বিজ্ঞান

উল্কাপাত মহাজাগতিক এক মহাবিস্ময়

  আমান বাবু ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

উল্কাপাত মহাজাগতিক এক মহাবিস্ময়

মেঘমুক্ত রাতের আকাশে দেখা যায় স্থির উজ্জ্বল নক্ষত্র বা মিটমিট করতে থাকা শতশত তারা। আমাদের পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ চাঁদ তার উপস্থিতি দিয়ে রাতের আকাশের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ।

এছাড়াও রাতের আকাশে মাঝেমাঝে দেখা যায় আর এক বিশেষ রকমের মহাজাগতিক বস্তু। খালি চোখে যখন আমরা রাতের আকাশের সৌন্দর্য উপভোগ করি, মাঝেমাঝে কিছু এলাকা জুড়ে পৃথিবীর দিকে ধাবিত কিছু আলোর মতো বস্তু দেখতে পাই, যা দীর্ঘ লেজ বিশিষ্ট ধূমকেতু থেকে তৈরি হয়। এই বিশেষ প্রজ্বলিত বস্তু যদি পৃথিবী পৃষ্ঠতলের ওপর পতিত হওয়ার আগেই পুড়ে ছাই হয়ে যায় তখন সেগুলোকে আমরা বলি উল্কা।

উল্কা হল মহাকাশে পরিভ্রমণরত পাথর বা ধাতু দিয়ে গঠিত ছোট মহাজাগতিক বস্তু যা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করলে বায়ুর সংঘর্ষে জ্বলে ওঠে। আর বায়ুমণ্ডলে নিঃশেষিত না হয়ে যদি পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়ে তখন তাকে বলি উল্কাপিণ্ড। এই দুইয়ে মিলে হয় উল্কাপাত।

উল্কাপিণ্ড গ্রহাণুর তুলানায় আকারে অনেক ক্ষুদ্র। যখন কোনো উল্কা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে তখন এর গতিবেগ সেকেন্ডে প্রায় ২০ কিমি. হয়। অধিকাংশ উল্কাই সৌরজগতের মঙ্গল ও বৃহস্পতি গ্রহের মধ্যে অবস্থিত একটি উপবৃত্তাকার গ্রহাণু বলয় থেকে আসে।

এই গ্রহাণু বলয় ছাড়াও উল্কা সৌরজগতের অভ্যন্তর অঞ্চল থেকেও উৎপত্তি লাভ করতে পারে। আর এ কারণেই পৃথিবীপৃষ্ঠের ওপর পাওয়া বেশ কিছু উল্কা চাঁদ বা মঙ্গলগ্রহ থেকে উৎপন্ন হয়েছে এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে। কোনো একটি পৃথিবী-বহির্ভূত বস্তু পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে যখন ঢোকে তখন বস্তুটির চাপ, তাপমাত্রা, উপাদান, ভর প্রভৃতি পরিবর্তিত হয়। বায়ুমণ্ডলীয় উপাদানের সঙ্গে বস্তুর সংঘর্ষ ঘটে ও রাসায়নিক বিক্রিয়া সম্পাদিত হয়।

ফলে বস্তুর অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা এতটাই বেড়ে যায় যে উল্কার বহিঃপৃষ্ঠ পুড়িয়ে দেয়। এসময় অ্যারোডাইনামিক্স তাপের কারণে উজ্জ্বল আলোকছটার সৃষ্টি হয়, আর একে ‘তারা খসা’ বলে। কিছু উল্কা একই উৎস হতে উৎপন্ন হয়ে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে ভেঙে প্রজ্বলিত হয় যাকে বলে উল্কাবৃষ্টি।

সাধারণত উল্কাকে তিনটি দলে ভাগ করা হয়-

স্টোনি উল্কা : এরা প্রধানত সিলিকেট খনিজ দিয়ে তৈরি। অধিকাংশ উল্কাই এই শ্রেণিভুক্ত। পৃথিবীপৃষ্ঠে পাওয়া মোট উল্কার প্রায় ৮৬ শতাংশ এই দলের অন্তর্গত।

আয়রন উল্কা : এরা প্রধানত লোহা-নিকেল ধাতু দিয়ে গঠিত। পৃথিবীপৃষ্ঠে পাওয়া মোট উল্কার প্রায় ৬ শতাংশ এই দলের অন্তর্গত।

স্টোনি-আয়রন উল্কা : এরা লোহা-নিকেল ধাতু ও সিলিকেট খনিজের মিশ্রণ দিয়ে গঠিত। বাকি ৮ শতাংশ এই দলের অন্তর্গত।

অধিকাংশ উল্কাই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পরপরই খণ্ড খণ্ড হয়ে ভেঙে যায়। গবেষণাতথ্য থেকে জানা গেছে, ১০ গ্রামের চেয়ে বড় ১৮ হাজার থেকে ৮৪ হাজার উল্কা পৃথিবীপৃষ্ঠে পৌঁছে, যার মধ্যে শুধু বছরে পৌঁছায় মাত্র ৫ থেকে ৬ টুকরো।

পৃথিবীপৃষ্ঠের কোনো জায়গায় উল্কা পড়ল আর আবিষ্কৃত হল সেই অনুযায়ী নামকরণ। আর যদি একাধিক উল্কা একই স্থানে পাওয়া যায়, তাহলে তাদের নামকরণ করা হয় ক্রমানুসারে। উল্কার আকার হতে পারে নানারকম।

এর ব্যাস কয়েক মিলিমিটার থেকে বেশ কয়েক মিটার পর্যন্ত হতে পারে। একটি বড় আকারের উল্কা পৃথিবীপৃষ্ঠের ওপর যখন পড়ে তখন একটি বেশ বড়সড় জ্বালামুখ তৈরি হয়। অতীতে উল্কাপাতের সময় পৃথিবীপৃষ্ঠের সঙ্গে সঙ্ঘাতে অনেক জ্বালামুখ সৃষ্টি হয়েছে, যার সঙ্গে পৃথিবী থেকে ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার ঘটনাকেও কোনো কোনোভাবে দায়ী বলে ভাবা হয়।

যদিও উল্কা পৃথিবীপৃষ্ঠের যে কোনো জায়গায় পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু উল্কার সংগ্রহ এন্টার্কটিকা মহাদেশের বেশিরভাগ অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ। আর এরপর যে অঞ্চল থেকে এদের সংগ্রহ করা হয় তা হল মরুভূমি এলাকা। আর খুব সামান্য কিছু সংগৃহীত হয়েছে বাকি অন্য দেশ এবং সমুদ্র ও মহাসাগরসহ অন্যান্য মহাদেশ থেকে।

এর অর্থ এই নয় যে, শুধু এন্টার্কটিকা বা মরুভূমি এলাকায় উল্কা প্রচুর সংখ্যক পড়ে। বরং বলা যায় এ উভয় এলাকার ভৌগোলিক স্বভাব এদের আবিষ্কারের জন্য সহায়ক হয়। এন্টার্কটিকা থেকে অনেক উল্কাপিণ্ড সংগ্রহ করা গেছে।

মরুভূমি এলাকাতেও ধূলি মলিন বালি এবং গাঢ় রঙের উল্কাপিণ্ডের মধ্যে রঙের পার্থক্য থেকেই উল্কাপিণ্ড শনাক্ত করা যায়। অন্যান্য জাগতিক বস্তুর বিভিন্ন রং উল্কাপিণ্ডের গাঢ় রঙের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় বলে অন্যান্য স্থানে এদের উপস্থিতি শনাক্ত করা এবং সংগ্রহ করা অনেক কঠিন হয়ে যায়।

উল্কাপিণ্ড যেহেতু মহাজাগতিক স্থান থেকে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে তাই এর অধ্যয়ন ও গবেষণা মহাজাগতিক গঠন বা অন্যান্য অনেক গ্রহের উৎপত্তি সেইসঙ্গে এদের গঠন সম্পর্কে আমাদের বুঝতে সাহায্য করে।

এখনও পর্যন্ত মানুষের পক্ষে স্বশরীরে অন্য কোনো গ্রহে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি, কিন্তু সেই গ্রহ থেকেই উৎপন্ন উল্কা পৃথিবীতে এসে সেই গ্রহের গঠন এবং উৎপত্তি সম্বন্ধে আমাদের নানা সূত্র দিচ্ছে। আর তারই ভিত্তিতে হচ্ছে বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা।

জীবনের উৎপত্তি এবং জীবনের অন্যতম উপাদান কার্বন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন- সেই সঙ্গে তাদের সংযুক্তিকরণ ও বিয়োজন এই উল্কাপিণ্ড থেকে চর্চিত হয়। ভবিষ্যতে উল্কাপিণ্ডের বিস্তারিত গবেষণা অন্যান্য গ্রহে ও মহাজাগতিক স্থানে জীবনের অস্তিত্ব জানার উপায় হিসেবে বিবেচিত হবে বলে ভাবা হচ্ছে।

এটা বলা যেতে পারে, গ্রহ এবং অন্য মহাজাগতিক বস্তুর উৎপত্তি ও বিবর্তন বুঝতে উল্কাপিণ্ড-গবেষণা একটি নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। নিঃসন্দেহে মহাবিশ্বের যেসব তথ্য এখনও উন্মোচিত করা সম্ভব হয়নি তা এই গবেষণা থেকে পাওয়া যেতে পারে। এজন্য উল্কাপিণ্ডের বৈজ্ঞানিক সংগ্রহ এবং এর গবেষণায় উৎসাহ ও যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

তথ্যসূত্র : ইন্টারনেট

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.