খেলাপি ঋণের করাল গ্রাসে নতুন ব্যাংক

  হামিদ বিশ্বাস ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান সরকারের সময়ে লাইসেন্স পাওয়া নতুন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো অব্যবস্থাপনায় ডুবতে বসেছে। এরই মধ্যে এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ আড়াই হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

প্রতি প্রান্তিকেই তা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। শুধু তা-ই নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য মন্দা থাকায় এবং প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে কিছু ব্যাংক আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ে ঝুঁকে পড়ে। তারই মাশুল দিয়ে যাচ্ছে এখন। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া এসব ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৩ সালে। অথচ কার্যক্রমে আসার মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণের কবলে পড়েছে এসব ব্যাংক। এতে আর্থিক ঝুঁকি বাড়ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত নতুন ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪২০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ৭১৩ কোটি টাকা। এতে এক বছরের ব্যবধানে এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা। খেলাপি প্রবৃদ্ধি প্রায় সাড়ে তিনগুণ।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, নতুন ৯টি ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া ঠিক হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক সে সময় আপত্তি জানিয়েছিল; কিন্তু চাপের মুখে তারা লাইসেন্স দিতে বাধ্য হয়। কয়েকটি ব্যাংকে ঋণ অনিয়ম এবং সব ব্যাংকের মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণই প্রমাণ করছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই সময়ের বিরোধিতা সঠিক ছিল।

খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নতুন ব্যাংকের মধ্যে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ রয়েছে ফারমার্স ব্যাংকের। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দেড় হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি এবং লুটপাটের কারণে ব্যাংকটি একপর্যায়ে অর্থশূন্য হয়ে পড়ে। এমনকি গ্রাহকের টাকা পর্যন্ত ফেরত দিতে পারছিল না। অবশেষে ফারমার্স ব্যাংককে বাঁচাতে ৭১৫ কোটি টাকা জোগান দেয়া হয়।

ইতিমধ্যে ব্যাংকটির পর্ষদে কয়েক দফা পরিবর্তন আসে। বর্তমানে সারা দেশে ৫৭টি শাখা নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে ব্যাংকটি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নতুন পর্ষদ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।

জানতে চাইলে ফারমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সারাফাত বলেন, আমরা দায়িত্ব নেয়ার পর বড় গ্রাহক থেকে ৪৫৩ কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে। গত চার মাসে ক্ষুদ্র আমানতকারীকে ফেরত দিয়েছি ৯৩৮ কোটি টাকা।

এছাড়া জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে নতুন আমানত সংগ্রহ করা হয়েছে ২৬১ কোটি টাকা। তিনি বলেন, মানুষের আস্থা ফেরাতে ব্যাংকটির নাম পরিবর্তনের চিন্তা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাচ্ছি।

জুন প্রান্তিকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের তালিকায় রয়েছে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক। ব্যাংকটির ২৭৩ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে; যা এক বছর আগে ছিল ১৯১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। নানান অনিয়ম-অভিযোগের এক পর্যায়ে এ ব্যাংকের নেতৃত্বেও পরিবর্তন আসে।

বর্তমানে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের ৬১টি শাখা রয়েছে। এর মধ্যে শহরে ৩১টি এবং গ্রামে ৩০টি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান এসএম তমাল পারভেজ যুগান্তরকে বলেন, আগে যেসব ঋণ দেয়া হয়, তাতে নজরদারি কম ছিল। সে কারণে খেলাপি ঋণ কিছুটা বেড়েছে। আশা করছি দ্রুতই আমরা এটি কমিয়ে আনতে পারব। ইতিমধ্যে পরিচালকদের নেয়া সব ঋণ ফেরত আনা হয়েছে।

খেলাপি ঋণের তৃতীয় শীর্ষস্থানে রয়েছে মেঘনা ব্যাংক। বর্তমানে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ রয়েছে ১৬২ কোটি ২৬ লাখ টাকা; যা আগের বছর একই সময়ে ছিল মাত্র ৫৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। ২০ সদস্যবিশিষ্ট পরিচালনা পর্ষদের এ ব্যাংকের নেতৃত্বে রয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা ও রংপুরের সংসদ সদস্য এইচএন আশিকুর রহমান।

এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের জুন পর্যন্ত ঋণ খেলাপি হয়েছে ১১১ কোটি ৩১ লাখ টাকা; যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৬৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।

এনআরবি ব্যাংকের জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণ রয়েছে ১১১ কোটি ৩০ লাখ টাকা; যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩১ কোটি টাকা। ইউনিয়ন ব্যাংকের জুন পর্যন্ত ঋণ খেলাপি হয়েছে ৭৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা; যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।

চলতি বছরের জুন পর্যন্ত মিডল্যান্ড ব্যাংকের খেলাপি ঋণ হয়েছে ৬৫ কোটি ২৮ লাখ টাকা; যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের জুন পর্যন্ত ঋণ খেলাপি হয়েছে ৫৪ কোটি টাকা; যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১১ কোটি টাকা। শাখা খোলা হয়েছে ৬৪টি।

এ ব্যাংকের পরিচালক ২০ জন। সাউথ বাংলা ব্যাংকে বর্তমানে চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন এসএম আমজাদ হোসেন। এমডির দায়িত্ব পালন করছেন মো. গোলাম ফারুক। মধুমতি ব্যাংকের জুন পর্যন্ত ঋণ খেলাপি রয়েছে ৪৭ কোটি টাকা।

আগের বছর একই সময়ে ছিল ৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন ১৯ জন সদস্য। ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসের ব্যাংক হিসেবে পরিচিতি পেলেও ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন হুমায়ূন কবির।

আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত