এআই প্রযুক্তিতে স্তন ক্যানসার শনাক্তে গবেষকদের নতুন মাইলফলক
Advertisement
আইটি ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৬:০৫ পিএম
ছবি: জেমিনি এআই
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
স্তন ক্যানসারের টিউমারের অভ্যন্তরে থাকা অতি সূক্ষ্ম পরিবর্তন ও অস্বাভাবিকতার ধরন নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহারে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাউদাম্পটনের গবেষকেরা। সম্প্রতি নেচার কমিউনিকেশন্স জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যানসার কোষের ভেতরে থাকা ‘সেন্ট্রোসোম’ নামের অতি ক্ষুদ্র কাঠামোর অস্বাভাবিক প্যাটার্ন শনাক্তের মাধ্যমে ক্যানসারের আক্রমণাত্মক আচরণ এবং রোগীর চিকিৎসাগত ফলাফল আগাম পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব।
সেন্ট্রোসোম কী এবং ক্যানসারে এর প্রভাব
কোষ বিভাজনের সময় জিনগত উপাদান সঠিকভাবে বণ্টন করা এবং কোষের অভ্যন্তরীণ কাঠামো সংগঠিত রাখাই সেন্ট্রোসোমের মূল কাজ। সেন্ট্রোসোমে কোনো ধরনের ত্রুটি বা অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে কোষ বিভাজনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। এর ফলে যেসব জেনেটিক ত্রুটি তৈরি হয়, তা সরাসরি ক্যানসার বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত। যদিও ক্যানসারের সঙ্গে সেন্ট্রোসোমের অস্বাভাবিকতার যোগসূত্রটি গবেষকদের এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে জানা, তবে টিউমারের বিপুলসংখ্যক কোষে এই ক্ষুদ্র কাঠামোগুলোর পরিবর্তন একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা এতদিন অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ বিষয় ছিল।
এআই প্ল্যাটফর্ম ‘সেনসেগনেট’
পরিমাপের এই জটিল সীমাবদ্ধতা কাটাতে গবেষকেরা ‘সেনসেগনেট’ (সেন্ট্রোসোম সেগমেন্টেশন নেটওয়ার্ক) নামে একটি ওপেন-সোর্স এআই প্ল্যাটফর্ম উদ্ভাবন করেছেন। এই প্ল্যাটফর্মটি টিউমার নমুনার হাজার হাজার কোষ দ্রুত বিশ্লেষণ করে সেন্ট্রোসোমের সংখ্যা, আকার ও অবস্থানের অস্বাভাবিকতা নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে পারে।
ড. সালাহ এলিয়াস-এর পরিচালনায় এই গবেষণায় ইউনিভার্সিটি হসপিটাল সাউদাম্পটনে চিকিৎসা নেওয়া ১২৭ জন স্তন ক্যানসার রোগীর ৯১১টি টিউমার নমুনা পরীক্ষা করা হয়। যেখানে এআই প্রযুক্তির সাহায্যে মোট ৩ লাখ ৩০ হাজারের বেশি সেন্ট্রোসোম সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সেন্ট্রোসোমের দুটি নতুন অস্বাভাবিকতা
গবেষণায় সেন্ট্রোসোমের দুটি পৃথক ধরনের অস্বাভাবিকতা উন্মোচিত হয়েছে—
- সংখ্যাগত পরিবর্তন: ক্যানসার কোষে স্বাভাবিকের চেয়ে সেন্ট্রোসোমের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়।
- আকারগত পরিবর্তন: সেন্ট্রোসোমগুলো আয়তনে অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে যায়।
অতীতে এই দুটি পরিবর্তনকে একই প্রক্রিয়ার অংশ মনে করা হলেও এআই বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এগুলো সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ঘটে এবং একই টিউমারের ভিন্ন ভিন্ন অংশে আলাদাভাবে অবস্থান করতে পারে।
ক্যানসারের ঝুঁকি ও চিকিৎসাগত সম্ভাবনা
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব টিউমারে বড় আকারের সেন্ট্রোসোমের উপস্থিতি বেশি, সেগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি আক্রমণাত্মক হয়। উচ্চতর টিউমার গ্রেড, লিম্ফ নোডে ক্যানসারের বিস্তার এবং নির্দিষ্ট জেনেটিক পরিবর্তনের মতো ঝুঁকিগুলোর সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে, টিউমারের কেন্দ্রীয় অংশে বড় আকারের সেন্ট্রোসোমের সংখ্যা কম থাকলে রোগীদের দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকার সম্ভাবনা বেশি দেখা যায়।
ড. সালাহ এলিয়াস জানান, এই প্রযুক্তি সেন্ট্রোসোমের অস্বাভাবিকতাকে একক বৈশিষ্ট্য হিসেবে না দেখে এগুলোর ভিন্ন জৈবিক অবস্থা ও অবস্থান আলাদা করে বোঝার সুযোগ দিয়েছে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে নতুন বায়োমার্কার শনাক্তকরণ এবং রোগীর জন্য সম্পূর্ণ ব্যক্তিকেন্দ্রিক (Personalized) চিকিৎসা নির্ধারণের পথ সুগম হবে।
ভবিষ্যৎ ভাবনা ও বৈশ্বিক সুযোগ
‘সেনসেগনেট’ একটি ওপেন-সোর্স প্রযুক্তি হওয়ায় সারা বিশ্বের গবেষক ও প্যাথলজিস্টরা এটি ব্যবহার করতে পারবেন। এটি কেবল স্তন ক্যানসারেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং কিডনি, কোলন ও অ্যাপেন্ডিক্সের টিস্যুতেও সাফল্যজনকভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে।
যদিও ক্লিনিক্যাল বা নিয়মিত চিকিৎসায় প্রয়োগের জন্য সেনসেগনেট এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়, তবে ভবিষ্যতে সেন্ট্রোসোমের অস্বাভাবিকতার মানচিত্র ব্যবহার করে উচ্চঝুঁকির রোগী শনাক্ত করা এবং সুনির্দিষ্ট প্রোটিন লক্ষ্য করে ওষুধ বেছে নেওয়া সহজ হবে। গবেষকদের পরবর্তী লক্ষ্য হলো এই এআই বিশ্লেষণকে জিনোমিক, ট্রান্সক্রিপ্টোমিক ও প্রোটিওমিক তথ্যের সঙ্গে সমন্বয় করা, যাতে ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসায় এটি সর্বোচ্চ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
