Logo
Logo
×
   

খেলা

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ: গ্রুপ কে প্রিভিউ

নেয়ামত উল্লাহ

নেয়ামত উল্লাহ

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ১০:৩২ পিএম

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ: গ্রুপ কে প্রিভিউ

এটাই কি শেষ বিশ্বকাপ? এই প্রশ্নের জবাবটা বেশ কৌশলে দিয়েছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। বয়স ৪১, তবু এই লুকোছাপা, তিনি রোনালদো বলেই; এই বয়সে এসেও ফিটনেসটাকে ধরে রেখেছেন, পাল্লা দিচ্ছেন মধ্য যৌবনে থাকা মানুষদের সঙ্গেও। 

এটা শেষ বিশ্বকাপ হোক বা না হোক, রোনালদোদের সামনে এর চেয়ে বাস্তব সুযোগ আর আসবে কি না, কে জানে! এবারের পর্তুগাল দলটা যে বেশ সমীহ জাগানিয়া!

তবে তাদের গ্রুপে আছে কলম্বিয়া, যে দলটি এই কিছু দিন আগেও টানা ২৮ ম্যাচ অপরাজিত থেকে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল। আছে কঙ্গো, যারা বিশ্বকাপে ফিরেছে ৫২ বছর পর; আছে উজবেকিস্তান, যারা বিশ্বকাপে এসেছে প্রথম বারের মতো।

এই গ্রুপের সব দলের সূচি, শক্তিসামর্থ্য, দুর্বলতা, ও চ্যালেঞ্জগুলো কী তা জেনে নেওয়া যাক—

গ্রুপ কে-র ফিক্সচার
১৭ জুন ২০২৬, পর্তুগাল–ডিআর কঙ্গো, হিউস্টন
১৭ জুন ২০২৬, উজবেকিস্তান–কলম্বিয়া, মেক্সিকো সিটি
২৩ জুন ২০২৬, পর্তুগাল–উজবেকিস্তান, হিউস্টন
২৩ জুন ২০২৬, কলম্বিয়া–ডিআর কঙ্গো, গুয়াদালাহারা
২৭ জুন ২০২৬, কলম্বিয়া–পর্তুগাল, মায়ামি
২৭ জুন ২০২৬, ডিআর কঙ্গো–উজবেকিস্তান, আটলান্টা


দল প্রিভিউ– পর্তুগাল  
এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম দাবিদার কে? এই আলাপের প্রথমেই উঠে আসে স্পেনের নাম। 

সেই স্পেনকে যে দল কোনো টুর্নামেন্টের ফাইনালে হারাতে পারে, সেই দলকে আর যাই হোক খাটো করে দেখা চলে না। গেল বছর স্পেনকে নেশন্স লিগের ফাইনালে হারিয়েছিল রোনালদোর পর্তুগাল। 

অধরা বিশ্বকাপ ছুঁয়ে দেখার স্বপ্নটাও আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার স্পর্ধা পেয়েছে ওই জয়ের পরই। পর্তুগাল দলটা বেশ পোক্ত। বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ছয় ম্যাচে চারটিতে জিতেছে, করেছে ২০ গোল। 

সবচেয়ে বড় কথা, এই দলটা এখন আর রোনালদোর দিকে চেয়ে থাকে না। দলে আছেন একাধিক ম্যাচ উইনার, ব্যালন ডি’অরের আলাপে থাকা খেলোয়াড়ও।

আক্রমণ
এই দলের সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি ব্রুনো ফের্নান্দেস। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে বছরের পর বছর ধরে যে সৃজনশীলতা তিনি দেখিয়েছেন, বিশ্বকাপের ঠিক আগে সেটি আরও বেশি করে জ্বলে উঠেছে যেন। বিশ্বকাপে তিনি পা রাখছেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের রেকর্ড গড়ে, বর্ষসেরার খেতাব জিতে। হাফ-স্পেস ধরে তিনি ঘোরাফেরা করেন, মোক্ষম সময় বুঝে পাস বাড়াতে পারেন। আর সেটাই পর্তুগালের আক্রমণকে অপ্রতিরোধ্য করে তোলে।

রাফায়েল লিয়াও এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বিপজ্জনক উইঙ্গারদের একজন। ম্যানচেস্টার সিটির বের্নার্দো সিলভা অভিজ্ঞতা ও টেকনিক্যাল নৈপুণ্যের প্রতীক। তাদের উপস্থিতি প্রতিপক্ষকে একই সঙ্গে দুই পাশ সামলানোর অসম্ভব চাপে ফেলে দেয়। 

তাদের সঙ্গে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে যোগ করলে পর্তুগালের শুরুর একাদশকে সমীহ না করে পারা যায় না।

এদিকে গনসালো রামোস রোনালদোর অনুপস্থিতিতে নামলেই দারুণ পারফর্ম করে যাচ্ছেন। সবশেষ ম্যাচে পেদ্রো নেতো আর ফ্রান্সিসকো কনসেইসাওরা গোল করে জানান দিয়েছেন পর্তুগালকে নতুন যুগের দিশা দিতে প্রস্তুত তারাও।

পর্তুগাল ৪-২-৩-১ বা ৪-৩-৩ ফরমেশনে খেলে থাকে। দুই পাশে সিলভা ও লিয়াও থাকেন, সেন্টার ফরোয়ার্ডের পেছনে থাকেন ফের্নান্দেস। সামনে রোনালদো ও রামোসের কেউ একজন থাকেন।

মিডফিল্ড
জোয়াও নেভেস যদি এই দলের মিডফিল্ডের ভবিষ্যৎ হয়ে থাকেন, তাহলে ‘বর্তমান’ হবেন ভিতিনিয়া। পিএসজির সবশেষ মৌসুমের পারফর্ম্যান্স দিয়ে দুজনই অপরিহার্য হয়ে উঠেছেন এই পর্তুগাল দলে। তাদের সামনে থাকা ব্রুনো ফের্নান্দেসের রক্ষণাত্মক দায়িত্ব কম, সে চাপটা সামলে নেন ভিতিনিয়া আর নেভেস মিলে।

রক্ষণ
রুবেন দিয়াজ ম্যানচেস্টার সিটিতে চোট-সমস্যার মধ্যেও এই টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা সেন্টারব্যাক। তার পড়ার ক্ষমতা, এরিয়াল ডুয়েলে আধিপত্য ও দলকে সংগঠিত করার দক্ষতা পর্তুগালের রক্ষণকে অসাধারণ শক্তিশালী করে। গনসালো ইনাসিও পাশে থেকে টেকনিক্যালি চমৎকার সঙ্গ দেন। নুনো মেন্দেস বামে এবং জোয়াও কান্সেলো বা দিওগো দালো ডানে থাকেন। গোলরক্ষক দিওগো কস্তা পোর্তোতে দুর্দান্ত ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেছেন।

সম্ভাব্য একাদশ
কস্তা; কান্সেলো, দিয়াজ, ইনাসিও, মেন্দেস; ভিতিনিয়া, নেভেস; সিলভা, ফের্নান্দেস, লিয়াও; রোনালদো।

সেট পিস তথ্য
কর্নার: ব্রুনো ফের্নান্দেস, বের্নার্দো সিলভা, নুনো মেন্দেস, পেদ্রো নেতো, ফ্রান্সিসকো কন্সেইসাও।
ডিরেক্ট ফ্রি কিক: ব্রুনো ফের্নান্দেস, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।
পেনাল্টি: ব্রুনো ফের্নান্দেস, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।

চ্যালেঞ্জ
পর্তুগালের প্রধান চ্যালেঞ্জ রোনালদোকে কীভাবে খেলানো হবে, সে প্রশ্নের জবাব খোঁজা। ৪১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডকে গ্রুপ পর্বের প্রতিটি ম্যাচেই খেলানো হলে নকআউট পর্বে বড় বিপদে পড়তে পারে পর্তুগাল।

রোনালদোর হ্যামস্ট্রিং চোট ফেব্রুয়ারিতে তাকে মার্চ উইন্ডো থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। জুনে কতটা ফিট অবস্থায় তিনি মাঠে নামবেন, সেটি এই গ্রুপের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

মিডফিল্ডের বল-জেতার দুর্বলতা বাছাইপর্বেই উঠে এসেছিল। ফের্নান্দেস, নেভেস ও ভিতিনিয়ার ত্রয়ী সৃজনশীলতায় অনন্য, কিন্তু উচ্চ-চাপের প্রেসিং দলের সামনে তারা কঠিন পরীক্ষায় পড়তে পারেন।

২৭ জুন মায়ামিতে কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচটিই এই গ্রুপের নির্ণায়ক মুহূর্ত। ডিআর কঙ্গো এবং উজবেকিস্তানের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের প্রথম দুটি ম্যাচকে সেই চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতি হিসেবে ব্যবহার করতে না পারলে পর্তুগাল ঝুঁকিতে পড়তে পারে।


দল প্রিভিউ— কলম্বিয়া 
২০২৪ সালের কোপা আমেরিকায় দারুণ খেলছিল কলম্বিয়া, তার আগে ২৮ ম্যাচ ধরে অপরাজিতও ছিল তারা। সে ফাইনালে হারের বদলা কলম্বিয়ানরা কোপা আমেরিকার পরেই নিয়েছে, তাতে দলটা জানান দিয়েছে, ২৮ ম্যাচ অপরাজিত থাকাটা নেহায়েতই ঝড়ে-বকে ছিল না।

সেই দলটাই এবার বিশ্বকাপে এসেছে, পড়ছে রোনালদোর দলের সামনে। যদিও এই বিশ্বকাপের আগে ফ্রান্সের কাছে হার কিছুটা বিপাকে ফেলে দিয়েছে তাদের। তবে সবশেষ দুই ম্যাচে দারুণ দুই জয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসী হয়েই বিশ্বকাপে পা রাখছে কোচ নেস্তর লরেঞ্জোর দল।

আক্রমণ
লুইস দিয়াজ এই গ্রুপের অন্যতম সেরা আক্রমণভাগের খেলোয়াড়। বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দেওয়ার পর থেকে তিনি ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে রয়েছেন। বাম প্রান্ত থেকে যেকোনো ফুলব্যাককে হারানোর মতো গতি, বক্সের ভেতর-বাইরে থেকে গোল করার সক্ষমতা আছে তার। তিনি এমন একজন খেলোয়াড় যিনি একাই একটি ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন।

২০১৪ বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটজয়ী হামেস রদ্রিগেজ ৩৪ বছর বয়সে এমএলএস ক্লাব মিনেসোটা ইউনাইটেডে নিয়মিত খেলেছেন, যার ফলে তিনি নিজেকে প্রস্তুতও রেখেছেন এই বিশ্বকাপের জন্য। তিনি ফিট ও মনোযোগী থাকলে কলম্বিয়া এক ভিন্ন দলে পরিণত হয়। দুই বছর আগে কোপা আমেরিকার সেরা খেলোয়াড় বনে গিয়ে তিনি জানান দিয়েছেন, আবারও বিশ্বকাপ মাতাতে ভালোভাবেই প্রস্তুত তিনি। 

এই দুজনই কলম্বিয়ার আক্রমণের নিউক্লিয়াস। হামেস প্রথম ছোঁয়াতেই রক্ষণের পেছনে দিয়াজকে বল বাড়াতে পারলে দলটা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

মিডফিল্ড
বেনফিকার রিচার্ড রিওস পর্তুগিজ লিগে বছরের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডারে পরিণত হয়েছেন। জেফার্সন লেরমার সঙ্গে ডাবল পিভোটে তিনি রক্ষণাত্মক স্ক্রিনিং ও মাঝমাঠ থেকে দ্রুত বিতরণের কাজ করেন। কিন্তু কলম্বিয়া হাইপ্রেস করতে গিয়ে শেপ ভেঙে গেলে দ্রুত ট্রানজিশনে একেবারে ন্যাড়া হয়ে পড়ে, ফ্রান্স তো বটেই, ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষেও তারা এ কারণে ভুগেছে।

রক্ষণ
দাভিনসন সানচেজ এবং হুয়ান লুকুমি সেন্টারব্যাক হিসেবে আছেন। দুজনেই দীর্ঘদেহী, যে কারণে দলটির রক্ষণ ফিজিক্যালিটি তো বটেই, এরিয়াল ডুয়েল জিততেও বেশ দারুণ দক্ষ হয়ে উঠেছে।

ক্রিস্টাল প্যালেসের দানিয়েল মুনোজ রাইট ফ্ল্যাংকে উঠে গিয়ে ক্রস করতে বিশেষভাবে কার্যকর। গোলরক্ষক কামিলো ভার্গাস বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতা রাখেন এবং ব্যাকআপে ডেভিড অস্পিনার অভিজ্ঞতা রয়েছে। 

সম্ভাব্য একাদশ
ভার্গাস; মুনোজ, সানচেজ, লুকুমি, মোহিকা; রিওস, লেরমা; আরিয়াস, রদ্রিগেজ, দিয়াজ; সুয়ারেজ।

সেট পিস তথ্য
কর্নার: হামেস রদ্রিগেজ, হোন আরিয়াস, হামিন্তন কাম্পাজ, হুয়ান কুইন্তেরো, ইয়াসের আসপ্রিয়া।
ডিরেক্ট ফ্রি কিক: হামেস রদ্রিগেজ, লুইস দিয়াজ।
পেনাল্টি: হামেস রদ্রিগেজ, লুইস দিয়াজ, মিগেল বোরহা।

চ্যালেঞ্জ
সেট পিস ডিফেন্ডিং নিয়ে ভাবতে হবে তাদের। নাহলে পর্তুগালের মতো দলের বিপক্ষে ভালোভাবেই ভুগতে হবে। 

হামেস রদ্রিগেজের ফিটনেস ও মনোযোগ এই দলের সবচেয়ে বড় অজানা। কলম্বিয়া হামেস সহ এবং হামেস ছাড়া কার্যত দুটো ভিন্ন দল।

২৭ জুনের পর্তুগাল ম্যাচ তাদের সর্বোচ্চ পরীক্ষা নেবে। কলম্বিয়া প্রথম দুই ম্যাচে পয়েন্ট হারালে বিপাকেই পড়তে হবে এই ম্যাচে।


দল প্রিভিউ– ডিআর কঙ্গো
৫২ বছর পর দলটা বিশ্বকাপে এসেছে। তবে কঙ্গো নামের কোনো দল কখনোই ফুটবলের বিশ্বআসরে খেলেনি। কারণ ১৯৭৪ বিশ্বকাপে যে দলটি খেলেছিল বিশ্বকাপে, তার নাম ছিল জায়ার।

ফ্রেঞ্চ কোচ সেবাস্তিয়ান দেসাবর আট আফ্রিকান দেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০২২ সাল থেকে এই দলটিকে গড়ে তুলছেন। দ্বৈত-নাগরিকত্বের খেলোয়াড় নিয়োগ ছিল কৌশলের কেন্দ্রে  ম্যানচেস্টারে বেড়ে ওঠা তুয়ানজেবে ২০২৪ সালে ইংল্যান্ড ছেড়ে কঙ্গোর হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেন, আর মাজে অ্যারন ওয়ান-বিসাকা টুর্নামেন্টের আগে ন'টি ম্যাচে মাঠে নামেন।

আক্রমণ
ইয়োনে উইসা নিউক্যাসলে এমন এক উইং ফরোয়ার্ড হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যার গতি, সরাসরি ড্রিবলিং এবং ফিনিশিং ক্ষমতা যেকোনো ডিফেন্সলাইনের জন্য বিপদ। ইনজুরি থেকে ফিরে টুর্নামেন্টের জন্য তৈরি হওয়া ডিআর কঙ্গোর সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক খবর। উইসার ফিটনেস এই দলের কাউন্টার-অ্যাটাকিং সিস্টেমের ভিত্তি।

রিয়াল বেতিসের সেদ্রিক বাকামবু ৬৫টিরও বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ এবং ২১ গোলের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কেন্দ্রীয় স্ট্রাইকার। জামাইকার বিরুদ্ধে দুবার প্রায় গোল করেছিলেন, এবং অভিজ্ঞতার দিক থেকে তিনি এই দলের আক্রমণভাগের নেতা। মন্তপেলিয়ের নাথানায়েল মবুকু ডান প্রান্ত থেকে পেস ও ওয়ান-অন-ওয়ান দক্ষতায় কাউন্টার সিস্টেমের দ্বিতীয় মাত্রা যোগ করেন।

ডিআর কঙ্গো সবচেয়ে ভালো খেলে যখন রক্ষণাত্মক ব্লক কমপ্যাক্ট থাকে এবং উইসা ও মবুকু ট্রানজিশনে দীর্ঘ পাসে বেরিয়ে যান। পর্তুগালের বিরুদ্ধে ১৭ জুনের ম্যাচে এই পরিকল্পনা সফল করতে প্রথমার্ধে কোনো গোল না খেয়ে থাকাটা অপরিহার্য।

মিডফিল্ড
সান্ডারল্যান্ডের নোয়া সাদিকি মাঝমাঠ থেকে সামনে ড্রাইভ করে বিপদজনক পজিশনে পৌঁছানোর সক্ষমতা রাখেন। মুতুসামি ও এলিয়ার পাশাপাশি মিডফিল্ডে রক্ষণাত্মক সুশৃঙ্খলতা নিশ্চিত করাই কঙ্গোর মূল লক্ষ্য, কারণ দলটি কখনো মাঝমাঠে আধিপত্য দিয়ে খেলতে আসেনি  তাদের অস্ত্র হলো ট্রানজিশনের গতি।

রক্ষণ
লিলের চানসেল মবেম্বা অধিনায়ক এবং রক্ষণের মেরুদণ্ড। ১০০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ, পোর্তো, নিউক্যাসল ও মার্সেইয়ের অভিজ্ঞতা  তার এরিয়াল ডুয়েলে দক্ষতা ও নেতৃত্বদানের সক্ষমতা পেছনের চারজনকে একতাবদ্ধ রাখে। গোলরক্ষক লে আ্যভ্রের লিওনেল মপাসি উচ্চ চাপের পরিস্থিতিতে অভিজ্ঞ। ওয়ান-বিসাকা, মাসুয়াকু ও তুয়ানজেবে ব্যাকফোরে প্রিমিয়ার লিগের অভিজ্ঞতা আনেন, কিন্তু গভীরতা সীমিত।

সম্ভাব্য একাদশ
মপাসি; ওয়ান-বিসাকা, মবেম্বা, তুয়ানজেবে, মাসুয়াকু; মবুকু, সাদিকি, মুতুসামি, এলিয়া; উইসা, বাকামবু।

সেট পিস তথ্য
কর্নার: আর্থার মাসুয়াকু, থিও বোনগোন্দা, নাথানায়েল মবুকু, ইয়োয়ানে উইসা, ব্রায়ান সিপেঙ্গা।
ডিরেক্ট ফ্রি কিক: আর্থার মাসুয়াকু, গায়েল কাকুতা, নাথানায়েল মবুকু।
পেনাল্টি: ইয়োনে উইসা, সেদ্রিক বাকামবু, গায়েল কাকুতা।

চ্যালেঞ্জ
১৭ জুন হিউস্টনে পর্তুগালের বিরুদ্ধে উদ্বোধনী ম্যাচটাই হবে তাদের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। তবে ২০২২-এ সৌদি আরব যেভাবে আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ ইউরোপে বেড়ে ওঠা কঙ্গোলিজ খেলোয়াড়রা টেকনিক্যাল দক্ষতা কাজে লাগিয়ে পর্তুগালের অতি আক্রমণাত্মক ফুলব্যাকদের পেছনে ফেলে দেওয়া স্পেসকে কীভাবে কাজে লাগাতে হয়, সেটা দারুণভাবেই জানেন।

উইসার ফিটনেস সুরক্ষিত রাখা কোচ দেসাবরের প্রধান দায়িত্ব। এই নিউক্যাসল ফরোয়ার্ডের গতি কাউন্টার-অ্যাটাকিং সিস্টেমে অপরিহার্য করে তোলে। তাকে হারানো মানে কঙ্গোর পুরো কৌশলের ভিত্তি নড়ে যাওয়া।

২৩ জুন গুয়াদালাহারায় কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচটি কঙ্গোর জন্য প্রকৃত নক-আউট ম্যাচ হয়ে যেতে পারে। এই ম্যাচটিই নির্ধারণ করবে গ্রুপে তৃতীয় হওয়ার সুযোগটা তাদের বাস্তব হবে কি না।

মিডফিল্ডে দলীয় গভীরতার অভাব সবচেয়ে বড় কাঠামোগত সমস্যা। তিনটি গ্রুপ ম্যাচে প্রতিপক্ষের ফিটনেস ও তীব্রতার সামনে মিডফিল্ডের ধকল সামলে মিড-ব্লক ধরে রাখতে পারবে কিনা, সেটাও দেখার বিষয় বটে।


দল প্রিভিউ– উজবেকিস্তান
স্বাধীন জাতি হিসেবে এবারই প্রথম উজবেকিস্তান এসেছে বিশ্বকাপে। ১৯৯১ সালে সোভিয়ের রাশিয়ার কাছ থেকে আলাদা হওয়ার পর থেকে বহুবার তারা বিশ্বকাপের খুব কাছে এসেছিল, তবে শিকে ছেঁড়েনি ভাগ্যে। এবার এএফসি বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ইরানের পিছনে দ্বিতীয় হয়ে অবশেষে জায়গা পাকা যখন হলো, তাশখন্দে সেই রাতের উদযাপন ছিল দেখার মতো।

বাছাইয়ের কাজ করেছিলেন স্লোভেনিয়ান কোচ স্রেচকো কাতানেস, কিন্তু তিনি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পদত্যাগ করেন। অন্তর্বর্তীকালীন কোচ তিমুর কাপাদজের পর অক্টোবর ২০২৫-এ দায়িত্ব নেন ইতালিয়ান কিংবদন্তি ফ্যাবিও ক্যানাভারো ২০০৬ বিশ্বকাপজয়ী ইতালি দলের অধিনায়ক, সেই বছরের ব্যালন ডি’অর বিজেতা। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, উজবেকিস্তানের পরিচয় হবে শৃঙ্খলা, সংগঠন ও সুযোগ কাজে লাগানো। ৯০ মিনিট ধরে প্রেস করার দর্শনে তিনি বিশ্বাস করেন না।

আক্রমণ
ম্যানচেস্টার সিটিতে নিয়মিত হওয়া আবদুকোদির খুসানভ এই স্কোয়াডের সবচেয়ে পরিচিত নাম। তবে তিনি রক্ষণের খেলোয়াড়। আক্রমণে অধিনায়ক এলদার শোমুরোদোভ আছেন, ৯০ ম্যাচে ৪৪ গোলের রেকর্ড আছে তার। তিনিই দলের প্রধান ভরসা।

উজবেকিস্তানের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত গোলের সুযোগ আসে ডিপ ব্লক থেকে দ্রুত ট্রানজিশনে এবং সেট পিসে খুসানভ এরিয়াল দক্ষতা দেখালে তখন।

মিডফিল্ড
ডাবল পিভটে কামরোবেকোভ ও শুকুরভ থাকবেন। মিডফিল্ডের শক্তি হলো সংগঠন ও কভারেজ। দুর্বলতা হলো হাইপ্রেসের সামনে প্রেস রেজিস্ট্যান্সি না দেখাতে পারা।

রক্ষণ
খুসানভ চ্যাম্পিয়নস লিগ খেলার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সেন্টারব্যাক হিসেবে এই দলের রক্ষণকে এমন একটি বিশ্বাসযোগ্যতা দিচ্ছেন যা আগের প্রজন্মে ছিল না। আশুরমাতোভ ও আব্দুল্লায়েভের সাথে তিনি ব্যাক থ্রিতে দলকে সুশৃঙ্খল রাখেন। গোলরক্ষক উতকির ইউসুপোভ সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে বাছাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ছ’টি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে দলকে বিশ্বকাপে এনেছেন।

সম্ভাব্য একাদশ
ইউসুপোভ; খুসানভ, আশুরমাতোভ, আব্দুল্লায়েভ; আলিজোনোভ, কামরোবেকোভ, শুকুরভ, নাসরুল্লায়েভ; ফায়জুল্লায়েভ, শোমুরোদোভ, উরুনোভ।

সেট পিস তথ্য
কর্নার: আব্বোসবেক ফায়জুল্লায়েভ, জামশিদ ইস্কান্দেরোভ, আজিজ গানিয়েভ, ওতাবেক শুকুরভ।
ডিরেক্ট ফ্রি কিক: আব্বোসবেক ফায়জুল্লায়েভ, এলদার শোমুরোদোভ।
পেনাল্টি: এলদার শোমুরোদোভ, ওতাবেক শুকুরভ।

চ্যালেঞ্জ
২৭ জুন আটলান্টায় ডিআর কঙ্গোর বিরুদ্ধে ম্যাচটিই উজবেকিস্তানের প্রাথমিক লক্ষ্য। কোচ ক্যানাভারো এটা বোঝেন, এবং কলম্বিয়া ও পর্তুগালের বিরুদ্ধে আগের দুই ম্যাচে দল নির্বাচন সেই অনুযায়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

খুসানভের ফিটনেস তিনটি ম্যাচ জুড়ে রক্ষা করা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ম্যানচেস্টার সিটির এই সেন্টারব্যাক না থাকলে উজবেকিস্তানের রক্ষণাত্মক কাঠামো পর্তুগাল বা কলম্বিয়ার আক্রমণের সামনে ভেঙে পড়তে পারে।

প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলার মানসিক চাপকে খাটো করে দেখা উচিত হবে না। ক্যানাভারোর অভিজ্ঞতা এই দলকে সেই বিষয়টা সামলাতে সাহায্য করতে পারে, তবে তাশখন্দের ভক্তদের প্রত্যাশার ভার কাঁধে নিয়ে বিশ্বের সেরা দলগুলোর বিরুদ্ধে মাঠে নামার চাপটাকেও একইসঙ্গে সামলাতে হবে দলকে।


প্রেডিকশন

পর্তুগাল এই গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হবে। মার্তিনেজের তৈরি করা দলের গভীরতা, ২০২৫ নেশনস লিগ শিরোপা এবং রোনালদোর অভিজ্ঞতার সাথে ফের্নান্দেস ও লিয়াওদের অসাধারণ আক্রমণশক্তি মিলিয়ে এটি এমন একটি দল যাকে এই গ্রুপের কোনো দলের থামানো কঠিন মনে হচ্ছে।

দ্বিতীয় স্থানের লড়াই এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আকর্ষণীয় সেকেন্ড-প্লেস প্রতিযোগিতাগুলির একটি হতে চলেছে।  ২৭ জুন মায়ামিতে কলম্বিয়া–পর্তুগাল ম্যাচটিই গ্রুপের অঘোষিত ‘ফাইনাল’ হবে, গ্রুপ চ্যাম্পিয়নশিপ এবং দ্বিতীয় স্থানের নিশ্চিতকরণ নির্ধারণ করবে এই ম্যাচের ফল। হামেস যদি ফিট থাকেন এবং সেট পিস রক্ষণ উন্নত হয়, কলম্বিয়া দ্বিতীয় হয়ে নকআউটে যাবে।

ডিআর কঙ্গো ও উজবেকিস্তান তৃতীয় স্থানের জন্য লড়াই করবে। ২৭ জুন আটলান্টায় মুখোমুখি হবে দুই দল। 


ঘটনাপ্রবাহ: ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬


আরও পড়ুন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম