Logo
Logo
×
   

Advertisement

খেলা

মাঠে খেলোয়াড়, নেপথ্যে প্রযুক্তি– স্বচ্ছতার নতুন স্বপ্ন

Advertisement

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৩:১৭ পিএম

মাঠে খেলোয়াড়, নেপথ্যে প্রযুক্তি– স্বচ্ছতার নতুন স্বপ্ন

Advertisement

একটা সময় ক্রীড়া প্রশাসনের দরজা  সব সময় আধখোলা ছিল। বাইরে থেকে ভেতরটা দেখা যেত না। ফাইলের পর ফাইল, কাগজের চিঠি, বন্ধ ঘরের বৈঠক সব মিলিয়ে এক অদৃশ্য পর্দা। কে জাতীয় দলে সুযোগ পেলেন, কোন ভিত্তিতে কোচ নিয়োগ হলো, কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ কোথায় ব্যয় হলো এমন অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনেক সময় গণমাধ্যমও থমকে দাঁড়িয়েছে।

পৃথিবী ইতিমধ্যে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশের ক্রীড়া প্রশাসনের বড় অংশ এখনও পুরোনো সময়ের ধুলোমাখা আলমারিতে আটকে।

দেশের বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশন ও সংস্থার কার্যক্রম চলে সরকারি অনুদান, পৃষ্ঠপোষকতা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায়। সেই অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, উন্নয়ন প্রকল্প কতদূর এগোল, কোন সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হলো এসব তথ্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থেকে যায়। তথ্যের এই অদৃশ্য দেয়ালই জন্ম দেয় প্রশ্নের। আর প্রশ্নের উত্তর না থাকলেই বাড়তে থাকে অবিশ্বাস।

পৃথিবীর অনেক দেশ এই সমস্যার সমাধান করেছে প্রযুক্তিকে সঙ্গী করেই। যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা কিংবা সিঙ্গাপুরের ক্রীড়া প্রশাসনে তথ্য লুকিয়ে রাখার সংস্কৃতি নেই বললেই চলে।অধিকাংশ ফেডারেশনের ওয়েবসাইটে নিয়মিত প্রকাশ করা হয় বার্ষিক প্রতিবেদন, নিরীক্ষা প্রতিবেদন, খেলোয়াড় নিবন্ধন, নির্বাচন-সংক্রান্ত তথ্য এবং বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি। তথ্য জানতে কারও দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয় না।স্বচ্ছতাই হয়ে ওঠে প্রশাসনের স্বাভাবিক নিয়ম।

লন্ডন সফররত কানাডাপ্রবাসী প্রযুক্তিবিদ জিয়াও মনে করেন, ‘প্রযুক্তিকে শুধু ব্যবসা কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের সুবিধার জন্য নয়, দেশের ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নেও কাজে লাগানো উচিত। তাঁর ইচ্ছা, নিজের প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের খেলাধুলায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে ভূমিকা রাখা।’ তাঁর ভাবনায়, ‘খেলোয়াড়ের তথ্য থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ, প্রতিযোগিতা, অর্থ ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সবকিছু যদি একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা যায়, তাহলে ক্রীড়াঙ্গনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি অনেকটাই বাড়ানো সম্ভব।’

বাংলাদেশেও এমন একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা অসম্ভব নয়। যেখানে প্রতিটি ফেডারেশনের বাজেট, ব্যয়ের খাত, পৃষ্ঠপোষকতা, বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা, সভার কার্যবিবরণী এবং অর্জনের তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এতে শুধু সাংবাদিক নন, খেলোয়াড়, সংগঠক, গবেষক কিংবা সাধারণ ক্রীড়াপ্রেমীরা জানতে পারবেন একটি ফেডারেশন আসলে কী করছে।

ডিজিটাল খেলোয়াড় নিবন্ধন ব্যবস্থাও সময়ের দাবি। এখনও নানা খেলায় নিবন্ধন নিয়ে বিতর্ক শোনা যায়। কখনও বয়স জালিয়াতি, কখনও একই খেলোয়াড়ের একাধিক নিবন্ধনের অভিযোগ। একটি কেন্দ্রীয় অনলাইন তথ্যভান্ডার থাকলে প্রত্যেক খেলোয়াড়ের বয়স, পারফরম্যান্স, অংশগ্রহণ, র‌্যাঙ্কিং এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব। তখন দল নির্বাচনও হবে তথ্য ও পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে।বিতর্কের অবকাশও কমবে।

অর্থ ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার আরও জরুরি। সরকারি অনুদান কিংবা পৃষ্ঠপোষকদের অর্থ কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে, কোন প্রকল্পে কত টাকা খরচ হয়েছে, তার অগ্রগতি কী?এসব তথ্য যদি নির্দিষ্ট সময় অন্তর অনলাইনে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা যায়, তাহলে আর্থিক স্বচ্ছতা অনেকটাই নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে অনলাইন দরপত্র ও ডিজিটাল অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা চালু হলে কেনাকাটা ও বিল পরিশোধেও অনিয়মের সুযোগ কমে আসবে।

অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও প্রযুক্তি হতে পারে কার্যকর হাতিয়ার। কোনো খেলোয়াড়, কোচ বা সংগঠকের অভিযোগ জমা দেওয়া থেকে শুরু করে তদন্তের অগ্রগতি ও নিষ্পত্তির তথ্য যদি অনলাইনেই দেখা যায়, তাহলে আস্থার জায়গাটা আরও শক্ত হবে। স্বচ্ছতা শুধু তথ্য প্রকাশে নয়, ন্যায়বিচারের পথটিও দৃশ্যমান করে।

প্রযুক্তি বদলে দিতে পারে মাঠের লড়াইটাও। আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা চালু হলে একজন খেলোয়াড়ের প্রশিক্ষণ, ফিটনেস, চোট, চিকিৎসা, পারফরম্যান্স এবং আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের পূর্ণাঙ্গ তথ্য এক জায়গায় সংরক্ষণ করা সম্ভব। তখন জাতীয় দল নির্বাচন হবে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ নয়, তথ্য ও পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে।

বাংলাদেশে ডিজিটাল ক্রীড়া প্রশাসন গড়ে তুলতে খুব বড় কোনো বিপ্লবের দরকার নেই। দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষ জনবল এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের মানসিকতা। প্রতিটি ফেডারেশনের জন্য বাধ্যতামূলক ওয়েবসাইট, বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ, জাতীয় খেলোয়াড় তথ্যভান্ডার, অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থা, ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি সমন্বিত ক্রীড়া প্রশাসন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা গেলে ক্রীড়া প্রশাসনে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।

প্রযুক্তি নিজে দুর্নীতি বন্ধ করতে পারে না, কিন্তু দুর্নীতিকে আড়াল করে রাখা কঠিন করে তোলে। তথ্য যখন সবার সামনে উন্মুক্ত হয়, তখন জবাবদিহিও আর এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

কানাডাপ্রবাসী প্রযুক্তিবিদ জিয়ার মতো প্রবাসী বাংলাদেশিরা যদি নিজেদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা দেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য কাজে লাগাতে চান, সেটিও হতে পারে নতুন সম্ভাবনার দরজা। প্রবাসে অর্জিত জ্ঞান যদি দেশের মাঠে ফিরে আসে, তাহলে প্রযুক্তি শুধু যন্ত্র হয়ে থাকবে না,হয়ে উঠবে পরিবর্তনের হাতিয়ার।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম