Logo
Logo
×
   

খেলা

২০১০ বিশ্বকাপ

আফ্রিকার আকাশে ফুটবলের উৎসব

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ১২:৪৩ পিএম

আফ্রিকার আকাশে ফুটবলের উৎসব

সিফিওয়ে শাবালালার গোল যেন পুরো মহাদেশকে একসঙ্গে উল্লাসে ভাসিয়ে দিল

১১ জুন ২০১০। দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ। শীতের বিকেল ধীরে ধীরে সন্ধ্যার দিকে এগোচ্ছে। সকার সিটি স্টেডিয়ামের গ্যালারি ভরে গেছে রঙে, পতাকায়, অপেক্ষায়। হাজার হাজার ভুভুজেলার অবিরাম শব্দ যেন বাতাসকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষ একসঙ্গে গাইছে, নাচছে, উদযাপন করছে। মাঠে তখনও খেলা শুরু হয়নি, কিন্তু ইতিহাস ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। কারণ এই প্রথমবার বিশ্বকাপ এসেছে আফ্রিকার মাটিতে। এটি শুধু একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট ছিল না। এটি ছিল একটি মহাদেশের আত্মপ্রকাশ। বহু বছরের উপনিবেশ, বর্ণবৈষম্য, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সংগ্রাম আর প্রত্যাশার পর আফ্রিকা প্রথমবার বিশ্বকে বলছিল আমরাও পারি। 

বিশ্বকাপের ইতিহাসে ২০১০ ছিল এক অনন্য মুহূর্ত। কারণ এই বিশ্বকাপ শুধু মাঠে খেলা হয়নি; এটি খেলা হয়েছিল মানুষের স্মৃতিতে, ইতিহাসে, পরিচয়ে। দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবল সংস্কৃতি অনেক আগের। কয়েক দশক ধরে বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থা দেশটিকে ভেতর থেকে বিভক্ত করে রেখেছিল। কালো ও শ্বেতাঙ্গ মানুষের জীবন আলাদা ছিল, সুযোগ আলাদা ছিল, স্বপ্নও যেন আলাদা ছিল। সেই বাস্তবতার বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামের এক প্রতীক ছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা। কারাগারের দীর্ঘ বছর পেরিয়ে তিনি শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার পথ দেখাননি, দেখিয়েছিলেন কীভাবে খেলাধুলাও একটি জাতিকে এক করতে পারে। 

১৯৯৫ সালে রাগবি বিশ্বকাপ আয়োজন করে দক্ষিণ আফ্রিকা পৃথিবীকে প্রথম বার্তা দিয়েছিল। কিন্তু বিশ্বকাপ ফুটবল ছিল আরও বড় স্বপ্ন। ২০০৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের লড়াইয়ে খুব অল্প ব্যবধানে হেরে যাওয়ার পর তারা আবার ফিরে আসে। অবশেষে ২০০৪ সালে ঘোষণা আসে ২০১০ বিশ্বকাপ হবে দক্ষিণ আফ্রিকায়। সেই মুহূর্তে বহু মানুষ সন্দেহ প্রকাশ করেছিল। প্রশ্ন উঠেছিল নিরাপত্তা নিয়ে। অবকাঠামো নিয়ে। পরিবহন নিয়ে।

অনেকেই বলেছিল, আফ্রিকা প্রস্তুত নয়। দক্ষিণ আফ্রিকা উত্তর দিয়েছিল কাজ দিয়ে। নতুন স্টেডিয়াম তৈরি হলো। বিমানবন্দর আধুনিক হলো। রাস্তা বদলাল। শহরগুলো নতুন রূপ পেল। কেপ টাউন, ডারবান, প্রিটোরিয়া, পোর্ট এলিজাবেথ, ব্লুমফন্টেইন, জোহানেসবার্গ শহরগুলো ফুটবলের ভাষায় কথা বলতে শুরু করল। 

মাঠের ভেতরে গল্পও ছিল অসাধারণ। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি এসেছে শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন নিয়ে। ফ্রান্স এসেছে আগের আসরের আক্ষেপ নিয়ে। ব্রাজিল এসেছে নিজেদের হারানো গৌরব ফেরাতে। আর্জেন্টিনা এসেছে এক কিংবদন্তির নেতৃত্বে। সেই কিংবদন্তির নাম দিয়েগো ম্যারাডোনা। এবার তিনি খেলোয়াড় নন, কোচ। তার চোখে আগুন, কথায় আত্মবিশ্বাস। তিনি ঘোষণা করেছিলেন আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিততে এসেছে। 

অন্যদিকে ইউরোপে তখন জন্ম নিচ্ছে নতুন এক শক্তি- স্পেন। দীর্ঘদিন প্রতিভাবান ফুটবলার থাকলেও বড় আসরে ব্যর্থতার ইতিহাস ছিল তাদের। কিন্তু এবার তারা এসেছে ইউরো জয়ের আত্মবিশ্বাস নিয়ে। দলে ছিলেন জাভি, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, ডেভিড ভিয়া, ইকার ক্যাসিয়াস। তাদের ফুটবল ছিল ধৈর্য, বল নিয়ন্ত্রণ আর সৌন্দর্যের এক নতুন ভাষা। গ্রুপপর্ব শুরু হতেই বিশ্বকাপ বুঝিয়ে দিল এখানে কোনো পূর্বাভাস নিরাপদ নয়।

উদ্বোধনী ম্যাচে আয়োজক দক্ষিণ আফ্রিকা মুখোমুখি হলো মেক্সিকোর। দ্বিতীয়ার্ধে সিফিওয়ে শাবালালার গোল যেন পুরো মহাদেশকে একসঙ্গে উল্লাসে ভাসিয়ে দিল। ভুভুজেলার শব্দ আকাশ কাঁপিয়ে দিল। কিন্তু আনন্দের মাঝেও ছিল হতাশা। শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকা দ্বিতীয় পর্বে উঠতে পারেনি। তবু তারা ইতিহাসে থেকে যায় প্রথম আফ্রিকান আয়োজক হিসেবে। 

সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে স্পেনের শুরুতে। প্রথম ম্যাচেই সুইজারল্যান্ডের কাছে হার। বিশ্ব অবাক। কিন্তু সেখান থেকেই শুরু হয় তাদের রূপান্তর। অন্যদিকে ফ্রান্সে শুরু হয় বিশৃঙ্খলা। খেলোয়াড়দের সঙ্গে কোচের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসে। অনুশীলন বয়কট পর্যন্ত হয়। বিশ্বকাপ শেষ হয় অপমান নিয়ে। ইতালির অবস্থাও ভিন্ন ছিল না। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন দলটি গ্রুপপর্বই পার হতে পারেনি।

অন্যদিকে জার্মানি শুরু করে ঝড়ের গতিতে। টমাস মুলার, মেসুত ওজিল, মিরোস্লাভ ক্লোজেরা ভবিষ্যতের শক্তির ইঙ্গিত দিচ্ছিল। নকআউট পর্বে এসে নাটক আরও গভীর হয়। জার্মানি ও ইংল্যান্ড ম্যাচে একটি বল স্পষ্টভাবে গোললাইন পেরিয়েও গোল হিসেবে গণনা হয়নি। বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত জার্মানি ৪–১ গোলে জিতে যায়।

আর্জেন্টিনা ও  জার্মানি। ম্যারাডোনার দল নিয়ে প্রত্যাশা ছিল বিশাল। কিন্তু বাস্তবতা নির্মম। জার্মানি ৪–০ গোলে জয় পায়। বেঞ্চে বসে ম্যারাডোনা দেখছিলেন স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার দৃশ্য। ব্রাজিলও নিরাপদ ছিল না। কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে শুরুতে এগিয়ে থেকেও হেরে যায়। ভুল, চাপ আর হতাশা তাদের বিদায় লিখে দেয়। 

সেমিফাইনালে একদিকে নেদারল্যান্ডস ও  উরুগুয়ে। অন্যদিকে জার্মানি এবং স্পেন। নেদারল্যান্ডস ফাইনালে উঠে যায়। আর স্পেন ধৈর্যের ফুটবল খেলে জার্মানিকে হারিয়ে ইতিহাসের দরজায় পৌঁছে যায়।

১১ জুলাই ২০১০। আবার সকার সিটি। নেদারল্যান্ডস ও স্পেন। ম্যাচটি ছিল স্নায়ুর যুদ্ধ। ফাউল, সংঘর্ষ, চাপের এক উত্তেজনাপূর্ণ লড়াই। নেদারল্যান্ডসের আরিয়েন রবেন একা সুযোগ পেয়েও গোল করতে পারেননি। স্পেনও সুযোগ হারিয়েছে। সময় গড়িয়েছে। অতিরিক্ত সময়ে ম্যাচ পৌঁছেছে। তারপর ১১৬ মিনিট। একটি পাস। একটি নিয়ন্ত্রণ। একটি শট। গোল। আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা। স্টেডিয়াম বিস্ফোরিত হলো আনন্দে। স্পেন প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। ইনিয়েস্তা জার্সি খুলে উৎসর্গ করলেন তার প্রয়াত বন্ধুকে। পুরো স্পেন আনন্দে ডুবে গেল। ২০১০ বিশ্বকাপ শুধু স্পেনের শিরোপা নয়। ছোট ছোট পাস দিয়েও বিশ্ব জয় করা যায় তা দেখেছে ফুটবল বিশ্ব । ফুটবল শুধু ইউরোপ বা দক্ষিণ আমেরিকার সম্পদ নয়। এটি আফ্রিকার আত্মপ্রকাশ। ভুভুজেলার শব্দের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার আত্মবিশ্বাস। ম্যারাডোনার অসমাপ্ত স্বপ্ন,জার্মানির ভবিষ্যতের ঘোষণা এবং ব্রাজিলের আক্ষেপের পাশাপাশি ইনিয়েস্তার অমরত্ব।

২০১০ বিশ্বকাপের কথা উঠলে মানুষের কানে প্রথমে বাজে ভুভুজেলার শব্দ। তারপর মনে পড়ে আফ্রিকার সেই শীতের বিকেলগুলো, যেখানে ফুটবল শুধু ছিল একটি মহাদেশের উৎসব, একটি জাতির গর্ব, আর এক নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়নের জন্মের মহাকাব্য।

ঘটনাপ্রবাহ: ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬


আরও পড়ুন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম