Logo
Logo
×
   

Advertisement

খেলা

স্কটল্যান্ড: হুইস্কি থেকে হাইড্রোজেন

এক পুরনো দেশের নতুন অর্থনীতি

Advertisement

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৩:০৪ পিএম

এক পুরনো দেশের নতুন অর্থনীতি

সংগৃহীত ছবি

Advertisement

স্কটল্যান্ডকে দেখলে প্রথমেই মনে পড়ে পাহাড়, কুয়াশা, দুর্গ আর হুইস্কির গল্প। শত বছরের পুরোনো কারখানা, কাঠের ব্যারেলে ধীরে ধীরে পরিণত হওয়া সোনালি পানীয়, ছোট ছোট গ্রামের নিঃশব্দ জীবন যেন অতীতের একটি ছবি। এই ছবির আড়ালেই তৈরি হচ্ছে আরেকটি স্কটল্যান্ড।

শুধু ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে বসে নেই, সেই ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়ে লিখছে ভবিষ্যতের অর্থনীতির নতুন অধ্যায়। একদিকে বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত স্কচ হুইস্কি শিল্প, অন্যদিকে সমুদ্রের বাতাস থেকে বিদ্যুৎ তৈরির স্বপ্ন। একদিকে শত বছরের পুরোনো কারিগরি দক্ষতা, অন্যদিকে গ্রিন হাইড্রোজেন, উইন্ড এনার্জি ও নবায়নযোগ্য প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত। স্কটল্যান্ড পুরোনোকে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে যেতে চায়।

স্কটল্যান্ডের অর্থনীতির সঙ্গে হুইস্কির সম্পর্ক শুধু ব্যবসার নয়, সংস্কৃতিরও। স্পেইসাইড, হাইল্যান্ড শুধু মানচিত্রের জায়গা নয়, এগুলো বিশ্বজুড়ে পরিচিত এক ঐতিহ্যের প্রতীক। কয়েকশ বছর ধরে তৈরি হচ্ছে স্কচ হুইস্কি। ছোট ছোট ডিস্টিলারি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বাজার—এই শিল্প হাজার হাজার মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িত।

গ্লাসগোর এক হুইস্কি বিশেষজ্ঞ ম্যালকম বলছিলেন, ‘হুইস্কি শুধু একটি পানীয় নয়। আমাদের ইতিহাস, আমাদের গল্প, আমাদের মানুষের দক্ষতা।’ একটি বোতল হুইস্কির পেছনে থাকে বছরের পর বছর অপেক্ষা। একটি দেশের উন্নয়নও একদিনে তৈরি হয় না।

একসময় উত্তর সাগরের তেল ও গ্যাস ছিল স্কটল্যান্ডের অর্থনীতির বড় শক্তি। অ্যাবারডিন শহরকে বলা হতো ইউরোপের তেল রাজধানী। পৃথিবী যখন জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে এগোচ্ছে, তখন স্কটল্যান্ডও বদলাচ্ছে নিজের পথ। উত্তরের বিশাল সমুদ্র এখন শুধু তেল অনুসন্ধানের জায়গা নয়, হয়ে উঠছে উইন্ড এনার্জির নতুন ক্ষেত্র। সমুদ্রের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল উইন্ড টারবাইনগুলো নতুন যুগের প্রতীক। যে বাতাস একসময় শুধু পাহাড়ের কুয়াশা আর সমুদ্রের ঢেউ তৈরি করত, সেই বাতাস এখন বিদ্যুৎ তৈরি করছে।

স্কটল্যান্ডের লক্ষ্য—ভবিষ্যতের জন্য একটি পরিষ্কার জ্বালানি অর্থনীতি তৈরি করা।

বিশ্ব কার্বন নিঃসরণ কমানোর পথ খুঁজছে, তখন গ্রিন হাইড্রোজেন নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখছে স্কটল্যান্ড। নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করে তৈরি করা হাইড্রোজেন ভবিষ্যতে শিল্প ও পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্কটল্যান্ডের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো এই নতুন অর্থনীতির সম্ভাবনাময় কেন্দ্র হয়ে উঠছে।

একসময় মানুষ কাজ করতেন তেল-গ্যাস শিল্পে, নতুন প্রজন্মের জন্য তৈরি হচ্ছে প্রযুক্তি ও সবুজ জ্বালানির কর্মসংস্থান। অর্থনীতির পরিবর্তন মানে শুধু শিল্পের পরিবর্তন নয়, মানুষের জীবনের পরিবর্তনও।

গ্লাসগো একসময় ছিল জাহাজ নির্মাণের শহর। ক্লাইড নদীর তীরে তৈরি হতো বিশ্বের বড় বড় জাহাজ। শিল্প বিপ্লবের সময় এই শহর ছিল ব্রিটেনের অন্যতম প্রধান শিল্পকেন্দ্র। সময় বদলেছে। অনেক পুরোনো কারখানা বন্ধ হয়েছে। কিন্তু শহর হারিয়ে যায়নি। আজ গ্লাসগো নতুন প্রযুক্তি, পরিষেবা খাত, শিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্র হয়ে উঠছে। পুরোনো শিল্পের অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে নতুন অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে শহরটি। ইতিহাস আর ভবিষ্যতের মধ্যে তৈরি হচ্ছে এক সেতু।

স্কটল্যান্ডের অর্থনীতির আরেকটি বড় শক্তি পর্যটন। এডিনবরার দুর্গ, হাইল্যান্ডের পাহাড়, লোখ নেসের রহস্য, দ্বীপের নিঃসঙ্গ সৌন্দর্য বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে মানুষকে টেনে আনে। পর্যটকরা শুধু ছবি তুলে ফিরে যান না। তারা অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে যান।

ছোট গ্রামের হোটেল, রেস্তোরাঁ, স্থানীয় শিল্প—সবকিছুই উপকৃত হয়। স্কটল্যান্ডের সৌন্দর্য শুধু প্রকৃতির নয়, অর্থনীতিরও সম্পদ।   

অর্থনীতির এই পরিবর্তনের মধ্যেও একটি প্রশ্ন থেকে যায়, পুরোনো পরিচয় কি হারিয়ে যাবে? স্কটিশদের উত্তর, না। তারা বিশ্বাস করেন, আধুনিক হওয়া মানে নিজের ইতিহাস ভুলে যাওয়া নয়। একজন তরুণ উদ্যোক্তা বলেন, ‘আমরা হুইস্কির দেশ, শুধু অতীতের নয়, ভবিষ্যতের দেশও হতে চাই।’ এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে নতুন স্কটল্যান্ডের গল্প।

কিল্ট পরে উৎসব করে। ব্যাগপাইপ বাজায়, দুর্গের ইতিহাস মনে রাখে। আবার নতুন প্রযুক্তি, সবুজ শক্তি আর ভবিষ্যতের অর্থনীতির স্বপ্ন দেখে।

স্কটল্যান্ড তাই শুধু হুইস্কির দেশ নয়। এখানে পুরোনো কাঠের ব্যারেলের পাশে দাঁড়িয়ে আছে নতুন হাইড্রোজেন প্ল্যান্ট। পাহাড়ের কুয়াশার ভেতর থেকেও দেখা যায় ভবিষ্যতের আলো। ঐতিহ্যের শিকড় মাটিতে রেখে, স্বপ্নের চোখ আকাশে তুলে এগিয়ে যাচ্ছে স্কটল্যান্ড।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম