পদক চাই, নাকি তৈরি করতে চাই পদকের কারিগর?
Advertisement
মোজাম্মেল হক চঞ্চল
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:২২ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা শেষ হলেই দৃশ্যটা প্রায় একই। ফলাফলের খাতা খোলে, পদকের হিসাব মেলে। কোথাও হতাশা, কোথাও ক্ষোভ। কেন পদক এল না? কেন সময়ের উন্নতি হলো না? এত টাকা খরচ করেও ফল নেই কেন? কয়েক দিন পর সেই আলোচনা স্তিমিত হয়ে যায়। সামনে আসে নতুন প্রতিযোগিতা, আবার শুরু হয় একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি।
কিন্তু প্রশ্নটা কি অন্যভাবে করা যায় না? আমরা কি শুধু পদক চাই, নাকি পদকের কারিগরও তৈরি করতে চাই?
সাবেক তারকা ফুটবলার আবদুল গাফফার মনে করেন, সাফল্যের জন্য শুধু প্রতিযোগিতার আগে ক্যাম্প করলেই হবে না। তাঁর কথা, ‘খেলোয়াড় তৈরি হয় দীর্ঘ প্রক্রিয়ায়। আমরা যখন বড় কোনো প্রতিযোগিতা সামনে আসে, তখন নড়েচড়ে বসি। কিন্তু একজন খেলোয়াড়কে আন্তর্জাতিক মানে নিতে হলে ছোটবেলা থেকেই তাকে নিয়মিত অনুশীলন, প্রতিযোগিতা ও সঠিক পরিচর্যার মধ্যে রাখতে হবে।’
বিশ্বের ক্রীড়াঙ্গনে বড় সাফল্য হঠাৎ দরজায় এসে কড়া নাড়ে না। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, চীন, জাপান কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশ বছরের পর বছর পরিকল্পনা, অবকাঠামো, বিজ্ঞান, প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তার সমন্বয়ে ক্রীড়াবিদ তৈরি করেছে। সেখানে একটি প্রতিভাবান শিশু শুধু খেলতে নামে না, তাকে ধাপে ধাপে আন্তর্জাতিক মঞ্চের জন্য প্রস্তুত করা হয়।
একজন আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়াবিদ তৈরি হতে আট দশ বছর, অনেক ক্ষেত্রে তারও বেশি সময় লাগে। অথচ আমাদের বাস্তবতা হলো বড় আসরের কয়েক মাস আগে ক্যাম্প, তারপর পদকের প্রত্যাশা। দুই মাসের প্রস্তুতি দিয়ে বছরের পর বছর এগিয়ে থাকা প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে আমরা ফল চাই অবিশ্বাস্য দ্রুততায়।
সাবেক তারকা সাঁতারু নিবেদিতা দাস বলছেন, ‘সাঁতারের মতো খেলায় তো আরও আগে থেকে পরিকল্পনা প্রয়োজন। একজন সাঁতারুর সময় একদিনে তৈরি হয় না। প্রতিদিনের অনুশীলন, সঠিক টেকনিক, খাবার, বিশ্রাম, ফিটনেস সবকিছু মিলিয়েই কয়েক সেকেন্ডের উন্নতি আসে।’
হারলে ক্রীড়াবিদকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সহজ। কোচকে দায়ী করাও সহজ। কিন্তু মাঠের বাইরে থাকা পুরো ব্যবস্থাটির দিকে আমরা কতবার তাকাই?
একজন আন্তর্জাতিক ক্রীড়াবিদের পাশে প্রয়োজন ফিজিওথেরাপিস্ট, স্পোর্টস সাইকোলজিস্ট, পুষ্টিবিদ, পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট। প্রয়োজন আধুনিক সরঞ্জাম, পর্যাপ্ত অনুশীলন, বিশ্রাম এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সময়। অথচ অনেক সময় দল প্রতিযোগিতার এক দুই দিন আগে বিদেশে পৌঁছে যায়। দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি, আবহাওয়ার পরিবর্তন, খাবারের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ধকল সামলে তখনই শুরু হয় আসল লড়াই।
মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের পরিচালক মোস্তাকুর রহমানের কথা, ‘আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় যাওয়াটা অবশ্যই দরকার। কিন্তু শুধু অংশ নেওয়ার জন্য অংশ নিলে হবে না। প্রতিটি সফর থেকে কী শিখলাম, কোথায় ঘাটতি ছিল, পরের প্রতিযোগিতার আগে কী পরিবর্তন করতে হবে সেই হিসাবও রাখতে হবে।’
অংশগ্রহণ তাই শেষ কথা নয়। অংশগ্রহণ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সাফল্য। পথটা হতে হবে এমনই।
বাংলাদেশে প্রতিভার অভাব নেই। ফুটবল, অ্যাথলেটিকস, আর্চারি, বক্সিং, শুটিং, কুস্তি, সাঁতারে ছড়িয়ে আছে সম্ভাবনার ছোট ছোট আলো। সমস্যা সেই আলোকে দীর্ঘদিন জ্বালিয়ে রাখার ব্যবস্থায়।
আধুনিক খেলাধুলা এখন আর শুধু মাঠের অনুশীলন নয়। একজন ক্রীড়াবিদ কী খাচ্ছেন, কতক্ষণ ঘুমাচ্ছেন, শরীরের কোন পেশিতে কতটা চাপ পড়ছে, মানসিক চাপ কীভাবে সামলাচ্ছেন সবই এখন পারফরম্যান্সের অংশ। বায়োমেকানিকস, স্পোর্টস নিউট্রিশন, ফিজিওথেরাপি, মনোবিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও পারফরম্যান্স ডেটা ছাড়া আন্তর্জাতিক ব্যবধান কমানো কঠিন।
তাই তৃণমূল থেকেই শুরু করতে হবে নতুন পথচলা। আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠান আলাদাভাবে প্রতিভা খুঁজবে, এমন ব্যবস্থার বদলে প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় প্রতিভা অন্বেষণ ব্যবস্থা। ‘নতুন কুঁড়ি’ উদ্যোগে দেশজুড়ে বিপুলসংখ্যক শিশু কিশোরের অংশগ্রহণ সেই সম্ভাবনার একটি উদাহরণ। সেখান থেকে বাছাই করা ৩০৬ প্রতিভাকে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সরকার ইউনিয়ন পর্যায়ে খেলার মাঠ, উপজেলা পর্যায়ে মিনি স্টেডিয়াম এবং পর্যায়ক্রমে জেলা পর্যায়ে স্পোর্টস ভিলেজ গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে। কিন্তু পরিকল্পনার সৌন্দর্য কাগজে নয়, তার বাস্তবায়নে। যোগ্য কোচ, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা, সরঞ্জাম ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি ছাড়া কোনো অবকাঠামোই শেষ পর্যন্ত ক্রীড়াবিদ তৈরি করতে পারবে না।
সাবেক তারকা ফুটবলার হাসানুজ্জামান বাবলু বলেন, ‘একজন প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের পেটে যদি প্রতিদিন সংসারের চিন্তা থাকে, মাথায় থাকে পড়াশোনার চাপ, চিকিৎসার সময় থাকে অর্থের সংকট, তাহলে তার দৌড় কতদূর যাবে?’
বাবলুর কথা, ‘পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে বেতন, ভাতা, চিকিৎসা সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তার কাঠামো তৈরি করা দরকার। একজন ক্রীড়াবিদকে অন্তত এতটুকু নিশ্চয়তা দিতে হবে, তুমি খেলো, তোমার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা ভাবছি।’
সাবেক হ্যান্ডবল তারকা কামরুন নাহার আজাদ স্বপ্না বলেন, ‘ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি বা গোষ্ঠীনির্ভর হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা টেকে না। দরকার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, পেশাদার ব্যবস্থাপনা এবং অর্থের কার্যকর ব্যবহার। পদক আসবে কি না, তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। কিন্তু পদক জয়ের মতো প্রস্তুতি আমরা নিচ্ছি কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরই খুঁজতে হবে।’
সাবেক হকি তারকা আরিফুল হক প্রিন্সের কথা, ‘আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে একটি দেশের পরিচয় শুধু পদকের সংখ্যায় লেখা হয় না। তার চেয়েও বড় পরিচয় একটি দেশ তার প্রতিভাবান শিশু থেকে কত বছর ধরে একজন আন্তর্জাতিক ক্রীড়াবিদ তৈরি করতে পারে।’
পথটা যদি ঠিক থাকে, পদক একদিন হয়তো আসবেই। কিন্তু পদকের কারিগর তৈরি না করে শুধু পদকের অপেক্ষায় থাকলে প্রতিটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা শেষে ফিরে আসবে সেই পুরোনো দৃশ্য। কয়েক দিনের হাহাকার, তারপর নীরবতা। আবার নতুন প্রতিযোগিতা। আবার নতুন স্বপ্ন। আবার একই প্রশ্ন।
