মেডিকেল টেকনোলজি কোর্স
দক্ষ চিকিৎসা সহযোগী তৈরিতে শিক্ষা বোর্ড
কোর্স পরিচালনায় সাইনবোর্ড সর্বস্ব প্রতিষ্ঠান * অ্যালাইড হেলথ শিক্ষা বোর্ড আইন-২০২১ খসড়া প্রণয়ন
Advertisement
জাহিদ হাসান
প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দক্ষ চিকিৎসা সহযোগী তৈরি করতে মেডিকেল টেকনোলজি কোর্স পরিচালনায় নতুন শিক্ষা বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে ‘অ্যালাইড হেলথ শিক্ষা বোর্ড আইন-২০২১’ নামে খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে স্বাস্থ্যসেবায় দক্ষ জনবল তৈরি হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বোর্ড-সংশ্লিষ্টরা যুগান্তরকে বলেন, মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর চিকিৎসা অনেকাংশে নির্ভরশীল। কিন্তু দেশে সাইনবোর্ড-সর্বস্ব কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নামসর্বস্ব মেডিকেল টেকনোলজিস্ট কোর্স পরিচালনা করছে। স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে হাতে-কলমে শেখার ঘাটতি রয়েছে। ফলে দক্ষ জনবল তৈরি সম্ভব হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অ্যালাইড হেলথ শিক্ষা বোর্ডে নির্দিষ্ট কোর্স কারিকুলাম থাকবে। এতে দক্ষ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট তৈরি করা সম্ভব হবে। আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশের মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের সনদের মানও বাড়বে। উচ্চশিক্ষায় দেশের যে কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি অথবা চাকরি ক্ষেত্রে শিক্ষা বোর্ড-সংক্রান্ত জটিলতার অবসান ঘটবে। কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এনায়েত হোসেন যুগান্তরকে বলেন, নতুন বোর্ডের কাগজপত্র স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে মন্ত্রিপরিষদে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ একবার দেখে পর্যবেক্ষণও দিয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে আবার মন্ত্রিপরিষদে পাঠানো হবে। সেখানে বেশকিছু ধাপ পার হয়ে এরপর আইন হিসাবে পাশ হবে। তবে কবে নাগাদ প্রক্রিয়াটি শেষ হবে, তা তিনি বলতে পারছেন না। কারণ একটি আইন হতে একাধিক মন্ত্রণালয়ের সম্পৃক্ততা থাকে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আমরা কাজটি করার চেষ্টা করছি।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্র্ধ্বতন কর্মকর্তারা যুগান্তরকে বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে ১৯৬২ সাল থেকে রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদ মেডিকেল টেকনোলজি, মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট কোর্সসহ বিভিন্ন কোর্স পরিচালনা করে আসছে। কিন্তু চিকিৎসা শিক্ষাসংক্রান্ত বিষয়ে ২০০৫ সালে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড কোর্সটি চালু করার পর জটিলতা তৈরি হয়। সমস্যা নিরসনে ২০০৭ সালে গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের মেডিকেল টেকনোলজি কোর্সটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন আনার সিদ্ধান্ত নেয়। ওয়ান আমব্রেলা কনসেপ্টের আওতায় কোর্স পরিচালনা এবং রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদকে শিক্ষা বোর্ডে রূপান্তরিত করার সুপারিশ করে। কিন্তু এ সুপারিশ উপেক্ষা করে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড কোর্স পরিচালনা অব্যাহত রাখে। এরই মধ্যে ২০১২ সালে নার্সিং কোর্স পরিচালনা শুরু করলে জটিলতা আরও বাড়তে থাকে।
এমন পরিস্থিতিতে ২০১৩ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর শূন্য পদে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করে। যেখানে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল না। তারা উচ্চ আদালতে মামলা করে। এ কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। এ ব্যাপারে ২০১৬ সালের নভেম্বরে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ একটি রায় দেন। রায়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সুপারিশের আলোকে ওয়ান আমব্রেলা কনসেপ্ট বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু তিন বছরেও ওই নির্দেশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় লিভ টু আপিল করা হয়। এতে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হয়।
সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের আদেশ এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগ গড়িমসি শুরু করে। এতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়াধীন প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করা মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। এ জটিলতা নিরসনে প্রধানমন্ত্রী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন। পরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আইন মন্ত্রণালয়, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, নার্সিং কাউন্সিল, রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে ২০১৯ সালে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠিত হয়।
সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিলকারী ‘বেকার অ্যান্ড প্রাইভেট সার্ভিসেস মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের’ সভাপতি শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদকে বোর্ডে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্তকে তারা ইতিবাচক হিসাবে দেখছেন। তবে বোর্ড গঠন করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। আদালত ও আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সব নির্দেশনা অবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোশিয়েশনের সাবেক মহাসচিব (কেন্দ্রীয় সংসদ) সেলিম মোল্লা যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অনুমোদিত চিকিৎসা অনুষদের তিন বছর মেয়াদি এবং এক বছর ইন্টার্নসহ ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট (ডিএমএ) কোর্স রয়েছে। তিন বছরের ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল টেকনোলজি কোর্স রয়েছে। এছাড়া ল্যাবরেটরি টেকনোলজি, ডেন্টাল টেকনোলজি, রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং, রেডিওথেরাপি, সেনিটারি ইনস্পেকটরশিপ, অকুপেশনাল থেরাপি, ফিজিওথেরাপি, অপারেশন থিয়েটার অ্যাসিস্ট্যান্টে (ওটিএ), ইনসেনটিভ কেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট (আইসিএ), কার্ডিওলজি, কার্ডিয়াক পারফিউশন বিষয়ে ডিপ্লোমা কোর্স চালু রয়েছে। কিন্তু অনেকে নামে-বেনামে এসব পরিচালনা করে আসছিল। এতে চিকিৎসাসেবার মতো মৌলিক বিষয়ের মান প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছিল। এখন নতুন বোর্ড হলে দক্ষ জনবল তৈরি হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিক্ষা বোর্ডের খসড়া আইনের অধ্যায় ৩ ও ২৮ ধারাটি (পেনশন ও আনুতোষিক) আইনে সংযোজন করার বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সচিবের মতামত চাওয়া হয়েছে। সেখান থেকে মতামত পাওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব সেটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত অ্যালাইড হেলথ শিক্ষা বোর্ড বাস্তবায়নে গত বছরের অক্টোবরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে সভা অনুষ্ঠিত হয়। আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির ওই সভায় বোর্ডের আইনের কিছু ধারার সংশোধনসহ খসড়া মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়। সভায় জানানো হয়, সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের লিভ টু আপিলের (২১৪৩/১৬) পরিপ্রেক্ষিতে অ্যালাইড হেলথ শিক্ষা বোর্ড আইন-২০২১-এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সোলতান আহমদের সভাপতিত্বে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। সভায় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব, যুগ্মসচিব, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব (আইন-২), জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব, বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন বিশেষজ্ঞ, জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
