এআই দিয়ে ভুয়া সংবাদ বানিয়ে আ.লীগের পক্ষে প্রচারণা, উঠে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৩৭ পিএম
নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের লোগো। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বাংলাদেশে প্রায় এক বছর ধরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষে ভুয়া খবর ও অপপ্রচার চালানোর একটি নেটওয়ার্ক উন্মোচন করেছে মার্কিন প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক।গাইবান্ধা জেলার একজন ব্যক্তি এআই চ্যাটবট ‘ক্লড’ ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে গণহারে এসব অপপ্রচারমূলক ভুয়া বাংলা খবর ও ভিডিও তৈরি করতেন বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে অ্যানথ্রপিক জানায়, নেটওয়ার্কটি তাদের ‘ক্লড’ নামের এআই চ্যাটবট ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ ভুয়া সংবাদ তৈরি করত। এসব কনটেন্টের একটি অংশ ‘ভারতপন্থি ভূরাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ’ ছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে অ্যানথ্রপিক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এই কর্মকাণ্ডের পেছনে কোনো রাষ্ট্রের নির্দেশনা বা অর্থায়নের প্রমাণ তারা পায়নি। ১৫৪ পৃষ্ঠার পুরো প্রতিবেদনে ভারতের প্রসঙ্গ সরাসরি এসেছে শুধু এই একটি জায়গাতেই।
অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেটওয়ার্কটি আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচার চালাত এবং দলটির রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ছড়াত।
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক কমিটিসহ আওয়ামী লীগের বিরোধীদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের ভুয়া গল্প তৈরি করা হয়। এসব গল্পে তাদের ‘তালেবান ধাঁচ’র শাসন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা এবং নিরাপত্তা বাহিনীতে অনুপ্রবেশের মতো অভিযোগ তুলে ধরা হতো।
এ ছাড়া অন্তবর্তী সরকারের সদস্য ও ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের হত্যার ষড়যন্ত্র, তাদের বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট এবং দুর্নীতি ও গোপন রাজনৈতিক আঁতাতের সঙ্গে জড়িত থাকার মতো মিথ্যা দাবিও প্রচার করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নেটওয়ার্কটির কার্যক্রম যখন চলছিল, তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল না। তাই এটিকে কোনো সরকারি প্রচারণা নয়, বরং একটি বিরোধী রাজনৈতিক দলের পক্ষে পরিচালিত কার্যক্রম হিসেবে বর্ণনা করেছে অ্যানথ্রপিক।
একজন ব্যক্তি, ২৯টি Claude অ্যাকাউন্ট
অ্যানথ্রপিকের দাবি, গাইবান্ধা জেলার ওই ব্যক্তি প্রায় ১৬ মাস ধরে ২৯টি ‘ক্লড’ অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে এই কার্যক্রম চালিয়েছেন। তিনি ‘fake\_news\_3.py’ নামে একটি প্রোগ্রামের মাধ্যমে একসঙ্গে ১৫টি শিরোনাম, তিনটি বানানো সংবাদ এবং ১৫টি ছবির জন্য নির্দেশনা তৈরি করতেন।
অ্যানথ্রপিকের হিসাব অনুযায়ী, এই কার্যক্রমে অন্তত—১,৫০০টি ভুয়া শিরোনাম, ৩০০টি মিথ্যা সংবাদ এবং ১,৫০০টি ছবির নির্দেশনা তৈরি করা হয়েছে।
তবে ‘ক্লড’ নিজে ছবি তৈরি করে না। তাই এসব নির্দেশনা অন্য এআই সিস্টেমে পাঠিয়ে ছবি তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
তৈরি করা ভুয়া কনটেন্ট পরে ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব ও টিকটকে ছড়িয়ে দেওয়া হতো। তাদের লক্ষ্য ছিল গ্রামাঞ্চলের আওয়ামী লীগ সমর্থক ও তুলনামূলক কম শিক্ষিত দর্শক।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেটওয়ার্কটির একজন অপারেটর এক মাস আগেই ইউটিউবে ভিডিও প্রকাশের সময়সূচি ঠিক করে রাখতে পারতেন। তৃতীয় পক্ষের একটি সেবার মাধ্যমে ভিডিও আপলোড করা হতো, যাতে পরিচালনাকারীর অবস্থান গোপন রাখা যায়।
অ্যানথ্রপিকের দাবি, ওই ব্যক্তি নিজেও জানতেন যে এসব খবর মিথ্যা। তার একটি নোটে লেখা ছিল, ‘কেউ জানে না খবরটি ভুয়া।’
কনটেন্টগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তেজনাপূর্ণ ও আক্রমণাত্মক ভাষায় তৈরি করা হতো এবং এমনভাবে লেখা হতো, যাতে গ্রামের সাধারণ মানুষও সহজে বুঝতে পারে।
অ্যাকাউন্ট বন্ধ করেছে অ্যানথ্রপিক
অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ তদন্তের মাধ্যমে তারা এই নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে। পরে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলো নিষিদ্ধ করা হয় এবং একই ধরনের কার্যক্রম শনাক্ত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেও এ বিষয়ে তথ্য দেওয়া হয়েছে।
অ্যানথ্রপিকের ‘ডিটেক্টিং অ্যান্ড কাউন্টারিং মিসইউজ অব এআই: সেপ্টেম্বর ২০২৬’ প্রতিবেদনে এ ঘটনার পাশাপাশি এআইয়ের অপব্যবহারের আরও কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে সাইবার হামলা, প্রভাব বিস্তারমূলক প্রচারণা, নজরদারি, অস্ত্র উন্নয়ন, জৈবিক অপব্যবহার, প্রতারণা ও এআই মডেল চুরির মতো বিষয় রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, এআই প্রযুক্তির কারণে এখন জটিল ধরনের অপারেশন চালাতে সবসময় বড় দল বা বিপুল সম্পদের প্রয়োজন হচ্ছে না। একজন ব্যক্তিও এমন প্রচারণা চালাতে পারছেন, যা আগে হয়তো একটি পুরো দলের প্রয়োজন হতো।
প্রতিবেদনটি বাংলাদেশে পরিচালিত এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে কোনো ভারতীয় ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা প্ল্যাটফর্মের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেনি।
ভারতের সম্পৃক্ততার প্রমাণ নেই
প্রতিবেদনে ভারতের প্রসঙ্গ এসেছে শুধু এতটুকু যে, নেটওয়ার্কটির তৈরি কিছু কনটেন্ট ভারতপন্থি ভূরাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণছিল।
তবে এসব কনটেন্ট কে নির্দেশ দিয়েছিল বা এর পেছনে ভারতের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, সে বিষয়ে কোনো প্রমাণ পাওয়ার কথা বলেনি অ্যানথ্রপিক।
তথ্যসূত্র: দ্য প্রিন্ট


