লোকরঞ্জনবাদের শেষ কোথায়?

  মিফতাহ তালহা ১৯ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

লোকরঞ্জনবাদের শেষ কোথায়?

গণতন্ত্রের নামে বর্তমান দুনিয়ায় লোকরঞ্জনবাদ বেশ ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। নির্বাচনে খুব সহজে কেল্লাফতে করার জন্য দরকার জনগণের মনোরঞ্জন।

এদিকে নির্বাচন ছাড়া গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতায় আসার বিকল্প কোনো পথও নেই। ফলে রাজনীতিকরা খুব সঙ্গত কারণেই এদিকে মনোযোগ দিচ্ছেন। সমস্যা হল, রাজনীতিকরা যখন দেখতে পান অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির মাধ্যমে একটি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মনোরঞ্জন করা বেশ কঠিন, তখন তারা বিকল্প সহজ পথটি বেছে নেন নির্বাচনে কেল্লাফতে করার জন্য।

বিকল্প পথটি খুব সহজই বলা চলে। প্রথমেই দেশের জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে শঙ্কা তৈরি করতে হবে, এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের কাছে জাতীয় শত্রু হিসেবে দেশের অভ্যন্তরের (হতে পারে কোনো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়) কিংবা বাইরের কাউকে না কাউকে উপস্থাপন করতে হবে।

সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ যদি সেই শত্রুকে বাস্তবিক শত্রু মনে করতে শুরু করে, এবং এও বিশ্বাস করতে শুরু করে যে আসলেই এই শত্রু মোকাবেলায় কোনো একটি নির্দিষ্ট দল কিংবা নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দরকার, তাহলেই হল। এরপর আর ভোটারের মনোরঞ্জনের জন্য দেশের সত্যিকারের উন্নয়নের দরকার পড়বে না, কথিত শত্রুর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান ব্যক্ত করেই লোকরঞ্জন করা সম্ভব হবে, ভোটের মাঠও ঠিক থাকবে।

আধুনিক গণতান্ত্রিক বিশ্বে এ বিষয়টি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প যেভাবে প্রচারণা চালিয়ে বিজয়ী হয়েছেন, তার সঙ্গে উপরের পদ্ধতির খুব একটা অমিল নেই। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের কথিত ‘একমাত্র গণতন্ত্রের দেশ’ ইসরাইলে নেতানিয়াহুও একই ধরনের প্রচারণার জোরে পুনরায় ক্ষমতায় এসেছেন।

তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি ইসরাইলের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে, ফিলিস্তিনিদের দমন করার ক্ষেত্রে তার চেয়ে উত্তম বিকল্প এ মুহূর্তে আর নেই। ফলে দুর্নীতির অভিযোগ পাত্তা পায়নি, তিনিই বিজয়ী হয়েছেন। বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের দাবিদার ভারতের সদ্য সমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনেও একই ঘটনা ঘটেছে।

সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সস্তা মনোরঞ্জনের এ পদ্ধতিটি আসলে সবার জন্যই বিপজ্জনক। একদিকে এর ফলে দেশের প্রকৃত উন্নয়ন ব্যাহত হয়, কোনো সমস্যারই সমাধান হয় না, অন্যদিকে সংখ্যালঘুদের শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে অসহনীয় করে তোলা হয়। সরকার টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের জনগণের মনোরঞ্জন করতে না পেরে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় আবেগ ব্যবহার করে জনগণের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে চায়।

প্রশ্ন হল, এই লোকরঞ্জনবাদের শেষ কোথায়? গণতান্ত্রিক মূলবোধের নামে যেসব তত্ত্বকথা আওড়ানো হয়, সেগুলো শুনতে যত ভালো লাগুক না কেন, বাস্তবে গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মনোরঞ্জনের কোনো বিকল্প নেই। ক্ষমতালোভী রাজনীতিকরা এই উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য যে কোনো ঘৃণ্য পন্থা অবলম্বন করতে পিছপা হয় না।

ফলে সত্যিকারের উদার রাজনীতি করার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এ সমস্যার আদৌ কোনো সমাধান হবে কিনা, তা সন্দেহের বিষয়। তবে এ কথা সত্য, নিছক উগ্র জাতীয়তাবাদ আর সংখ্যালঘুদের বিরোধিতার ওপর একটি দেশ টিকে থাকতে পারে না।

পেটে ভাত না থাকলে কিছুদিন হয়তো ধর্মের কথা, জাতীয়তাবাদ আর জাতীয় নিরাপত্তার কথা শুনতে ভালো লাগে; কিন্তু একসময় ঠিকই ভাতই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে।

মিফতাহ তালহা : প্রাবন্ধিক ও শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×