মাঠ থেকে জেলে, ফুটবলের সেই কালো সেপ্টেম্বর
Advertisement
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫১ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সবুজ মাঠের চৌহদ্দিতে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টা বিলিয়ে দেওয়া মানুষগুলো কি সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র করতে পারেন?
আজকের প্রজন্মের কাছে প্রশ্নটি অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। অথচ চার দশকেরও বেশি আগে, ১৯৮২ সালের ২১ সেপ্টেম্বরে, বাংলাদেশের ফুটবলের চার তারকা খেলোয়াড়কে ঠিক এমনই এক অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। হাতে হাতকড়া, কোমরে দড়ি। তারপর সামরিক আদালত। সাজা। কারাগার।
কাজী সালাউদ্দিন, আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নু, গোলাম রব্বানী হেলাল ও কাজী আনোয়ার সবুজ মাঠের পরিচিত চার মুখ হঠাৎই হয়ে গেলেন রাষ্ট্রের চোখে অভিযুক্ত। একটি ফুটবল ম্যাচের উত্তেজনা কীভাবে তাঁদের জীবনে এমন এক অন্ধকার দরজা খুলে দিয়েছিল, তার নামই পরে হয়ে যায় ‘ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর’।
সেপ্টেম্বর ১৯৮২। দেশে তখন সামরিক শাসন। জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণের কয়েক মাস মাত্র পেরিয়েছে। দেশের নানা প্রান্তে সামরিক আদালতে বিভিন্ন পেশার মানুষকে বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছিল। সেই সময়ও ঢাকার ফুটবল মাঠে ছিল মানুষের অন্যরকম আবেগ।
আবাহনী-মোহামেডান খেলা মানেই শহর দুই রঙে ভাগ হয়ে যেত। সেই আবেগেরই এক সন্ধ্যা। ঢাকা স্টেডিয়াম কানায় কানায় পূর্ণ। গ্যালারির বাইরে হাজারো মানুষ। কেউ রেডিও কানে ধরে, কেউ টেলিভিশনের সামনে। মাঠে আবাহনী-মোহামেডানের লিগের শেষ ম্যাচ। মোহামেডান এগিয়ে ১-০ গোলে।
এরমধ্যেই আবাহনীর অধিনায়ক কাজী আনোয়ারের একটি ক্রস বাঁক খেয়ে গোলমুখে ঢোকার মুহূর্তে সেটি ঠেকিয়ে দেন মোহামেডানের তরুণ গোলকিপার মোহাম্মদ মহসিন। আবাহনীর খেলোয়াড়দের দাবি, বল গোললাইন অতিক্রম করেছিল। কিন্তু রেফারি মুনীর হোসেন ও লাইন্সম্যান তাঁদের সিদ্ধান্তে অটল।
তারপর মাঠে উত্তেজনা।উত্তেজনা গ্যালারিতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে স্টেডিয়ামের বাইরেও। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। পল্টন-জিপিও, বায়তুল মোকাররম, বিজয়নগরসহ আশপাশের এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। ম্যাচ আর শেষ হয় না। লিগের নিয়ম অনুযায়ী মোহামেডানকে ২-০ গোলে জয়ী ঘোষণা করা হয়।
রাত যত গভীর হয়েছে, ঢাকার ফুটবল ততই ঢুকে পড়েছিল এক অচেনা অন্ধকারে। স্টেডিয়ামের পাশেই জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ভবনে তখন জাতীয় দলের ক্যাম্প। সামনে দিল্লি এশিয়ান গেমস। আবাহনী-মোহামেডানের অনেক খেলোয়াড়ই ছিলেন সেই ক্যাম্পে। ম্যাচ শেষে কেউ ক্যাম্পে ফিরেছেন, কেউ ক্লাবে, কেউ বাড়িতে। মাঠের ঘটনার পর কী আসছে, কেউ জানতেন না।
রাত গভীর হলে সেনাবাহিনী, বিডিআর ও পুলিশের যৌথ বাহিনী অভিযান চালায় জাতীয় দলের ক্যাম্প ও ধানমন্ডির আবাহনী ক্লাবে। কাজী সালাউদ্দিনকে গ্রেপ্তার করতে অভিযান যায় তাঁর গুলশানের বাসায়। গোলাম রব্বানী হেলালসহ কয়েকজনকে আবাহনী ক্লাব থেকে তুলে নেওয়া হয়। জাতীয় দলের ক্যাম্প থেকে আটক হন কাজী আনোয়ার ও আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নু।
পরদিন সকালে তাঁদের শাহবাগ পুলিশ কন্ট্রোল রুমে আনা হয়। হাতকড়া তখনও হাতে। কোমরে দড়ি। আবাহনীর দুই শ্রীলঙ্কান ফুটবলার অশোকা রবীন্দ্র ও পাকির আলিকেও আটক করা হয়েছিল।
শাহবাগ থেকে সালাউদ্দিন, আনোয়ার, হেলাল ও চুন্নুকে আলাদা করে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে।
তারপর সামরিক আদালত। রায়ও এল দ্রুত।
কাজী সালাউদ্দিন ও আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নুর তিন মাস করে কারাদণ্ড। গোলাম রব্বানী হেলালের ছয় মাস। কাজী আনোয়ারের এক বছর। পরে সালাউদ্দিন ও চুন্নুকে যশোর এবং হেলাল ও আনোয়ারকে রাজশাহী কারাগারে পাঠানো হয়েছিল।
অভিযোগ? সামরিক সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র! ফুটবলার গোলাম রব্বানী হেলালের স্মৃতিতে সেই অভিযোগ আজও অবিশ্বাস্য। তাঁরা তো ফুটবল নিয়েই থাকতেন। মাঠ, অনুশীলন, ম্যাচ এই ছিল তাঁদের পৃথিবী। রাষ্ট্রক্ষমতা উল্টে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করার সময়ই বা কোথায়? কারাগারের দিনগুলো ছিল আরও কঠিন। বাইরে থেকে হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করলেও ভেতরে তাঁরা ভেঙে পড়েছিলেন। জাতীয় দলের তারকা কাজী সালাউদ্দিনকে সাধারণ বন্দিদের সঙ্গে থাকতে হয়েছিল। এমন জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন না আনোয়ার, চুন্নু কিংবা হেলালও।
আর তখনই শুরু হয় তাঁদের মুক্তির জন্য দৌড়ঝাঁপ। চার ফুটবলারকে জেলে নেওয়ার পর দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নিন্দার ঝড় ওঠে। তাঁদের মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন মহল থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়। আবাহনী পরিবারের ভেতর থেকেও তাঁদের মুক্তির জন্য চেষ্টা চলতে থাকে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন আবাহনীর সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ, ক্লাব কর্মকর্তা শাহ আলম চৌধুরী, মোহামেডান সাবেক তারকা ফুটবলার প্রয়াত বাদল রায়, আব্দুল গাফফার,ব্যাডমিন্টন তারকা কামরুন নাহার ডানা, বিওএর প্রয়াত মহাসচিব জাফর ইমামসহ অনেকেই।
একটি অদ্ভুত সময় ছিল সেটি। মাঠের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনী-মোহামেডানের বিভাজন তখন অন্য অর্থ হারিয়েছিল। চারজনই ছিলেন বাংলাদেশের ফুটবলের সন্তান। তাঁদের মুক্তির দাবিতে ক্রীড়াঙ্গনের মানুষ এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন। চার ফুটবলারকে কারাগারে পাঠানোর পর সমর্থকদের ক্ষোভ ও বিভিন্ন মহলের প্রতিবাদের বিষয়টিও পরবর্তী বর্ণনাগুলোতে উঠে এসেছে।
দিন গড়ায়। এক দিন, দুই দিন, দশ দিন.. কারাগারের দেয়ালের ওপারে চার ফুটবলারের অপেক্ষা। বাইরে তাঁদের মুক্তির চেষ্টা। শেষ পর্যন্ত ১৭ দিনের মাথায় আসে মুক্তির খবর। প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল এরশাদের নির্দেশে চার ফুটবলার মুক্তি পান।
স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে যাঁদের জন্য হাজার মানুষ চিৎকার করত, তাঁরা দেখলেন কারাগারের লোহার দরজা। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে যাঁরা দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, তাঁদের হাতেই পরানো হলো হাতকড়া। মাঠের একটি গোলের সিদ্ধান্ত থেকে শুরু হওয়া উত্তেজনা শেষ হলো রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে কারাবাসে।
পরে আবাহনী-মোহামেডানের মাঠে আরও বহুবার উত্তেজনা হয়েছে। সংঘর্ষ হয়েছে। এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু ১৯৮২ সালের মতো করে জাতীয় দলের চার তারকা ফুটবলারকে হাতকড়া পরিয়ে কারাগারে পাঠানোর ঘটনা আর ফিরে আসেনি।
ঢাকার সেই পুরোনো স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাস, গ্যালারির গর্জন, কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়া, রাতের অন্ধকারে সামরিক গাড়ির শব্দ, কোমরে বাঁধা দড়ি, কারাগারের দরজা সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ফুটবলের ইতিহাসে সেপ্টেম্বর ১৯৮২ যেন এক দীর্ঘ কালো ছায়া।
আর সেই ছায়ার নাম ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর।

