Logo
Logo
×
   

খেলা

হারানো মাঠের খোঁজে বাংলাদেশ, বদলে যাচ্ছে ক্রীড়ার মানচিত্র

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৩:২৮ পিএম

হারানো মাঠের খোঁজে বাংলাদেশ, বদলে যাচ্ছে ক্রীড়ার মানচিত্র

ছবি: সংগৃহীত

ক্রীড়া বিপ্লবের শুরু হচ্ছে গ্রামের ধুলোমাখা মাঠে। বিকালের শেষ আলোয় খালি পায়ে ছুটে চলা এক শিশুর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের কোনো ফুটবলার, ক্রিকেটার কিংবা অলিম্পিয়ান। সেই হারিয়ে যাওয়া মাঠ ফিরিয়ে আনতেই এবার বড় অবকাঠামোগত পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। ইউনিয়ন থেকে উপজেলা, জেলা থেকে বিভাগ—পুরো দেশজুড়ে গড়ে উঠছে ক্রীড়ার এক নতুন মানচিত্র। 

পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু গ্রামবাংলা। বর্তমানে দেশে ৪ হাজার ৫৭৮টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, প্রতিটি ইউনিয়নে অন্তত ৮ বিঘা জমির ওপর একটি আধুনিক উন্মুক্ত খেলার মাঠ গড়ে তোলা। যেখানে ৮ বিঘা জমি পাওয়া যাবে না, সেখানে অন্তত ৪ বিঘা জমিতে মাঠ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। উদ্দেশ্য একটাই—কোনো শিশুই যেন খেলার জায়গার অভাবে তার শৈশব হারিয়ে না ফেলে।

দ্রুত নগরায়ণ, প্রযুক্তিনির্ভর জীবন এবং একের পর এক উন্মুক্ত মাঠ হারিয়ে যাওয়ার বাস্তবতায় শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। সেই বাস্তবতা বদলাতেই প্রতিটি ইউনিয়নে মাঠ তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি ইতোমধ্যে মাঠ চিহ্নিতকরণের কাজ শুরু করেছে। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদেরও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। 

তবে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের স্বপ্নটা শুধু মাঠ তৈরিতে থেমে নেই। তার কথায়, ‘আমরা শুধু মাঠ বানাতে চাই না, মাঠের সঙ্গে একটি প্রজন্মের স্বপ্নকে জুড়ে দিতে চাই। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে খেলার মাঠ থাকবে। পাশাপাশি সারা দেশে ১০টি আন্তর্জাতিক মানের স্পোর্টস ভিলেজ গড়ে তোলা হবে। আমাদের লক্ষ্য রাজধানীকেন্দ্রিক ক্রীড়া ব্যবস্থাকে গ্রাম পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া। গ্রামের যে শিশুটি আজ ধুলোমাখা মাঠে খেলে, সুযোগ পেলে সেই শিশুই একদিন বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়াবে।’ 

সরকার একই সঙ্গে দেশের ১০টি জেলায় আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া কমপ্লেক্স বা স্পোর্টস ভিলেজ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে। প্রায় ৭ একর জায়গাজুড়ে নির্মিত এসব কমপ্লেক্সে থাকবে আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম, ইনডোর এরিনা, সাঁতার, শুটিং, আর্চারি, জিমনেশিয়াম এবং বিভিন্ন আউটডোর খেলার সুযোগ। লক্ষ্য, রাজধানীকেন্দ্রিক ক্রীড়া সংস্কৃতির বাইরে জেলা পর্যায়েই বিশ্বমানের প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা।

অন্যদিকে উপজেলা পর্যায়েও চলছে বড় পরিবর্তন। শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পের প্রথম ধাপে ১২৫টি উপজেলায় নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে আরও ২০১টি উপজেলায় মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের কাজ চলছে। তৃতীয় ধাপে বাকি উপজেলাগুলোকেও এই প্রকল্পের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব স্টেডিয়াম শুধু জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠান কিংবা আনুষ্ঠানিকতার জায়গা হয়ে থাকবে না—স্থানীয় ক্রীড়াবিদদের নিয়মিত অনুশীলন, বয়সভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং প্রতিভা বিকাশের কেন্দ্র হিসেবেই ব্যবহার করার কথা।

দেশের প্রতিটি জেলা ও বিভাগীয় শহরে ইতোমধ্যে স্টেডিয়াম রয়েছে। এবার সেই অবকাঠামোকে ইউনিয়ন পর্যন্ত সম্প্রসারণ করে একটি ধারাবাহিক ক্রীড়া উন্নয়ন কাঠামো গড়ে তুলতে চায় সরকার। সেই কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’। সারা দেশ থেকে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সি প্রতিভাবান কিশোর-কিশোরীদের খুঁজে এনে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের আওতায় আনার উদ্যোগ।

বাংলাদেশে প্রতিভার কখনো অভাব ছিল না। অভাব ছিল মাঠের, পরিকল্পনার, ধারাবাহিক পরিচর্যার। কোনো এক প্রত্যন্ত গ্রামের কিশোর হয়তো অসম্ভব দ্রুত দৌড়ায়, কোনো কিশোরীর চোখ তীরের নিশানায় অদ্ভুত স্থির। কিন্তু তাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ ছিল না। শহরে যাওয়ার সামর্থ্য ছিল না। ভালো কোচ ছিল না। আন্তর্জাতিক মানের সরঞ্জাম ছিল না। 

এবার সেই গল্পটাই বদলাতে চায় সরকার।

ইউনিয়নের মাঠ, উপজেলা মিনি স্টেডিয়াম, জেলা স্টেডিয়াম এবং প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া কমপ্লেক্স—এই চার স্তরের অবকাঠামো যদি কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়, তার সঙ্গে যদি নিয়মিত কোচিং, প্রতিভা অন্বেষণ, পুষ্টি, চিকিৎসা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সুযোগ যুক্ত করা যায়, তবে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে সত্যিই নতুন যুগের সূচনা হতে পারে। 

একটি মাঠ মানে বিকালে বাড়ি ফেরার আগে আরও দশ মিনিট দৌড়ানোর সুযোগ। একটি মাঠ মানে বাবার চোখ এড়িয়ে খেলতে যাওয়া কোনো কিশোরের স্বপ্ন। একটি মাঠ মানে স্কুলের বেঞ্চে বসে থাকা কোনো মেয়ের প্রথমবারের মতো জার্সি পরার আনন্দ। একটি মাঠ মানে হয়তো ভবিষ্যতের কোনো জাতীয় দলের খেলোয়াড়ের প্রথম পদক্ষেপ। 

একসময় গ্রামের মাঠ থেকেই উঠে এসেছিলেন বাংলাদেশের অসংখ্য তারকা। সময়ের স্রোতে সেই মাঠ হারিয়েছে, কমেছে খেলাধুলার জায়গা। মোবাইল ফোন আর কম্পিউটারের পর্দা দখল করেছে শিশুর বিকাল। এখন আবার সেই মাঠ ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখছে দেশ।

সফল হলে হয়তো কোনো এক প্রত্যন্ত ইউনিয়নের চার কিংবা আট বিঘার সেই মাঠ থেকেই একদিন জন্ম নেবে বাংলাদেশের পরবর্তী অলিম্পিয়ান, এশিয়ান গেমস পদকজয়ী কিংবা বিশ্বমঞ্চে দেশের পতাকা উড়িয়ে দেওয়া কোনো নতুন নায়ক।

তখন এই মাঠগুলো শুধু ইট-পাথর, ঘাস আর সীমানারেখা হবে না। হয়ে উঠবে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় স্বপ্নের ঠিকানা। আর সেই স্বপ্নের শুরুটা হবে খুব সাধারণভাবে বিকালের নরম আলোয়, ধুলোমাখা মাঠে, খালি পায়ে ছুটতে থাকা কোনো এক শিশুকে দিয়ে। 

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .