Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

হাদি ও বিপ্লব সমার্থক

Icon

অধ্যাপক হায়াত হোসেন

প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

হাদি ও বিপ্লব সমার্থক

জুলাই যোদ্ধা শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর শুনে আমি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসাবে মধ্যরাতে ফেসবুকে একটি ছোট পোস্ট দিয়েছি এবং তাতে উল্লেখ করেছি, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই বিখ্যাত পঙ্ক্তি-‘এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ, মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান’। জুলাই বিপ্লবের এ অকুতোভয়, অদম্য এক লড়াকু তরুণ অল্প দিনেই দেশব্যাপী দেশপ্রেমের যে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে গেছে, তা অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তরুণদের বর্তমান প্রজন্ম যদি এ ধারা ধরে রাখতে পারে, তা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে আগামীতে সুরক্ষা দেবে বলে আমি মনে করি। প্রাচীন এক শ্লোকে আছে ‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী’, অর্থাৎ জননী ও জন্মভূমি স্বর্গের চেয়েও শ্রেয়। হাদির আত্মদানে আবারও এটা স্পষ্ট হলো।

প্রকৃতপক্ষে এ দেশের মানুষ সেই ১৯৫২ সাল থেকেই প্রমাণ করেছে, তারা দেশকে কতটা ভালোবাসে; মাতৃভাষাকে কতটা ভালোবাসে। এ কারণেই সেই ৫২ সাল থেকেই বাঙালি প্রাণ দেওয়া শুরু করেছে এবং এ ধারা অব্যাহত ছিল ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনে, ১৯৬৯ সালের গণ-আন্দোলনে। এরপর ১৯৭১ সালে যে রক্তগঙ্গা বয়ে গেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, বাঙালি সত্যিই অকুতোভয় ও নির্ভীক।

দুঃখজনক হলো, একাত্তরের স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই আমরা দেখতে পেলাম, দেশে অনাচার, অত্যাচার, দুর্নীতি ও লুণ্ঠন হয়েছে, তার প্রেক্ষাপটে দেশের ক্ষমতা বদল হয়েছে।

এই দীর্ঘ ৫০ বছরের যে অভিজ্ঞতা-দুঃখের অভিজ্ঞতা-এটা থেকে আমার মনে হয় বর্তমান যে ‘জি জেনারেশন’, তারা একটা শিক্ষা লাভ করেছে। এটা আমরা ইদানীং আমাদের আশপাশের দেশগুলোয়ও দেখতে পাচ্ছি-নেপাল, শ্রীলংকায়ও। আমি একান্তভাবেই আশাবাদী যে, আমাদের এ বর্তমান প্রজন্ম যে পথ দেখিয়েছে, দেশ সেই পথে চললে বাঙালি জাতিকে বা বাংলাদেশি জনগণের অগ্রগতি রোধ করা যাবে না। অতীতে আমরা অনেক রক্ত দিয়েছি, আমরা অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছি; এখন আমাদের কিছু প্রাপ্তির সময় এসে গেছে।

যেভাবে আমরা আন্তর্জাতিক সমর্থন পাচ্ছি এবং বিশেষ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো একজন দূরদর্শী নেতা যে এসে আমাদের এই দুঃসময়ে হাল ধরেছেন, এটা একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তার আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও সমর্থন এবং তার নিজস্ব প্রজ্ঞা ও সততা-এটা না হলে হয়তো এ দুঃসময়ে আমাদের আরও অনেক বড় বিপদে পড়তে হতো।

আমি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সহকর্মী ছিলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে-তিনি ১৯৭৩-৭৪ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি ছিলেন এবং আমি ছিলাম সাধারণ সম্পাদক। তখনো খুব একটা কঠিন সময় পার করছিল দেশ এবং বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো। আশা করি, তার নেতৃত্বে এবারও আমরা সফল হব। এখন জনগণ আগের চেয়ে বেশি সচেতন। জাতির সংকটে যে কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের মানুষ বিশেষভাবে সতর্ক থাকবে, এটাই প্রত্যাশা। উল্লেখ্য, জুলাই বিপ্লবের সময় সর্বস্তরের মানুষের যে অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ দেখা গেছে, তা স্বাধীনতার পর আর দেখা যায়নি। জুলাই বিপ্লবে এত মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে চেতনার বীজ বপন হয়েছে, হাদির কোরবানির মধ্য দিয়ে এই চেতনা আরও বিকশিত হয়েছে। দেশের বৃহত্তর কল্যাণে- নবচেতনার এই ধারা যাতে অব্যাহত থাকে সেদিকে সবাইকে দৃষ্টি রাখতে হবে।

গত শতকের বায়ান্ন সালে মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় কয়েকজনের মৃত্যুর ঘটনায় দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। জুলাই বিপ্লবে এই যে এত মানুষের আত্মত্যাগ, তা যেন বৃথা না যায়; সেজন্য সবাইকে সচেষ্ট হতে হবে।

শেখ হাসিনার সরকার-একটি পর্বতকে মানুষ সরিয়ে দিল। তাতে সারা দেশের মানুষ আবার আশাবাদী হয়ে ওঠে। আমরা ইতোমধ্যে শেখ হাসিনার বিচারের ব্যাপারে যে অগ্রগতি দেখেছি, এটা যথেষ্ট সন্তোষজনক বলে মনে করি। বিপ্লবী হাদির হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারও দ্রুততার সঙ্গে শেষ করতে হবে। বলা হয়ে থাকে, বিচার বিলম্বিত হলে ন্যায়বিচার পাওয়া সহজ হয় না।

অধ্যাপক হায়াত হোসেন : সাবেক চেয়ারম্যান, ইতিহাস বিভাগ এবং ডিন, কলা অনুষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম