রাগবির সবুজ গালিচা থেকে নীল ট্র্যাক
Advertisement
প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬, ০১:৩৮ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
২৮ জুলাই। স্কটস্টাউন স্টেডিয়ামের নাল ট্র্যাকে ইতিহাস লেখা হচ্ছে। স্টার্টারের বন্দুকের শব্দে ছুটছেন বিশ্বের দ্রুততম স্প্রিন্টাররা। গ্যালারিতে উচ্ছ্বাসের ঢেউ। এক লেনে ক্যামেরুনের এমানুয়েল এসেমে, অন্য লেনে অস্ট্রেলিয়ার লাচলান কেনেডি, ইংল্যান্ডের জেরেমায়া আজু।
আর সেই একই ট্র্যাকে নিজের মৌসুমসেরা সময় নিয়ে ফিনিশিং লাইন পার করছেন বাংলাদেশের লুশাদ ইসলাম। দর্শকের চোখে নিখুঁত এক অ্যাথলেটিক্স স্টেডিয়াম।
কয়েক সপ্তাহ আগেও এখানে নীল ট্র্যাকের নয়, ছিল সবুজ কৃত্রিম ঘাসের রাজত্ব। এই মাঠ কাঁপাত রাগবি বুটের আঘাত। যেখানে আজ গতির খেলা সেখানেই কিছুদিন আগেও চলত স্ক্রাম, ট্যাকল আর ট্রাইয়ের যুদ্ধ।
গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসের সবচেয়ে বিস্ময়কর গল্প লুকিয়ে আছে এই স্কটস্টাউন স্টেডিয়ামের রূপান্তরে। দীর্ঘদিন ধরেই এটি স্কটল্যান্ডের অন্যতম পরিচিত রাগবি ভেন্যু। ইউনাইটেড রাগবি চ্যাম্পিয়নশিপের শক্তিশালী ক্লাব গ্লাসগো ওয়ারিয়র্সের ঘরের মাঠ। মাঝখানে ছিল আন্তর্জাতিক মানের থ্রি-জি কৃত্রিম টার্ফ, চারপাশে পুরোনো অ্যাথলেটিক্স ট্র্যাক। রাগবির জন্য ট্র্যাকের ওপর পর্যন্ত বসানো হয়েছিল অস্থায়ী গ্যালারি। ফলে আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্স আয়োজনের উপযোগিতা প্রায় হারিয়েছিল স্টেডিয়ামটি।
তারপর বদলে গেল সব হিসাব। অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া আয়োজনের দায়িত্ব ছেড়ে দিলে মাত্র আঠারো মাসের মধ্যে কমনওয়েলথ গেমস আয়োজনের দায়িত্ব নেয় গ্লাসগো। সময় ছিল অল্প, চ্যালেঞ্জ ছিল বিশাল। নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণের সুযোগ ছিল না। তাই সিদ্ধান্ত হলো, বিদ্যমান একটি ভেন্যুকেই নতুন প্রাণ দেওয়া হবে।
২০২৫ সালের জুনে শুরু হয় বড় রূপান্তরের কাজ। খুলে ফেলা হয় রাগবির কৃত্রিম টার্ফ। সরিয়ে নেওয়া হয় অস্থায়ী গ্যালারি। শুরু হয় আন্তর্জাতিক মানের নতুন ট্র্যাক বসানোর কাজ। সেপ্টেম্বরের মধ্যেই শেষ হয় প্রথম ধাপ। এরপর শেষ কয়েক মাস ধরে চলে সূক্ষ্ম প্রস্তুতি, প্রযুক্তিগত পরীক্ষা, ইনফিল্ড উন্নয়ন এবং প্রতিযোগিতা উপযোগী পরিবেশ তৈরির কাজ।
স্টেডিয়ামের হৃদয়ে বসানো হয় বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক ট্র্যাকগুলোর একটি—MONDO Sportflex Super X 720। বেইজিং অলিম্পিক থেকে শুরু করে বিশ্বের বহু বড় প্রতিযোগিতায় ব্যবহৃত এই প্রযুক্তির ট্র্যাকের বিশেষ বায়ুকোষ কাঠামো অ্যাথলেটের পায়ের আঘাত শোষণ করে আবার সেই শক্তির বড় অংশ ফিরিয়ে দেয়।
ফলে দৌড়বিদ কম শক্তি খরচ করে বেশি গতি তুলতে পারেন। আধুনিক স্প্রিন্টের বিজ্ঞানে এটি এখন সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সারফেসগুলোর একটি।
২৮ জুলাই সেই ট্র্যাকেই প্রযুক্তি আর প্রতিভার মিলন ঘটল। এসেমে গড়লেন নতুন গেমস রেকর্ড। জোয়ে হবস হলেন দ্রুততম মানবী। কেনেডি গড়লেন অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় রেকর্ড। বাংলাদেশের লুশাদ ইসলামও করলেন নিজের মৌসুমের সেরা সময়। যে মাঠে কিছুদিন আগেও রাগবির সংঘর্ষে গ্যালারি কাঁপত, সেখানে এখন জন্ম নিচ্ছে নতুন অ্যাথলেটিক্স ইতিহাস।
এই রূপান্তর শুধু কয়েক দিনের উৎসবের জন্য নয়।
গেমস শেষে এই অত্যাধুনিক ট্র্যাক গ্লাসগো শহরের সম্পদ হয়ে থাকবে। স্থানীয় ক্লাব, তরুণ অ্যাথলেট, স্কুল-কলেজের খেলোয়াড়রা ব্যবহার করতে পারবেন বিশ্বমানের এই সুবিধা।
গ্লাসগোর প্রধান নির্বাহী ফিল ব্যাটি মনে করেন, এই বিনিয়োগ শুধু কমনওয়েলথ গেমসের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও। বিশ্বমানের সুবিধা দিয়ে স্থানীয় ক্রীড়াবিদদের নতুন সুযোগ তৈরি করাই এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সাফল্য। স্কটিশ অ্যাথলেটিক্সের প্রধান নির্বাহী কলিন হাচিসনও বলেছেন, নতুন ট্র্যাক শুধু গেমসের কেন্দ্রবিন্দু নয়, আগামী বহু বছর স্কটিশ অ্যাথলেটিক্সেরও প্রাণকেন্দ্র হয়ে থাকবে।
এই পরিবর্তনের মূল্যও কম নয়। গেমস শেষে আবার নতুন করে রাগবির কৃত্রিম টার্ফ বসাতে হবে। গ্লাসগো ওয়ারিয়র্সের নতুন মৌসুম শুরুর আগে মাঠকে আবার রাগবির উপযোগী করে তুলতে হবে। এই স্টেডিয়াম আবার বদলে যাবে। আবার ফিরে আসবে সবুজ। একটি মাঠ কোনো এক খেলার চিরস্থায়ী সম্পত্তি নয়। সময়ের প্রয়োজনেই তার পরিচয় বদলায়, তার ভাষা বদলায়, তার ইতিহাসও নতুন করে লেখা হয়।
স্কটস্টাউন সেই গল্পটাই বলছে। কয়েক সপ্তাহ আগে যেখানে রাগবি খেলোয়াড়দের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই ছিল, সেখানে স্প্রিন্টারের চোখে একশ মিটারের স্বপ্ন। যেখানে রাগবির বল আকাশে উড়ত, সেখানে জ্যাভলিন ছুটছে। সংঘর্ষ ছিল শক্তির, সেখানে গতি আর সময়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।
একটি স্টেডিয়ামেরও জীবন থাকে। স্মৃতি থাকে। পরিচয় থাকে। স্কটস্টাউন নিজের পরিচয় বদলাতে ভয় পায়নি। সবুজ কৃত্রিম গালিচা সরিয়ে জায়গা করে দিয়েছে নীল ট্র্যাককে। সেই নীল ট্র্যাকেই জন্ম নিয়েছে নতুন রেকর্ড, নতুন নায়ক, নতুন স্বপ্ন।
কয়েক মাস পর আবার এখানে রাগবির বাঁশি বাজবে। আবার সবুজে ঢেকে যাবে মাঝমাঠ। ইতিহাস জানবে, এক গ্রীষ্মে এই মাঠই বিশ্বের দ্রুততম মানুষদের পদচারণায় কেঁপেছিল। রাগবির সবুজ গালিচার নিচেই লুকিয়ে ছিল নীল ট্র্যাকের ভবিষ্যৎ। বড় ক্রীড়া আসরের মহিমা শুধু নতুন স্টেডিয়ামে নয়, পুরোনো স্বপ্নকে নতুন রূপ দেওয়ার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে।

