আবাহনী মাঠ ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের হাতে
সালামি নিয়ে দুই পক্ষের দুই দাবি
Advertisement
ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৭ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ধানমন্ডির ব্যস্ত শহরজীবনের মাঝখানে দুটো মাঠ। চারপাশে উঁচু দালান, ছুটে চলা গাড়ি, মানুষের ব্যস্ততার মধ্যে একটু সবুজ, একটু খোলা আকাশ। বহুদিন ধরে মাঠ দুটিই ছিল নগরের ক্রীড়াপ্রেমীদের স্বস্তির জায়গা।
একটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আবাহনীর দীর্ঘ ইতিহাস, অন্যটি পরিচিত ধানমন্ডি মাঠ নামে। এবার সেই দুই মাঠের গল্পে যোগ হলো নতুন অধ্যায়। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা দুই মাঠের সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হলো যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে।
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। অনুষ্ঠানে ছিলেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের এবং যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক।
ধানমন্ডির ৮ ও ৯ নম্বর সড়কের মাঝামাঝি ১০ দশমিক ৬৫ একর জায়গাজুড়ে যে মাঠটি এতদিন মানুষের কাছে ‘আবাহনী মাঠ’ নামে পরিচিত। যদিও সরকারি খাতায় তার নাম ‘ধানমন্ডি ক্রিকেট মাঠ’। ১৯৯৬ সালে আবাহনী ৯ দশমিক ৭৬ একর জমি ৯৯ বছরের জন্য ইজারা চেয়ে আবেদন করেছিল।
১৯৯৮ সালে মাঠের সিংহভাগ এবং ২০১০ সালে অবশিষ্ট ০ দশমিক ৮৯ একর—দুই ধাপে পুরো ১০ দশমিক ৬৫ একর জমি ৯৯ বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়। ১৯৭২ সালে ক্লাব প্রতিষ্ঠার পর থেকেই মাঠটি আবাহনীর অনুশীলন ও ক্রীড়া কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। সেই সূত্রেই সরকারি নথির মাঠটি একসময় মানুষের মুখে হয়ে ওঠে ‘আবাহনী মাঠ’।
একটি মাঠের ইতিহাস শুধু ইজারার কাগজে লেখা থাকে না। ঘাসের ওপর পড়ে থাকা পায়ের ছাপেও তার গল্প থাকে। ষাটের দশকে যেখানে ছিল ইটভাটা, সময়ের সঙ্গে সেই জায়গাই হয়ে ওঠে খেলার মাঠ। আবাহনী প্রতিষ্ঠার পর সেখানে যোগ হয় অনুশীলনের ব্যস্ততা, খেলোয়াড়দের ঘাম, ফুটবল-ক্রিকেটের শব্দ। স্পোর্টস কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ক্লাব অফিস, সুইমিংপুল, জিমনেশিয়ামসহ বিভিন্ন ক্রীড়া অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনাও ছিল সেখানে।
মাঠ ছাড়ার গল্পে শুধু সরকারের বক্তব্য নেই, আছে আবাহনীরও ব্যাখ্যা। আর সেখানেই সামনে এসেছে সালামি পরিশোধের হিসাব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব ওবায়দুর রহমানের কথা, ‘আবাহনী ২০২৩ সালের পর ইজারার সালামি পরিশোধ করেনি। ইজারার শর্ত ভঙ্গ, বকেয়া সালামি, অনুমোদন ছাড়া স্থাপনা নির্মাণ এবং বাণিজ্যিক ব্যবহারের উদ্যোগের কারণেই ইজারা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে’।
আবাহনী অবশ্য এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নয়। গত ৭ জুন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে ক্লাবটি তাদের অবস্থানের পক্ষে হিসাব ও কাগজপত্র হাজির করেছে। চিঠিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ২০২৪ সাল পর্যন্ত সালামির টাকা নিয়মিত পরিশোধ করেছে আবাহনী। গণপূর্ত সচিবের ‘২০২৩ সালের পর সালামি দেওয়া হয়নি’ বক্তব্যের বিপরীতে আবাহনী ২০২৪ সালের সালামি পরিশোধের প্রমাণ মন্ত্রণালয়ের সামনে উপস্থাপন করেছে। চিঠিতে ২০২৫ সালের সালামির বিষয়েও নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে আবাহনী।
ক্লাবের বক্তব্য, ২০২৫ সালের সালামি বিলম্বে পরিশোধের নিয়ম অনুযায়ী ১ দশমিক ৫ শতাংশ সুদসহ দিতে তারা প্রস্তুত। ২০২৬ সালের সালামিও নির্ধারিত সময় ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে পরিশোধ করার কথা জানিয়েছে। একই চিঠিতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছে ক্লাবটি।
মাঠের ইজারা বাতিলের নেপথ্যে সালামির হিসাবটি এখন আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। মন্ত্রনালয়ের বক্তব্যে যেখানে ২০২৩ সালের পর অর্থ পরিশোধ না করার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে আবাহনীর হাতে থাকা নথিতে ২০২৪ সালের সালামি পরিশোধের দাবি ও তার প্রমাণ রয়েছে।
মাঠের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের । তাঁর কথা,’পুর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে আরও অনেক মাঠ রয়েছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় মাঠগুলো ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে। বহুমুখী ক্রীড়া কমপ্লেক্স হলে শিশু-কিশোররা একই জায়গায় নানা ধরনের খেলাধুলার সুযোগ পাবে। ‘
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হকের পরিকল্পনায় মাঠটিতে ফুটবল, ফুটসাল, প্যাডেল, শুটিং, আর্চারি এবং পাঁচ-এ-সাইড হকির মতো খেলার সুযোগ তৈরির কথা রয়েছে। তাঁর বক্তব্য, মাঠ কোনো নির্দিষ্ট ক্লাব বা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিশু, তরুণ, নারী ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষও এখানে খেলতে পারবেন। বিদ্যমান অবকাঠামো ভেঙে ফেলার পরিবর্তে সেগুলো রেখেই সংস্কার ও ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও তিনি জানিয়েছেন। আবাহনীর বর্তমান ম্যানেজমেন্টকে মাঠের দায়িত্ব দেবার কথাও জোর দিয়ে বলেছেন আমিনুল হক।
তবে নতুন ব্যবস্থাপনায় মাঠটি ঠিক কীভাবে পরিচালিত হবে, ব্যবহারকারীদের জন্য নিয়ম কী হবে বা কোনো ফি থাকবে কি না এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। আবাহনী ও ধানমন্ডি ক্লাবের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করেই পরবর্তী ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন পরিকল্পনা ঠিক করার কথা জানিয়েছে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়।
একসময় ইটভাটার ধুলোয় ঢাকা জায়গাটি পেয়েছিল সবুজ ঘাসের শরীর। তারপর সেই সবুজে গড়ে উঠেছিল আবাহনীর দীর্ঘ ক্রীড়া-স্মৃতি। এবার সেই স্মৃতির ওপর বসছে সরকারি ব্যবস্থাপনার নতুন ছাপ। নাম বদলেছে, দায়িত্ব বদলেছে, বদলেছে ব্যবহারের পরিসর। মাঠের গল্প কিন্তু থামছে না।ধানমন্ডির এই সবুজ প্রান্তর এবার নতুন প্রজন্মের পায়ের শব্দের অপেক্ষায়।
