মাঠে কোটি টাকা, পেছনে দেনা
Advertisement
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মাঠে নামার আগে দল সাজে। নতুন জার্সি আসে, তারকা ফুটবলার আসেন, বিদেশিদের ঘিরে তৈরি হয় নতুন স্বপ্ন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া হয় বড় বড় চুক্তির ঘোষণা। সমর্থকরা ভাবেন, এবার শিরোপা ঘরে আসবে। কিন্তু সেই ঝলমলে ছবির উলটো দিকে পড়ে থাকে দেনার খাতা। সেখানে লেখা থাকে কোন ফুটবলারের কত মাসের বেতন বাকি, কোন কোচ পারিশ্রমিকের অপেক্ষায়, কোন বিদেশি ফুটবলার পাওনা না পেয়ে ক্লাবকে তাগাদা দিচ্ছেন। সমাধান না হলে হস্তক্ষেপ করে ফিফা।
তারপর আসে নিষেধাজ্ঞা। দলবদলের দরজা বন্ধ। নতুন ফুটবলার নেওয়া যায় না। মাঠে নামার আগেই ক্লাবকে খেলতে হয় অন্য এক ম্যাচ-বকেয়া মেটানোর ম্যাচ। বাংলাদেশের ক্লাব ফুটবলে এই ছবি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। আবাহনী, মোহামেডান, বসুন্ধরা কিংসসহ দেশের বড় ক্লাবগুলোকে ফিফার নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হয়েছে। বকেয়া পারিশ্রমিক যার অন্যতম কারণ।
আবাহনীর সাম্প্রতিক ঘটনায় পুরোনো প্রশ্নটি সামনে এসেছে। বিদেশি ফুটবলারদের পাওনা পরিশোধ করতে না পারায় ফিফার নিষেধাজ্ঞা পেয়েছিল ক্লাবটি। শেষ পর্যন্ত অর্থ পরিশোধ ও সমঝোতার মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে নতুন মৌসুমের দল গঠনে ফিরেছে তারা। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা উঠলেই কি সব ঠিক হয়ে যায়? না। পুরোনো দেনার চাপ এখনো ক্লাবটির অর্থনীতিতে ছায়া ফেলছে। নতুন দল গড়তে হচ্ছে তুলনামূলক কম বাজেটে। মোহামেডানের ছবিও আলাদা নয়। বেতন-বকেয়া নিয়ে ফুটবলারদের অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছে। ফিফার নিষেধাজ্ঞার পেছনেও ছিল সাবেক বিদেশি ফুটবলারের পাওনা। বসুন্ধরা কিংসও একাধিকবার নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে।
প্রশ্ন হলো দেশের শীর্ষ ক্লাবগুলোর কাছে মোট কত টাকা পাওনা ফুটবলার, কোচ ও বিদেশিদের? ক্লাবের বাজেট ও চুক্তির হিসাব সাধারণত প্রকাশ্যে আসে না। বাংলাদেশ স্পোর্টস ক্লাব অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব মোস্তাকুর রহমান বিষয়টিকে দুই দিক থেকেই দেখছেন। তার বক্তব্য, ‘ক্লাবগুলোও চায় খেলোয়াড়দের পাওনা সময়মতো পরিশোধ করতে। কিন্তু বিভিন্ন বাস্তবতার কারণে কখনো বিলম্ব হয়। ঢালাওভাবে সব ক্লাবকে একইভাবে দেখা ঠিক হবে না। আবার খেলোয়াড়দের পাওনা যেন দীর্ঘদিন আটকে না থাকে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। চুক্তির শর্ত মেনে পাওনা পরিশোধের সংস্কৃতি গড়ে উঠলে ফুটবলের পরিবেশ আরও সুস্থ হবে।’ কিন্তু বকেয়া শুধু বিদেশিদের নয়। বাংলাদেশের ক্লাব ফুটবলের আরও নির্মম বাস্তবতা লুকিয়ে আছে স্থানীয় ফুটবলারদের পাওনার খাতায়। বিদেশি ফুটবলার পাওনা না পেলে ফিফার দ্বারস্থ হতে পারেন। অভিযোগ আন্তর্জাতিক সংস্থার টেবিলে যেতে পারে, নিষেধাজ্ঞাও আসতে পারে। সেই চাপেই অনেক সময় বিদেশিদের পাওনা মেটাতে ক্লাব উদ্যোগী হয়। কিন্তু স্থানীয় ফুটবলার? তাদের অনেকের পাওনা পড়ে থাকে মাসের পর মাস। কারও এক মাস, কারও দুই মাস, কারও পুরো মৌসুমের অর্থও আটকে থাকার অভিযোগ রয়েছে। নতুন মৌসুম আসে, নতুন চুক্তি হয়, নতুন জার্সি গায়ে ওঠে। কিন্তু আগের মৌসুমের দেনা থেকে যায় পুরোনো খাতায়।
পারিশ্রমিকের সেই অর্থ অনেক ফুটবলারের পরিবারের একমাত্র ভরসা। মাসের শেষে বেতন না এলে তার কাছে সেটি ছোট অঙ্ক নয়; সেটিই তার জীবন। আরও বেদনাদায়ক, অনেক স্থানীয় ফুটবলার পাওনা চাইতেও সংকোচ করেন। ক্লাবের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হবে, পরের মৌসুমে দল পাবেন না, কোচ অসন্তুষ্ট হবেন এই ভয় কাজ করে। ফলে পাওনার খাতা ভারী হয়, অভিযোগের শব্দ শোনা যায় না। বিদেশিরা তুলনামূলক শক্ত অবস্থানে। তারা পাওনা না পেলে ফিফায় অভিযোগ করতে পারেন। স্থানীয় ফুটবলারের সামনে সেই পথ সহজ নয়। এখানেই তার ক্যারিয়ার, এখানেই পরের মৌসুমের দল। তাই পাওনা চাইতে গিয়েও অনেককে ভাবতে হয়, আজ টাকা চাইলে কাল কি দল পাব?
আরেকটি অভিযোগ শোনা যায়, ফুটবলারদের চুক্তির অর্থ থেকে বিভিন্ন পক্ষ কমিশন নেয়। অভিযোগটি কতটা সত্য, কোথায় কত টাকা নেওয়া হয়, কারা নেন, এসবের স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ্যে নেই। ফলে বিষয়টি তদন্ত ও পরিষ্কার নীতিমালার দাবি রাখে। এই জায়গাতে দরকার স্বচ্ছতা। দরকার লিখিত চুক্তি, নির্দিষ্ট পরিশোধসূচি এবং প্রতিটি টাকার হিসাব। তাই প্রশ্নটা শুধু বিদেশি ফুটবলারদের কত টাকা বাকি, তা নয়। স্থানীয় ফুটবলারদের কত টাকা পাওনা? কতজন এখনো গত মৌসুমের টাকা পাননি? এই হিসাব প্রকাশ্যে আসা দরকার। দল গড়ার আগে ক্লাবগুলোর একবার পেছনে তাকানো জরুরি। গত মৌসুমের সব পাওনা মিটেছে কি না? পুরোনো চুক্তির দায় রয়ে গেছে কি না? নতুন চুক্তির অর্থ দেওয়ার নিশ্চয়তা আছে কি না? এসব প্রশ্ন কি সত্যিই হিসাবের টেবিলে আসে? নাকি নতুন মৌসুম এলেই পুরোনো খাতা বন্ধ করে নতুন স্বপ্নের খাতা খুলে যায়? তারপর একদিন সেই পুরোনো হিসাবই ফিরে আসে ফিফার চিঠি হয়ে। দলবদলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। নতুন খেলোয়াড় সই করানো যায় না। মাঠে নামার আগেই ক্লাবের পরিকল্পনা ভেঙে পড়ে। তাই এখন সময় এসেছে শুধু নতুন তারকা কেনার হিসাব নয়, পুরোনো পাওনার হিসাবও প্রকাশ করার। কত টাকা ছিল? কত টাকা দেওয়া হয়েছে? কত টাকা এখনো বাকি? কার কাছে বাকি? কেন বাকি? কবে দেওয়া হবে? দল গড়ার আগে তাই দরকার দেনার খাতা মেলানো।

