Logo
Logo
×
   

Advertisement

খেলা

গ্যালারির কান্না, মাঠের হাসি

Advertisement

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ০৩:২১ পিএম

গ্যালারির কান্না, মাঠের হাসি

Advertisement

ফুটবল শুধু ২২ জন খেলোয়াড়ের খেলা নয়, কোটি কোটি মানুষের হৃদস্পন্দনের নাম। একটি গোল স্কোরবোর্ড বদলায় না, বদলে দেয় একটি দেশের রাত। স্ট্রাইকারের গোল মিসের ব্যর্থতা হয়ে ওঠে কোটি মানুষের দীর্ঘশ্বাস। পেনাল্টি শুধু রেফারির বাঁশি নয়, একটি জাতির হৃদস্পন্দন থামিয়ে দেওয়ার মুহূর্ত। লাল কার্ড খেলোয়াড়কে মাঠের বাইরে পাঠায় না, পুরো একটি দেশের স্বপ্নকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়।

ম্যাচ শুরুর কয়েক মিনিট আগে ক্যামেরা গ্যালারির দিকে তাক করলে দেখা যায় হাজারো মুখ। কেউ জাতীয় পতাকা জড়িয়ে বসে আছেন। কেউ মুখে এঁকেছেন দেশের রং। কোনো বাবা কাঁধে তুলে রেখেছেন ছোট্ট ছেলেকে। কোনো বৃদ্ধা দুই হাত জোড় করে প্রার্থনা করছেন। কেউ চোখ বন্ধ করে জাতীয় সংগীত গাইছেন। সেই মুহূর্তে তারা হয়ে ওঠেন একটি দেশের প্রতিচ্ছবি।

বল ডান বাম প্রান্তে যায়, গ্যালারির হাজারো মানুষ একসঙ্গে উঠে দাঁড়ায়। শট গোলপোস্টের কয়েক ইঞ্চি বাইরে চলে গেলে পুরো স্টেডিয়াম একসঙ্গে হাহাকার করে ওঠে। বল জালে জড়িয়ে যেতেই অচেনা মানুষও একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে আনন্দে। ভাষা আলাদা, সংস্কৃতি আলাদা, ধর্ম আলাদা। আনন্দের ভাষা একটাই।

চলতি বিশ্বকাপে সেই আবেগের রং আরও গাঢ় হয়েছে। ব্রাজিল নরওয়ের কাছে বিদায় নিল, মাঠে শুধু খেলোয়াড়রাই কাঁদেনি। গ্যালারিতে বসা হাজারো ব্রাজিলিয়ান সমর্থকও নির্বাক হয়ে গিয়েছিলেন। কারও হাতে জাতীয় পতাকা, কারও গালে সবুজ-হলুদের রং। সবার চোখে একই প্রশ্ন এত দ্রুত কীভাবে শেষ হয়ে গেল চার বছরের স্বপ্ন?

নরওয়ের খেলোয়াড়রা শেষ বাঁশির পর একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন, তা ছিল একটি জাতির দীর্ঘ প্রতীক্ষার বিস্ফোরণ।

মরক্কোর সমর্থকদের দেখলেই বোঝা যায়, ফুটবল কখনো একটি খেলা নয়। দল হারলেও খেলোয়াড়দের জন্য করতালি দিয়েছেন। কখনো কখনো সম্মানজনক পরাজয়ও ইতিহাস হয়ে থাকে। চোখে জল ছিল। সেই জল অপমানের নয়, গর্বের।

স্পেনের তরুণ ফুটবলারদের প্রতিটি গোলে গ্যালারি নতুন একটি প্রজন্মের জন্ম উদযাপন করছে। বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্ম ধীরে ধীরে বিদায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি পাস, শট, ভুল বলে দিচ্ছে এমন সুযোগ হয়ত আর আসবে না।

১৯৯৪ সালে রবার্তো ব‍্যাজিও টাইব্রেকারের শেষ পেনাল্টিটি আকাশে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। একজন ফুটবলার ভেঙে পড়েননি, কেঁদেছিল পুরো ইতালি। সেই শট আজও ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ছবিগুলোর একটি।

২০০৬ সালে জিনেদিন জিদান বিশ্বকাপ ফাইনালে মাথা ঠুকে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। মুহূর্তে একজন কিংবদন্তির বিদায়ের গল্প বদলে গিয়েছিল। ট্রফির চেয়েও বেশি আলোচনায় ছিল সেই মুহূর্ত।

২০১৪ সালে ব্রাজিলের বিপক্ষে জার্মানির সাত গোলের রাতে ক্যামেরা বারবার গিয়েছিল গ্যালারির দিকে। কেউ মুখ ঢেকে কাঁদছেন, কেউ বাকরুদ্ধ হয়ে বসে আছেন, কেউ নিজের সন্তানকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। ফুটবলের ইতিহাসে সেই রাত শুধু একটি জাতির মানসিক ক্ষতের প্রতীক।

২০২২ সালে মরক্কোর প্রতিটি জয় ছিল একেকটি উৎসব। রাবাত, কাসাব্লাঙ্কা, মারাকেশসহ পুরো দেশ রাস্তায় নেমে এসেছিল। শুধু মরক্কো নয়, আফ্রিকার কোটি মানুষ সেই জয়কে নিজেদের জয় হিসেবে উদযাপন করেছিল। ফুটবল তখন সীমান্ত মানেনি।

বিশ্বকাপে সবচেয়ে নিঃসঙ্গ মানুষটি সেই ফুটবলার, যিনি পেনাল্টি মিস করেন। হাজারো দর্শকের সামনে তিনি একা দাঁড়িয়ে থাকেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। গোল হলে তিনি নায়ক, মিস হলে খলনায়ক।

গোলকিপারের অসম্ভব একটি সেভে বাঁচিয়ে দেন একটি দেশের স্বপ্ন। সতীর্থরা ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরেন, গ্যালারি তার নাম ধরে চিৎকার করে, আর কোটি মানুষ টেলিভিশনের সামনে লাফিয়ে ওঠে। একটি সেভও একটি গোলের চেয়েও মূল্যবান হয়ে ওঠে।

গ্যালারিতে শুধু দর্শক বসে নেই,বসে আছে হাজার হাজার অসমাপ্ত গল্প। কোথাও একজন বাবা তার সন্তানের হাত ধরে প্রথম বিশ্বকাপ দেখছেন। কোথাও এক বৃদ্ধ শেষবারের মতো প্রিয় দলের ম্যাচ দেখতে এসেছেন। কোথাও এক শিশু বুঝতে শিখছে, ফুটবল কেন মানুষের জীবনের এত বড় অংশ।

শেষ বাঁশি বাজে। স্টেডিয়ামের আলো নিভতে শুরু করে। গ্যালারি ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যায়। কিছু কান্না সিটের ওপর রয়ে যায়, কিছু হাসি ভেসে বেড়ায় বাতাসে। খেলোয়াড়রা ড্রেসিংরুমে ফিরে যান, দর্শকেরা ঘরে ফেরেন, সেই রাতের আবেগ থেকে যায় বহু বছর।

ইতিহাস শুধু ট্রফি জেতা দলগুলোর নয়। ইতিহাস লেখা হয় সেই সমর্থকের চোখের জলে, হারার পরও পতাকাটি বুকে জড়িয়ে রাখেন। ইতিহাস লেখা হয় সেই শিশুর হাসিতে, যে বাবার কাঁধে বসে প্রথমবার দেখেছে নিজের দেশের জয়।

বিশ্বকাপের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য তাই মাঠে নয়, গ্যালারিতে। সেখানে একই সঙ্গে জন্ম নেয় হাসি আর কান্না, জয় আর বেদনা, বিদায় আর নতুন স্বপ্ন।

Advertisement

Advertisement

ঘটনাপ্রবাহ: ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬


আরও পড়ুন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম