়া বিক্ষিপ্তভাবে অনেকেই রাধারমণের গান নিয়ে কাজ করছেন। সুখের বিষয় রাধারমণ দত্তের মৃত্যু শতবার্ষিকী উপলক্ষে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের শেষ দিন ভারতীয় লোক ব্যান্ড ‘দোহার’ আসবে যারা নিবিড়ভাবে রাধারমণকে নিয়ে কাজ করছে।

রাধারমণের গানের সুনির্দিষ্ট স্বরলিপি নেই। ফলে বিভিন্ন জন বিভিন্ন সুরে তার গান গাইছেন। কিছু কণ্ঠশিল্পী ও ক্যাসেট ব্যবসায়ীরা এ যুগশ্রেষ্ঠ কবির গানের সৃষ্টিকেও অস্বীকার করে চলছেন। বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি তথা কপিরাইট আইনের এ এক নির্লজ্জ লঙ্ঘন। ‘ভ্রমর কইও গিয়া/শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে/অঙ্গ যায় জ্বলিয়ারে’ গানটি রাধারমণের সৃষ্টি; কিন্তু অনেক ক্যাসেট এবং সিডিতে লেখা রয়েছে ‘শুধু সংগ্রহ’। এছাড়া কিছু লোক ভুয়া গান রচনা করে রাধারমণের অনাবিষ্কৃত গান বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে যা সঙ্গীত জগতের জন্য সুখের নয়। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য রাধারমণের গানের কথা চুরি করে, একটু-আধটু বদল করে নিজের নামে রচনা করে গান গাইছেন- এটাও সত্যিকার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নয়।

রাধারমণের গান গেয়ে বড় হয়েছেন, গান শুনে তৃপ্ত হয়েছেন, তার গান শোনানোর জন্য অনুরোধ আসে আসরে; কিন্তু এটা যে তার গান তা ওরা জানেনও না। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার কিংবা বিভিন্ন সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় রাধারমণের সঙ্গীত পরিবেশন করে অনেকেই বিখ্যাত হয়েছেন। বিভিন্ন বেসরকারি চ্যানেলে বিভিন্ন ধরনের গায়ক Hunting-এ রাধারমণের গান গেয়ে অনেকের বিভিন্ন পর্যায়ের উত্তরণ ঘটেছে। কিন্তু শিল্পী, কলা-কুশলী কিংবা দর্শকও অনেক ক্ষেত্রে এসব গান যে রাধারমণের সৃষ্টি সে বিষয় সম্পর্কে অবগত নন কিংবা জানার চেষ্টাও করেননি।

এমনকি তাজিকিস্তানের বিখ্যাত শিল্পী নইজা কারুমাতুল্ল ‘ভ্রমর কইও গিয়া’ গানটি আমাদের সুরে তাদের ভাষায় গেয়ে বিশ্ব আসর মাতিয়েছেন; কিন্তু রাধারমণ ভক্ত বা দেশবাসী অনেকেই তা জানেন না। গানটির প্রথম দুটি চরণ নিুরূপ :

খুজই, খুজই, খুজ, বারান্দাই, সিকাআস্তাবলে ....

রুই দোস্তয়া কিপরে ফিতা দুমুত মারমুদা

সুনামগঞ্জে রাধারমণকে নিয়ে যতটুকু কাজ হয়েছে বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তা হয়নি। সুনামগঞ্জবাসী এ কৃতিত্বের দাবিদার। রাধারমণের মৃত্যুশতবার্ষিকী অনুষ্ঠানটি সুনামগঞ্জ ছাড়া দেশের অন্য কোথাও উদ্যাপিত হচ্ছে মর্মে আমার জানা নেই। জাতীয়ভাবে ঢাকায় উদযাপন করলে রাধারমণকে আরও বিকশিত করার সুযোগ সৃষ্টি হতো বলে আমার বিশ্বাস। ৮ নভেম্বর প্রকাশিত ‘দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর’ পড়ে জানতে পারলাম ৯ নভেম্বর লন্ডনে রাধারমণের মৃত্যুশতবার্ষিকী উপলক্ষে রাধারমণ একাডেমি, ইউকে-এর উদ্যোগে ‘ভাইবে রাধারমণ বলে’ শীর্ষক সঙ্গীত সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়েছে। আয়োজকদের সাধুবাদ জানাই। আগামী দিনে আরও বড় পরিসরে ঢাকাসহ বিশ্বের বাঙালি অধ্যুষিত শহরগুলোতে এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে নিশ্চয়ই বিশ্বদরবারে আমরা রাধারমণকে পরিচিত করে তুলতে পারব। রাধারমণ দত্তের পরিচিতি বিশ্বদরবারে আমাদের আরও সমৃদ্ধ করবে। আমি বিশ্বাস করি, রাধারমণ আমাদের জাতীয় সম্পদ এবং সে সম্পদ রক্ষায় আমাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। রাধারমণ দত্ত ও তার গানকে বিশ্ব আসরে পরিচিত করতে বাংলাদেশে একটি একাডেমি স্থাপন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।

সাংবিধানিকভাবেও আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। মহান সংবিধানের ২৩ অনুচ্ছেদ মতে ‘রাষ্ট্র জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার রক্ষণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’ রাধারমণ আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার। একে রক্ষণ, লালন-পালন করা আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব; এতে আমাদের সংস্কৃতি, ঐহিত্য সমৃদ্ধ হবে। রাধারমণের মৃত্যুশতবার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও এটিএন নিউজ বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করছে। এটাও শুভ লক্ষণ বটে।

তবে ৮ নভেম্বর ‘দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর’-এর প্রথম পৃষ্ঠায় সবচেয়ে উদ্বেগের খবর ছিল ‘বৈষ্ণব কবির ৩০ একর জায়গাই বেদখল’। খবরে প্রকাশ, প্রভাবশালী দখলবাজদের হাত থেকে কবির সমাধি মন্দিরের জায়গা ছাড়া আর কিছুই রক্ষা পায়নি। সংবাদটি নিঃসন্দেহে উৎকণ্ঠার, চরম লজ্জার।

রাধারমণ আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ঐহিত্য, আমাদের গর্ব। মরমি এ সাধকের যে মাটিতে ছিল পদচারণা, ধ্যান-জ্ঞান, যেখান থেকে তার সব অমর সৃষ্টি সেটিই আজ বেহাত হয়ে গেছে। এ যেন শেকড়সহ উপড়ে ফেলা। এ জায়গা পুনরুদ্ধার করে সেখানে রাধারমণ একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা একটি গণদাবিতে পরিণত হয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে। আর এ দাবি পূরণে যার যার অবস্থান থেকে দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে আসা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। রাধারমণ দত্ত, আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার, সবাই এ যেন পারি বুঝিবার।

লেখক পরিচিতি : সচিব, তথ্য মন্ত্রণালয়




 

 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র