স্বপ্ন বোনে নতুন প্রজন্ম
গ্লাসগোর হৃদয়ে জ্ঞানের আলো
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬, ০৩:১৮ পিএম
শহরের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গ্লাসগোর সকাল শুরু হয় ঘণ্টাধ্বনিতে। কোথাও পুরোনো চার্চের ঘণ্টা, কোথাও ব্যস্ত শহরের ট্রাফিকের শব্দ। শহরের পশ্চিম প্রান্তে পা রাখলেই অন্য এক আবহ। পাথরের পুরোনো ভবন, সবুজ চত্বর, হাতে বই নিয়ে হেঁটে চলা তরুণ-তরুণী।
শহরের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি জীবন্ত ইতিহাস হয়ে আছে। প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছরের পুরোনো এই বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়াল, করিডর, লাইব্রেরির তাক বহন করে চলেছে শত শত বছরের জ্ঞান, গবেষণা আর স্বপ্ন।
১৪৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজিভাষী বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়। কয়েক শতাব্দী ধরে এখান থেকে বেরিয়ে এসেছেন বিজ্ঞানী, দার্শনিক, সাহিত্যিক, অর্থনীতিবিদ ও সমাজ পরিবর্তনের কারিগররা। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা ছুটে আসেন গ্লাসগোয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গিলমোরহিল ক্যাম্পাসে ঢুকলেই চোখে পড়ে গথিক স্থাপত্যের অপূর্ব সৌন্দর্য। উঁচু টাওয়ার, পাথরের দেয়াল আর সবুজ লন ইতিহাসের সঙ্গে বসবাস করে।
শ্রেণিকক্ষের বাইরে এখানকার শিক্ষাজীবনও আলাদা। কেউ লাইব্রেরিতে বসে গবেষণায় ডুবে আছেন, কেউ ক্যাফেতে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করছেন, কেউ আবার ক্যাম্পাসের সবুজ মাঠে বসে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা একই জায়গায় এসে তৈরি করছেন এক বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশ।
এক বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে দেখা হলো বাংলাদেশের এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বললেন, ‘দেশ থেকে এত দূরে এসে প্রথমে অনেক কিছু কঠিন মনে হয়েছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ধীরে ধীরে আপন করে নেয়। এখানে শুধু পড়াশোনা নয়, নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার সুযোগ পাওয়া যায়।’
গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কম নয়। কেউ এসেছেন উচ্চশিক্ষার জন্য, কেউ গবেষণার কাজে, কেউ ভবিষ্যতের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা তরুণ-তরুণীরা নিজেদের মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে তৈরি করছেন নতুন পরিচয়। এক বাংলাদেশি ছাত্রী বলছিলেন, ‘প্রথম দিকে স্কটিশ আবহাওয়া, নতুন সংস্কৃতি—সবকিছুই অপরিচিত ছিল। এখানে বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ পেয়েছি। নিজের দেশকেও নতুনভাবে তুলে ধরতে পারছি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় আকর্ষণগুলোর একটি হলো এর লাইব্রেরি সংস্কৃতি। বিশাল সংগ্রহশালা, ডিজিটাল রিসোর্স এবং গবেষণার সুযোগ শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের নতুন দরজা খুলে দেয়। রাত গভীর হলেও অনেক শিক্ষার্থীকে দেখা যায় বই, ল্যাপটপ আর গবেষণার নোট নিয়ে ব্যস্ত থাকতে।
গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন শুধু ডিগ্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে তৈরি হয় বন্ধুত্ব, অভিজ্ঞতা এবং জীবনের গল্প। বিভিন্ন দেশের উৎসব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ছাত্র সংগঠনের কার্যক্রমে ক্যাম্পাস হয়ে ওঠে ছোট্ট এক পৃথিবী।
শহরটির সঙ্গেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক গভীর। শহরের জাদুঘর, সংগীত, ইতিহাস, নদীর তীর—সবকিছুই শিক্ষার অংশ হয়ে যায়।
ক্লাইড নদীর পাশে দাঁড়িয়ে অনেক শিক্ষার্থী ভবিষ্যতের স্বপ্ন আঁকেন। কেউ গবেষক হতে চান, কেউ সমাজ পরিবর্তনের অংশ হতে চান, কেউ আবার নিজের দেশে ফিরে নতুন কিছু করতে চান। বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে হাঁটলে মনে হয়, এখানে বর্তমান প্রজন্মের বাইরেও ভবিষ্যতের পৃথিবীও তৈরি হচ্ছে। একেকটি শ্রেণিকক্ষে জন্ম নিচ্ছে নতুন ধারণা, একেকটি গবেষণাগারে তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা। গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের নানা প্রান্তের তরুণদের স্বপ্নের ঠিকানা।
যেখানে পুরোনো পাথরের দেয়াল অতীতের গল্প বলে, আর তরুণ চোখগুলো খোঁজে আগামী দিনের পথ। এই শহরে বইয়ের পাতার সঙ্গে মিশে থাকে স্বপ্নের শব্দ। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় প্রতিদিন লেখা হয় নতুন ইতিহাস।


-6a74467cddbe3.jpg)