Logo
Logo
×
   

Advertisement

খেলা

একটি স্বর্ণ, কুড়িটি মুখ, ষোলো বছরের গল্প

২০১০ এসএ গেমসের সেই সোনালি ফুটবল দল আজ কে কোথায়

Advertisement

Icon

মোজাম্মেল হক চঞ্চল

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:০৭ পিএম

২০১০ এসএ গেমসের সেই সোনালি ফুটবল দল আজ কে কোথায়

Advertisement

বন্ধু, কি খবর বল! কত দিন পর দেখা হলো। কথাটা হয়তো খুব সাধারণ। কিন্তু ষোলো বছর পর যখন একই ড্রেসিংরুমের বন্ধুরা আবার মুখোমুখি হন, তখন এই একটি বাক্যই খুলে দেয় স্মৃতির পুরোনো দরজা। চোখের সামনে ফিরে আসে সেই মাঠ, সেই জার্সি, সেই উল্লাস, সেই সোনার পদক।

একদিন তাঁরা ছিলেন একই স্বপ্নের মানুষ। একই ড্রেসিংরুম, একই জার্সি, একই পতাকা। মাঠে একজন গোল ঠেকিয়েছেন, কেউ ডিফেন্স সামলেছেন, কেউ মিডফিল্ডে খেলার সুতো বুনেছেন, কেউ ছুটেছেন গোলের সন্ধানে। শেষ পর্যন্ত সবাই মিলে বাংলাদেশকে তুলে দিয়েছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের সর্বোচ্চ আসনে।

দিনটি ছিল ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১০। ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে ফাইনাল। সামনে আফগানিস্তান। ৯০ মিনিট শেষে স্কোরবোর্ডে একপেশে ছবি। বাংলাদেশ ৪, আফগানিস্তান ০।

তার আগে গ্রুপে নেপালকে ৩-০, ভুটানকে ৪-০, মালদ্বীপকে ১-০ গোলে হারানো। সেমিফাইনালে ভারতকে ১-০। পাঁচ ম্যাচে পাঁচ জয়। প্রতিপক্ষের জালে ১৩ গোল, নিজেদের জালে একটিও নয়। বাংলাদেশের ফুটবলের ইতিহাসে এমন একটি টুর্নামেন্ট আজও আলাদা করে মনে রাখার মতো।

সেই দলের অধিনায়ক ছিলেন আমিনুল হক। সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে গেছে। বদলেছে মানুষের পরিচয়, বদলেছে জীবনযাপন, বদলেছে মাঠের ঠিকানা। কেউ ফুটবল ছেড়েছেন, কেউ জাতীয় দলের জার্সিতে দীর্ঘ পথ হেঁটেছেন, কেউ কোচ হয়েছেন, কেউ উঠে এসেছেন ক্রীড়া প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়। কেউ আবার হারিয়ে গেছেন ফুটবলের নিয়মিত আলো থেকে।

ষোলো বছর পর সেই সোনালি দিনের মানুষগুলোকে এক জায়গায় করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক নিজেই। তাঁর আমন্ত্রণে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে হাজির হয়েছিলেন দলের ১৬ সদস্য। কেউ এসেছেন দূর থেকে, কেউ ব্যস্ততা সরিয়ে। ইউসুফ ও কোমল ছিলেন বিদেশে। ওয়ালী ফয়সাল ও মিঠুন আসতে পারেননি। যারা এসেছিলেন, তাঁদের মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্তটি সময়কে উল্টো দিকে হাঁটিয়ে দিল।

কেউ হাসলেন, কেউ পুরোনো গল্পে ফিরে গেলেন। কারও চোখে ফুটে উঠল সেই দিনের মাঠ। কারও কথায় ফিরে এল দর্দেভিচের অনুশীলন, কারও স্মৃতিতে ফাইনালের চার গোল। ষোলো বছর আগের তরুণ ফুটবলাররা এক মুহূর্তে ফিরে গেলেন তাঁদের যৌবনের সেই দিনটিতে।

স্মৃতিটাকে আরও স্থায়ী করে রাখতে প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া হলো সম্মাননা স্মারক। দেওয়া হলো টি শার্ট। আর সবচেয়ে আবেগের উপহার, চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরের সেই ঐতিহাসিক ছবি বাঁধাই করে তুলে দেওয়া হলো তাঁদের হাতে।

একটি ছবি। তার ভেতরে একটি প্রজন্মের গল্প। সেদিনের গোলপোস্টের নিচে দাঁড়ানো আমিনুল হক আজ ক্রীড়া প্রশাসনের বড় দায়িত্বে। একসময় যিনি বাংলাদেশের গোলপোস্ট পাহারা দিয়েছেন, এখন তাঁর দায়িত্ব দেশের ক্রীড়াঙ্গনের নীতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কাজ করা।

জাহেদ পারভেজও বদলে গেছেন। মাঠের মিডফিল্ড ছেড়ে এখন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পরিচালক (ক্রীড়া)হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

আতিকুর রহমান মিশুর গল্পটাও আলাদা। একদিন নিজে তরুণ ফুটবলার হিসেবে সোনা জিতেছেন। এখন তরুণদের শেখান কীভাবে সেই স্বপ্নের দিকে ছুটতে হয়।

মামুনুল ইসলাম হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় দলের অন্যতম পরিচিত মিডফিল্ডার ও অধিনায়ক। এমিলি ছিলেন গোলের মানুষ। সবুজের ভারতের বিপক্ষে সেমিফাইনালের জয়সূচক গোলটি এখনও আলাদা করে মনে রাখেন বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা। নাসিরুল, মিন্টু, রেজাউল, ওয়ালীসহ বাকিরাও ছিলেন সেই অপ্রতিরোধ্য দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ষোলো বছর পর তাই প্রশ্নটা শুধু কে কোথায়, তা নয়। প্রশ্নটা আরও গভীর। আমরা কি সেই দলটাকে যথেষ্ট মনে রেখেছি?

২০১০ সালে এসএ গেমসের সোনা বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন স্বপ্ন জাগিয়েছিল। মনে হয়েছিল, এবার হয়তো সামনে আরও বড় দিন আসছে। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথটা শেষ পর্যন্ত মসৃণ হয়নি। একসময় যারা দেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎ বলে বিবেচিত ছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখন ফুটবলের আলো থেকে অনেক দূরে।

তবু ইতিহাসের কিছু দিন কখনও দূরে সরে যায় না। ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১০ তেমনই একটি দিন। একটি স্বর্ণ। কুড়িটি মুখ। ষোলো বছরের গল্প। সেই গল্পের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটি হয়তো এটাই।অনেক বছর পর বন্ধুরা আবার পাশাপাশি বসেছেন। হাতে সেই পুরোনো ছবির স্মৃতি। গায়ে নতুন টি শার্ট। সামনে সম্মাননা স্মারক। কেউ হয়তো মনে মনে বলছেন, বন্ধু, কি খবর বল! কত দিন পর দেখা হলো। সময় তাঁদের বয়স বাড়িয়েছে। চুলে পাক ধরেছে। মাঠের গতি কমেছে। কারও হাতে এখন বাঁশি, কারও হাতে ফাইল, কারও হাতে কলম। কেউ দেশের বাইরে, কেউ দেশের ফুটবলের ভেতরে, কেউ একেবারেই অন্য জীবনে।

একটি জায়গায় তাঁরা এখনও একই রকম।

২০১০-এর সেই সোনার দলের সদস্য।

বাংলাদেশের ফুটবলের ইতিহাসে কিছু নাম সময়ের সঙ্গে মুছে যায় না। কিছু ছবি পুরোনো হয় না। কিছু জয়কে নতুন করে উদযাপন করতে হয় না, শুধু মনে করিয়ে দিতে হয়।

ষোলো বছর পর সেই ছবিটাই যেন বলছে তোমরা একদিন পেরেছিলে। বাংলাদেশ একদিন পেরেছিল। সেই সোনার দিনটি এখনও আছে। শুধু মাঠের সবুজ থেকে উঠে এসে এখন জায়গা করে নিয়েছে স্মৃতির অ্যালবামে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম