লোহার পথে ছুটে চলে পাহাড় মেঘ আর হাজার বছরের ইতিহাস
প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩৩ পিএম
সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গ্লাসগো কুইন স্ট্রিট স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনটিকে মনে হয় একটি চলন্ত গল্পের বই। যার প্রতিটি পাতায় লেখা আছে পাহাড়ের গল্প, হ্রদের গল্প, পুরোনো দুর্গের স্মৃতি আর প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের দীর্ঘ সম্পর্কের কাহিনি।
ঘড়ির কাঁটা নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছে দেয় ট্রেনকে প্ল্যাটফর্মে। দরজা বন্ধ হয়। হুইসেল বাজে। ধীরে ধীরে গ্লাসগোর ব্যস্ত শহর পেছনে ফেলে ট্রেন এগিয়ে যায় অজানা সৌন্দর্যের দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বদলে যায় দৃশ্যপট। উঁচু ভবন, ব্যস্ত রাস্তা, শহুরে কোলাহল মিলিয়ে গিয়ে জানালার ওপারে দেখা দেয় সবুজ মাঠ, ছোট ছোট গ্রাম, পাহাড়ের রেখা আর মেঘে ঢাকা আকাশ। স্কটল্যান্ড শহরের পর্দা সরিয়ে নিজের আসল মুখটি দেখাতে শুরু করেছে।
স্কটল্যান্ডে ট্রেনযাত্রা নিজেই একটি অভিজ্ঞতা। গ্লাসগো থেকে এডিনবরো কিংবা হাইল্যান্ডের পথে যাত্রাপথকে বিশ্বের অন্যতম সুন্দর ভ্রমণ অভিজ্ঞতার একটি বলা হয়।
স্কটল্যান্ডের রেল নেটওয়ার্ক পরিচালনায় বড় ভূমিকা রাখা স্কটরেলের বিভিন্ন রুটের মধ্যে ওয়েস্ট হাইল্যান্ড লাইন বিশেষভাবে পরিচিত তার অসাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্য। গ্লাসগো থেকে শুরু হওয়া এই পথ ধীরে ধীরে নিয়ে যায় পাহাড়, উপত্যকা, লক বা হ্রদ এবং জনবসতি থেকে দূরের এক শান্ত পৃথিবীর দিকে।
জানালার পাশে বসে থাকা যাত্রীর চোখের সামনে প্রতি মুহূর্তে বদলে যায় প্রকৃতির ছবি।
কখনও দেখা যায় বিস্তীর্ণ সবুজ ঘাসের মাঠে ভেড়ার পাল। কখনও পাহাড়ের চূড়ায় নেমে এসেছে মেঘের দল। কখনও হ্রদের শান্ত পানিতে আকাশের প্রতিচ্ছবি। আবার কখনও মনে হয়, ট্রেনটি কোনো সিনেমার দৃশ্যের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
লন্ডন থেকে স্কটল্যান্ড ঘুরতে আসা পর্যটক জন ও তাঁর স্ত্রী সারাহ জানালার পাশে বসে মুগ্ধ চোখে বাইরে তাকিয়ে ছিলেন। প্রথমবার হাইল্যান্ডের পথে ট্রেনে উঠেছেন তাঁরা। জন বললেন, ‘গাড়িতে গেলে হয়তো দ্রুত পৌঁছানো যেত, এই দৃশ্যগুলো দেখা যেত না। এই যাত্রাটাই আমাদের ভ্রমণের সবচেয়ে বড় স্মৃতি হয়ে থাকবে।’
একই অভিজ্ঞতা এক তরুণ পর্যটক এমিলিরও। ক্যামেরা হাতে বারবার জানালার বাইরে তাকাচ্ছিলেন তিনি। পাহাড়ের ছবি তুলতে তুলতে বললেন, ‘স্কটল্যান্ডকে বইয়ে পড়েছি, ছবিতে দেখেছি। ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখা এই সৌন্দর্যের সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা হয় না।’
গ্লাসগো থেকে হাইল্যান্ডের পথে ট্রেন এগিয়ে যায়, শহরের পরিচিত মুখ ধীরে ধীরে বদলে যায়। আসে লক লমন্ডের সৌন্দর্য, পাহাড়ি উপত্যকা, নির্জন প্রান্তর। কোথাও কোথাও মনে হয়, মানুষ নয়, প্রকৃতিই এখানে রাজা।
এখানকার পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে হাজার বছরের সাক্ষী হয়ে। হ্রদের পানি শান্তভাবে বয়ে চলে। বাতাসের শব্দও যেন ধীর। প্রকৃতি মানুষকে তাড়াহুড়ো নয়, থেমে দেখার শিক্ষা দেয়।
গ্লাসগো থেকে এডিনবরোর ট্রেনযাত্রা আবার অন্যরকম অনুভূতি তৈরি করে। দুটি শহর স্কটল্যান্ডের দুই ভিন্ন মুখ। গ্লাসগো শিল্প, সংগীত ও আধুনিকতার শহর। আর এডিনবরা ইতিহাস, রাজকীয় স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের শহর। ট্রেন এডিনবরোর দিকে এগিয়ে যায়, দূরে দেখা যায় বিখ্যাত এডিনবরা দুর্গ। পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেই দুর্গ কয়েকশো বছরের ইতিহাস নিয়ে আজও যাত্রীদের স্বাগত জানায়।
এই পথের সৌন্দর্য শুধু প্রকৃতিতে নয়, মানুষের মধ্যেও। ট্রেনে দেখা যায় নানা বয়সের মানুষ। কেউ অফিস শেষে বাড়ি ফিরছেন। কেউ ছুটিতে বেরিয়েছেন। কেউ বই পড়ছেন, কেউ জানালার পাশে বসে নিঃশব্দে প্রকৃতি দেখছেন। কোনো শিশুর চোখে প্রথম পাহাড় দেখার বিস্ময়। কোনো বৃদ্ধ দম্পতির চোখে পুরোনো দিনের স্মৃতি। প্রত্যেক যাত্রীর জন্য এই পথের গল্প আলাদা।
হাইল্যান্ড স্কটল্যান্ডের আত্মার একটি অংশ। পাহাড়ের সঙ্গে মিশে আছে যুদ্ধের ইতিহাস, লোককথা, সংগীত আর মানুষের সংগ্রামের স্মৃতি। গ্লেনফিনান ভায়াডাক্ট এই রেলপথের অন্যতম আকর্ষণ। বিশাল বাঁকানো সেতুটি জনপ্রিয় সংস্কৃতিরও অংশ। সিনেমার পর্দায় দেখা এই সেতু বাস্তবে দেখার জন্যও অনেক পর্যটক এই পথে ভ্রমণ করেন।
ওয়েস্ট হাইল্যান্ড লাইন ধরে যাত্রা গিয়ে শেষ হয় পশ্চিম উপকূলের ম্যালাইগ পর্যন্ত। পথে যত এগোনো যায়, ততই মনে হয় সভ্যতার কোলাহল থেকে দূরে সরে গিয়ে প্রকৃতির আরও কাছে পৌঁছে যাচ্ছেন যাত্রীরা।
ট্রেনের জানালায় স্কটল্যান্ড একটি চলমান চিত্রকর্ম। ঋতু বদলের সঙ্গে বদলায় তার রং। কখনও সবুজ, কখনও ধূসর, কখনও মেঘে ঢাকা রহস্যময়। সূর্যের আলো পড়লে পাহাড়ের চেহারা বদলে যায়, আবার বৃষ্টির ফোঁটায় তৈরি হয় অন্য এক সৌন্দর্য।
এই দেশের মানুষও প্রকৃতির সঙ্গে সেই সম্পর্ক ধরে রেখেছেন। ছুটির দিনে তাঁরা পাহাড়ে যান, হ্রদের পাশে বসেন, দীর্ঘ হাঁটায় বের হন। প্রকৃতি এখানে শুধু পর্যটনের বিষয় নয়, জীবনযাপনের অংশ।
একসময় ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছে যায়। দরজা খুলে যায়। যাত্রীরা নেমে পড়েন। জানালার ওপারে দেখা দৃশ্যগুলো থেকে যায় মনে।
স্কটল্যান্ডের ট্রেনযাত্রা তেমনই এক অভিজ্ঞতা। ট্রেন শুধু লোহার চাকার ওপর চলে না। ছুটে চলে ইতিহাসের ভেতর দিয়ে, পাহাড়ের ভেতর দিয়ে, মানুষের অনুভূতির ভেতর দিয়ে। ট্রেনের জানালায় দেখা যায় একটি দেশের আত্মা।

