কার্তিকের শেষে বইছে শীতের হাওয়া
jugantor
কার্তিকের শেষে বইছে শীতের হাওয়া

  মুসতাক আহমদ  

০৮ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রকৃতিতে গত কয়েকদিন ধরে পুরোদমে বইছে শীতের হাওয়া। পঞ্জিকার হিসাবে নীল কুয়াশার কার্তিকের তৃতীয় সপ্তাহ শেষ হয়েছে। আবহমান গ্রাম বাংলা এমনকি ইট-পাথরের শহরেও শুরু হয়েছে পুরোপুরি শীতের আমেজ। শুধু শেষ রাত নয়, কোথাও মধ্যরাতের আগেই শরীরে চাপাতে হয় কাঁথা-কম্বল। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এখনি পরতে হচ্ছে গরম পোশাক।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, মূলত চার কারণে এবার হঠাৎ জাঁকিয়ে বসেছে শীত। এগুলো হচ্ছে ঘূর্ণিঝড় নিম্নচাপ ও লঘুচাপের প্রভাব; মৌসুমের বিলম্বিত প্রস্থান; সূর্যের দক্ষিণায়ন; সূর্যের স্বল্পমেয়াদি কিরণ কাল এবং রাতের বর্ধিত ব্যাপ্তি। মে মাসের শেষের দিকে বাংলাদেশসহ ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় আম্পান। এর কয়েকদিনের মধ্যে আরব সাগর থেকে উৎসারিত ঘূর্ণিঝড় নিসর্গ আঘাত হানে ভারতে। ঘূর্ণিঝড় দুটির প্রভাবে বাংলাদেশ ব্যাপক বৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে, ৫ থেকে ৭ দফা বন্যার কবলে পড়তে হয় এ দেশকে। অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহে সর্বশেষ বঙ্গোপসাগরে গভীর নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। এর প্রভাবে ও বেশ কয়েকদিন ধরে বৃষ্টি হয়।

মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এ ৫ মাসে ঘন ঘন নিম্নচাপ লঘুচাপের কবলে পড়ে দেশ। এতে অধিকাংশ সময় আকাশ থাকে মেঘলা। মেঘে ঢাকা আকাশ থেকে সূর্যের আলো ধরণী গরম করতে পারেনি। অন্যদিকে অতি বৃষ্টি বন্যার পাশাপাশি দেশের ভূ-ভাগকে আর্দ্র করে তোলে। আগে থেকেই শীতল ছিল বাংলার প্রকৃতি। অন্যদিকে ২৩ জুনের পরে সূর্যের দক্ষিণায়ণ শুরু হয়। ইতোমধ্যে সূর্য চলে গেছে বঙ্গোপসাগরের উপরে। খাড়াভাবে যে সূর্য বাংলাদেশকে তাপ দিত সেটি এখন দিচ্ছে তীর্যকভাবে। দেশের দক্ষিণাঞ্চল কমবেশি আলো পেলেও উত্তরাঞ্চল থেকে মধ্যাঞ্চল বা ঢাকা পর্যন্ত উত্তপ্ত হয় কমই। এরমধ্যে অতি বৃষ্টি আর ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ প্রকৃতির কারণে হালে পানি লাগে মৌসুমের। ফলে যে মৌসুমের সেপ্টেম্বরেই এটাই হওয়ার কথা সেটি অক্টোবর পর্যন্ত অবস্থান করে। এ তিনটি পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দিনের সংকুচিত ব্যাপ্তিকাল এবং প্রলম্বিত রাত। দিনের শুরু এবং অপরাহ্নের পর সূর্য বাংলাদেশকে এমন উষ্ণ করতে পারে না। দুপুরের দিকে যতটুকু তাপ দেয় তাতে ১৩ ঘণ্টা দীর্ঘ রাতে ভূ-ভাগ যে শীতল হয় সেটি হল স্বাভাবিক হতে পারে না। সব মিলিয়ে বেড়েছে শীতের প্রকোপ।

আবহাওয়া অধিদফতরের (বিএমডি) আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক যুগান্তরকে বলেন, নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে এবার পুরোদমে শীত পড়তে পারে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, নাতিশীতোষ্ণ দেশ বাংলাদেশ পাঁচ কারণে শীতের আগমন ঘটে। এগুলো হচ্ছে- সূর্যের দক্ষিণায়ন; বাতাসের দিক পরিবর্তন; স্বল্পমেয়াদি কিরণকাল, হিমালয়ের দিক থেকে আশা শীতল বায়ু; রাতের বড় ব্যাপ্তিকাল। এসব কারণের সঙ্গে এ বছর যুক্ত হয়েছে বৈরী প্রাকৃতিক পরিস্থিতি তথা ঘূর্ণিঝড়, লঘু ও নিম্নচাপ পরিস্থিতি। এ কারণে আকাশে প্রচুর মেঘ ছিল। দিনের পর দিন সূর্য অনেকভাবে বাংলাদেশকে তাপ দিতে পারেনি। ফলে আগে থেকে শীতল ধরণী উল্লিখিত পাঁচটি বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে শীত নিয়ে এসেছে।

বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, এমনিতে জলবায়ু পরিবর্তনের একটি কুফল বাংলাদেশসহ বিশ্ববাসী ভোগ করছে। এর মধ্যেই বছর শুরু হয়েছে আবহাওয়ার বিশেষ পরিস্থিতি লা নিনা। সাধারণত লা নিনার বছরে আমাদের এ অঞ্চলে শীতকালে তীব্র শীতের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। এখন পর্যন্ত বিদ্যমান পরিস্থিতি লা নিনার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কুফলকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। কেননা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ার যে কোনো পরিস্থিতি চরম রূপ লাভ করবে বলে বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস আছে। চরম রূপ বলতে শীতকালে অতিমাত্রায় শীত গরমে তীব্র তাপদাহ আর বর্ষায় অতিবৃষ্টি ও বড় বন্যা হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

শনিবার বিএমডির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী দেখা গেছে, রাজশাহী এবং রংপুর অঞ্চলে বেশি করেছে। দেশের কোথাও ব্যারোমিটারে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পার করেনি। এ ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা যে করেছে কক্সবাজারে। আর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে হিমালয় কন্যা সেতু তেঁতুলিয়ায় ১৩.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ৩১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বঙ্গোসাগরের তীরের থানা টেকনাফে। বিএমডি জানিয়েছে, আগামী ৩ দিন পরিস্থিতি একই রকম অব্যাহত থাকতে পারে।

কার্তিকের শেষে বইছে শীতের হাওয়া

 মুসতাক আহমদ 
০৮ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রকৃতিতে গত কয়েকদিন ধরে পুরোদমে বইছে শীতের হাওয়া। পঞ্জিকার হিসাবে নীল কুয়াশার কার্তিকের তৃতীয় সপ্তাহ শেষ হয়েছে। আবহমান গ্রাম বাংলা এমনকি ইট-পাথরের শহরেও শুরু হয়েছে পুরোপুরি শীতের আমেজ। শুধু শেষ রাত নয়, কোথাও মধ্যরাতের আগেই শরীরে চাপাতে হয় কাঁথা-কম্বল। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এখনি পরতে হচ্ছে গরম পোশাক।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, মূলত চার কারণে এবার হঠাৎ জাঁকিয়ে বসেছে শীত। এগুলো হচ্ছে ঘূর্ণিঝড় নিম্নচাপ ও লঘুচাপের প্রভাব; মৌসুমের বিলম্বিত প্রস্থান; সূর্যের দক্ষিণায়ন; সূর্যের স্বল্পমেয়াদি কিরণ কাল এবং রাতের বর্ধিত ব্যাপ্তি। মে মাসের শেষের দিকে বাংলাদেশসহ ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় আম্পান। এর কয়েকদিনের মধ্যে আরব সাগর থেকে উৎসারিত ঘূর্ণিঝড় নিসর্গ আঘাত হানে ভারতে। ঘূর্ণিঝড় দুটির প্রভাবে বাংলাদেশ ব্যাপক বৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে, ৫ থেকে ৭ দফা বন্যার কবলে পড়তে হয় এ দেশকে। অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহে সর্বশেষ বঙ্গোপসাগরে গভীর নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। এর প্রভাবে ও বেশ কয়েকদিন ধরে বৃষ্টি হয়।

মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এ ৫ মাসে ঘন ঘন নিম্নচাপ লঘুচাপের কবলে পড়ে দেশ। এতে অধিকাংশ সময় আকাশ থাকে মেঘলা। মেঘে ঢাকা আকাশ থেকে সূর্যের আলো ধরণী গরম করতে পারেনি। অন্যদিকে অতি বৃষ্টি বন্যার পাশাপাশি দেশের ভূ-ভাগকে আর্দ্র করে তোলে। আগে থেকেই শীতল ছিল বাংলার প্রকৃতি। অন্যদিকে ২৩ জুনের পরে সূর্যের দক্ষিণায়ণ শুরু হয়। ইতোমধ্যে সূর্য চলে গেছে বঙ্গোপসাগরের উপরে। খাড়াভাবে যে সূর্য বাংলাদেশকে তাপ দিত সেটি এখন দিচ্ছে তীর্যকভাবে। দেশের দক্ষিণাঞ্চল কমবেশি আলো পেলেও উত্তরাঞ্চল থেকে মধ্যাঞ্চল বা ঢাকা পর্যন্ত উত্তপ্ত হয় কমই। এরমধ্যে অতি বৃষ্টি আর ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ প্রকৃতির কারণে হালে পানি লাগে মৌসুমের। ফলে যে মৌসুমের সেপ্টেম্বরেই এটাই হওয়ার কথা সেটি অক্টোবর পর্যন্ত অবস্থান করে। এ তিনটি পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দিনের সংকুচিত ব্যাপ্তিকাল এবং প্রলম্বিত রাত। দিনের শুরু এবং অপরাহ্নের পর সূর্য বাংলাদেশকে এমন উষ্ণ করতে পারে না। দুপুরের দিকে যতটুকু তাপ দেয় তাতে ১৩ ঘণ্টা দীর্ঘ রাতে ভূ-ভাগ যে শীতল হয় সেটি হল স্বাভাবিক হতে পারে না। সব মিলিয়ে বেড়েছে শীতের প্রকোপ।

আবহাওয়া অধিদফতরের (বিএমডি) আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক যুগান্তরকে বলেন, নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে এবার পুরোদমে শীত পড়তে পারে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, নাতিশীতোষ্ণ দেশ বাংলাদেশ পাঁচ কারণে শীতের আগমন ঘটে। এগুলো হচ্ছে- সূর্যের দক্ষিণায়ন; বাতাসের দিক পরিবর্তন; স্বল্পমেয়াদি কিরণকাল, হিমালয়ের দিক থেকে আশা শীতল বায়ু; রাতের বড় ব্যাপ্তিকাল। এসব কারণের সঙ্গে এ বছর যুক্ত হয়েছে বৈরী প্রাকৃতিক পরিস্থিতি তথা ঘূর্ণিঝড়, লঘু ও নিম্নচাপ পরিস্থিতি। এ কারণে আকাশে প্রচুর মেঘ ছিল। দিনের পর দিন সূর্য অনেকভাবে বাংলাদেশকে তাপ দিতে পারেনি। ফলে আগে থেকে শীতল ধরণী উল্লিখিত পাঁচটি বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে শীত নিয়ে এসেছে।

বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, এমনিতে জলবায়ু পরিবর্তনের একটি কুফল বাংলাদেশসহ বিশ্ববাসী ভোগ করছে। এর মধ্যেই বছর শুরু হয়েছে আবহাওয়ার বিশেষ পরিস্থিতি লা নিনা। সাধারণত লা নিনার বছরে আমাদের এ অঞ্চলে শীতকালে তীব্র শীতের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। এখন পর্যন্ত বিদ্যমান পরিস্থিতি লা নিনার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কুফলকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। কেননা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ার যে কোনো পরিস্থিতি চরম রূপ লাভ করবে বলে বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস আছে। চরম রূপ বলতে শীতকালে অতিমাত্রায় শীত গরমে তীব্র তাপদাহ আর বর্ষায় অতিবৃষ্টি ও বড় বন্যা হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

শনিবার বিএমডির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী দেখা গেছে, রাজশাহী এবং রংপুর অঞ্চলে বেশি করেছে। দেশের কোথাও ব্যারোমিটারে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পার করেনি। এ ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা যে করেছে কক্সবাজারে। আর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে হিমালয় কন্যা সেতু তেঁতুলিয়ায় ১৩.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ৩১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বঙ্গোসাগরের তীরের থানা টেকনাফে। বিএমডি জানিয়েছে, আগামী ৩ দিন পরিস্থিতি একই রকম অব্যাহত থাকতে পারে।