প্রবাসে দেশীয় রাজনীতির উত্তাপ ছড়ানো বন্ধ হোক

  পলাশ রহমান ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৯:০৫:৫৩ | অনলাইন সংস্করণ

ইতালিতে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিএনপির বিক্ষোভ। ফাইল ছবি

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি চার দিনের সফরে ইতালি এসেছিলেন। এ সময় তিনি ইতালির প্রধানমন্ত্রী সিনোর জুসেপ্পে কোনতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

রোমে নবনির্মিত বাংলাদেশ দূতাবাস ভবন উদ্বোধন এবং ইতালি আওয়ামী লীগের আয়োজনে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।

প্রধানমন্ত্রী ইতালির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর মিলানোয় যান এবং সেখানেও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ দেন।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত প্রবাসী নেতাকর্মীদের সংবর্ধনা সভায় শেখ হাসিনা বলেন, জিয়াউর রহমানের জন্ম বিহারে, এরশাদের জন্ম কুচবিহারে, খালেদা জিয়ার জন্ম শিলিগুড়ি। তাদের একজনও এই মাটির সন্তান না।

বিমানবন্দরে প্রবাসীদের হয়রানি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আসলে আমাদের দেশের কিছু মানুষের চরিত্রই খারাপ। যেই শুনে বাইরে থেকে আসবে, ভাবে একটু চাপ দিলেই মনে হয় কয়েকটা ডলার পাওয়া যাবে। এটা দিয়ে অভ্যাসটা আপনারাই খারাপ করেছেন। (দৈনিক মানব জমিন)

অপর দিকে শেখ হাসিনার ইতালি আগমনের প্রতিবাদ জানাতে ইতালি বিএনপির নেতাকর্মীরা রোম এবং মিলানোর রাজপথে জড়ো হন। তারা শেখ হাসিনা এবং সিনোর কোনতের বৈঠকের সময় ইতালিয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন শ্লোগান দিতে থাকেন।

এ সময় তাদের হাতে ছিল খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়ে এবং শেখ হাসিনার ইতালি আগমনের প্রতিবাদ জানিয়ে লেখা বিভিন্ন শ্লোগান। বিএনপির নেতাকর্মীরা গলা ফাটিয়ে বলতে থাকেন, ‘হাসিনা যাবে যেখানে, প্রতিরোধ হবে সেখানে’।

প্রবাসীরা বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতি করেন এ আর নতুন কিছু নয়। তারা বছরকে বছর ধরে আওয়ামীলীগ বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আস্তাবল খুলে পকেটের টাকা খরচ করে বাংলাদেশের অসুস্থ রাজনীতির চর্চা করেন।

এ কাজে দুয়ো দেন দেশের রাজনীতিকরা। তারা বিদেশি শাখাকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে অনুমোদন করেন। বিভিন্ন সময় বিদেশে এসে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে মিটিং করেন, সংবর্ধনা নেন, দামি দামি উপঢৌকন বগলদাবা করেন। দেশীয় কায়দায় বিদ্বেষমূলক বক্তৃতা করে কমিউনিটিতে হিংসা বিদ্বেষের বিষ ঢালেন দক্ষতার সঙ্গে।

ঢাকার নির্বাচন কমিশন আইন করেও তাদের এসব কাজ থেকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। আওয়ামীলীগ বিএনপি নিবন্ধনের শর্ত ভেঙ্গে তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে র্নিলজ্জ ভাবে। বিদেশে এসে দলীয় ব্যানার টানিয়ে তারা মিটিং সিটিং করছে নিয়মিত। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী আসলেও আইন বিরোধী এসব কাজ থেকে বিরত থাকা হয় না।

অথচ প্রবাসে দলীয় রাজনীতির জন্য দেশের এবং প্রবাসীদের পরিবারের ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। দেশের এবং কম্যুনিটির ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। ইমেজ সংকট তৈরী হয়। স্থানীয় আইন অমান্য হয়। নিজেদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ মারামারি সৃষ্টি হয়। কদিন আগে পর্তুগালের বিএনপি আওয়ামীলীগ সমর্থকরা মারামারি করে প্রায় ১০ জনকে গুরুতর আহত করেছে। যা দেশের প্রায় সব জাতীয় কাগজে ছাপা হয়েছে।

এতদিন প্রবাসীদের দলীয় রাজনীতি ঘরের ভেতরে বা কম্যুনিটির ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তা আর থাকছে না। কথায় কথায় তারা রাস্তায় নেমে পড়ছেন। গত ১০/১২ বছর যাবৎ ভিন্ন দলের, ভিন্ন মতের কাউকে নাগালে পেলে প্রতিবাদের নামে ঝাপিয়ে পড়ার এক ভয়ঙ্কর কালচার শুরু হয়েছে প্রবাসে। যা সত্যিই খুব উদ্বেগের।

ভিন্ন মতের, ভিন্ন দলের এমপি নেতা মন্ত্রী বিদেশে এলে বিক্ষোভ প্রতিবাদের নামে রাস্তায় নেমে আসা, তার উপর হামলে পড়ার প্রবাসী কালচার খুব বেশি দিনের নয়। এ কালচার মূলত শুরু হয় ফখরুদ্দিন মইনুদ্দিনের বিশেষ সরকারের সময় থেকে।

তারা জরুরী অবস্থা ঘোষনা করে প্রায় দুই বছর স্বাভাবিক রাজনীতির টুটি চেপে ধরেছিল। সে সময় দেশে রাজনীতি নিয়ে খোলাখুলি কথা বলা যেতো না। রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করা যেতো না।

ঢাকার রাজনীতিকদের উস্কানিতে সেই ঝাল মেটাতে শুরু করেন প্রবাসীরা। তারা সরকার পক্ষের কাউকে হাতের নাগালে পেলেই ঝাপিয়ে পড়তে শুরু করেন। তাদের হামলা থেকে রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, সম্পাদক, বিচারক, বুদ্ধিজীবী কেউই রেহাই পাননি।

বিশেষ সরকার বিদায় হলেও দেশের রাজনীতির রুপ খুব একটা বদলায়নি। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, শেখ হাসিনার সরকার ফখরুদ্দিন মইনুদ্দিনদের মতো করে বিরোধী দলের টুটি চেপে ধরে দেশ চালাতে শুরু করে। হামলা, মামলা, খুন, গুম দিয়ে দেশকে প্রায় বিরোধী দল শূন্য করে ফেলা হয়।

সংসদ রাজপথ কোথাও বিরোধী দলকে সহ্য করা হয় না। তাদের কোনো কর্মসূচি পালন করতে দেয়া হয় না। কথায় কথায় নেতাকর্মী গুম হতে থাকে। হাজার হাজার মামলা দিয়ে নেতাকর্মীদের পুলিশি হয়রানির মধ্যে রাখা হয়। ডাকসাইটে নেতাদের হাস্যকর মামলায় গ্রেফতার করে নির্যাতন করা হয়। নির্বাচনের নামে লাগাতার তামাশা করা হয়।

সরকারী নির্যাতন থেকে সাংবাদিক, সমালোচক, বুদ্ধিজীবীরাও রেহাই পায় না। তাদের নামেও নানা কিসিমের মামলা দিয়ে গ্রেফতার করা হয়। হয়রানি করা হয়। দেশে মূলত একদলীয় শাসন কায়েম করা হয়। এর প্রতিক্রিয়া ভয়াবহ আকারে শুরু হয় প্রবাসে। শেখ হাসিনা সরকারের কেউ বিদেশে এলেই বিএনপি জামায়াতের নেতাকর্মীরা ঝাপিয়ে পড়েন। প্রতিবাদ জানায়, প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেন।

এদিক থেকে আওয়ামীলীগও পিছিয়ে থাকে না। তারাও বিএনপিসহ ভিন্নমতের মানুষদের উপর হামলা চালাতে একটুও দ্বিধা করে না।

দেশে গণতন্ত্র না থাকলে, রাজনীতি করার, কথা বলার পরিবেশ না থাকলে প্রবাস থেকে প্রতিবাদ করা যেতে পারে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কেউ এলে তাকে বিক্ষোভ দেখানো যেতে পারে। কিন্তু তা যদি নিয়ম বা প্রথায় পরিণত হয়, দেশের এবং কম্যুনিটির ইমেজ নষ্ট করে তা কোনো ভাবেই গ্রহণযোগ্য হয় না।

তাছাড়া প্রবাসে বিক্ষোভ দেখানো বা প্রতিবাদ করার কিছু নিয়ম আছে, শৃংখলা আছে, স্থানীয় মান আছে। তা ভেঙ্গে দেশি কায়দায় অশ্লীলতা করা, গালাগাল করা, মারামারি করা, সম্মানি মানুষ কে অসম্মান করা কোনো ভাবেই সমর্থন যোগ্য নয়। এগুলো বন্ধ করা দরকার। এসব বন্ধের জন্য এখনি কার্যকর পদক্ষে নেয়া দরকার।

অন্যদিকে রোমের নবনির্মিত বাংলাদেশ দূতাবাস ভবন কেনা এবং প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে সোস্যাল মিডিয়ায় বেশ উত্তাপ লক্ষ করা গেছে। ইতালির প্রবাসীরা জানতে চায় মোট কতো ইউরোর বিনিময়ে ওই ভবন কেনা হয়েছে? কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, শুধুমাত্র একটি ভবন উদ্বোধন করতে কেনো প্রধানমন্ত্রীকে বিদেশ সফর করতে হবে?

রোমের ইমিগ্রেশন আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা নূরে আলম সিদ্দিকি বাচ্চু জানান, তিনি রাষ্ট্রদূতকে ইমেইল করে বিষয়টি জানতে চেয়েছেন। তিনি মনে করেন এটা জানার অধিকার প্রবাসীদের আছে, কিন্তু রাষ্ট্রদূত পক্ষ থেকে কোনো সদুত্তর না পেয়ে তিনি হতাশা প্রকাশ করেছেন।

ইতালি প্রবাসীদের অনেকেই ধারনা করছেন, ভবনটি কেনার সময় মোটা অংকের অর্থদূর্নীতি করা হয়েছে। যা প্রকাশ পেয়ে যাওয়ার ভয়ে ভবনের প্রকৃত মূল্য গোপন করা হচ্ছে।

প্রবাসীদের মার খেয়ে, গালাগাল শুনেও আমাদের দেশের রাজনীতিকদের হুশ হয় না। তারা বিদেশে এসে দলীয় আতলামি বন্ধ করেন না। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও এসব আইন বিরোধী কাজ থেকে বিরত থাকেন না।

তিনি কোনো দিন বিদেশ সফরের আগে প্রবাসী সমর্থকদের নির্দেশ দেননি সংবর্ধনার নামে অশান্তি করা যাবে না। বিদেশের মাটিতে দলীয় ব্যানার তোলা যাবে না।

তিনি দেশের বাইরে এসেও নিজেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভাবতে পারেন না। সব সময় নিজেকে আওয়ামীলীগের প্রধানমন্ত্রী ভাবেন। তা না হলে দেশের আইন এবং বিদেশের আইন ভেঙ্গে আওয়ামীলীগের নামে ব্যানার টানিয়ে মিটিং করার যৌক্তিকতা কী?

কেন তিনি বিদেশে এসে সব প্রবাসীদের নিয়ে মিটিং করতে পারেন না? কেন তিনি প্রবাসীদের মিটিং এ বিদ্বেষমূলক বক্তৃতা ছাড়তে পারেন না? বিদেশে জিয়া, এরশাদ, খালেদাদের ছোট করে বক্তৃতা দিয়ে কী লাভ হয়? প্রবাসীদের মধ্যে রাজনৈতিক হিংসা বিদ্বেষ উস্কে দেয়া ছাড়া কী এর অন্য কোনো ভালো দিক আছে?

প্রধানমন্ত্রী বা অন্য নেতাদের সংবর্ধনায় কতো টাকা খরচ হয়? এই টাকার উৎস কী? প্রবাসীদের কষ্টের অর্থ এভাবে অপচয়ের মাধ্যমে কী দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি করা হয় না? প্রবাসীদের পরিবারের ক্ষতি করা হয় না? বাংলাদেশি বাদে পৃথিবীর অন্য কোন দেশের মানুষ প্রবাসে দলীয় রাজনীতি করে? তাদের কী দেশপ্রেম নেই?

ঢাকার একটা মাত্র এয়ারপোর্টের যাত্রী হয়রানি যে সরকার বন্ধ করতে পারে না সে সরকার প্রধান কী ভাবে প্রবাসীদের সামনে অন্যের সমালোচনা করে বক্তৃতা করেন? কেন তিনি নিজেকে হাসাহাসির পাত্র বানান?

আমাদের প্রধানমন্ত্রী কেনো বিদেশে এসে দ্বিতীয় প্রজন্মের ছেলে মেয়েদের সঙ্গে কথা বলেন না? কেনো তাদের লেখাপড়া বা চিন্তা ভাবনার খবর নেন না?

প্রবাসে অনেক গুনী মানুষ আছেন, অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা বাংলাদেশি কম্যুনিটিকে সমৃদ্ধ করতে, দেশের ইতিবাচক ইমেজ তুলে ধরতে কাজ করে, প্রবাসী ছেলে মেয়েদের বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতি শিক্ষা দেয়, প্রধানমন্ত্রী কেনো তাদের খোজ নেন না? কেন তিনি আওয়ামীলীগের ব্যানারে আটকে থাকেন?

একজন প্রধানমন্ত্রী নিজে কী ভাবে আইন ভাঙ্গেন? ঢাকার নির্বাচন কমিশনের রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের শর্তের মধ্যে অন্যতম হলো বিদেশে কোনো শাখা থাকতে পারবে না। প্রধানমন্ত্রী নিজে কেন সে আইন মানেন না? কেনো বিদেশে বক্তৃতা করার সময় রাজনৈতিক বিদ্বেষমূলক কথা বলেন?

আমি মনে করি এক্ষেত্রে দেশপ্রেমিক কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের এগিয়ে আসা দরকার।
আদালতের মাধ্যমে হলেও প্রবাসে দলের নামে বা বেনামে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা এবং বিদ্বেষমূলক বক্তৃতা করার উপর নিষেধাজ্ঞা আনতে হবে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে শাস্তির ব্যবস্থা রাখতে হবে।

এক্ষেত্রে দেশপ্রেমিক কোনো বিচারপতি স্বপ্রণোদিত হয়েও এগিয়ে আসতে পারেন।

লেখক:প্রবাসী সাংবাদিক, সমালোচক

 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত