Logo
Logo
×
   

Advertisement

রাজনীতি

বিমান মন্ত্রণালয়

প্রথম নারী মন্ত্রী রিতার সংগ্রামী জীবনের পথপরিক্রমা

Advertisement

মতিউর রহমান

মতিউর রহমান

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:১৯ পিএম

প্রথম নারী মন্ত্রী রিতার সংগ্রামী জীবনের পথপরিক্রমা

বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা। ফাইল ছবি।

Advertisement

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নজির গড়া জয়। এবার সেই ধারাবাহিকতায় আরও একটি মাইলফলক স্পর্শ করলেন মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আফরোজা খানম রিতা। তার জীবনটাই সংগ্রামমুখর। তবে পারিবারিক জীবন থেকে পেশা পরে রাজনীতি সবক্ষেত্রে সফল তিনি।

স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো তিনি বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিলেন। দেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে এটি একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন।

রাষ্ট্র পরিচালনায় এই দপ্তর বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থার ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ, প্রবাসী আয় সহজতর করা এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশ—সবকিছুর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত এ মন্ত্রণালয়। বিভিন্ন সময়ে অভিজ্ঞ ও প্রভাবশালী নেতারা দায়িত্ব পালন করেছেন এখানে। সেই দীর্ঘ ধারায় এবার যুক্ত হলো একজন নারী নেতৃত্বের নাম।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সেই দীর্ঘ ইতিহাসে এবার যুক্ত হলো নতুন অধ্যায়। বিএনপির আফরোজা খানম রিতা স্বাধীনতার পর এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়া প্রথম নারী মন্ত্রী।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও দলিল দস্তাবেজ ঘেটে জানা গেছে, যুদ্ধ-পরবর্তী শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর ১৯৭২–১৯৭৩ সময়ে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে নৌ, বিমান ও পর্যটন খাতের দায়িত্বে ছিলেন এম মনসুর আলী। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে কাজী আনোয়ারুল হক স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলেও তিনি এ দপ্তরের দায়িত্বে ছিলেন।

১৯৯৬–২০০১ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একই সময় ১৯৯৬ সালে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, বিএনপি সরকারের আমলে বিমান বহর সম্প্রসারণ এবং পর্যটন খাতে নীতিগত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৯১–১৯৯৬ এবং ২০০১–২০০৬ দুই দফায় এম কে আনোয়ার মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০০১–২০০৫ সময়ে মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন এবং ২০০৫–২০০৬ সময়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৯–২০১১ মেয়াদে জাতীয় পার্টির জি এম কাদের মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। ২০১১–২০১৩ সময়ে আওয়ামী লীগের মুহাম্মদ ফারুক খান দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪–২০১৮ মেয়াদে ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন নেতৃত্ব দেন মন্ত্রণালয়টির। এরপর ২০১৮–২০১৯ সময়ে এ কে এম শাহজাহান কামাল এবং ২০১৯–২০২৪ পর্যন্ত প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মো. মাহবুব আলী দায়িত্ব পালন করেন।

২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মুহাম্মদ ফারুক খান আবারও স্বল্প সময়ের জন্য মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। সর্বশেষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে আকিজ গ্রুপের অন্যতম শেখ বশির উদ্দিন ১৫ এপ্রিল ২০২৫ থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

নারী নেতৃত্বের নতুন সংযোজন

এই দীর্ঘ রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে একজন নারী পূর্ণমন্ত্রী। ঐতিহাসিক দলিলে নাম লেখালেন প্রথমবার সংসদ সদস্য হওয়া আফরোজা খানম রিতা। মানিকগঞ্জ-৩ আসনে রেকর্ড ভোটে নির্বাচিত হয়ে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে আলোচিত হন। বাংলাদেশের ভোটের ইতিহাসে তিনি তৃতীয় সর্বোচ্চ ব্যবধানে জয়ী নারী প্রার্থী। তার আগে সরাসরি ভোটে বড় ব্যবধানে বিজয়ের নজির রয়েছে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার। তবে এই দীর্ঘ পথচলা এই মন্ত্রনালয়টিতে নারী নেতৃত্বের উপস্থিতি ছিল না। পাঁচ দশকের বেশি সময়ে প্রথমবারের মতো সেই শূন্যতা পূরণ হলো।

পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকারও তার পরিচয়ের অংশ। তার বাবা বিএনপি সরকারের সময়ে দফতরবিহীন মন্ত্রী ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় এবার জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেলেন কন্যা।

অর্থনীতির বাস্তবতায় এই দপ্তরের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট, কার্গো কার্যক্রম, হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা এবং পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সঙ্গে জড়িত। দক্ষ নীতিনির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ খাত জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

রেকর্ড ভোটে নির্বাচিত হয়ে কৌশলগত এই দায়িত্ব গ্রহণ রিতার রাজনৈতিক জীবনের বড় অর্জন। একই সঙ্গে এটি নারী অংশগ্রহণের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। 

শিক্ষাগত উচ্চতায় তিনিও ছিলেন অনন্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা আফরোজা খানম বর্তমানে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য এবং জেলা বিএনপির আহ্বায়ক। তিনি মুন্নু গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান। তার স্বামী মইনুল ইসলাম মুন্নু গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিাজের ভাইস-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

আফরোজা খানমের তিন ছেলে সন্তান রয়েছেন। বড় সন্তান মাইমুনুল ইসলাম অন্তু লন্ডনের ইমপেরিয়াল কলেজ থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে মুন্নু সিরামিকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দ্বিতীয় সন্তান রাশীদ সামিউল ইসলাম অর্ক লন্ডনের ইমপেরিয়াল কলেজ থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে মুন্নু ফেব্রিক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কনিষ্ঠ সন্তান রাশীদ রাফিউল ইসলাম অর্নব লন্ডনের সিটি ইউনিভার্সিটি থেকে ইন্টারন্যাশনাল পলিটিকস বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে মুন্নু মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি রাজনীতির মাঠেও দীর্ঘ সময় সক্রিয় ছিলেন তিনি। ২০০১ সালে বাবার নির্বাচনি সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন থেকে শুরু করে জেলা ও কেন্দ্রীয় রাজনীতির নানা পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ২০১০ সালে জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, পরে জেলা বিএনপির সভাপতি এবং সর্বশেষ আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

বিগত সরকারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে সক্রিয় উপস্থিতি, মামলা-হামলার মধ্যেও দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে থাকা এবং সাংগঠনিকভাবে দলকে শক্তিশালী করার ভূমিকা তাকে জেলা রাজনীতিতে আলাদা অবস্থান এনে দেয়।

স্থানীয় নেতারা বলছেন, কঠিন সময়ে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতাই আজকের এই প্রাপ্তির পেছনে বড় কারণ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাবা প্রয়াত হারুনার রশীদ খান মুন্নুর হাত ধরে রাজনীতিতে এসে পিতার মর্যাদায় আরও উচ্চমাত্রায় তুলে ধরলেন রিতা। বিগত স্বৈরাচার পতন আন্দোলন কর্মসূচিতে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে রাজপথে ছিলেন আফরোজা খানম। তিনিসহ দলের অসংখ্য নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হয়। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকার পতন আন্দোলনে জেলাসহ ঢাকায়ও সমানতালে অংশ নেন। মামলা ও হামলায় জর্জরিত দলীয় নেতাকর্মীদের পাশে থেকে আর্থিক ও মানসিক সহায়তা করেন। এসব কারণে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণসহ নানাভাবে হয়রানি করে। তবুও তিনি দমে যাননি। কঠিন ও কঠোর সময়ে নেতাকর্মীদের নিয়ে তিনি আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। মূলত তার নেতৃত্বেই এ জেলায় বিএনপি ঘুরে দাঁড়ায়।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম