নারী ক্রিকেটে নির্বাচন-বিতর্ক
ক্ষুব্ধ সুমনার চিঠি বিসিবিকে
Advertisement
জান্নাতুল সুমনা/ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের নির্বাচনি প্রক্রিয়া, খেলোয়াড়দের ক্যাম্পে ডাকা এবং কেন্দ্রীয় চুক্তিকে ঘিরে প্রশ্ন তুলেছেন নারী ক্রিকেটার জান্নাতুল সুমনা। সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) মহিলা উইংয়ের সাবেক চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দিয়ে নিজের হতাশা ও ক্ষোভ তুলে ধরেছেন। তার দাবি, ধারাবাহিকভাবে ভালো পারফরম্যান্স করেও তিনি উপেক্ষিত। জাতীয় দলের ক্যাম্প কিংবা কেন্দ্রীয় চুক্তি কোনোটিতেই তার পারফরম্যান্সের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি।
চিঠির শুরুতে সুমনা স্মরণ করিয়ে দেন যে, দায়িত্ব নেওয়ার পর নারী ক্রিকেটের উন্নয়ন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনার জন্য ‘সবার জন্য দরজা খোলা’ রাখার কথা বলেছিলেন তিনি। সেই আশ্বাসের ওপর ভরসা করে নিজের অভিজ্ঞতা, হতাশা এবং নির্বাচনি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এই স্পিনার। বিশ্বকাপের আগে ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজের পারফরম্যান্সের চিত্র তুলে ধরেন তিনি। তার দাবি, প্রিমিয়ার লিগে আট ইনিংসে ২১ উইকেট নিয়ে তিনি ছিলেন প্রতিযোগিতার সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি। একই সময়ে নিশিতা আট ইনিংসে নিয়েছেন ১৫ উইকেট। বিসিএলে মাত্র তিন ইনিংসে ১৪ উইকেট নিয়ে সেখানেও সবার ওপরে ছিলেন তিনি। শুধু ঘরোয়া ক্রিকেটে নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিজের ধারাবাহিকতার প্রমাণ দিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন সুমনা। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে বাংলাদেশের হয়ে পাঁচ ম্যাচে নয় উইকেট নিয়ে ছিলেন দলের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। বিশ্বকাপের আগে চ্যালেঞ্জ কাপে তিন ম্যাচে পাঁচ উইকেট নেন, যেখানে তার ইকোনমি রেট ছিল চার। একই সময়ে নিশিতা চার ম্যাচে পাঁচ উইকেট পেলেও খেলেছেন একটি ম্যাচ বেশি।
কিন্তু এত কিছুর পরও কোচ ও টিম ম্যানেজমেন্ট তাকে জানিয়ে দেয়-তাকে বিবেচনায় রাখা হচ্ছে না। সুমনার প্রশ্ন, যখন বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে তিনিই ছিলেন দলের সেরা বোলার, তখন কিসের ভিত্তিতে তাকে পরিকল্পনার বাইরে রাখা হলো? বিশ্বকাপ-পরবর্তী সময়েও নিজের পারফরম্যান্সের সঙ্গে অন্যদের তুলনা টেনে নির্বাচনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার হিসাবে, বিশ্বকাপের পর ছয় ইনিংসে তিনি নিয়েছেন সাত উইকেট, ইকোনমি রেট ছিল ছয়। অন্যদিকে সুলতানা সমান ইনিংসে পেয়েছেন মাত্র তিন উইকেট, ইকোনমি রেটও ছিল সমান। তারপরও ২২ সদস্যের জাতীয় দলের ক্যাম্পে জায়গা হয়নি তার।
চিঠিতে টি ২০ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে সুলতানার পারফরম্যান্সও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে থাইল্যান্ডের বিপক্ষে দুই ওভারে ১০ রান দিয়ে উইকেটশূন্য ছিলেন তিনি। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে এক ওভারে নয় রান এবং পাপুয়া নিউগিনির বিপক্ষে চার ওভারে ২৬ রান দিলেও পাননি কোনো উইকেট। অন্যদিকে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের সাম্প্রতিক থাইল্যান্ড সফরে নিজের পারফরম্যান্সকেও উদাহরণ হিসাবে তুলে ধরেন সুমনা। শ্রীলংকার বিপক্ষে তিন ওভারে ১৩ রান দিয়ে এক উইকেট, থাইল্যান্ডের বিপক্ষে তিন ওভারে ১২ রান দিয়ে এক উইকেট এবং মালয়েশিয়ার বিপক্ষে চার ওভারে ১৬ রান দিয়ে উইকেট না পেলেও ছিলেন নিয়ন্ত্রিত। তারপরও জানানো হয়, ‘টিম কম্বিনেশন’-এর কারণে তাকে খেলানো হয়নি। সুমনার অভিযোগ, ফাইনালে তার জায়গায় যাকে খেলানো হয়েছিল, সেই অফ-স্পিনার পুরো ম্যাচে এক ওভারও বল করেননি। পরে ওই ক্রিকেটার অধিনায়কের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, এটি কোচের সিদ্ধান্ত। সুমনার মতে, স্পিন-সহায়ক উইকেটে এমন সিদ্ধান্ত শুধু বিস্ময়করই নয়, বরং প্রশ্নবিদ্ধও। তার ভাষায়, ‘যদি একজন অফ-স্পিনারকে খেলানোই হয়, অথচ তাকে দিয়ে একটি বলও করানো না হয়, তাহলে শুরুতেই অন্য কাউকে সুযোগ দেওয়া হলো না কেন?’ চিঠির গুরুত্বপূর্ণ অংশে তিনি একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলেন-একজন ক্রিকেটার ধারাবাহিকভাবে ভালো পারফরম্যান্স করেও যদি উপেক্ষিত হন, তাহলে পারফরম্যান্সের মূল্যায়ন কীভাবে হচ্ছে?
তার দাবি, এমন আরও কয়েকজন ক্রিকেটারের তথ্য তার কাছে রয়েছে, যাদের পারফরম্যান্স উল্লেখযোগ্য না হলেও তারা জাতীয় দলে জায়গা পেয়েছেন। কেন্দ্রীয় চুক্তি প্রসঙ্গে সুমনার মত, গত এক বছরে আন্তর্জাতিক ও প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে কার পারফরম্যান্স কেমন-তার পূর্ণ পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। নির্বাচক কমিটি যদি প্রকাশ্যে পারফরম্যান্স শিট তুলে ধরে, তাহলে বোঝা যাবে কারা সত্যিকার অর্থে কন্ট্রাক্ট পাওয়ার যোগ্য। তিনি উল্লেখ করেন, গত বছর তিনি মোট আটটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন এবং প্রায় পুরো সময় জাতীয় দলের ক্যাম্পে ছিলেন। এই সময়ে নিয়েছেন ১২ উইকেট। তারপরও তাকে চুক্তিতে রাখা হয়নি। চিঠিতে নারী ক্রিকেটের একটি সংবেদনশীল বাস্তবতা তুলে ধরেন সুমনা। তার মতে, কোনো নারী ক্রিকেটার নিজের ন্যায্য সুযোগ বা অধিকার নিয়ে কথা বললে তাকে অনেক সময় নেতিবাচকভাবে দেখা হয়, এমনকি বিভিন্ন ধরনের চাপের মুখেও পড়তে হয়। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অনিশ্চিত পরিবেশ তৈরি হয়। সবশেষে সরাসরি সাক্ষাৎ করে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তিনি। তার প্রত্যাশা, নারী ক্রিকেটে স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং পারফরম্যান্সভিত্তিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে বোর্ড কার্যকর উদ্যোগ নেবে। এ বিষয়ে বিসিবি, নির্বাচক কমিটি কিংবা টিম ম্যানেজমেন্টের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

