|
ফলো করুন |
|
|---|---|
১৯২৯ সালে যাত্রা শুরু করা লা লিগা বিশ্বের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফুটবল লিগ। প্রায় এক শতাব্দীর পথচলায় স্পেনের এই শীর্ষ লিগ দেখেছে অসংখ্য কিংবদন্তির উত্থান, অবিশ্বাস্য গোল, আধিপত্য আর দলীয় সাফল্য।
তবে এই দীর্ঘ ইতিহাসে এমন কিছু রেকর্ড তৈরি হয়েছে, যেগুলোর উচ্চতা এতটাই বেশি যে আধুনিক ফুটবলে সেগুলো ভাঙা প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হয়। মেসি-রোনালদোর গোলের বন্যা, বার্সেলোনার ঐতিহাসিক মৌসুম কিংবা রিয়াল মাদ্রিদের দীর্ঘ জয়যাত্রা—লা লিগার ইতিহাসে এমন কিছু কীর্তি আছে, যা সময়ের সঙ্গে আরও কঠিন হয়ে উঠছে। দেখে নেওয়া যাক সেসব রেকর্ডের কয়েকটি—
লিওনেল মেসির ৪৭৪ গোল
লা লিগার ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা লিওনেল মেসি। বার্সেলোনার হয়ে ৫২০ ম্যাচে ৪৭৪ গোল করেছেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোও অনেক পেছনে, ৩১১ গোল তার।
একটি লিগে একজন খেলোয়াড়ের এত দীর্ঘ সময় ধরে এমন গোলের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা বর্তমান ফুটবলে অত্যন্ত কঠিন। নিয়মিত দলবদল, ভিন্ন লিগে খেলা এবং খেলোয়াড়দের ওপর বাড়তে থাকা শারীরিক চাপ বিবেচনায় মেসির এই রেকর্ড ভাঙতে একজন ফুটবলারকে বহু বছর ধরে অসাধারণ ধারাবাহিকতা দেখাতে হবে।
এক মৌসুমে মেসির ৫০ গোল
২০১১-১২ মৌসুমে লা লিগায় ৫০ গোল করেছিলেন মেসি। ৩৭ ম্যাচে এই গোলসংখ্যা তাকে এক মৌসুমে লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড এনে দেয়।
৫০ গোলের এই সীমা রীতিমত অবিশ্বাস্য। পুরো মৌসুমে এত গোল করতে হলে প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই গোল করার পাশাপাশি একাধিক ম্যাচে জোড়া বা তার বেশি গোল করতে হয়। তাই মেসির এই রেকর্ডও দীর্ঘদিন অক্ষত থাকার সম্ভাবনা প্রবল।
এক মৌসুমে বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদের ১০০ পয়েন্ট
২০১২-১৩ মৌসুমে তিতো ভিলানোভার বার্সেলোনা লা লিগায় ১০০ পয়েন্ট সংগ্রহ করে। ৩৮ ম্যাচে তারা জিতেছিল ৩২টি, ড্র করেছিল ৪টি এবং হেরেছিল মাত্র ২ ম্যাচ। সেই মৌসুমে বার্সা ১১৫ গোলও করেছিল। অন্যদিকে ২০১১-১২ মৌসুমে হোসে মরিনিওর রিয়াল মাদ্রিদ ১০০ পয়েন্ট স্পর্শ করে। ৩৮ ম্যাচে ৩২ জয়, ৪ ড্র এবং ২ হারের সঙ্গে এই মাইলফলক ছোঁয় তারা।
একটি পূর্ণ লিগ মৌসুমে ১০০ পয়েন্ট পেতে হলে ৩৮ ম্যাচের প্রায় পুরোটা সময়ই অসাধারণ ধারাবাহিক থাকতে হয়। কয়েকটি ম্যাচে পয়েন্ট হারালেই সেই লক্ষ্যে পৌঁছানো কঠিন। ফলে এই রেকর্ড ভাঙা ভবিষ্যতের দলগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
টানা ২১ ম্যাচে গোল—মেসির রেকর্ড
২০১২-১৩ মৌসুমে টানা ২১ ম্যাচে গোল করেছিলেন মেসি। এই ধারায় তিনি মোট ৩৩ গোল করেন।
একজন খেলোয়াড়ের জন্য টানা ২১ ম্যাচে গোল করা কতটা কঠিন, তা বোঝাই যায়। প্রতিপক্ষের কৌশল, চোট, নিষেধাজ্ঞা কিংবা অফ-ফর্ম—সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে এত দীর্ঘ সময় গোল করে যাওয়া প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি।
এক ক্যালেন্ডার বছরে মেসির ৯১ গোল
২০১২ সালে মেসি ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ৯১ গোল করেছিলেন। একটি ক্যালেন্ডার বছরে এত গোল করার কীর্তি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর ব্যক্তিগত রেকর্ড।
যদিও এটি শুধু লা লিগার রেকর্ড নয়, সেই সময়ের লা লিগা পারফরম্যান্সই তার এই অবিশ্বাস্য গোলযাত্রার বড় ভিত্তি ছিল। আধুনিক ফুটবলে ম্যাচের চাপ ও খেলোয়াড়দের রোটেশন বিবেচনায় এমন সংখ্যা আবার দেখা অত্যন্ত কঠিন।
এক লা লিগা মৌসুমে ১১৫ গোল বার্সেলোনার
১০০ পয়েন্টের পাশাপাশি ২০১২-১৩ মৌসুমে বার্সেলোনা ১১৫ গোল করেছিল। অর্থাৎ ৩৮ ম্যাচে গড়ে তিনটিরও বেশি গোল করেছিল কাতালান ক্লাবটি।
একটি পুরো লিগ মৌসুমে এত বেশি গোল করার জন্য শুধু দুর্দান্ত আক্রমণভাগ নয়, পুরো দলকে প্রায় প্রতিটি ম্যাচে একই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হয়। তাই এই রেকর্ডও ভবিষ্যতের দলগুলোর জন্য কঠিন পরীক্ষাই হয়ে থাকবে।
রোনালদো ও মেসির যুগের অবিশ্বাস্য গোল-ধারাবাহিকতা
লা লিগার ইতিহাসে মেসি ও রোনালদোর সময়কে আলাদা করে রাখার অন্যতম কারণ ছিল তাদের অবিশ্বাস্য গোলের ধারাবাহিকতা। একসময় লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় দুজনের আধিপত্য এতটাই ছিল যে অন্যদের জন্য সেই ব্যবধান কমানোই কঠিন হয়ে পড়েছিল।
বিশেষ করে মেসির ৪৭৪ গোলের রেকর্ড দেখিয়ে দেয়, একটি নির্দিষ্ট লিগে দীর্ঘ সময় ধরে একই মানের পারফরম্যান্স ধরে রাখা কতটা বিরল।
এল ক্লাসিকোর সবচেয়ে বড় জয়—রিয়াল মাদ্রিদের ৮-২
লা লিগার সবচেয়ে আলোচিত দ্বৈরথ এল ক্লাসিকোতেও রয়েছে এমন একটি রেকর্ড, যা দীর্ঘদিন ধরে অক্ষত। ১৯৩৪-৩৫ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদ বার্সেলোনাকে ৮-২ গোলে হারিয়েছিল। লা লিগার ইতিহাসে এটিই এল ক্লাসিকোর সবচেয়ে বড় জয়।
মেসি-রোনালদো যুগেও দুই দলের মধ্যে বহু গোলের ম্যাচ হয়েছে, কিন্তু এই ব্যবধান আর দেখা যায়নি। দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা যতটা তীব্র, এমন বড় ব্যবধানে জয় পাওয়া ততটাই কঠিন।
লা লিগার ইতিহাসে রেকর্ডের সংখ্যা অসংখ্য। তবে মেসির ৪৭৪ গোল, এক মৌসুমে ৫০ গোল, বার্সা-রিয়ালের ১০০ পয়েন্ট কিংবা ১১৫ গোলের মতো কীর্তিগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়—এগুলো ফুটবলের এমন কিছু উচ্চতা, যেগুলো পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে পারে।

