Logo
Logo
×

বাতায়ন

মবতন্ত্র নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি

Icon

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৪৫ পিএম

মবতন্ত্র নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি

গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা। মতভেদ থাকবে। বিতর্ক হবে। ক্ষমতার পালাবদল হবে ভোটের মাধ্যমে। কিন্তু যখন মত প্রকাশের জায়গা দখল করে নেয় ভয়, হুমকি আর সংঘবদ্ধ উচ্ছৃঙ্খলতা, তখন গণতন্ত্র নিজেই প্রশ্নের মুখে পড়ে। আজ বাংলাদেশের বাস্তবতায় সেই প্রশ্নটাই সামনে এসেছে। গণতন্ত্রের চেয়ে বড় সমস্যা হয়ে উঠছে মবতন্ত্র।

মবতন্ত্র মানে শুধু রাস্তায় ভাঙচুর নয়। মবতন্ত্র মানে আইনকে পাশ কাটিয়ে দলবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া। মবতন্ত্র মানে বিচারকের রায়ের আগেই রায় কার্যকর করা। মবতন্ত্র মানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে অপরাধী বানিয়ে রাস্তায় নামা। এই প্রবণতা শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য নয়। রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির জন্যও ভয়ংকর।

সমাজবিজ্ঞানের ভাষায়, মবতন্ত্র হলো এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে ব্যক্তির যুক্তিবোধ লুপ্ত হয়ে দলগত আবেগ প্রাধান্য পায়। মানুষ তখন নিজের বিবেক নয়, ভিড়ের স্রোতে গা ভাসায়। এই ভিড় কখনো ধর্মের নামে, কখনো জাতীয়তাবাদের নামে, কখনো ন্যায়বিচারের নামে সংগঠিত হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফলাফল দাঁড়ায় শূন্য আর হতাশা। আইন দুর্বল হয়। প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ে।

বিশ্বখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী গুস্তাভ ল্য বঁ তার বিখ্যাত গ্রন্থ The Crowd-এ লিখেছিলেন,

‘একটি ভিড় কখনো যুক্তিবাদী হয় না। ভিড় আবেগ দিয়ে চালিত হয়।’ অর্থাৎ ভিড় যুক্তির দ্বারা নয়, আবেগের দ্বারা পরিচালিত হয়।

এই কথাটি আজ বাংলাদেশের বাস্তবতায় হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে। একটি গুজব, একটি ভিডিও ক্লিপ কিংবা একটি অসম্পূর্ণ খবরই যথেষ্ট একটি মব তৈরি করার জন্য। এরপর শুরু হয় বাড়িঘর ভাঙচুর, মানুষকে মারধর, কখনো হত্যা।

বাংলাদেশে মবতন্ত্র নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষ করে পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে এটি উদ্বেগজনক মাত্রায় বেড়েছে। গ্রামে হোক বা শহরে, ধর্মীয় ইস্যু, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত বিরোধ—সব ক্ষেত্রেই মবতন্ত্র দেখা যাচ্ছে।

কখনো দেখা যায়, চুরির অভিযোগে কাউকে ধরে এনে গণপিটুনি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু পরে জানা যায় যে ,অভিযোগটি ভিত্তিহীন ছিল। কখনো ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পুরো এলাকা উত্তপ্ত করা হয়। সেখানে প্রশাসন পৌঁছানোর আগেই ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে যায়। আবার কখনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করতে পরিকল্পিতভাবে মব তৈরি করা হয়।

এখানে সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, অনেক সময় মবতন্ত্র নীরব প্রশ্রয় পায়। কেউ কেউ ভাবেন, ‘ও তো খারাপ লোক ছিল।’ এই মানসিকতাই মবতন্ত্রকে শক্তিশালী করছে বলে আমি মনে করি।

গণতন্ত্রের মূল শর্ত হলো আইনের শাসন। আইন সবার জন্য সমান। অপরাধের বিচার হবে আদালতে। কিন্তু মবতন্ত্র এই ধারণাকে ধ্বংস করে। মব বলে, আদালতের দরকার নেই। প্রমাণের দরকার নেই। আমরা নিজেরাই বিচার করব।

দার্শনিক হান্না আরেন্ট বলেছিলেন,

‘যখন আইন ভেঙে পড়ে, তখন সহিংসতা নিজেকে ন্যায় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।’ অর্থাৎ আইন দুর্বল হলে সহিংসতা নিজেকে ন্যায়ের রূপে তুলে ধরে।

বাংলাদেশে ঠিক সেটাই হচ্ছে। সহিংসতাকে ন্যায়ের মোড়ক পরানো হচ্ছে। কেউ কেউ একে ‘জনতার ক্ষোভ’ বলে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ক্ষোভ কখনোই আইন হতে পারে না।

ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক—এই প্ল্যাটফর্মগুলো মানুষের কণ্ঠ হয়ে উঠেছে। এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে এগুলো মবতন্ত্রের জ্বালানি হিসেবেও কাজ করছে। এতে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

প্রবাসী কিছু ইউটিউবারের উস্কানিতে বাংলাদেশে বেশ কিছু মদের ঘটনার কথা আমরা জানি।

বিশেষ করে গণমাধ্যমে হামলা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ এর ঘটনা গুলোর পেছনে ওই ইউটিউবারদের উস্কানিই প্রধানত দায়ী বলে আমি মনে করি।

একটি গুজব পোস্ট, একটি উসকানিমূলক লাইভ ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষকে উত্তেজিত করতে পারে।

সমাজবিজ্ঞানী ম্যানুয়েল কাস্তেলস বলেছেন, ‘নেটওয়ার্ক সমাজে ক্ষমতা ছড়িয়ে পড়ে খুব দ্রুত, কিন্তু দায়িত্ব ছড়ায় না।’

অর্থাৎ ডিজিটাল সমাজে ক্ষমতা দ্রুত ছড়ালেও দায়িত্ববোধ তত দ্রুত ছড়ায় না।

এই দায়িত্বহীনতাই সমস্যার মূল কারণ। মানুষ শেয়ার করে। লাইক দেয়। উত্তেজনা বাড়ায়। কিন্তু ফলাফলের দায় নেয় না।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে মবতন্ত্র একটি বিপজ্জনক অস্ত্র হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে লোক জড়ো করা। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে জনতার ক্ষোভ ব্যবহার করা। এসব ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু যখন রাজনৈতিক সংস্কৃতি দুর্বল হয়, তখন মবতন্ত্রই হয়ে ওঠে সহজ পথ।

গণতন্ত্রে বিরোধী মত থাকবে। কিন্তু বিরোধ মানে শত্রুতা নয়। মবতন্ত্র এই পার্থক্য মুছে দেয়। ফলে রাজনীতি সহিংস হয়ে ওঠে। নির্বাচনের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়।

মবতন্ত্র মোকাবিলায় রাষ্ট্রের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নিলে মবতন্ত্র আরও সাহস পায়। অনেক সময় দেখা যায়, পুলিশ পরিস্থিতি সামাল দিতে দেরি করে। আবার কোথাও কোথাও রাজনৈতিক চাপ কাজ করে।

সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার রাষ্ট্রকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন এভাবে,

‘রাষ্ট্র হলো সেই সত্তা, যার হাতে বৈধ সহিংসতার একচেটিয়া অধিকার থাকে।’ অর্থাৎ বৈধভাবে শক্তি প্রয়োগের অধিকার শুধু রাষ্ট্রের। সুতরাং

যখন এই অধিকার ভিড়ের হাতে চলে যায়, তখন রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়ে।

আমি মনে করি,মবতন্ত্র শুধু আইনগত সমস্যা নয়। একটি নৈতিক সমস্যাও। আমরা কি আমাদের সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা দিচ্ছ? শিক্ষাব্যবস্থায় নাগরিক শিক্ষা দুর্বল হলে মানুষ সহজেই মবের অংশ হয়ে যায়।

একজন মানুষ যখন ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যায়, তখন সে নিজের দায়িত্ব ভুলে যায়। এই মানসিকতা বদলানো জরুরি।

বিশ্বের অনেক দেশেই মবতন্ত্রের অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও আইনের শাসনের মাধ্যমে তারা এটি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। ভারতে গণপিটুনির বিরুদ্ধে কঠোর আইন হয়েছে। ইউরোপে ঘৃণাভাষণের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার হয়। আমরাও  মব নিয়ন্ত্রণ করতে পারব। কিন্তু তার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার। প্রশাসনিক সাহস দরকার।

মব নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগে শূন্য সহনশীলতা দেখাতে হবে। মবতন্ত্রে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে। পরিচয়, দল, ধর্ম—কিছুই বিবেচ্য হতে পারে না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব নিয়ন্ত্রণে দরকার কার্যকর ব্যবস্থা। কিন্তু তা যেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন না করে সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। অন্যদিকে  শিক্ষা ও গণমাধ্যমের ভূমিকা বাড়াতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে, মব  মানে ন্যায়বিচার নয় বরং ঘৃণ্য অপরাধ।

গণতন্ত্র কখনো নিখুঁত নয়। তবু গণতন্ত্রের বিকল্প নেই। কিন্তু যদি গণতন্ত্রকে বাঁচাতে হয়, তাহলে মবতন্ত্রকে থামাতে হবে। ভিড়ের শাসন কোনো সমাজকে নিরাপদ করে না। বরং তা সবাইকে অনিরাপদ করে তোলে। সুতরাং আমাদের আজই এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, আমরা কি আইন ও বিবেকের পথে হাটবো। নাকি আবেগ আর ভিড়ের হাতে নিজেদের ভবিষ্যৎ তুলে দেব?

লেখক: সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা

ahabibhme@gmail.com 

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম