যে নিজের পরিচয় গোপন করে অপকর্ম করে, সেই বড় গুপ্ত: জামায়াত আমির
চট্টগ্রাম ব্যুরো
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২০ এএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, যে নিজের পরিচয় গোপন করে অপকর্ম ও দুর্নীতি করে, সেই সবচেয়ে বড় গুপ্ত। তিনি বলেন, মানুষ আদালতে গেলে আর শোষণ-বঞ্চনার শিকার হবে না, ন্যায়বিচার পাবে। সন্তানরা ভালো শিক্ষা পাবে, হাতে ভালো কাজ পাবে এবং তারা দেশ গড়বে। দেশ থেকে চাঁদাবাজি, ঘুষ ও দুর্নীতি নির্মূল হবে। কিন্তু তার একটাও হয়নি।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাতে চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে ১১ দলীয় জোটের লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি এলডিপির চেয়ারম্যান কর্ণেল (অব) অলি আহমদ। শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে লংমার্চের বিশাল গাড়ি বহর নগরীর লালদীঘির পাড়ে পৌছে। এসময় নেতাকর্মীর স্লোগান দিতে শুরু করে।
প্রধান অতিথির বক্তেব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখ জনগণ দুটি ভোট দিয়েছিল। একটি জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচনের জন্য, আরেকটি বাংলাদেশের রাজনীতির পরিবর্তনের জন্য সংস্কার পরিষদের সদস্য নির্বাচনের উদ্দেশ্যে। একই ব্যক্তিকে দুটি ভোট দিতে হয়েছিল। নির্বাচনের আগে বর্তমান সরকারি দল এবং আমরা সবাই বলেছিলাম, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলুন। ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে আমরা বদ্ধপরিকর। বিএনপিও এ কথা বলেছে, আমরাও বলেছি। ছয় মাস চলে গেল, বিএনপি কি তাদের কথা রেখেছে?
ওই সময় বাংলাদেশের মানুষ বুকভরা আশা নিয়ে ভেবেছিল, এবার একটা পরিবর্তন আসবে। বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের জন্ম হবে না। মানুষ আদালতে গেলে আর শোষণ-বঞ্চনার শিকার হবে না, ন্যায়বিচার পাবে। সন্তানরা ভালো শিক্ষা পাবে, হাতে ভালো কাজ পাবে এবং তারা দেশ গড়বে। দেশ থেকে চাঁদাবাজি, ঘুষ ও দুর্নীতি নির্মূল হবে। কিন্তু তার একটাও হয়নি।
জামায়াত আমির বলেন, তারা তখন বলেছিল, অনির্বাচিত সরকার যত দ্রুত বিদায় নেবে, দেশের তত মঙ্গল হবে। আমি জিজ্ঞেস করতে চাই, অনির্বাচিত সরকার আমাদের জান্নাতে পাঠায়নি, এটা ঠিক। কিন্তু অনির্বাচিত সরকারের সময় আপনারা যেমন ছিলেন, এখন কি সেই সুবিধাগুলো পাচ্ছেন?
ঢাকা বিমানবন্দরে এক প্রবাসীর স্বর্ণ ছিনতাইয়ের প্রসঙ্গ তুলে ডা.শফিকুর রহমান বলেন, কয়েক দিন আগে তিনজন ছিনতাইকারী একজন প্রবাসীর স্বর্ণ ছিনতাই করেছে। ছিনতাইয়ের সময় তারা নিজেদের আওয়ামী লীগের লোক পরিচয় দিয়ে ভয় দেখিয়েছিল। কিন্তু ধরা পড়ার পর দেখা গেল, তারা বিএনপির লোক। তিনি বলেন, এরা গুপ্ত। যে নিজের পরিচয় গোপন করে অপকর্ম করে, দুর্নীতি করে, সেই হচ্ছে সবচেয়ে বড় গুপ্ত।
সমাবেশে এনসিপির আহবায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, স্বৈরাচারে রেখে যাওয়া সমস্যার সমাধান যদি আপনি করতে না পারেন তাহলে সেটা প্রথমে সবের আগে জনগণের কাছে স্বীকার করুন । স্বীকার করুন এই সমস্যার সমাধান আপনার একা পক্ষে সম্ভব নয়। স্বীকার করুন আপনার কাছে কোনো সঠিক পরিকল্পনা নাই দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার এবং বিরোধী দলের সাথে আলোচনায় বসুন । বিরোধী দল সমর্থন না দিলে এই দেশ আপনার পক্ষে একা চালানোর সম্ভব নয়। এই বাস্তবতা মেনে নিন। আমরা স্বৈরাচারকে, অতীত স্বৈরাচারকে আসার কোনো পথ করে দিচ্ছি না । এই পথ আপনারাই করে দিচ্ছেন । কারণ জনগণকে আপনারা সমস্যার সমাধান দিতে পারছেন না। ফলে জনগণ কিন্তু বিকল্প খুঁজছে এবং সেই বিকল্প কিন্তু আজকের নাম মানছে বাংলাদেশের জনগণ দেখেছে বিকল্প শক্তি কারা। পতিত স্বৈরাচার কোনোভাবেই দেশে ফিরে আসতে পারবে না। একইভাবে নতুন কোনো স্বৈরাচার হওয়ার রাস্তাও আমরা এই বাংলাদেশে হতে দেব না, ইনশাআল্লাহ।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্যে করে তিনি বলেন, তারেক রহমান এই সমস্যার সংকট আপনিই তৈরি করেছেন। আপনি সংসদকে কার্যকর করেননি। সংসদ কার্যকর না হওয়ার কারণে আজকে আন্দোলন রাজপথে গড়িয়েছে। আপনি যদি প্রথমেই গণভোটের গণরায় সংবিধান বাস্তবায়ন পরিষদ করতেন তাহলে সেই সংবিধান পরিষদে আমরা আলোচনা করতে পারতাম।
জনগণের নির্বাচিত এমপিদেরকে কাজ করতে দিচ্ছেন না। দেশের অন্য সকল প্রতিষ্ঠানের মতো এই সংসদকেও একটা একদলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন।
তিনি হুঁশিয়ারি উচ্ছারণ করে বলেন, আমরা হুঁশিয়ার করে দিতে চাই সংসদ যদি আস্তে একাকার হয়ে যাবে। তার আগেই আপনি জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। অথবা ঐতিহাসিকভাবে কীভাবে দেশকে নেতৃত্ব দেওয়া যায় সেটার রাস্তা খুঁজে বের করুন। নতুনভাবে জনগণের দেওয়া প্রতিশ্রতি আপনারা ভঙ্গ করেছেন । আপনারা প্রতারণা করেছেন। এর পরিণতি আপনাকে দিতে হবে আপনার দলকে দিতে হবে । বিগত স্বৈরাচার সরকারকে দিতে ষোল বছর জনগণ অপেক্ষা করেছিল। আপনার জন্য আমরা ষোল বছর অপেক্ষা করব না । পাঁচ বছর অপেক্ষা করব না।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় জোটের সমন্বয়ক এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, গোটা বাংলাদেশ আজ বিস্ফোরণময়। সকাল থেকে লালদীঘি পর্যন্ত জনতার ঢল নেমেছে। এই জনগণ যদি রাস্তায় নামে, ১১ দলের ঐক্যেরও প্রয়োজন হবে না। জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে সরকারের বিদায় নিশ্চিত করবে। দেশে গ্যাস সংকট নেই এমন বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। মাতারবাড়ীসহ বিভিন্ন স্থানে গ্যাস সরবরাহের অবকাঠামো থাকলেও জনগণ সংকটে রয়েছে। গত ১৭ জুলাই জ্বালানি খাতের দায়িত্বশীলরা এক সপ্তাহের মধ্যে গ্যাস সংকট সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেই সংকট কাটেনি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির এনসিপির নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, বিএনপির নেতাকর্মীদের ঘরে ঘরে গিয়ে তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রশ্ন করা উচিত কেন তারা জনগণের ওপর ‘জুলুম’ করেছেন। জনগণের দাবি আদায়ে বর্তমানে ছয় দফা নিয়ে আন্দোলন চলছে, এসব দাবির বিষয়ে জবাবদিহি না হলে তা এক দফা দাবিতে পরিণত হবে। আমরা লং মার্চ করেছি তাদের দাবি নিয়ে, যাদের সন্তানদের বাংলাদেশ থেকে চিরতরে মুছে দেওয়া হয়েছে। আমরা লং মার্চ করেছি তাদের দাবি নিয়ে, যাদের সন্তান পড়তে-বসতে বিদ্যুৎ পায় না। আমরা লং মার্চ করেছি সেই পরিবারের জন্য, যেখানে রান্নাঘরে গিয়ে গ্যাসের চাবি ঘোরানোর পরও গ্যাস পাওয়া যায় না।
১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চের পৌঁছার আগেই চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘির মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। শনিবার দুপুরের পর থেকে বিভিন্ন এলাকা থেকে নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে ময়দানে আসতে শুরু করেন। এসময় আশপাশের এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সমাবেশ ঘিরে নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সমাবেশস্থলের আশপাশে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ময়দানে ডগ স্কোয়াড নিয়ে তল্লাশি চালাতে দেখা গেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সদস্যদের।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, লালদীঘির মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে জহুর হকারমার্কেট, জেলা পরিষদ মার্কেট পর্যন্ত নেতা-কর্মি অবস্থান নিয়েছে। শনিবার দুপুরের পর থেকেই লালদিঘি ময়দানে চকবাজার, কোতোয়ালী মোড়, কাজির দেউড়ি, লাভলেইন, সিআরবি মোড়, টাইগারপাস ও আন্দরকিল্লা এলাকা মিছিলে মিছিলে মুখরিত হয়ে ওঠে। সন্ধ্যা গড়াতেই পুরো লালদিঘি ময়দানে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না।
কক্সবাজার, তিন পার্বত্য জেলা এবং চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলা ও মহানগরের ১৬টি থানা থেকে হাজার হাজার নেতাকর্মী খন্ড খন্ড মিছিল নিয়ে লালদিঘির মাঠে জমায়েত হন। নেতাকর্মীদের হাতে শোভা পায় বিভিন্ন ধরনের পোস্টার, প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার, যেখানে ৬ দফা দাবি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে তা বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হচ্ছে।
সমাবেশে মাগরিবের আগ পর্যন্ত বক্তব্য রাখেন, চট্টগ্রাম -১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহাজাহান চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১৬ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা জহিরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম মহানগর আমীর নজরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আমীর আনোয়ারুল ইসলাম চৌধুরী, এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগরীর আহবায়ক মোহাম্মদ মীর শোয়াইব,জামায়াতে ইসলামীর চট্টগ্রাম অঞ্চলের সদস্য জাফর সাদেকসহ আরও অনেকে।
শনিবার সকাল সোয়া ৮টার পর রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বর থেকে চট্টগ্রামের পথে লংমার্চ শুরু হয়।
