যুগান্তর গোলটেবিল বৈঠক
তিন ব্যাধি রোধে সবাইকে এগিয়ে আসার তাগিদ
Advertisement
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গত শনিবার যুগান্তর আয়োজিত ‘মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটক-সমাজের তিন ব্যাধি রোধে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন- মাদক, কিশোর গ্যাং, টিকটক-সমাজের এ তিন ব্যাধিতে বিপর্যস্ত নতুন প্রজন্ম। আলোচকদের মতে, মাদকের ভয়াবহতায় যুবসমাজ আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। কাজেই এ বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও দপ্তরগুলোর সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসা জরুরি। একইসঙ্গে এসব সমস্যা সমাধানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও ‘স্মার্ট’ হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বিচারব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজড করার দাবি জানানো হয়েছে। আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার ওপরও গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তাদের মতে মাদক, টিকটক, কিশোর গ্যাং ইত্যাদি কোনোটিই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি অপরটির সঙ্গে সম্পর্কিত। অতএব এগুলোকে সমন্বিত পন্থায় নিয়ন্ত্রণে আনার ওপর জোর দিতে হবে।
উদ্বেগজনক হলো, গত এক দশকে রাজধানীকেন্দ্রিক আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বেশিরভাগই কিশোর অপরাধীদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। কিশোর অপরাধীরা এলাকার ‘প্রভাবশালী’ বড় ভাইদের ছত্রছায়ায় বিভিন্ন দল বা সহযোগী সংগঠনের নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন অপরাধেই শুধু যুক্ত হচ্ছে না; দল বেঁধে মাদক সেবনও করছে। দেশে বর্তমানে কমপক্ষে ২ কোটি মাদকসেবী রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এদের ৮৪ ভাগ পুরুষ ও ১৬ ভাগ নারী। আশঙ্কাজনক হলো, এর মধ্যে ৮০ ভাগই তরুণ। বলার অপেক্ষা রাখে না, মাদকের ভয়াবহতায় যুবসমাজ আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। মূলত মাদকের পাশাপাশি দেশের কিশোর-তরুণ ও যুবসমাজকে বেপথু করতে ইন্ধন জোগাচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্লাটফরম ও রাজধানীর অলিগলি-মহল্লাভিত্তিক অপরাজনীতি।
তবে কেবল রাজধানী নয়; সারা দেশেই এ ধরনের কর্মকাণ্ড ও তৎপরতা যেন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বিষয়টি অভিভাবক ও রাষ্ট্রের জন্য নিঃসন্দেহে দুর্ভাবনার। যারা কিশোর বয়স থেকেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে, তারা যে একদিন শীর্ষ সন্ত্রাসীর খাতায় নাম লেখাবে না-এর নিশ্চয়তা কী? এ ক্ষত সমাজদেহে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করার আগেই প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের এগিয়ে আসা উচিত। এক্ষেত্রে পরিবারেরও বড় ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করি আমরা। শিশুরা অসৎ সঙ্গ বর্জন করাসহ যে কোনো প্রকার লোভ-লালসা, প্রলোভন বা অনৈতিক কাজ থেকে দূরে থাকার শিক্ষা জীবনের শুরুতেই যদি পরিবার থেকে পায়, তাহলে অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে বলে আশা করা যায়। আজকাল মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও আকাশ সংস্কৃতির থাবায় কিশোর-কিশোরীদের বিপথগামী হওয়ার সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ইন্টারনেটনির্ভর জনপ্রিয় বিভিন্ন অ্যাপস ও গেমে আসক্ত কিশোর-কিশোরীরা কী ভয়াবহ পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তা ভাবলেও গা শিউরে ওঠে।
ইন্টারনেট মানুষের জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে পড়ায় এ সংক্রান্ত অপরাধ রোধে সচেতনতাই হতে পারে সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ। তবে কেবল সচেতনতা তৈরিই যথেষ্ট নয়, পাশাপাশি সাইবার অপরাধ দমন ও মাদকের বিস্তার রোধে কঠোর আইন ও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক সাজার ব্যবস্থাও থাকতে হবে। আশার কথা, কিশোরদের মধ্যে সংবেদনশীল আচরণ, সহমর্মিতা ও মূল্যবোধ জাগ্রত করার লক্ষ্যে সরকার দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে কিশোর-কিশোরী ক্লাব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি জেলায় এ ধরনের ক্লাব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। সারা দেশে এ ধরনের ক্লাব প্রতিষ্ঠা করে মাদক, কিশোর গ্যাং ও টিকটক-সমাজের এ তিন ব্যাধি রোধে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আন্তরিক ভূমিকা পালন করবে, এটাই প্রত্যাশা।
