ভ্রমণ
লিচুর রাজ্যে ভ্রমণ
Advertisement
লেখা ও ছবি : সুমন্ত গুপ্ত
প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অফিসের কাজে ব্যস্ত ছিলাম, কখন থেকে ফোন বাজছিল টের পাইনি। মনির ভাই হঠাৎ করে বলে উঠলেন, দাদা কোন সময় থেকে আপনার মোবাইল বাজছে। ফোন দিতেই অপর প্রান্ত থেকে চিন্টু বলল, দাদা তুমি আসছ তো এ শুক্রবার। আমি বললাম, এখন পর্যন্ত নিশ্চিত, যদি অন্য কোনো ঝামেলা না থাকে। চিন্টু বলে ঠিক আছে, তোমাকে নতুন এক জায়গায় ঘুরতে নিয়ে যাব। বৃহস্পতিবার রাত ১০টার ট্রেনে রওয়ানা দিলাম ঢাকার উদ্দেশে। দিনের আলোয় এসে পৌঁছালাম ঢাকা শহরে। কিছু সময় বিশ্রাম নিলাম। কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে তাকাতেই দেখি সহধর্মিণী সানন্দা দাঁড়িয়ে আছে। বলল, তুমি না ঘুরতে বের হবে চিন্টুর সঙ্গে। তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠো। আমি ঘুম থেকে উঠে রেডি হয়ে নিলাম। কিন্তু কোথায় নিয়ে যাবে চিন্টু, বলতেই চিন্টু চুপ, আগে যাই, পরে দেখ। যাই হোক, আমরা গন্তব্য যাওয়ার জন্য বের হলাম। গাড়িতে উঠেই চিন্টু বলল, দাদা বল তো, গ্রীষ্মের সবচেয়ে লোভনীয় ফল কোনটি। আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম; বললাম, গ্রীষ্মের সবচেয়ে লোভনীয় ফল তো অনেক কিছুই হতেই পারে। যেমন-আম, কাঁঠাল, আনারস, লিচু; তুমি কোন ফলের কথা বলছ চিন্টু; অনেক সময় ভণিতা করে বলে গ্রীষ্মের সবচেয়ে লোভনীয় ও স্বল্পমেয়াদি ফল লিচু। ততক্ষণে আমার আর বুঝতে বাকি রইল না। দেশের সব ফলের বাজারে এরই মধ্যে লিচুর রঙে রাঙাতে শুরু করেছে। বাগানে গাছে গাছে এখন থোকায় থোকায় পাকা লিচু রয়েছে। বাংলাদেশের যেকটি এলাকায় লিচুর ভালো ফলন হয়, তার মধ্যে সোনারগাঁ অন্যতম। সোনারগাঁয়ের লিচু সবার আগেই বাজারে আসে। তাই আমরা চলছি সোনারগাঁয়ের পথে। ঢাকার গুলিস্তান থেকে বোরাক পরিবহণের বাসে উঠলাম। মহাসড়ক পেরিয়ে আমরা যান্ত্রিক বাহনে শহরের দিকে এগিয়ে চলছি। দেখতে দেখতে পৌঁছালাম মোগড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ডে। বাস থেকে নেমেই আমরা এগিয়ে চললাম লিচু বাগানের দিকে। মোগড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে সোনারগাঁয়ের পথে কিছুটা পথ এগোলেই সড়কের দুপাশের চিত্র কিছুটা থমকে দিল আমাদের। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে রক্তিম লাল থোকা থোকা লিচু শোভা পাচ্ছে ডালে ডালে। সোনারগাঁয়ের সব লিচু বাগানেরই চিত্র অনেকটা এ রকম। এখানকার গাছগুলো দেখলেই আঁচ করা যায় বাগানগুলো বেশ পুরোনো। তবে গাছগুলোর উচ্চতা এতই কম, হাত দিয়েও লিচু পেড়ে খাওয়া যায়। প্রতিটি গাছের ডালে ডালে থোকায় থোকায় ঝুলছে কাঁচা-পাকা লিচু। টকটকে লাল রঙের লিচু দেখতেই লোভ লাগছিল, আর হাতের খুব কাছে ছিল; কিন্তু ভদ্রতার খাতিরে গাছ থেকে নিয়ে খেলাম না। এগিয়ে চললাম সামনের দিকে। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা আসছেন লিচু কিনতে। দেখা পেলাম ওই এলাকার মুরুব্বি জসিম উদ্দিনের সঙ্গে; তিনি বললেন, সোনারগাঁয়ের লিচু অন্যসব অঞ্চলের লিচুর আগে বাজারে আসে বলে ক্রেতার আগ্রহ থাকে বেশি। তবে লোকসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কমতে শুরু করছে সোনারগাঁয়ে ঐতিহ্যবাহী লিচু গাছের সংখ্যা। সুস্বাদু ও সুমিষ্ট হওয়ায় সারা দেশে সোনারগাঁয়ের লিচুর বেশ সুনাম রয়েছে। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে এ লিচু প্রথমে বাজারে আসে। সোনারগাঁ থেকে শুরু করে পানামনগরীর আশপাশে বেশকিছু লিচুবাগান রয়েছে। আমাদের মতো অনেকেই এসেছেন লিচুবাগান ঘুরে দেখতে। আমাদের দেখে বাগান মালিকরা সানন্দে এগিয়ে এলেন। বাগান ঘুরিয়ে দেখাতে লাগলেন। বাগান মালিকের নাম জানতে চাইলে বলেন, জাহিদ হাসান। তিনি আমাদের গাছ থেকে পেড়ে লিচু দিলেন খেতে। গাছের টকটকে লাল লিচু পেয়ে আমার সহধর্মিণী খুব খুশি। আমিও আর লোভ সামলাতে পারলাম না, টপটপ করে খেতে লাগলাম; অসাধারণ স্বাদ। একসঙ্গে ১৫-২০টি লিচু খেয়ে নিলাম। জাহিদ ভাই বলছিলেন, সোনারগাঁ উপজেলার যেসব এলাকায় লিচু বাগান রয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-পানাম, গোয়ালদী, বৈদ্যের বাজার, ভট্টপুর, গাবতলী, হারিয়া, অর্জুন্দী, গোবিন্দপুর, কৃষ্ণপুর। পাতি, কদমী আর বোম্বাই এ তিন প্রজাতির লিচুর ফলনই সোনারগাঁয়ের বাগানগুলোতে বেশি হয়ে থাকে। এর মধ্যে পাতি লিচুর চাষ হয় সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া এ প্রজাতির লিচু সবচেয়ে আগে আসে বাজারে। এরপর কদমী ও বোম্বাই লিচু। এ দুই প্রজাতির লিচু আকারে বড় হয়। পাতি লিচু আকারে ছোট হলেও স্বাদে ভালো। আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে দেখলাম, কিছু লোক বাগানের গাছগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। কী দেখছেন, প্রথমে বুঝতে পারিনি, পরে বুঝতে পারলাম, তারা বাগান পরিচর্যাকারী। বাগান পরিচর্যাকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, টানা বৃষ্টি হলে লিচু নষ্ট হয়ে যায়। বৃষ্টির পরপরই কীটনাশক দিতে হয়, নয়তো পোকার আক্রমণ শুরু হয়। তবে ফরমালিন জাতীয় রাসায়নিক ব্যবহার করেন না। এদিকে বাসার জন্য লিচু নেব, তাই আমরা এ বাগান, সে বাগান ঘুরতে লাগলাম। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঘুরতে ঘুরতে প্রায় শখানেক লিচু খেলাম। প্রধান সড়কে এসে দেখি, সড়কের দুপাশে বিক্রেতারা লিচু নিয়ে বসে আছে বিক্রির জন্য। লিচুর রাজ্যে হানা দেওয়ার এটাই উপযুক্ত সময়।
কীভাবে যাবেন : ঢাকার গুলিস্তান থেকে বোরাক ও সোনারগাঁ পরিবহণ ইত্যাদি বাসে এসে নামতে হবে মোগড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ডে। ভাড়া ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। এ ছাড়া একই জায়গা থেকে দাউদকান্দি কিংবা মেঘনাগামী যে কোনো বাসে মোগড়াপাড়া আসা যায়। মোগড়াপাড়া থেকে লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের রিকশা ভাড়া ২০ থেকে ২৫ টাকা।
