স্থানীয় সরকার নির্বাচন
নতুন ছক কষছে বিএনপি
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৩৮ পিএম
ফাইল ছবি।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূলে সরব হয়ে উঠেছেন বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা। এরই মধ্যে ফেনী সদর উপজেলার মোটবী ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে দলের সমর্থন পেতে অন্তত নয়জন নেতা বা সমর্থক তৎপর রয়েছেন। একাধিক প্রার্থী মাঠে নামার এমন পরিস্থিতিতে ভোট ভাগাভাগির আশঙ্কা করছে বিএনপি। ফলে বিদ্রোহ ঠেকিয়ে একক প্রার্থী নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের সমর্থকদের ভোট নিজেদের বাক্সে টানতে নতুন সমীকরণ কষছে দলটি।
তবে স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে আগেভাগেই মাঠপর্যায়ে নজর রাখছে বিএনপি। দল সমর্থিত প্রার্থীর বাইরে যাতে কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না পারেন সে ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বিএনপি। জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ প্রার্থী হলে তা মেনে নেওয়া হবে না। এমন বার্তাই দেওয়া হচ্ছে দলের বিভিন্ন পর্যায় থেকে।
সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকেও এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন। আসন্ন নির্বাচন ঘিরে দলীয় শৃঙ্খলা ইস্যুতে জোর দিচ্ছেন তিনি। একই সঙ্গে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলে আসছেন-স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ‘একক প্রার্থী’ ঠিক করতে হবে এবং সবাইকে মিলে দল সমর্থিত প্রার্থীকে বিজয়ী করতে হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাঠপর্যায়ে একাধিক প্রার্থী হওয়ার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটিতে স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্বপ্রত্যাশীর সংখ্যা অনেক। বেশকিছু এলাকায় একাধিক নেতা দলীয় সমর্থন ও নিজেদের আধিপত্যের লড়াইয়ে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
গণমাধ্যমে এসেছে, ফেনী সদর উপজেলার মোটবী ইউনিয়নে এবার চেয়ারম্যান পদে দলের সমর্থন পেতে বিএনপির নেতা বা সমর্থক অন্তত নয়জন তৎপর রয়েছেন। এজন্য আগেভাগেই বিদ্রোহীদের সামলানো এবং তাদের সমর্থকদের ভোট টানার নতুন ছক কষছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগসহ প্রতিপক্ষ অন্য দল এবং বিগত নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিদ্রোহী প্রার্থীদের সমর্থকদের ভোট কীভাবে নিজেদের বাক্সে আনা যায়, তা নিয়ে চুলচেরা হিসাব-নিকাশ করছেন দায়িত্বশীল নেতারা। অবশ্যই কিছু কিছু এলাকায় বিএনপির দলীয় নেতারা সমঝোতার ভিত্তিতে একক প্রার্থী ঠিক করছেন।
বিএনপির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, স্থানীয় নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী হলে ভোট ভাগাভাগির ঝুঁকি তৈরি হবে। এতে দল সমর্থিত প্রার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। একই সঙ্গে তৃণমূলে বিভক্তি বাড়তে পারে। তাই শুরুতেই বিদ্রোহের পথ বন্ধ করতে চায় দলটির হাইকমান্ড।
স্থানীয় নির্বাচনে প্রতীক না থাকলেও বিএনপির অভ্যন্তরীণ আলোচনায় জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতাও গুরুত্ব পাচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যারা প্রার্থী হয়েছিলেন, তাদের সমর্থকরা স্থানীয় নির্বাচনে কী ভূমিকা রাখবেন, সেটিও হিসাবের মধ্যে রাখা হচ্ছে। একইভাবে আওয়ামী লীগ ও অন্য রাজনৈতিক দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের সমর্থকদের ভোট নিয়েও নানা সমীকরণ কষছেন তারা।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী যুগান্তরকে বলেন, আমাদের নেতাকর্মীদের এই বিষয়ে আগে থেকেই সতর্ক করা হচ্ছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রতিটি বৈঠকে (জেলা ও বিভাগীয়) এই বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়ে আসছেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী সমর্থন ইস্যুতে স্থানীয় সংসদ-সদস্যদেরও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র একজন সদস্য যুগান্তরকে বলেন, বিএনপি একক প্রার্থীকে সমর্থন দেবে। তবে মাঠের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে কোথাও কোথাও একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন চাইতে পারে। সেক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই পরবর্তী মনোনয়নপত্র বৈধ হলে একক প্রার্থীর পক্ষে সবাই কাজ করবেন।
বিএনপির বরিশাল বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরীন যুগান্তরকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আমাদের দলের নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি রয়েছে। সাংগঠনিকভাবে দলের পক্ষ থেকে সবাইকে একটি স্পষ্ট ও দৃঢ় বার্তা দিচ্ছি যে, দলীয় প্রার্থী হবেন একজন। দল সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে সবাইকে কাজ করতে হবে। তবে সব ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী হবে-এমনটা নয়। হয়তো কিছু কিছু জায়গায় দু-একজন মনোনয়ন জমা দেবে, কিন্তু চূড়ান্ত সময়ে (মনোনয়ন যাচাই-বাছাই পরবর্তী) দলের একজনই থাকবে। এজন্য সবাইকে আগেভাগেই সতর্ক করছি আমরা।
বিএনপির জেলা পর্যায়ের নেতারা জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ফলে প্রার্থী বাছাই নিয়েও প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়তে পারে। বিশেষ করে ইউনিয়ন পর্যায়ে একাধিক নেতা নিজেদের যোগ্য প্রার্থী হিসাবে তুলে ধরছেন। কোথাও সাবেক জনপ্রতিনিধিরা মাঠে নামছেন। কোথাও নতুন মুখের তৎপরতা বেড়েছে। আবার কোথাও দলের একাধিক নেতার মধ্যে নীরব প্রতিযোগিতা চলছে। এতে তৃণমূলে নতুন করে বিভাজনের শঙ্কাও করছেন কেউ কেউ।
দলের দায়িত্বশীল নেতারা অবশ্য বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ প্রার্থী হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা সামনে রেখে এবার আরও কঠোর হওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের মতে, দল এখন রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে তৃণমূলের সাংগঠনিক সক্ষমতারও পরীক্ষা। তাই প্রার্থী সমর্থন থেকে শুরু করে নির্বাচনি কর্মকাণ্ড-সব ক্ষেত্রেই স্থানীয় বিএনপির পাশাপাশি কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ রাখার চেষ্টা থাকবে।
এদিকে তৃণমূলে সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন ইউনিয়নে চলছে মতবিনিময়। নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। কেউ সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হচ্ছেন। কেউ স্থানীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিতি বাড়াচ্ছেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেকজন সদস্য যুগান্তরকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিদ্রোহের বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়ন করবে বিএনপি। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ যাতে নির্বাচনে না নামেন, সেজন্য আগেভাগেই সতর্ক করা হবে। একই সঙ্গে তৃণমূলের মতামত নিয়ে প্রার্থী বাছাইয়ের উদ্যোগও নেওয়া হতে পারে।





