কর-জিডিপি অনুপাত
কর আদায়ে দুর্বল হচ্ছে বাংলাদেশ
Advertisement
মনির হোসেন
প্রকাশ: ১০ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) বিপরীতে কর আদায়ে বিশ্বে অন্যতম দুর্বল অবস্থানে বাংলাদেশ। ১৮৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৫তম। করোনার কারণে এ অবস্থান আরও নিচে নামছে। জিডিপির অনুপাতে গত ৫ বছরের গড় হিসাবে বাংলাদেশের কর আদায় ৯ দশমিক ৯০ শতাংশ। পাশের দেশ ভারতে ১৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ। পাকিস্তানেও তা ১৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে এ তথ্য।
তবে বিষয়টিকে রাজস্ব খাতের দুর্বলতা হিসাবে চিহ্নিত করেছে সরকার। এ কারণে মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতিতে নতুন কৌশলের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে কর আদায়ে প্রথম অবস্থানে ফ্রান্স এবং সবার নিচে কুয়েত। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, টেকসই অর্থনীতির জন্য আমাদের কর আদায় বাড়ানো জরুরি। জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, কর আদায় বাংলাদেশের অন্যতম দুর্বলতা। জিডিপির অনুপাতে অন্যতম খারাপ অবস্থানে বাংলাদেশ। আর এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। না হলে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি বলেন, এ অবস্থার উত্তরণের জন্য কর ফাঁকি রোধ করতে হবে। পাশাপাশি করের জন্য নতুন খাত চিহ্নিত করা জরুরি। তার মতে, এখনো প্রচুর পরিমাণ করযোগ্য লোক, যারা কর দেন না। তাদেরকে চিহ্নিত করে করের আওতায় আনতে হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে গত বছর কর জিডিপির একটি প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়েছে। এ প্রতিবেদনে ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৫ বছরের তথ্য মূল্যায়ন করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুসারে বাংলাদেশে জিডিপির অনুপাতে কর আদায় ৯ দশমিক ৯০ শতাংশ। এছাড়া আইএমএফ-এর তথ্য অনুসারে জিডিপির অনুপাতে কর আদায়ের দিক থেকে ১৮৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৫ নম্বরে। জিডিপির অনুপাতে বাজেটের আকার ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং সরকারি ঋণ ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ। এই তালিকায় প্রথম অবস্থানে রয়েছে ইউরোপের দেশ ফ্রান্স এবং সর্বনিম্নে কুয়েত। ফ্রান্স জিডিপির ৪৬ দশমিক ২ শতাংশ কর আদায় করে। আর বাজেটের আকার জিডিপির ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ। এছাড়াও দেশটির সরকারি ঋণ জিডিপির ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশ। এর পরেই রয়েছে ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, সুইডেন ও ফিনল্যান্ড। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ৫৬ নম্বরে। দেশটির কর আদায় ২৭ দশমিক ১ শতাংশ। এছাড়া জিডিপির ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ কর আদায় করে বিশ্বে ১০০ নম্বরে রয়েছে আমাদের প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম। এছাড়াও পাশের দেশ নেপালে ২১ দশমিক ৫০ শতাংশ, শ্রীলংকায় ১২ দশমিক ৭৮, ভারতে ১৯ দশমিক ৬৭, পাকিস্তানে ১৪ দশমিক ৮৮, উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর গড় ২৪ দশমিক ৭ এবং উন্নত বিশ্বে ৩৫ দশমিক ৮ শতাংশ। আর কুয়েতে কর আদায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে দেশটির বিপুল পরিমাণ খনিজসম্পদ রয়েছে। এগুলো বিক্রি করে অর্থনীতি শক্তিশালী করেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই বিবৃতিতে বলা হয়, ১০ বছরে বাংলাদেশে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে, এর সঙ্গে মিলিয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানো সম্ভব হয়নি। তাই রাজস্ব ব্যবস্থায় এই দুর্বলতা বিবেচনায় নিয়ে মধ্যমেয়াদে কার্যকর রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আয় বাড়ানোর জন্য নতুনভাবে কৌশল ও পরিকল্পনা জরুরি।
তবে কর আদায়ের দুর্বলতার ব্যাখ্যা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বাজেট নিয়ে যুগান্তরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বাংলাদেশে যত ধরনের কর ছাড় দেওয়া হয়, অন্য কোনো প্রতিবেশী দেশে তা দেওয়া হয় না। আমাদের ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্প ও মেগা প্রকল্পসহ বিভিন্ন খাতের পণ্য আমদানিতে প্রচুর পরিমাণ কর ছাড় দেওয়া হয়। অন্যদিকে সরকারি হিসাবের এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে বুক ট্রান্সফার না করার দরুন অনাদায়ি ট্যাক্সের হিসাবও নেওয়া হয় না। এছাড়াও বিভিন্ন দেশীয় শিল্পে কর ছাড় দেওয়া হয়। এগুলো আদায় হলে আমাদের কর জিডিপি ১৪ থেকে ১৫ শতাংশে চলে যেত।
জানা গেছে, আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জিডিপির আকার ধরা হয়েছে ৩৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪০ কোটি টাকা। আর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। এ হিসাবে জিডিপির অনুপাতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ। কর আদায় নিয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ সিপিডির সিনিয়র রিসার্স ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, বাংলাদেশের করব্যবস্থায় যে পরিমাণ ফাঁকি দেওয়া হয়, তা অন্য কোনো দেশে নেই। তিনি বলেন, কর ফাঁকি বন্ধ করতে পারলে রাজস্ব আদায়ে ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি সম্ভব। কিন্তু এই ধরনের ফাঁকি বন্ধে যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ এবং পরিকল্পনা থাকা দরকার ছিল, এবারের বাজেটে সেই ধরনের পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
