|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সাংবাদিকতায় প্রচলিত একটি শব্দ হলো- ‘অব দ্য রেকর্ড’। এই অব দ্য রেকর্ডে আপনি অনেক কিছু শুনবেন, অনেক তথ্য জানবেন; কিন্তু কিছুই লিখতে পারবেন না! আহ কী আফসোস, তাই না! যারা লিখতে ভালোবাসেন তারা এই আফসোসটা সত্যিই ফিল করবেন। অন্যরা এর মর্মও বুঝবেন না!
বিষয়টা হলো এমন-বস আপনার ওপর কোনো বিষয়ে খুব বিরক্ত হয়ে চরম লেভেলের বকাঝকা করল। আপনি প্রতিবাদ করলে চাকরিও হারাতে পারেন। সেজন্য অনেক কিছু বলার থাকলেও বলতে পারেন না। চেপে যেতে হয়। এমনই একটা ইস্যুতে এক গুণী সাংবাদিকের পরামর্শ- ‘‘মাইন্ড কইরো না, মাইন্ডে রেখো।’’ তার মানে আপনি কারো মাধ্যমে কষ্ট পেয়েছেন- কিন্তু সেই কষ্টের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে মেজাজ দেখিয়ে লাভ নেই। মেজাজ দেখালে আখেরে আপনারই ক্ষতি হবে- চাকরিও যেতে পারে! তবে কষ্ট পাওয়া সেই বিষয়টি মনে রেখে দিলে ভবিষ্যতে কাজে দেবে হয়তো।
তো বলছিলাম- অব দ্য রেকর্ডের কথা। ২০১৫ সালে মোস্তাফিজুর রহমান জাতীয় দলে অভিষেকের পর দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেন। তার অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের সুবাদে বাংলাদেশ ঘরের মাঠে পরপর পাকিস্তান, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করে ওয়ানডে সিরিজে চরমভাবে হারায়। সেই সিরিজ জয়ের নায়ক ছিলেন মোস্তাফিজ। তার কার্টারের সুনাম দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। আর সেই পারফরম্যান্সের কারণেই ২০১৬ সালে প্রথম আইপিএলে সুযোগ পান মোস্তাফিজ।
মোস্তাফিজ আইপিএল খেলতে ভারতে যাওয়ার পর খুব সমস্যায় পড়েন। সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার তারালি ইউনিয়নের তেঁতুলিয়ার অজোপাড়া গ্রাম থেকে উঠে আসা মোস্তাফিজ জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার পর সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে হ্যাঁ, হু, জি- বলে ছোট ছোট উত্তর দিয়ে প্রশ্নপর্ব থেকে মুক্তি পেতে চাইতেন। যেই মোস্তাফিজ (ক্যারিয়ারের শুরুতে) বাংলায় প্রশ্ন করলে ঠিকমতো উত্তর দিতে পারতেন না; সেই মোস্তাফিজের পক্ষে ভারতে গিয়ে বিশ্বসেরা তারকাদের ইংরেজিতে বলা কথাগুলো বুঝা তো দূরে থাক- ভারতের মাতৃভাষা হিন্দিও ঠিকমতো বুঝতেন না! যে কারণে মোস্তাফিজের জন্য বাধ্য হয়ে পরবর্তীতে দো-ভাষী হিসেবে তামিম ইকবালের বড় ভাই জাতীয় দলের সাবেক তারকা ওপেনার নাফিস ইকবালকেও নিতে হয় আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজিকে। সেটা অবশ্য অন্য ব্যাপার; কথা হলো- অব দ্য রেকর্ড নিয়ে।
মোস্তাফিজ আইপিএল খেলতে ভারতে যাওয়ার পর থেকেই ঢাকায় থাকা তৎকালীন বাংলাদেশ জাতীয় দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজার সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখেন। যে ‘অস্ত্রের’ কারণে মোস্তাফিজ আইপিএলে সুযোগ পান, সেই অস্ত্র ‘কাটার’ যাতে নেট প্র্যাকটিসের সময় মোস্তাফিজ না মারেন; সেই পরামর্শই তাকে বারবার দেন মাশরাফি।
বাংলাদেশ দলের এই কিংবদন্তি অধিনায়ক মোস্তাফিজকে বলেন- ‘তুই আইপিএলের ম্যাচে কার্টার দিবি, কিন্তু নেটে যখন বল করবি- তখন কার্টার মারবি না। তাহলে তুই সাকসেস হতে পারবি।’
আগের রাতে মোস্তাফিজকে দেওয়া সেই পরামর্শগুলোই পরদিন মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়াম একাডেমির মাঠে সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে বলছিলেন জাতীয় দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। সেই আলোচনায় সমকালের সিনিয়র সাংবাদিক সেকান্দার আলি ভাইসহ আমিও ছিলাম। আরও কয়েকজন ছিলেন- যাদের নাম এই মুহূর্তে মনে নেই।
আমি সেদিন মাঠ থেকে অফিসে ফিরে দৈনিক ইত্তেফাকের স্পোর্টস এডিটর তথা আমার বস- মোতাহের হোসেন মাসুম ভাইকে জানাই। আসলে মাঠে কী নিউজ পেলাম, নিউজ করার মতো কী কী তথ্য আছে- সব আমাকে বসকে জানাতে হতো। প্রতিদিনের রুটিনের মতো সেদিনও আমি মাঠের সব ঘটনা বসকে শেয়ার করলাম।
স্পোর্টস এডিটর মাসুম ভাই তখন আমাকে মোস্তাফিজকে দেওয়া মাশরাফির সেই পরামর্শ নিয়ে লিখতে বললেন। আমি তখন বসকে বুঝাতে চেষ্টা করেছিলাম- ভাই মাশরাফি তো এটা ‘অব দ্য রেকর্ড’ বলেছে; এটা নিয়ে লেখা কি ঠিক হবে? লিখলেও আমার সম্পর্কে মাশরাফি ভাই বিরূপ ধারণা করবেন। বস বললেন- লিখো কোনো সমস্যা হবে না।
বসের নির্দেশ মেনে মাশরাফির সেই ‘অব দ্য রেকর্ডের’ কথা নিয়ে আমাকে নিউজ করতেই হলো।
পরদিন আমি যখন মিরপুর শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে গেলাম; তখন মাশরাফি ভাই মাত্রই মিরপুর স্টেডিয়ামের সেন্টার উইকেট থেকে প্র্যাকটিস শেষে একাডেমির জিমে ফিরছিলেন। মাশরাফির সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে শেরেবাংলা থেকে একাডেমির দিকে যাচ্ছিলেন দৈনিক সমকালের সিনিয়র রিপোর্টার সেকান্দার আলি ভাইও। তখন সেকান্দার ভাই মাশরাফিকে বলেন- ভাই এই সেই মামুন, ও আপনার গতকালকের ‘অব দ্য রেকর্ডের’ কথা দিয়ে নিউজ করে দিয়েছে।
মাশরাফি ভাইয়ের তখন দীর্ঘ প্র্যাকটিস শেষে প্রচন্ড গরম আর রোদের মধ্যে ঘেমে অস্থির অবস্থা। সেই অবস্থায় ফিরছিলেন জিমে। শরীর ক্লান্ত থাকার পরও ওনার মেজাজ একটুও বিগড়ে যায়নি। আমাকে তেমন কিছুই বলেননি। বকাঝকাও করেননি। মৃদু হেসে সেদিন যা বলেছিলেন তার সারমর্ম হলো- মামুন ভাই, আপনারা আমাদের পরিবারের সদস্যের মতো। আপনাদের সঙ্গেই আমরা পরিবারের চেয়ে বেশি সময় কাটাই, কতো কথা বলি, সব কিছু নিয়ে নিউজ করলে হবে! এসব আর কইরেন না।
বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই অধিনায়কের জন্মদিন আজ। ১৯৮৩ সালের ৫ অক্টোবর নড়াইলে জন্ম মাশরাফি বিন মুর্তজার। ২০০১ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর থেকে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন ‘ম্যাশ’। বাংলাদেশ দলকে দীর্ঘ সময় ধরে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। তার নেতৃত্বে ২০১৫ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলে বাংলাদেশ।
মাশরাফির অধিনায়কত্বে বাংলাদেশ ওয়ানডে ক্রিকেটে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়। কঠিন পরিস্থিতিতে সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দেওয়া, সতীর্থদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানো, দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখায় মাশরাফি ছিলেন অনন্য।
বারবার ইনজুরি আর শারীরিক ধকলের কারণে ২০২০ সাল থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে দূরে মাশরাফি। ক্রিকেট ছাড়ার পরও মাশরাফির জনপ্রিয়তা কমেনি।

