ভোটের হিসাব, মোটের হিসাব

  কাকন রেজা ১৯ জানুয়ারি ২০২০, ০০:১৬:৫৮ | অনলাইন সংস্করণ

চট্টগ্রামের একটি সংসদীয় আসনে উপনির্বাচন হয়েছে অতিসম্প্রতি। আসনটি চৌদ্দ দলের অংশীদার জাসদের মইনউদ্দিন খান বাদলের। তিনি মারা যাওয়ায় আসনটি শূন্য হয়। ত্রিশ ডিসেম্বর দিনের পক্ষান্তরে বিরোধীদের মতে ঊনত্রিশ ডিসেম্বর রাতের ভোটে বাদল এ আসন থেকে জয়ী হন। সাতচল্লিশ বছর পর আওয়ামী ঘরানার অধীনে যায় এ আসনটি। বিরোধীরা এই নির্বাচনকে মেনে নেননি, আবার সংসদেও গিয়েছেন। সুতরাং তাদের ধারণাতেই প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনকে মেনে নিয়ে নিজেরাই আবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছেন।

এ শুধু ভূমিকা, মূলকথা নয়। বিএনপি দেশের অন্যতম প্রধান দল। একযুগ ক্ষমতার বাইরে থাকা এবং দলের দুই প্রধানের একজন জেলে, অন্যজন দেশের বাইরে ফেরারি জীবনযাপন করছেন। তারপরও দলটির প্রতি মানুষের সমর্থন যে কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের জন্য ঈর্ষণীয়। অথচ এই দলটিসহ প্রায় সব দলই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও ভোটারদের অংশগ্রহণ একেবারে নাই বললেই চলে। গত মেয়র নির্বাচনে ঢাকার খালি ভোট কেন্দ্রই তার প্রমান। সম্প্রতি হয়ে যাওয়া উপজেলা নির্বাচনেও ভোটারদের ডাকতে মসজিদের মাইক ব্যবহার করতে হয়েছে। গণমাধ্যমে অসংখ্য ছবি এসেছে ভোটারশূন্য কেন্দ্রের।

দেশের সিংহভাগ মানুষই আওয়ামী লীগ-বিএনপি এ দুটো দলের সমর্থক। দুটো দলই ভোটে যাচ্ছে। আছে তিন নম্বর জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্যরা। তা সত্বেও সমর্থকদের বেশিরভাগই ভোট দিতে যাচ্ছে না। কেনো যাচ্ছে না, সেই অনুল্লেখ্য কারণটা অন্তত বিরোধীদের জানা। জানা সত্বেও সেই সমর্থকদের দলই নির্বাচনে যাচ্ছে। বর্তমান রাজনীতির এমন কান্ড আর হিসাব সত্যিই গোলমেলে। হয়ত দলগুলো ভোটারদের পালস বুঝতে পারছে না, নয়তো ভোটাররা রাজনৈতিক দলগুলোর কাজ মেনে নিতে পারছেন না। ‘চট্টগ্রাম-৮ উপনির্বাচন: আগ্রহ নেই সাধারণ ভোটারদের’ দৈনিক যুগান্তরে’র এমন শিরোনামই প্রমান করে সত্যিই দলগুলো জনগনের পালস বুঝতে ক্রমেই অক্ষম হয়ে পড়ছে।

১৯৯১ এর নির্বাচন হচ্ছে এদেশের সবচেয়ে স্ট্যান্ডার্ড নির্বাচন। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোটের অনুপাত কাছাকাছি ছিল। এরপর মোটামুটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনগুলোতেও কমবেশি পঁচিশ থেকে ত্রিশের কোঠার মধ্যেই উঠানামা ছিল দু’দলের শতাংশ ভোটের হিসাব। সে অনুযায়ী যদি বিএনপির সব অভিযোগকে বাতিল করে দিয়ে সর্বশেষ চট্টগ্রামের নির্বাচনকে স্ট্যান্ডার্ড ধরি, তাহলে সেখানে মোট ভোট পড়েছে তেইশ শতাংশের কিছু কম। বলা হচ্ছে উন্নয়নজনিত কারণে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। সে অনুযায়ী আওয়ামী লীগের নিজস্য ভোটই হওয়ার কথা ত্রিশ শতাংশের ওপরে। সেখানে ভোটের পরিমান তেইশ শতাংশেরও কম। এরমধ্যে আবার বিএনপি ও অন্যদের ভোটও রয়েছে। তেইশ শতাংশের মধ্যে অন্তত ছয়-সাত শতাংশ রয়েছে বিএনপিও অন্যদের ভোট। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত ভোট হচ্ছে ষোল থেকে সতেরো শতাংশ। এখন যদি এই হিসাবকে ভিত্তি ধরে বলা হয়, ভোট দেয়াতে উৎসাহ হারিয়েছে আওয়ামী লীগের কর্মীরাও, তবে কি খুব ভুল বলা হবে। এমন কী তেইশ শতাংশ ভোটের পুরোটা আওয়ামী লীগের হলেও ভোটে উৎসাহ হারানোর ধারণাকে ভুল প্রমান করার জো নেই।

ভুল বোঝার কারণ নেই। এখানে আমি আওয়ামী লীগ, বিএনপির সমালোচনা বা ভোট কারচুপির আলাপ পারছি না। আমি আলাপ পারছি, মানুষের ভোটে অনাগ্রহ বিষয়ে। একটি গণতান্ত্রিক দেশের জন্য, উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটা ভয়াবহ একটি অশনিসংকেত। কথায় কথায় যারা দেশকে আমেরিকা কানাডার সঙ্গে তুলনা করেন, তারা বলতে পারেন, ‘আমেরিকার জনগণওতো ভোটে তেমন উৎসাহী নয়’। ‘উৎসাহী নয়’, কথাটা এমন না, তাদের আনুষ্ঠানিকতা কম। বিপরীতে এক সময় যেমন আমাদের দেশে ভোট ছিলো উৎসব, ছিল আড়ম্বর আনুষ্ঠানিকতা। ভোটে মানুষ অনানুষ্ঠানিক, অনাগ্রহী হয় দুটো পরিস্থিতিতে। যখন একটি সিস্টেম স্ট্যাবলিস্ট করে যায়, রাষ্ট্রীয় কাঠামো একটা নিয়মতান্ত্রিক বৃত্তে আবর্তিত হতে থাকে। অর্থাৎ মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত হয়। তখন মানুষ ভোটের ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক হয়ে পরে।

এমন অবস্থাকেই অনেকে অনাগ্রহী হিসাবে চিহ্নিত করতে চান, যা মূলত আড়ম্বরহীনতা। প্রকৃত অর্থে মানুষ ভোটে অনাগ্রহী হয় তখন, যখন তারা বুঝতে পারে তাদের ভোট অকার্যকর। তাদের ভোট কোনো কিছু পরিবর্তন করতে অক্ষম। তাদের ধারণা দাঁড়ায় ভোট কোনো কাজের জিনিস না। আর অকাজের জিনিসের প্রতি স্বভাবত ও সঙ্গতই আগ্রহ হারায় মানুষ।

আমাদের ভাবতে হবে সার্বিক ঘটনা প্রবাহের আলোকে। আমরা কি উন্নত দেশগুলোর পর্যায়ে পৌঁছে গেছি, যেখানে আমাদের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত হয়েছে। যার ফলেই আমরা ভোটে অনানুষ্ঠানিক হয়ে উঠেছি। না, আমাদের ভোট অকাজের ভোট হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার ফলে ভোটাররা আগ্রহ হারিয়েছে। এই বিশ্লেষণটা এখন বড় জরুরি। কেনো তেইশ শতাংশের বিপরীতে সাতাত্তর শতাংশ মানুষ অনাগ্রহী, এমন বিশ্লেষণই আমাদের ভবিষ্যত করণীয় নির্ধারিত করবে। দলগুলো ভোটারদের পালস বুঝতে পারবে। রাজনীতি আবার তার নিজ গতি ফিরে পাবে। না হলে, প্রশ্ন আর জবাবদিহিতার উর্ধ্বে উঠে যাবে ক্ষমতা কেন্দ্র। ক্রমেই দেশটি পরিণত হবে বোধহীন জঙ্গী রাষ্ট্রে।

ঘটনাপ্রবাহ : কাকন রেজার কলাম

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত