Logo
Logo
×

Advertisement

বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি

তথ্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগে মেটাকে রেকর্ড জরিমানা

Advertisement

Icon

আইটি ডেস্ক

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৮ পিএম

তথ্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগে মেটাকে রেকর্ড জরিমানা

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাকে ২৫ বিলিয়ন ডলার জরিমানা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের একটি আদালত। ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করা এবং অঙ্গরাজ্যের আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এ রায় দেওয়া হয়েছে। মেটার বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত আরোপ করা জরিমানার মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত বুধবার (২১ অক্টোবর) দেওয়া এ রায় চলতি বছরের শুরুতে অনুষ্ঠিত দুই সপ্তাহের বিচার শেষে জুরি বোর্ডের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এসেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ফেসবুক ব্যবহারকারীদের তথ্য কীভাবে সংগ্রহ, ব্যবস্থাপনা ও ভাগাভাগি করা হয়, তা নিয়ে বছরের পর বছর ধরে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করেছে মেটা।

বিচারক ফ্রান্সিস ম্যাথিউ বলেন, মেটার মিথ্যাচার শুধু ব্যবহারকারীদের তথ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা প্রতিষ্ঠানটির মূল ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও জড়িত ছিল। ২০১০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১১ বছরেরও বেশি সময় ধরে এসব অনিয়ম ঘটেছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।

মেটার প্রধান আইনজীবী সি জে মাহোনি এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার ঘোষণা দিয়েছেন। তার দাবি, এ রায়ের কারণে নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। আপিলে মেটা জয়ী হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

মাহোনি অভিযোগ করেন, অনলাইনে মানুষ কী বলতে পারবে, সে বিষয়ে নতুন বিধিনিষেধ কার্যকর করার উদ্দেশ্যে এ মামলা করা হয়েছে। তার ভাষায়, এটি মূলত বক্তব্যের ওপর কর আরোপের একটি প্রচেষ্টা।

৪ কোটির বেশি আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ

নিউ মেক্সিকোর আইনজীবীরা আদালতে অভিযোগ করেন, ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে মেটা দীর্ঘদিন ধরে অসত্য বক্তব্য দিয়ে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহীরা বিভিন্ন সময়ে দাবি করেছিলেন, ব্যবহারকারীদের অনুমতি ছাড়া তাদের তথ্য তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে ভাগাভাগি করা হয় না এবং তৃতীয় পক্ষেরও এসব তথ্যে প্রবেশের সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবে এর বিপরীত ঘটেছে বলে দাবি করেন আইনজীবীরা।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মেটার তথ্য ব্যবস্থাপনার অসততার কারণে অঙ্গরাজ্যটির প্রায় ২০ লাখ বাসিন্দা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। জুরি বোর্ডের সিদ্ধান্তে দেখা যায়, মেটা অঙ্গরাজ্যের আইন ৪ কোটিরও বেশি বার লঙ্ঘন করেছে।

নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেজ বুধবার বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এমনভাবে ব্যবসা পরিচালনা করেছে, যেন তাদের আকার ও প্রভাব তাদের আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছে। এ রায়ের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠানই এতটা ক্ষমতাবান নয় যে তাকে জবাবদিহির বাইরে রাখা যাবে।

মেটার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ৪০ বিলিয়ন ডলার জরিমানা দাবি করেছিলেন অঙ্গরাজ্যটির আইনজীবীরা। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি জরিমানা আরোপ করা হলে তা হবে অসাংবিধানিক।

বিচারক ম্যাথিউ অবশ্য জরিমানার ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নেন। অঙ্গরাজ্যের আইন হাজার হাজার বার লঙ্ঘনের ভিত্তিতে মেটার বিরুদ্ধে জরিমানার অঙ্ক ২১৯ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তা কমিয়ে ২৫ বিলিয়ন ডলার করা হয়।

বিচারকের আদেশে বলা হয়, মেটার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে আদান-প্রদান করা বিভিন্ন নথি জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল। ব্যবহারকারীদের তথ্য কীভাবে ব্যবহার ও ভাগাভাগি করা হয়েছে, সে বিষয়ে আইন লঙ্ঘন এবং জনগণকে বিভ্রান্ত করার ঘটনাগুলো ইচ্ছাকৃত ছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।   

ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারি থেকে মামলার সূত্রপাত

নিউ মেক্সিকোর মামলাটির সূত্রপাত ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারি থেকে। ওই সময় মেটা ফেসবুক নামেই ব্যবসা পরিচালনা করত। রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা ফেসবুকের লাখ লাখ ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য কাজে লাগিয়েছিল। ২০১৬ সালের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরেও এসব তথ্য ব্যবহার করা হয়েছিল। ওই নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

নিউ মেক্সিকো কর্তৃপক্ষের অভিযোগ ছিল, বিদ্বেষমূলক বক্তব্যসংবলিত কনটেন্ট থেকে কীভাবে মেটা লাভবান হয় এবং এ ধরনের কনটেন্টের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটির নীতিমালা কীভাবে প্রয়োগ করা হয়, সে বিষয়েও জনসাধারণকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। জুরি বোর্ড এ অভিযোগেও মেটাকে দায়ী করেছে।

এর আগে ২০১৯ সালে ব্যবহারকারীদের তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষায় ব্যর্থতার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ট্রেড কমিশন (এফটিসি) মেটাকে ৫ বিলিয়ন ডলার জরিমানা করেছিল।

চলতি বছর শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগেও নিউ মেক্সিকোতে মেটার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলার বিচার হয়েছে। ওই মামলায় প্রতিষ্ঠানটিকে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সেই মামলার বিচারক শিশুদের মানসিক ক্ষতি ও যৌন শোষণের সঙ্গে মেটার কার্যক্রমের তুলনা করেছিলেন শিল্পকারখানার বায়ুদূষণের সঙ্গে। তাঁর ভাষায়, মেটার ক্ষেত্রে দূষণের ধরন হলো শিশুদের মানসিক ক্ষতি ও যৌন শোষণ।   

জরিমানার পাশাপাশি এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগ

মেটার বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের জরিমানার রায় এলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা থেকে সরে আসেনি প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে অবকাঠামো ও এআই-সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে তারা।

আর্থিক বিশ্লেষকদের সঙ্গে এক ফোনালাপে মেটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গ জানান, ভোক্তাদের জন্য তৈরি প্রতিষ্ঠানটির এআই টুল ‘মিউজ’ ইতিমধ্যে ১ কোটি মানুষ ব্যবহার করছেন। তার ভাষ্য, কোটি কোটি মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করে মিউজকে গড়ে তোলাই প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ও কৌশল।

এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে চলতি বছর মেটা অন্তত ১৩৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে। এর বড় অংশ ব্যয় হবে এআই-সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে। পরিস্থিতি অনুযায়ী মোট ব্যয়ের পরিমাণ ১৪৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

বিপুল বিনিয়োগের প্রভাবে প্রতিষ্ঠানটির নগদ অর্থপ্রবাহেও চাপ তৈরি হয়েছে। বিবিসির পর্যালোচনা করা মেটার আগের আর্থিক নথি অনুযায়ী, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার ১৪ বছরের মধ্যে এবারই প্রথম প্রতিষ্ঠানটির নগদ অর্থপ্রবাহ ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণাত্মক হয়েছে।

নগদ অর্থপ্রবাহ বলতে পরিচালন ব্যয় ও বিনিয়োগের অর্থ পরিশোধের পর একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে অবশিষ্ট থাকা অর্থকে বোঝায়। অর্থাৎ মেটার আয় বাড়লেও প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে।

তবে আয় ও মুনাফা—দুই ক্ষেত্রেই প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে মেটার আয় ২৬ শতাংশ বেড়ে ৬৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা প্রায় তিন গুণ বেড়ে ৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

অর্থায়নে নমনীয়তা বাড়ানোর উদ্যোগ

এআই খাতে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শেয়ার কাঠামোয় পরিবর্তনের ঘোষণাও দিয়েছে মেটা। আর্থিক বিশ্লেষকদের সঙ্গে ফোনালাপে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা সুসান লি নতুন এক শ্রেণির শেয়ার চালুর কথা জানান। এর আওতায় বর্তমান শেয়ারধারীরা ভোটাধিকারবিহীন নতুন শ্রেণির একটি করে শেয়ার পাবেন।

লি বলেন, নতুন শ্রেণির শেয়ার এখনই কোনো নির্দিষ্ট বিনিয়োগের জন্য বরাদ্দ করা হচ্ছে না। তবে এআই খাতে চলমান বিপুল ব্যয়ের প্রসঙ্গ তুলে তিনি ইঙ্গিত দেন, আগামী বছর প্রতিষ্ঠানটির অর্থায়নের ক্ষেত্রে আরও নমনীয়তার প্রয়োজন হতে পারে।

একদিকে ব্যবহারকারীদের তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে বড় অঙ্কের জরিমানা ও আইনি চাপ, অন্যদিকে এআই খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা—দুই দিক সামলে এগোতে হচ্ছে মেটাকে। আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য প্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাতে ব্যয় অব্যাহত রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

ফেসবুকের গোপনীয়তা লঙ্ঘন, মেটার ইতিহাসে সর্বোচ্চ জরিমানা

ফেসবুকের গোপনীয়তা লঙ্ঘন, মেটার ইতিহাসে সর্বোচ্চ জরিমানা

নতুন ফোন বা কম্পিউটারে স্টোরেজ কম দেখায় কেন?

নতুন ফোন বা কম্পিউটারে স্টোরেজ কম দেখায় কেন?

বন্ধ হচ্ছে ফেসবুকের পরিচিত ‘রিচ’ পদ্ধতি, যা চালু করতে যাচ্ছে মেটা

বন্ধ হচ্ছে ফেসবুকের পরিচিত ‘রিচ’ পদ্ধতি, যা চালু করতে যাচ্ছে মেটা

টিকটকের শিশু নিরাপত্তা নিয়ে বড় শঙ্কা, সতর্ক করেছিলেন খোদ কর্মীরাই

টিকটকের শিশু নিরাপত্তা নিয়ে বড় শঙ্কা, সতর্ক করেছিলেন খোদ কর্মীরাই

ভিডিও পোস্ট করলেই লাখ লাখ টাকা

ভিডিও পোস্ট করলেই লাখ লাখ টাকা

ফোনের র‍্যাম বাড়াতে যা করবেন

ফোনের র‍্যাম বাড়াতে যা করবেন

আরও পড়ুন

আসছে টেসলার চালকবিহীন সাইবার ক্যাব

আসছে টেসলার চালকবিহীন সাইবার ক্যাব

তথ্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগে মেটাকে রেকর্ড জরিমানা

তথ্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগে মেটাকে রেকর্ড জরিমানা

পিএইচপি কী, এটি কেন বিশ্বজুড়ে সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি করল?

পিএইচপি কী, এটি কেন বিশ্বজুড়ে সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি করল?

১৪ কোটি টাকায় বিক্রি হলো অ্যাপলের প্রথম কম্পিউটার

১৪ কোটি টাকায় বিক্রি হলো অ্যাপলের প্রথম কম্পিউটার

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম