বঙ্গবন্ধুর জেলজীবন
jugantor
বঙ্গবন্ধুর জেলজীবন

  মোকাম্মেল হোসেন  

১৭ মার্চ ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যে কোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই বঙ্গবন্ধু ছিলেন এক অনন্য নেতা; সহজ-সরল, সাদামাটা অথচ দৃঢ়চেতা একজন মানুষ। দেহসৌষ্ঠবে এবং বজ কণ্ঠের বিস্ময়কর শক্তির এই মানুষটিকে সহজেই আলাদাভাবে চেনা যেত। বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে তার নাম।

বায়ান্ন থেকে একাত্তর পর্যন্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু ছিলেন সংগ্রামী জনতার পুরোভাগে। বজ কণ্ঠে তিনি ডাক দিয়েছিলেন স্বাধীনতার। তার আদর্শ, ত্যাগ, দূরদর্শিতা এবং অকুতোভয় আপসহীন নেতৃত্বে দেশ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত হয়, বাঙালি জাতি পায় হাজার বছরের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা; স্বাধীন পতাকা ও স্বাধীন মানচিত্র।

বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি জাতিসত্তা, স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশ এক ও অভিন্ন। বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য আজীবন লড়াই করেছেন। তিনি তার জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, যাতে এ দেশের মানুষ আত্মমর্যাদা নিয়ে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।

তার রাজনীতির মূলমন্ত্রই ছিল আদর্শের জন্য সংগ্রাম, আদর্শের জন্য ত্যাগ। যে আদর্শ, বিশ্বাস ও স্বপ্ন নিয়ে তিনি রাজনীতি করতেন, শত কষ্ট ও প্রচণ্ড চাপেও তিনি তাতে অটল ছিলেন- এটা আমরা দেখতে পাই তার ছাত্রজীবন থেকেই। ১৯৩৯ সালে স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে তার কারাবরণ শুরু।

বস্তুত জেল-জুলুম ও নিপীড়ন বঙ্গবন্ধুর জীবনে এক নিয়মিত অধ্যায়ে পরিণত হয়েছিল। জনগণের জন্য, দেশের জন্য তিনি প্রায় এক যুগ কারান্তরালে বন্দি জীবন-যাপন করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর কারাপঞ্জি

বছর সময়কাল

১৯৩৮ ৭ দিন

১৯৪৮ ৪ মাস

১৯৪৯ ৯ মাস

১৯৫০ ১ বছর

১৯৫১ ১ বছর

১৯৫২ ২ মাস

১৯৫৪ ৮ মাস

১৯৫৮ ৩ মাস

১৯৫৯ ১ বছর

১৯৬০ ১ বছর (কার্যত গৃহবন্দি; রাজনীতি নিষিদ্ধ)

১৯৬১ ১ বছর (কার্যত গৃহবন্দি; রাজনীতি নিষিদ্ধ)

১৯৬২ ৬ মাস

১৯৬৪ ১০ মাস

১৯৬৫ ১ বছর

১৯৬৬ ১১ মাস

১৯৬৭ ১ বছর

১৯৬৮ ১ বছর

১৯৬৯ ২ মাস

১৯৭১ ১০ মাস

১৯৭২ ৮ দিন

৫৪ বছরের জীবনে বঙ্গবন্ধু ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাগারে ছিলেন, যা তার মোট জীবনের এক-চতুর্থাংশ। বঙ্গবন্ধু স্কুলের ছাত্রাবস্থায় ১৯৩৮ সালে সর্বপ্রথম কারাগারে যান। ওই সময় তিনি সাত দিন কারাভোগ করেন। এরপর বঙ্গবন্ধু ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত ৫ দিন কারাগারে ছিলেন। একই বছর ১১ সেপ্টেম্বর কারাগারে গিয়ে মুক্তি পান ১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারি।

এ দফায় তিনি ১৩২ দিন কারাভোগ করেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৪৯ সালের ১৯ এপ্রিল আবারও কারাগারে গিয়ে ৮০ দিন পর মুক্তি পান ওই বছরের ২৮ জুন। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি আবারও ২৭ দিন কারাভোগ করেন। ১৯৪৯ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৩ দিন বঙ্গবন্ধু কারাভোগ করেন। ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯৫২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি টানা ৭৮৭ দিন বঙ্গবন্ধু কারাগারে ছিলেন।

ট্রাজেডি হল, ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পরও বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে যেতে হয়েছিল এবং এ দফায় বঙ্গবন্ধু ২০৬ দিন কারাভোগ করেছিলেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের মার্শাল ল’ জারির পর বঙ্গবন্ধু ১১ অক্টোবর গ্রেফতার হন। এসময়ই বঙ্গবন্ধুকে একটানা সবচেয়ে বেশি সময়- এক হাজার ১৫৩ দিন অর্থাৎ ৩ বছরের বেশি সময় কারাগারে কাটাতে হয়। ১৯৬২ সালের ৬ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পুনরায় গ্রেফতার হয়ে একই বছরের ১৮ জুন মুক্তি পান। এ দফায় তিনি কারাভোগ করেন ১৫৮ দিন।

এরপর ১৯৬৪ ও ১৯৬৫ সালে বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন মেয়াদে ৬৬৫ দিন কারাগারে ছিলেন। বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে বিবেচিত ছয় দফা দেয়ার পর বঙ্গবন্ধু এর পক্ষে জনমত গড়ে তোলার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ করতে গিয়ে কয়েক দফায় গ্রেফতার হন ও কারাভোগ করেন। এরপর ১৯৬৬ সালে ৮ মে আবারও গ্রেফতার হয়ে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পান বঙ্গবন্ধু।

এসময় তিনি এক হাজার ২১ দিন কারাগারে ছিলেন। কারামুক্তির পর ছাত্র-গণসংবর্ধনায় তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেয়া হয়। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার পরপরই পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে।

১৯৭১ সালে সাড়ে নয় মাস পশ্চিম পাকিস্তানের লায়ালপুরের মিয়ানওয়ালী কারাগারে বন্দি থাকেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান; মুক্তিলাভ করেন ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি।

বঙ্গবন্ধু তার জীবনে বারবার জেল, নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করে আলোয় উদ্ভাসিত করে গেছেন একটি জাতিসত্তাকে, স্বাধীন ভূখণ্ডকে। কেমন ছিল তার জেলজীবন? বঙ্গবন্ধু জানাচ্ছেন- ‘জেলে যারা যায় নাই, জেল যারা খাটে নাই- তারা জানে না জেল কি জিনিস।

বাইরে থেকে মানুষের যে ধারণা জেল সমন্ধে ভিতরে তার একদম উল্টা। জনসাধারণ মনে করে চারদিকে দেওয়াল দিয়ে ঘেরা, ভিতরে সমস্ত কয়েদি একসাথে থাকে, তাহা নয়। জেলের ভিতর অনেক ছোট ছোট জেল আছে’ (কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা ২৭)।

জেলজীবন, জেল-যন্ত্রণা, কারাগারের ভেতর কয়েদিদের অজানা কথা, অপরাধীদের কথা বঙ্গবন্ধু লিখে গেছেন অকপটে; কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসে। লিখেছেন, কেন ওই অপরাধীরা অপরাধ জগতে পা দিয়েছিল; তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন ছিল। কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের দুঃখ-দুর্দশা, গণমাধ্যমের অবস্থা, শাসকগোষ্ঠীর নির্মম নির্যাতন সম্পর্কে তিনি লিখেছেন।

কারাগারে নির্মম অত্যাচারের কথা, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার বঙ্গবন্ধুর লেখায় উঠে এসেছে এভাবে- ‘রাজবন্দি হিসেবে জেল খেটেছি, সশ্রম কারাদণ্ডও ভোগ করতে হয়েছে। আবার হাজতি হিসেবেও জেল খাটতে হয়েছে। তাই সকল রকম কয়েদির অবস্থা নিজের জীবন দিয়ে বুঝতে পেরেছি’ (কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা ২৭)।

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুকে বারবার বন্দি করেও তার মনোবলে চিড় ধরাতে পারেনি। ‘কারাগারের রোজনামচা’য় ১৯৬৬ সালের ৫ জুন বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- আমার মনে হয় মোনায়েম খান সাহেব পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়ে কোনো কোনো বন্ধুর কাছ থেকে বুদ্ধি নিয়েছেন। তিনি ভুলে গেছেন এটা পূর্ব বাংলা, পশ্চিম পাকিস্তান নহে! আন্দোলন করা এবং নির্যাতন সহ্য করার ক্ষমতা এরা রাখে।

১২ জুন বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- ভরসা আমার আছে, জনগণের সমর্থন এবং ভালবাসা দুইই আছে আমাদের জন্য। তাই আন্দোলন ও পার্টির কাজ চলবে।

জন্মের পর থেকেই শিশু রাসেল দেখে আসছে, তার বাবা বাসায় থাকেন না; থাকেন কারাগারে। অবুঝ শিশুমনে তাই ধারণা হয়েছিল- কারাগারটাই বুঝি তার ‘আব্বার বাড়ি’। ১৯৬৬ সালের ১৫ জুন। রাসেল গেছে বাবাকে দেখতে। বঙ্গবন্ধু বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে- ১৮ মাসের রাসেল জেল অফিসে এসে একটুও হাসে না, যে পর্যন্ত আমাকে না দেখে। দেখলাম দূর থেকে পূর্বের মতোই ‘আব্বা আব্বা’ বলে চিৎকার করছে। জেল গেট দিয়ে একটা মাল বোঝাই ট্রাক ঢুকছিল।

আমি তাই জানালায় দাঁড়াইয়া ওকে আদর করলাম। একটু পরেই ভিতরে যেতেই রাসেল আমার গলা ধরে হেসে দিল। ওরা বলল, আমি না আসা পর্যন্ত শুধু জানালার দিকে চেয়ে থাকে, বলে ‘আব্বার বাড়ি’। এখন ওর ধারণা হয়েছে এটা ওর আব্বার বাড়ি। বঙ্গবন্ধু আরও লিখেছেন- ৮ ফেব্রুয়ারি ২ বৎসরের ছেলেটা এসে বলে, ‘আব্বা বালি চলো’। কি উত্তর ওকে আমি দেব।

ওকে ভোলাতে চেষ্টা করলাম, ও তো বুঝে না আমি কারাবন্দী। ওকে বললাম, তোমার মার বাড়ি তুমি যাও। আমি আমার বাড়ি থাকি। আবার আমাকে দেখতে এসো। ও কি বুঝতে চায়! কি করে নিয়ে যাবে এই ছোট্ট ছেলেটা, ওর দুর্বল হাত দিয়ে মুক্ত করে এই পাষাণ প্রাচীর থেকে!

জেল কোডে আছে, কোনো কয়েদিকে তিন মাসের বেশি একাকী (Solitary Confinement) রাখা চলবে না। একাকী রাখার কারণে বঙ্গবন্ধু অনশনও করেছিলেন। শাস্তি দেয়ার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে কর্তৃপক্ষ রাজনৈতিক বন্দিদের একাকী রাখত। কারাগারে একাকী থাকা যে কত কষ্টকর, তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ অনুভব করতে পারবে না।

কারাগারে অন্য বন্দিদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু দেখা করা বা কথা বলার সুযোগ পেতেন না। বঙ্গবন্ধুর বর্ণনায় তা ওঠে এসেছে এভাবে- কারও সঙ্গে আলাপ করার উপায় নাই। কারও সঙ্গে পরামর্শ করারও উপায় নাই। সান্ত্বনা দেবার কেহ নাই। কারাগারের ভিতর একাকী রাখার মতো নিষ্ঠুরতা আর কি হতে পারে?

আরেক জায়গায় লিখেছেন- জেলে রাতটাই বেশি কষ্টের। আবার যারা আমার মতো একাকী নির্জন স্থানে থাকতে বাধ্য হয় যাকে ইংরেজিতে বলে সলিটারি কনফাইয়েনমেন্ট তাদের অবস্থা কল্পনা করা যায় না।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক বন্দিকে থাকতে না দেয়ায় ঈদের দিনও তাকে একা থাকতে হতো। ‘কারাগারের রোজনামচা’য় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- একাকী কি ঈদ উদযাপন করা যায়? তারপরও যতটা সম্ভব ঈদের দিন বঙ্গবন্ধু অন্য বন্দিদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতেন।

বঙ্গবন্ধুর জবানীতে তারই একটি চিত্র হচ্ছে এরকম- নামাজ পড়ার পর শত শত কয়েদি আমাকে ঘিরে ফেলল। সকলের সাথে হাত মিলাতে আমার প্রায় আধাঘণ্টা সময় লেগেছিল। বঙ্গবন্ধু জানতেন, জীবনের আরও অনেক ঈদ হয়তো জেলে কাটাতে হবে। ‘কারাগারের রোজনামচা’য় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- আগামী ১৩ জানুয়ারি ঈদের নামাজ। ছেলেমেয়েরা জামা-কাপড় নেবে না। ঈদ করবে না, কারণ আমি জেলে। অন্য এক জায়গায় তিনি লিখেছেন- আজ কোরবানির ঈদ।

গত ঈদেও জেলে ছিলাম। এবারও জেলে। বন্দি জীবনে ঈদ উদযাপন করা একটি মর্মান্তিক ঘটনা বলা চলে। ঈদের দিন পাকিস্তানের জেলে কাটানোর স্মৃতিচারণ করেছেন বঙ্গবন্ধুর এভাবে- আমার প্রিয় জনগণ কীভাবে তাদের ঈদ উৎসব পালন করছে? এই প্রশ্ন আমি করলাম, জানি না কাকে! সেই দিন, আবার কখনো তাদের দেখা পাবো কিনা সেটা না জেনেই, আমি মোনাজাত করে আমার জনগণের মঙ্গল ও নিরাপত্তা দয়াময় আল্লাহতা’লার হাতে সমর্পণ করলাম। এটাই ছিল আমার ঈদ।

জেলজীবনে মাঝেমধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়তেন বঙ্গবন্ধু। তারই একটি খণ্ডচিত্র আমরা পাই ২৯ জুলাই ১৯৬৬ তারিখের ‘কারাগারের রোজনামচা’য়। এদিন বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- সারাদিন ব্যথায় কাতর। ডাক্তার ক্যাপ্টেন সামাদ সাহেব এলেন আমাকে দেখতে। খাবার ঔষধ দিলেন, আরও দিলেন মালিশ। বিছানায় পড়ে রইলাম। সন্ধ্যার দিকে কষ্ট করে বের হয়ে বাগানের ভেতর আরাম কেদারায় কিছু সময় বসে আবার শুয়ে পড়লাম। খুবই কষ্ট পেতেছি।

এর আগে ১৯৫০ সালে গোপালগঞ্জ জেলে থাকাকালে ‘দুর্বল হার্ট, চক্ষু যন্ত্রণা ও বাম পায়ে রিউমেটিক ব্যথা’ হয় বঙ্গবন্ধুর। খুলনা জেলে ‘ভীষণ জ্বর ও মাথাব্যথা এবং বুকে ব্যথা’ ধরা পড়ে; ‘চোখের অসুখও বাড়ে।’ ভালো চিকিৎসার দাবিতে ফরিদপুর জেলে বঙ্গবন্ধু অনশন করেন। জেল চিকিৎসকরা জোর করে টিউব ঢুকিয়ে তরল খাবার প্রবেশ করালে নাকে ক্ষত সৃষ্টি হয় আর এতে ‘হার্টের অবস্থা খারাপ হয়, পালপিটিশন বাড়ে এবং নিঃশ্বাস ফেলতে কষ্ট হয়।’ ১৯৬৬ সালে জেলে থাকাকালে বঙ্গবন্ধু ‘অনিদ্রা ও ক্ষুধামন্দায় ভোগেন।’

একাধিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও নির্জন কারাবাসেও বঙ্গবন্ধুর মনোবল নষ্ট হয়নি; অটল ছিল মনের দৃঢ়তা। ১৯৬৬ সালের ২৯ জুন ‘কারাগারের রোজনামচা’য় তিনি লিখেছেন- খুব সাবধানে থাকি আমি জেলে। শরীর রক্ষা করতে চাই, বাঁচতে চাই, কাজ আছে অনেক আমার। তবে একটা ছেড়ে আরেকটা ব্যারাম এসে দেখা দেয়।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধুকে কমান্ডো স্টাইলে গ্রেফতার করে লায়ালপুরের মিয়ানওয়ালী কারাগারে নেয়ার পর একটি অতি ক্ষুদ্র সেলে রাখা হয়-

যেখানে লোহার শিক দ্বারা বেষ্টিত ছোট্ট ফাঁকা জায়গা থেকে এই বিশ্বজগৎ প্রায় আবছা; প্রচণ্ড গরম অথচ কোনো বৈদ্যুতিক পাখা ছিল না। পরবর্তী সময়ে একটি পুরনো বৈদ্যুতিক পাখা লাগানো হল- যা মূলত ঘরের গরমকে আরও ছড়িয়ে দেবার জন্যই। এছাড়াও আরও নানা রকমের অত্যাচার ছিল সেখানে।

ইয়াহিয়ার ইচ্ছা ছিল, বিচারের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা। মার্শাল ল’ কোর্টে নেয়ার সময় যেন বঙ্গবন্ধু সুস্থ থাকেন- এ বিষয়টি তার মনে ছিল; যে কারণে বঙ্গবন্ধুকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়নি। সেখানে একজন বাঙালি বাবুর্চি আনা হয়েছিল রান্নার জন্য। কেননা, ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধুর শরীর ভেঙে যাচ্ছিল। বন্ধুবন্ধুকে দেখার জন্য একজন ডাক্তারও নিয়োগ দেয়া হয়েছিল।

এসময় লন্ডনের ফিনানশিয়াল টাইমস পত্রিকায় দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইয়াহিয়া বলে- সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, খুব শীঘ্রই বঙ্গবন্ধুর বিচার কাজ শুরু করবে। সাক্ষাৎকারে ইয়াহিয়া আরও বলে- বঙ্গবন্ধুর বিচার হবে সিক্রেট মিলিটারী ট্রাইবুন্যালে। ইয়াহিয়া যদিও বলেনি, বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে কী ধরনের কয়টি চার্জ গঠন করা হবে। কিন্তু এ কথা সে উল্লেখ করে, এই চার্জশীটে মৃত্যুদণ্ডের কয়েকটি ধারা থাকবে।

পর্বতমালায় ঘেরা মিয়ানওয়ালী কারাগার। সেখানে প্রায়ই শিলাবৃষ্টি নেমে আসত। ধূসর মেঘগুলো পাহাড়ের গায়ে মিশে থাকত। ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠে পাতলা বিবর্ণ একটা কম্বল মুড়ি দিয়ে বন্দি বঙ্গবন্ধুর দিন কাটত। একদিন প্রচণ্ড বেগে নেমে এলো ঝড়। সঙ্গে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত।

আকাশজুড়ে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। বৃষ্টির জল বাতাসে ধাক্কা খেয়ে জানালা দিয়ে আছড়ে পড়ছিল। কনকনে ঠাণ্ডা প্রতিরোধে একটা কম্বল মোটেই সহায়ক ছিল না। বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা কাঁটার মতো বঙ্গবন্ধুর মুখে বিঁধতে লাগল।

পরের দিন দুপুরবেলা বঙ্গবন্ধু হঠাৎ বাইরে তাকিয়ে দেখতে পেলেন তার সেলের দশ গজ সামনে কাঁটাতারের বেড়া ঘেঁষে কয়েকজন কয়েদি একটি বড় গর্ত খুঁড়ছে। বঙ্গবন্ধু কিছুটা অবাক হলেন। কাছে এসে ভালো করে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন, কবর খোঁড়া হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর বুঝতে অসুবিধা হল না, ওটা তার জন্যই তৈরি করা হচ্ছে; সম্ভবত দু’একদিনের মধ্যেই তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে চলেছে।

বঙ্গবন্ধু যখন মিয়ানওয়ালী কারাগারের ক্ষুদ্র কনডেম সেলে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন; তিনি জানতেন না- তার স্বপ্ন সত্যে পরিণত হয়েছে; বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। তিনি শুধু জানতেন, মৃত্যু দুয়ারে করাঘাত করছে। সময়ের চাকা ঘুরে ঘুরতে সেদিন ২৬ ডিসেম্বর। গভীর রাত। প্রচণ্ড শীত। একটি মাত্র কম্বলে শীতে বঙ্গবন্ধু ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিলেন। হঠাৎ কানে এলো একটা চলন্ত গাড়ির আওয়াজ।

জানালা দিয়ে তাকাতেই লক্ষ করলেন- একটা ট্রাক আসছে ধীরে ধীরে। ট্রাকটা সেলের সঙ্গে লাগোয়া গার্ড হাউসের সামনে এসে দাঁড়াল। বাইরে ছুটোছুটি, হাঁকডাক ও ফিসফিসানির শব্দ। হঠাৎ ঝন ঝন করে লৌহকপাট খুলে গেল। চারজন সৈন্য ভেতরে ঢুকে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে দাঁড়াল।

সামনে এসে দাঁড়ালেন বেঁটে-খাটো শ্মশ্রুমণ্ডিত জেল গভর্নর হাবিব আলী। মাথায় মিলিটারি ক্যাপ; গায়ে রেইনকোট জড়ানো। হাবিব আলী পরিচিত কর্কশ স্বরে বললেন, আপনি আমাকে বিশ্বাস করুন; আমি আপনাকে একটা নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যেতে এসেছি...

চলতে চলতে বঙ্গবন্ধু ভাবলেন- ওরা তাহলে এখনই আমাকে এই অন্ধকারের মধ্যে গুলি করে মেরে ফেলবে! কিন্তু এতসবের কী প্রয়োজন ছিল! সেলের সামনের গর্তের পাশে নিয়েও তো গোপনে মেরে ফেলতে পারত। এত দূরে নিয়ে এলো কেন? কিছুক্ষণ পর বঙ্গবন্ধু দেখলেন- পাহাড়ের গা ঘেঁষেই সুন্দর নিম্নভূমি; সেখানে সুরম্য বাংলোর সামনে সাজানো বাগান। বাগানের পিচঢালা পথ ধরে তার দিকে একজন চেনা মানুষ এগিয়ে আসছেন। তিনি জুলফিকার আলী ভুট্টো।

৮ জানুয়ারি, ১৯৭২। রাওয়ালপিণ্ডি বিমানবন্দর। সময় রাত এগারোটা। এয়ারপোর্ট তখন ব্ল্যাক আউট। থমথমে ভাব। পিআইএ’র একটি বিশেষ বিমান রানওয়েতে দাঁড়িয়ে আছে। পাইলট, স্টুয়ার্ড, এয়ারহোস্টেস যার যার জায়গায় অন্ধকারে বসে আছে। গোপনীয়তা রক্ষার তাগিদ আসছে ঘন ঘন।

সৈন্যরা যার যার সীমানায় টহল দিচ্ছে। রাত ২টায় রানওয়েতে অপেক্ষমাণ একমাত্র বিমানযাত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজ রাতেই তাকে নিয়ে বিশেষ এই বিমানটি উড়ে যাবে। আর সেইসঙ্গে পরিসমাপ্তি ঘটবে বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ জীবনব্যাপী নিঃসঙ্গ, একাকী, দুঃসহ কারাজীবনের।

৯ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী পাকিস্তানের বিমানটি কুয়াশাসিক্ত শীতার্ত ভোরে হিথরো বিমানবন্দরে অবতরণ করার পর পুলিশ প্রহরায় একটা রোলসরয়েস গাড়ি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গেল ক্লারিজ হোটেলে। প্রবাসীদের মুখেই বঙ্গবন্ধু প্রথম শুনতে পেলেন, স্বদেশে পাকিস্তান বাহিনীর নিষ্ঠুর গণহত্যার সংবাদ।

খুন, ধর্ষণ, আগুনের বিভীষিকাময় ছবি; রক্তে রক্তে নদী বয়ে যাওয়ার কাহিনী। এসব শুনে দু’হাতে মুখ ঢেকে বঙ্গবন্ধু শিশুর মতো কেঁদে ফেললেন। কান্নাজড়িত গলায় বারবার কেবল একটা কথাই বলছিলেন- আহ! আমার দুঃখিনী বাংলা মা।

১০ জানুয়ারি, ১৯৭২। বেলা ১টা ৪১ মিনিটে জাতির অবিসংবাদিত নেতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার স্বপ্নের মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন। পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে বিজয়ীর বেশে এলেন ইতিহাসের মহানায়ক, বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বিকাল ৫টায় তিনি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান, বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে ভাষণ দেন।

সশ্রদ্ধচিত্তে তিনি সবার ত্যাগের কথা স্মরণ করেন, সবাইকে দেশ গড়ার কাজে উদ্বুদ্ধ করেন। রাজনীতির ধ্র“পদী কবি বলেন- যে মাটিকে আমি এত ভালোবাসি, যে মানুষকে আমি এত ভালোবাসি, যে জাতিকে আমি এত ভালোবাসি; আমি জানতাম না, সে বাংলায় আমি যেতে পারব কিনা। আজ আমি বাংলায় ফিরে এসেছি বাংলার ভাইদের কাছে, মায়েদের কাছে, বোনদের কাছে। বাংলা আমার স্বাধীন, বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।

১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কর্মসূচি দিয়ে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালনের যে ক্ষণগণনা শুরু হয়েছিল; আজ ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর শুভ জন্মদিন। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়ে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। এসব কর্মসূচি চলবে আজ থেকে পরবর্তী এক বছর পর্যন্ত।

মুজিববর্ষ সফল ও সার্থক হোক। মুজিববর্ষ পালনের মধ্যে দিয়ে নতুন প্রজন্মের প্রতিশ্রুতি হোক, বঙ্গবন্ধুর যাপিত জীবন এবং রাজনৈতিক ও উন্নয়ন দর্শন থেকে শিক্ষা নেয়া; আরও প্রতিশ্রুতি হোক, সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গঠন। মাদক-দুর্নীতি-সন্ত্রাস ও শোষণহীন সমাজ গঠনে আত্মনিয়োগের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়নে সচেষ্ট হবো- এ শপথ অন্তরে লালন করুক প্রত্যেক বাঙালি।

পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা তাদের কাজের জন্য, গুণের জন্য মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকেন অনন্তকাল। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এমন একটি নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যিনি ভাষণে, শাসনে, দেশপ্রেমে, নেতৃত্বে ইতিহাসে অমোচনীয় এক নাম, তিনি জাতির পিতা।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা তার স্বাধীন দেশে ফেরার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন কাজে আত্মনিয়োগ করলেন। তিনি এজন্য সবুজবিপ্লবের ডাক দিলেন। দেশের মানুষের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, কৃষির উন্নয়নে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে লাগলেন।

তিনি জানতেন, এ দেশের সব সম্পদ হারিয়ে গেছে। পাকিস্তানি বিত্তবানরা সব ধন-সম্পদ লুট করে নিয়ে গেছে। আমাদের রাস্তা-ঘাট, স্কুল-কলেজ, হাট-বাজার, মসজিদ-মন্দির, শিল্প-কারখানা তারা ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। যুদ্ধের তাণ্ডবে আমাদের দেশের শ্রমিক-মুজুর, কৃষক-জেলে, তাঁতী-ধোপা সবাই সর্বস্বান্ত। দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ শোষকের শোষণে নিঃস্ব।

তাদের রক্ষা করতে দ্রুততম সময়ে কৌশল নির্ধারণ করে উৎপাদনমুখী করতে না পারলে মৌলিক চাহিদার অভাবে জাতি দুর্বিষহ অবস্থায় পড়বে। এজন্য দেশের উন্নয়নে কাজ করতে হবে; ভবিষ্যৎ দিক-নির্দেশনা নিয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

বঙ্গবন্ধুর সেদিনের নির্দেশিত কৌশল ও স্বপ্ন আজকের বাংলাদেশের উন্নয়ন ও ক্ষুধামুক্তির জাগরণ সৃষ্টির উপজীব্য। ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন।

বাংলাদেশের জনগণের নির্ভার জীবনযাপনের যে দায়িত্ব তিনি কাঁধে তুলে নিয়েছেন, তা পালনে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়ার নেপথ্যপুরুষ হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান; যার জন্য আমাদের স্বাধীনতা পাওয়া। বঙ্গবন্ধুর রক্তের কাছে আমাদের ইতিহাস ঋণী। জাতির জনকের জন্মশতবর্ষের এই শুভক্ষণে তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করছি-

‘ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর রৌদ্র ঝরে

চিরকাল, গান হয়ে

নেমে আসে শ্রাবণের বৃষ্টিধারা; যাঁর নামের ওপর

কখনো ধুলো জমতে দেয় না হাওয়া,

ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর ঝরে

মুক্তিযোদ্ধাদের জয়ধ্বনি।’

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে লেখা কবি শামসুর রাহমানের এ কবিতা কখনো পুরনো হবে না; যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, জনকের নাম আর মুক্তিযুদ্ধের অমর স্মৃতি স্মরিত হবে ততদিন।

মোকাম্মেল হোসেন : সহকারী সম্পাদক, যুগান্তর

বঙ্গবন্ধুর জেলজীবন

 মোকাম্মেল হোসেন 
১৭ মার্চ ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যে কোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই বঙ্গবন্ধু ছিলেন এক অনন্য নেতা; সহজ-সরল, সাদামাটা অথচ দৃঢ়চেতা একজন মানুষ। দেহসৌষ্ঠবে এবং বজ কণ্ঠের বিস্ময়কর শক্তির এই মানুষটিকে সহজেই আলাদাভাবে চেনা যেত। বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে তার নাম।

বায়ান্ন থেকে একাত্তর পর্যন্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু ছিলেন সংগ্রামী জনতার পুরোভাগে। বজ কণ্ঠে তিনি ডাক দিয়েছিলেন স্বাধীনতার। তার আদর্শ, ত্যাগ, দূরদর্শিতা এবং অকুতোভয় আপসহীন নেতৃত্বে দেশ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত হয়, বাঙালি জাতি পায় হাজার বছরের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা; স্বাধীন পতাকা ও স্বাধীন মানচিত্র।

বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি জাতিসত্তা, স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশ এক ও অভিন্ন। বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য আজীবন লড়াই করেছেন। তিনি তার জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, যাতে এ দেশের মানুষ আত্মমর্যাদা নিয়ে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।

তার রাজনীতির মূলমন্ত্রই ছিল আদর্শের জন্য সংগ্রাম, আদর্শের জন্য ত্যাগ। যে আদর্শ, বিশ্বাস ও স্বপ্ন নিয়ে তিনি রাজনীতি করতেন, শত কষ্ট ও প্রচণ্ড চাপেও তিনি তাতে অটল ছিলেন- এটা আমরা দেখতে পাই তার ছাত্রজীবন থেকেই। ১৯৩৯ সালে স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে তার কারাবরণ শুরু।

বস্তুত জেল-জুলুম ও নিপীড়ন বঙ্গবন্ধুর জীবনে এক নিয়মিত অধ্যায়ে পরিণত হয়েছিল। জনগণের জন্য, দেশের জন্য তিনি প্রায় এক যুগ কারান্তরালে বন্দি জীবন-যাপন করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর কারাপঞ্জি

বছর সময়কাল

১৯৩৮ ৭ দিন

১৯৪৮ ৪ মাস

১৯৪৯ ৯ মাস

১৯৫০ ১ বছর

১৯৫১ ১ বছর

১৯৫২ ২ মাস

১৯৫৪ ৮ মাস

১৯৫৮ ৩ মাস

১৯৫৯ ১ বছর

১৯৬০ ১ বছর (কার্যত গৃহবন্দি; রাজনীতি নিষিদ্ধ)

১৯৬১ ১ বছর (কার্যত গৃহবন্দি; রাজনীতি নিষিদ্ধ)

১৯৬২ ৬ মাস

১৯৬৪ ১০ মাস

১৯৬৫ ১ বছর

১৯৬৬ ১১ মাস

১৯৬৭ ১ বছর

১৯৬৮ ১ বছর

১৯৬৯ ২ মাস

১৯৭১ ১০ মাস

১৯৭২ ৮ দিন

৫৪ বছরের জীবনে বঙ্গবন্ধু ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাগারে ছিলেন, যা তার মোট জীবনের এক-চতুর্থাংশ। বঙ্গবন্ধু স্কুলের ছাত্রাবস্থায় ১৯৩৮ সালে সর্বপ্রথম কারাগারে যান। ওই সময় তিনি সাত দিন কারাভোগ করেন। এরপর বঙ্গবন্ধু ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত ৫ দিন কারাগারে ছিলেন। একই বছর ১১ সেপ্টেম্বর কারাগারে গিয়ে মুক্তি পান ১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারি।

এ দফায় তিনি ১৩২ দিন কারাভোগ করেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৪৯ সালের ১৯ এপ্রিল আবারও কারাগারে গিয়ে ৮০ দিন পর মুক্তি পান ওই বছরের ২৮ জুন। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি আবারও ২৭ দিন কারাভোগ করেন। ১৯৪৯ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৩ দিন বঙ্গবন্ধু কারাভোগ করেন। ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯৫২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি টানা ৭৮৭ দিন বঙ্গবন্ধু কারাগারে ছিলেন।

ট্রাজেডি হল, ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পরও বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে যেতে হয়েছিল এবং এ দফায় বঙ্গবন্ধু ২০৬ দিন কারাভোগ করেছিলেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের মার্শাল ল’ জারির পর বঙ্গবন্ধু ১১ অক্টোবর গ্রেফতার হন। এসময়ই বঙ্গবন্ধুকে একটানা সবচেয়ে বেশি সময়- এক হাজার ১৫৩ দিন অর্থাৎ ৩ বছরের বেশি সময় কারাগারে কাটাতে হয়। ১৯৬২ সালের ৬ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পুনরায় গ্রেফতার হয়ে একই বছরের ১৮ জুন মুক্তি পান। এ দফায় তিনি কারাভোগ করেন ১৫৮ দিন।

এরপর ১৯৬৪ ও ১৯৬৫ সালে বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন মেয়াদে ৬৬৫ দিন কারাগারে ছিলেন। বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে বিবেচিত ছয় দফা দেয়ার পর বঙ্গবন্ধু এর পক্ষে জনমত গড়ে তোলার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ করতে গিয়ে কয়েক দফায় গ্রেফতার হন ও কারাভোগ করেন। এরপর ১৯৬৬ সালে ৮ মে আবারও গ্রেফতার হয়ে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পান বঙ্গবন্ধু।

এসময় তিনি এক হাজার ২১ দিন কারাগারে ছিলেন। কারামুক্তির পর ছাত্র-গণসংবর্ধনায় তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেয়া হয়। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার পরপরই পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে।

১৯৭১ সালে সাড়ে নয় মাস পশ্চিম পাকিস্তানের লায়ালপুরের মিয়ানওয়ালী কারাগারে বন্দি থাকেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান; মুক্তিলাভ করেন ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি।

বঙ্গবন্ধু তার জীবনে বারবার জেল, নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করে আলোয় উদ্ভাসিত করে গেছেন একটি জাতিসত্তাকে, স্বাধীন ভূখণ্ডকে। কেমন ছিল তার জেলজীবন? বঙ্গবন্ধু জানাচ্ছেন- ‘জেলে যারা যায় নাই, জেল যারা খাটে নাই- তারা জানে না জেল কি জিনিস।

বাইরে থেকে মানুষের যে ধারণা জেল সমন্ধে ভিতরে তার একদম উল্টা। জনসাধারণ মনে করে চারদিকে দেওয়াল দিয়ে ঘেরা, ভিতরে সমস্ত কয়েদি একসাথে থাকে, তাহা নয়। জেলের ভিতর অনেক ছোট ছোট জেল আছে’ (কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা ২৭)।

জেলজীবন, জেল-যন্ত্রণা, কারাগারের ভেতর কয়েদিদের অজানা কথা, অপরাধীদের কথা বঙ্গবন্ধু লিখে গেছেন অকপটে; কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসে। লিখেছেন, কেন ওই অপরাধীরা অপরাধ জগতে পা দিয়েছিল; তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন ছিল। কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের দুঃখ-দুর্দশা, গণমাধ্যমের অবস্থা, শাসকগোষ্ঠীর নির্মম নির্যাতন সম্পর্কে তিনি লিখেছেন।

কারাগারে নির্মম অত্যাচারের কথা, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার বঙ্গবন্ধুর লেখায় উঠে এসেছে এভাবে- ‘রাজবন্দি হিসেবে জেল খেটেছি, সশ্রম কারাদণ্ডও ভোগ করতে হয়েছে। আবার হাজতি হিসেবেও জেল খাটতে হয়েছে। তাই সকল রকম কয়েদির অবস্থা নিজের জীবন দিয়ে বুঝতে পেরেছি’ (কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা ২৭)।

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুকে বারবার বন্দি করেও তার মনোবলে চিড় ধরাতে পারেনি। ‘কারাগারের রোজনামচা’য় ১৯৬৬ সালের ৫ জুন বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- আমার মনে হয় মোনায়েম খান সাহেব পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়ে কোনো কোনো বন্ধুর কাছ থেকে বুদ্ধি নিয়েছেন। তিনি ভুলে গেছেন এটা পূর্ব বাংলা, পশ্চিম পাকিস্তান নহে! আন্দোলন করা এবং নির্যাতন সহ্য করার ক্ষমতা এরা রাখে।

১২ জুন বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- ভরসা আমার আছে, জনগণের সমর্থন এবং ভালবাসা দুইই আছে আমাদের জন্য। তাই আন্দোলন ও পার্টির কাজ চলবে।

জন্মের পর থেকেই শিশু রাসেল দেখে আসছে, তার বাবা বাসায় থাকেন না; থাকেন কারাগারে। অবুঝ শিশুমনে তাই ধারণা হয়েছিল- কারাগারটাই বুঝি তার ‘আব্বার বাড়ি’। ১৯৬৬ সালের ১৫ জুন। রাসেল গেছে বাবাকে দেখতে। বঙ্গবন্ধু বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে- ১৮ মাসের রাসেল জেল অফিসে এসে একটুও হাসে না, যে পর্যন্ত আমাকে না দেখে। দেখলাম দূর থেকে পূর্বের মতোই ‘আব্বা আব্বা’ বলে চিৎকার করছে। জেল গেট দিয়ে একটা মাল বোঝাই ট্রাক ঢুকছিল।

আমি তাই জানালায় দাঁড়াইয়া ওকে আদর করলাম। একটু পরেই ভিতরে যেতেই রাসেল আমার গলা ধরে হেসে দিল। ওরা বলল, আমি না আসা পর্যন্ত শুধু জানালার দিকে চেয়ে থাকে, বলে ‘আব্বার বাড়ি’। এখন ওর ধারণা হয়েছে এটা ওর আব্বার বাড়ি। বঙ্গবন্ধু আরও লিখেছেন- ৮ ফেব্রুয়ারি ২ বৎসরের ছেলেটা এসে বলে, ‘আব্বা বালি চলো’। কি উত্তর ওকে আমি দেব।

ওকে ভোলাতে চেষ্টা করলাম, ও তো বুঝে না আমি কারাবন্দী। ওকে বললাম, তোমার মার বাড়ি তুমি যাও। আমি আমার বাড়ি থাকি। আবার আমাকে দেখতে এসো। ও কি বুঝতে চায়! কি করে নিয়ে যাবে এই ছোট্ট ছেলেটা, ওর দুর্বল হাত দিয়ে মুক্ত করে এই পাষাণ প্রাচীর থেকে!

জেল কোডে আছে, কোনো কয়েদিকে তিন মাসের বেশি একাকী (Solitary Confinement) রাখা চলবে না। একাকী রাখার কারণে বঙ্গবন্ধু অনশনও করেছিলেন। শাস্তি দেয়ার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে কর্তৃপক্ষ রাজনৈতিক বন্দিদের একাকী রাখত। কারাগারে একাকী থাকা যে কত কষ্টকর, তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ অনুভব করতে পারবে না।

কারাগারে অন্য বন্দিদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু দেখা করা বা কথা বলার সুযোগ পেতেন না। বঙ্গবন্ধুর বর্ণনায় তা ওঠে এসেছে এভাবে- কারও সঙ্গে আলাপ করার উপায় নাই। কারও সঙ্গে পরামর্শ করারও উপায় নাই। সান্ত্বনা দেবার কেহ নাই। কারাগারের ভিতর একাকী রাখার মতো নিষ্ঠুরতা আর কি হতে পারে?

আরেক জায়গায় লিখেছেন- জেলে রাতটাই বেশি কষ্টের। আবার যারা আমার মতো একাকী নির্জন স্থানে থাকতে বাধ্য হয় যাকে ইংরেজিতে বলে সলিটারি কনফাইয়েনমেন্ট তাদের অবস্থা কল্পনা করা যায় না।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক বন্দিকে থাকতে না দেয়ায় ঈদের দিনও তাকে একা থাকতে হতো। ‘কারাগারের রোজনামচা’য় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- একাকী কি ঈদ উদযাপন করা যায়? তারপরও যতটা সম্ভব ঈদের দিন বঙ্গবন্ধু অন্য বন্দিদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতেন।

বঙ্গবন্ধুর জবানীতে তারই একটি চিত্র হচ্ছে এরকম- নামাজ পড়ার পর শত শত কয়েদি আমাকে ঘিরে ফেলল। সকলের সাথে হাত মিলাতে আমার প্রায় আধাঘণ্টা সময় লেগেছিল। বঙ্গবন্ধু জানতেন, জীবনের আরও অনেক ঈদ হয়তো জেলে কাটাতে হবে। ‘কারাগারের রোজনামচা’য় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- আগামী ১৩ জানুয়ারি ঈদের নামাজ। ছেলেমেয়েরা জামা-কাপড় নেবে না। ঈদ করবে না, কারণ আমি জেলে। অন্য এক জায়গায় তিনি লিখেছেন- আজ কোরবানির ঈদ।

গত ঈদেও জেলে ছিলাম। এবারও জেলে। বন্দি জীবনে ঈদ উদযাপন করা একটি মর্মান্তিক ঘটনা বলা চলে। ঈদের দিন পাকিস্তানের জেলে কাটানোর স্মৃতিচারণ করেছেন বঙ্গবন্ধুর এভাবে- আমার প্রিয় জনগণ কীভাবে তাদের ঈদ উৎসব পালন করছে? এই প্রশ্ন আমি করলাম, জানি না কাকে! সেই দিন, আবার কখনো তাদের দেখা পাবো কিনা সেটা না জেনেই, আমি মোনাজাত করে আমার জনগণের মঙ্গল ও নিরাপত্তা দয়াময় আল্লাহতা’লার হাতে সমর্পণ করলাম। এটাই ছিল আমার ঈদ।

জেলজীবনে মাঝেমধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়তেন বঙ্গবন্ধু। তারই একটি খণ্ডচিত্র আমরা পাই ২৯ জুলাই ১৯৬৬ তারিখের ‘কারাগারের রোজনামচা’য়। এদিন বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- সারাদিন ব্যথায় কাতর। ডাক্তার ক্যাপ্টেন সামাদ সাহেব এলেন আমাকে দেখতে। খাবার ঔষধ দিলেন, আরও দিলেন মালিশ। বিছানায় পড়ে রইলাম। সন্ধ্যার দিকে কষ্ট করে বের হয়ে বাগানের ভেতর আরাম কেদারায় কিছু সময় বসে আবার শুয়ে পড়লাম। খুবই কষ্ট পেতেছি।

এর আগে ১৯৫০ সালে গোপালগঞ্জ জেলে থাকাকালে ‘দুর্বল হার্ট, চক্ষু যন্ত্রণা ও বাম পায়ে রিউমেটিক ব্যথা’ হয় বঙ্গবন্ধুর। খুলনা জেলে ‘ভীষণ জ্বর ও মাথাব্যথা এবং বুকে ব্যথা’ ধরা পড়ে; ‘চোখের অসুখও বাড়ে।’ ভালো চিকিৎসার দাবিতে ফরিদপুর জেলে বঙ্গবন্ধু অনশন করেন। জেল চিকিৎসকরা জোর করে টিউব ঢুকিয়ে তরল খাবার প্রবেশ করালে নাকে ক্ষত সৃষ্টি হয় আর এতে ‘হার্টের অবস্থা খারাপ হয়, পালপিটিশন বাড়ে এবং নিঃশ্বাস ফেলতে কষ্ট হয়।’ ১৯৬৬ সালে জেলে থাকাকালে বঙ্গবন্ধু ‘অনিদ্রা ও ক্ষুধামন্দায় ভোগেন।’

একাধিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও নির্জন কারাবাসেও বঙ্গবন্ধুর মনোবল নষ্ট হয়নি; অটল ছিল মনের দৃঢ়তা। ১৯৬৬ সালের ২৯ জুন ‘কারাগারের রোজনামচা’য় তিনি লিখেছেন- খুব সাবধানে থাকি আমি জেলে। শরীর রক্ষা করতে চাই, বাঁচতে চাই, কাজ আছে অনেক আমার। তবে একটা ছেড়ে আরেকটা ব্যারাম এসে দেখা দেয়।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধুকে কমান্ডো স্টাইলে গ্রেফতার করে লায়ালপুরের মিয়ানওয়ালী কারাগারে নেয়ার পর একটি অতি ক্ষুদ্র সেলে রাখা হয়-

যেখানে লোহার শিক দ্বারা বেষ্টিত ছোট্ট ফাঁকা জায়গা থেকে এই বিশ্বজগৎ প্রায় আবছা; প্রচণ্ড গরম অথচ কোনো বৈদ্যুতিক পাখা ছিল না। পরবর্তী সময়ে একটি পুরনো বৈদ্যুতিক পাখা লাগানো হল- যা মূলত ঘরের গরমকে আরও ছড়িয়ে দেবার জন্যই। এছাড়াও আরও নানা রকমের অত্যাচার ছিল সেখানে।

ইয়াহিয়ার ইচ্ছা ছিল, বিচারের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা। মার্শাল ল’ কোর্টে নেয়ার সময় যেন বঙ্গবন্ধু সুস্থ থাকেন- এ বিষয়টি তার মনে ছিল; যে কারণে বঙ্গবন্ধুকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়নি। সেখানে একজন বাঙালি বাবুর্চি আনা হয়েছিল রান্নার জন্য। কেননা, ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধুর শরীর ভেঙে যাচ্ছিল। বন্ধুবন্ধুকে দেখার জন্য একজন ডাক্তারও নিয়োগ দেয়া হয়েছিল।

এসময় লন্ডনের ফিনানশিয়াল টাইমস পত্রিকায় দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইয়াহিয়া বলে- সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, খুব শীঘ্রই বঙ্গবন্ধুর বিচার কাজ শুরু করবে। সাক্ষাৎকারে ইয়াহিয়া আরও বলে- বঙ্গবন্ধুর বিচার হবে সিক্রেট মিলিটারী ট্রাইবুন্যালে। ইয়াহিয়া যদিও বলেনি, বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে কী ধরনের কয়টি চার্জ গঠন করা হবে। কিন্তু এ কথা সে উল্লেখ করে, এই চার্জশীটে মৃত্যুদণ্ডের কয়েকটি ধারা থাকবে।

পর্বতমালায় ঘেরা মিয়ানওয়ালী কারাগার। সেখানে প্রায়ই শিলাবৃষ্টি নেমে আসত। ধূসর মেঘগুলো পাহাড়ের গায়ে মিশে থাকত। ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠে পাতলা বিবর্ণ একটা কম্বল মুড়ি দিয়ে বন্দি বঙ্গবন্ধুর দিন কাটত। একদিন প্রচণ্ড বেগে নেমে এলো ঝড়। সঙ্গে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত।

আকাশজুড়ে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। বৃষ্টির জল বাতাসে ধাক্কা খেয়ে জানালা দিয়ে আছড়ে পড়ছিল। কনকনে ঠাণ্ডা প্রতিরোধে একটা কম্বল মোটেই সহায়ক ছিল না। বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা কাঁটার মতো বঙ্গবন্ধুর মুখে বিঁধতে লাগল।

পরের দিন দুপুরবেলা বঙ্গবন্ধু হঠাৎ বাইরে তাকিয়ে দেখতে পেলেন তার সেলের দশ গজ সামনে কাঁটাতারের বেড়া ঘেঁষে কয়েকজন কয়েদি একটি বড় গর্ত খুঁড়ছে। বঙ্গবন্ধু কিছুটা অবাক হলেন। কাছে এসে ভালো করে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন, কবর খোঁড়া হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর বুঝতে অসুবিধা হল না, ওটা তার জন্যই তৈরি করা হচ্ছে; সম্ভবত দু’একদিনের মধ্যেই তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে চলেছে।

বঙ্গবন্ধু যখন মিয়ানওয়ালী কারাগারের ক্ষুদ্র কনডেম সেলে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন; তিনি জানতেন না- তার স্বপ্ন সত্যে পরিণত হয়েছে; বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। তিনি শুধু জানতেন, মৃত্যু দুয়ারে করাঘাত করছে। সময়ের চাকা ঘুরে ঘুরতে সেদিন ২৬ ডিসেম্বর। গভীর রাত। প্রচণ্ড শীত। একটি মাত্র কম্বলে শীতে বঙ্গবন্ধু ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিলেন। হঠাৎ কানে এলো একটা চলন্ত গাড়ির আওয়াজ।

জানালা দিয়ে তাকাতেই লক্ষ করলেন- একটা ট্রাক আসছে ধীরে ধীরে। ট্রাকটা সেলের সঙ্গে লাগোয়া গার্ড হাউসের সামনে এসে দাঁড়াল। বাইরে ছুটোছুটি, হাঁকডাক ও ফিসফিসানির শব্দ। হঠাৎ ঝন ঝন করে লৌহকপাট খুলে গেল। চারজন সৈন্য ভেতরে ঢুকে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে দাঁড়াল।

সামনে এসে দাঁড়ালেন বেঁটে-খাটো শ্মশ্রুমণ্ডিত জেল গভর্নর হাবিব আলী। মাথায় মিলিটারি ক্যাপ; গায়ে রেইনকোট জড়ানো। হাবিব আলী পরিচিত কর্কশ স্বরে বললেন, আপনি আমাকে বিশ্বাস করুন; আমি আপনাকে একটা নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যেতে এসেছি...

চলতে চলতে বঙ্গবন্ধু ভাবলেন- ওরা তাহলে এখনই আমাকে এই অন্ধকারের মধ্যে গুলি করে মেরে ফেলবে! কিন্তু এতসবের কী প্রয়োজন ছিল! সেলের সামনের গর্তের পাশে নিয়েও তো গোপনে মেরে ফেলতে পারত। এত দূরে নিয়ে এলো কেন? কিছুক্ষণ পর বঙ্গবন্ধু দেখলেন- পাহাড়ের গা ঘেঁষেই সুন্দর নিম্নভূমি; সেখানে সুরম্য বাংলোর সামনে সাজানো বাগান। বাগানের পিচঢালা পথ ধরে তার দিকে একজন চেনা মানুষ এগিয়ে আসছেন। তিনি জুলফিকার আলী ভুট্টো।

৮ জানুয়ারি, ১৯৭২। রাওয়ালপিণ্ডি বিমানবন্দর। সময় রাত এগারোটা। এয়ারপোর্ট তখন ব্ল্যাক আউট। থমথমে ভাব। পিআইএ’র একটি বিশেষ বিমান রানওয়েতে দাঁড়িয়ে আছে। পাইলট, স্টুয়ার্ড, এয়ারহোস্টেস যার যার জায়গায় অন্ধকারে বসে আছে। গোপনীয়তা রক্ষার তাগিদ আসছে ঘন ঘন।

সৈন্যরা যার যার সীমানায় টহল দিচ্ছে। রাত ২টায় রানওয়েতে অপেক্ষমাণ একমাত্র বিমানযাত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজ রাতেই তাকে নিয়ে বিশেষ এই বিমানটি উড়ে যাবে। আর সেইসঙ্গে পরিসমাপ্তি ঘটবে বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ জীবনব্যাপী নিঃসঙ্গ, একাকী, দুঃসহ কারাজীবনের।

৯ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী পাকিস্তানের বিমানটি কুয়াশাসিক্ত শীতার্ত ভোরে হিথরো বিমানবন্দরে অবতরণ করার পর পুলিশ প্রহরায় একটা রোলসরয়েস গাড়ি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গেল ক্লারিজ হোটেলে। প্রবাসীদের মুখেই বঙ্গবন্ধু প্রথম শুনতে পেলেন, স্বদেশে পাকিস্তান বাহিনীর নিষ্ঠুর গণহত্যার সংবাদ।

খুন, ধর্ষণ, আগুনের বিভীষিকাময় ছবি; রক্তে রক্তে নদী বয়ে যাওয়ার কাহিনী। এসব শুনে দু’হাতে মুখ ঢেকে বঙ্গবন্ধু শিশুর মতো কেঁদে ফেললেন। কান্নাজড়িত গলায় বারবার কেবল একটা কথাই বলছিলেন- আহ! আমার দুঃখিনী বাংলা মা।

১০ জানুয়ারি, ১৯৭২। বেলা ১টা ৪১ মিনিটে জাতির অবিসংবাদিত নেতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার স্বপ্নের মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন। পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে বিজয়ীর বেশে এলেন ইতিহাসের মহানায়ক, বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বিকাল ৫টায় তিনি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান, বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে ভাষণ দেন।

সশ্রদ্ধচিত্তে তিনি সবার ত্যাগের কথা স্মরণ করেন, সবাইকে দেশ গড়ার কাজে উদ্বুদ্ধ করেন। রাজনীতির ধ্র“পদী কবি বলেন- যে মাটিকে আমি এত ভালোবাসি, যে মানুষকে আমি এত ভালোবাসি, যে জাতিকে আমি এত ভালোবাসি; আমি জানতাম না, সে বাংলায় আমি যেতে পারব কিনা। আজ আমি বাংলায় ফিরে এসেছি বাংলার ভাইদের কাছে, মায়েদের কাছে, বোনদের কাছে। বাংলা আমার স্বাধীন, বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।

১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কর্মসূচি দিয়ে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালনের যে ক্ষণগণনা শুরু হয়েছিল; আজ ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর শুভ জন্মদিন। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়ে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। এসব কর্মসূচি চলবে আজ থেকে পরবর্তী এক বছর পর্যন্ত।

মুজিববর্ষ সফল ও সার্থক হোক। মুজিববর্ষ পালনের মধ্যে দিয়ে নতুন প্রজন্মের প্রতিশ্রুতি হোক, বঙ্গবন্ধুর যাপিত জীবন এবং রাজনৈতিক ও উন্নয়ন দর্শন থেকে শিক্ষা নেয়া; আরও প্রতিশ্রুতি হোক, সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গঠন। মাদক-দুর্নীতি-সন্ত্রাস ও শোষণহীন সমাজ গঠনে আত্মনিয়োগের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়নে সচেষ্ট হবো- এ শপথ অন্তরে লালন করুক প্রত্যেক বাঙালি।

পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা তাদের কাজের জন্য, গুণের জন্য মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকেন অনন্তকাল। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এমন একটি নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যিনি ভাষণে, শাসনে, দেশপ্রেমে, নেতৃত্বে ইতিহাসে অমোচনীয় এক নাম, তিনি জাতির পিতা।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা তার স্বাধীন দেশে ফেরার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন কাজে আত্মনিয়োগ করলেন। তিনি এজন্য সবুজবিপ্লবের ডাক দিলেন। দেশের মানুষের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, কৃষির উন্নয়নে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে লাগলেন।

তিনি জানতেন, এ দেশের সব সম্পদ হারিয়ে গেছে। পাকিস্তানি বিত্তবানরা সব ধন-সম্পদ লুট করে নিয়ে গেছে। আমাদের রাস্তা-ঘাট, স্কুল-কলেজ, হাট-বাজার, মসজিদ-মন্দির, শিল্প-কারখানা তারা ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। যুদ্ধের তাণ্ডবে আমাদের দেশের শ্রমিক-মুজুর, কৃষক-জেলে, তাঁতী-ধোপা সবাই সর্বস্বান্ত। দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ শোষকের শোষণে নিঃস্ব।

তাদের রক্ষা করতে দ্রুততম সময়ে কৌশল নির্ধারণ করে উৎপাদনমুখী করতে না পারলে মৌলিক চাহিদার অভাবে জাতি দুর্বিষহ অবস্থায় পড়বে। এজন্য দেশের উন্নয়নে কাজ করতে হবে; ভবিষ্যৎ দিক-নির্দেশনা নিয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

বঙ্গবন্ধুর সেদিনের নির্দেশিত কৌশল ও স্বপ্ন আজকের বাংলাদেশের উন্নয়ন ও ক্ষুধামুক্তির জাগরণ সৃষ্টির উপজীব্য। ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন।

বাংলাদেশের জনগণের নির্ভার জীবনযাপনের যে দায়িত্ব তিনি কাঁধে তুলে নিয়েছেন, তা পালনে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়ার নেপথ্যপুরুষ হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান; যার জন্য আমাদের স্বাধীনতা পাওয়া। বঙ্গবন্ধুর রক্তের কাছে আমাদের ইতিহাস ঋণী। জাতির জনকের জন্মশতবর্ষের এই শুভক্ষণে তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করছি-

‘ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর রৌদ্র ঝরে

চিরকাল, গান হয়ে

নেমে আসে শ্রাবণের বৃষ্টিধারা; যাঁর নামের ওপর

কখনো ধুলো জমতে দেয় না হাওয়া,

ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর ঝরে

মুক্তিযোদ্ধাদের জয়ধ্বনি।’

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে লেখা কবি শামসুর রাহমানের এ কবিতা কখনো পুরনো হবে না; যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, জনকের নাম আর মুক্তিযুদ্ধের অমর স্মৃতি স্মরিত হবে ততদিন।

মোকাম্মেল হোসেন : সহকারী সম্পাদক, যুগান্তর