ফাল্গুনে ফাগুয়া উৎসব

চা বাগানের আদিবাসী জনগোষ্ঠী বসন্ত ঋতুর ফাল্গুন মাসের দোল পূর্ণিমা তিথিতে ফাগুয়ার হোলি খেলা নামে উৎসব করেন। অনেকের কাছে ফাগুয়া উৎসব নামে পরিচিত। মৌলভীবাজারের বড়লেখার বিভিন্ন চা বাগানে এ উৎসব হয়। ঘুরে এসে লিখেছেন-

  গাজী আবদুল মান্নান ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফাল্গুনের দোল পূর্ণিমায় অনুষ্ঠিত হয়, সে জন্যই নাম- ফাগুয়া উৎসব। চা বাগানের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর এ উৎসব দেখার জন্যই ফাল্গুনের এক দুপুরে আসি মৌলভীবাজারের বড়লেখার সমনবাগ। স্থানীয় অনুজ বন্ধু নাজমুল, মুন্না, শুভ ও এখানকার পল্লী চিকিৎসক তমাল চন্দ্র দাশ দেখিয়েছেন পথ। সমনবাগ চা বাগানের পথেই দেখি ফাগুয়া উৎসব করছে একদল শিশু-কিশোর। তাদের মধ্যে একজন ছেলে মেয়ে সেজেছে। অন্যরাও রয়েছে নানা সাজে। তাদের কারও পরনে ধুতি, আবার কারও পরনে হাফপ্যান্ট। গায়ে শার্ট বা টি-শার্ট। তবে সবার হাতেই রয়েছে রঙের বোতল। সবার শরীরেও রঙ মাখান। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানি, তারা চা বাগানের বিভিন্ন পাড়ায় বাড়ি-বাড়ি ঘুরে নাচ-গান করবে। তাই আমরাও তাদের সঙ্গী হই। তারা একটি বাড়িতে গিয়ে নাচ-গান করল। তাদের নাচ-গান দেখে বাড়ির কর্তারা বখশিশ হিসেবে টাকা দিয়েছে। আমরাও কিছু বখশিশ দিই।

শিশু-কিশোর এ দলের নাচ-গান দেখে আমরা আসি চা শ্রমিকদের আরেকটি বাড়িতে। বাড়ির উঠানটি ছোট্ট। সেই উঠানে একজন হারমোনিয়াম বাজাচ্ছেন। আরেকজন বাজাচ্ছেন ঢোল। তাদের সঙ্গে একজন গান গাইছেন। সেই গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচছেন আরও কয়েকজন ছেলেমেয়ে। এর মধ্যে একজন ছেলে মেয়ে সেজেছেন। বয়সে তারা সবাই তরুণ-যুবা। তাদের এ নাচ-গান উপভোগ করছেন উঠানের চারপাশে দাঁড়িয়ে পাড়া-প্রতিবেশীরা। অন্যদিকে নাচ-গানের ফাঁকে চলে রঙ মাখামাখি। যেন রঙ মাখামাখির খেলা। আর যে গান গাইছেন, তারও কোনো বাছাই নেই। কখনও বাংলা, কখনও হিন্দি, যখন যেটা মনে আসছে সেটাই গাইছেন। তার সঙ্গে চলছে নাচ। মাঝে মধ্যে আবার নিজেদের সংস্কৃতির গান গেয়ে তার সঙ্গেও নাচছেন। সব মিলিয়ে অন্যরকম আনন্দের প্রকাশ। সত্যিই দারুণ উপভোগ্য।

নাচ-গান চলার ফাঁকেই উঠানের এক কোণে বসে কথা হয় চা শ্রমিক যমুনা প্রসাদের সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রতি বছর বসন্ত ঋতুর ফাল্গুন মাসের দোল পূর্ণিমা তিথিতে আমরা এ উৎসব করি। আমরা বলি ফাগুয়ার হোলি খেলা। তবে অনেকের কাছে ফাগুয়া উৎসব নামে পরিচিত। সনাতন ধর্মীয় পুরাণকথা অনুযায়ী, রাক্ষস হিরণ্য কশিপু তার ঈশ্বর ভক্ত ছেলে প্রহল্লাদকে বসন্ত পূর্ণিমার তিথিতে বধ করার জন্য বেশ কয়েকবার প্রচেষ্টা চালায় এবং ব্যর্থ হয়ে শেষে নিজেকেই প্রাণ দিতে হয়েছিল। সেই দিনের সেই ধার্মিকের বিজয় আর অধার্মিকের পরাজয়ের ঘটনাকে স্মরণ করেই মূলত এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। উৎসবে চা শ্রমিকরা রঙ মাখামাখি আর হাসি-আনন্দে ভুলে যান অতীতের সব দুঃখ-কষ্ট।

উৎসব চলে তিন দিন ধরে। এ তিন দিন চা বাগানও বন্ধ থাকে। আর উৎসব উপলক্ষে বিশেষ খাওয়া-দাওয়া হয়। বাড়ি-ঘর করা হয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। বাড়ির উঠান ও দেওয়ালে আঁকা হয় আলপনা। সাদা রঙের আলপনাই বেশি চোখে পড়ল। কিছু বাড়িতে সাদা রঙের পাশাপাশি লালসহ অন্য রঙের আলপনাও আছে। কথা হয় চা শ্রমিক হরি প্রদাস, বিষু বাবু, সুজিত দাশ, শ্যাম বাবু দাশ, রাজু, রীনা রায়সহ আরও অনেকের সঙ্গে। তারাও জানান, ফাগুয়া উৎসব তাদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব।

আমরা দক্ষিণ বাগের সমনবাগ চা বাগান এলাকার মণ্ডপটিলা, কেলাশ টিলা, বাংলা টিলা, পাকা লাইন টিলা, মুণ্ডা টিলাসহ আশপাশের কয়েকটি টিলার চা শ্রমিকদের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে উপভোগ করি উৎসবের আমেজ। শ্রমিকদের অধিকাংশ ঘরের দেওয়ালই মাটির তৈরি আর উপরে টিনের চালা। এক বাড়িতে দেখি যারা নাচ-গান করছেন, তাদের কেউ কেউ রঙ মাখার পাশাপাশি বাড়ির কর্তা বা বড়দের পায়ে রঙ লাগিয়ে প্রণাম করছেন। আর যাকে প্রণাম করছেন তিনি খুশি হয়ে বখশিশ হিসেবে টাকা দেন।

বিভিন্ন পাড়া ঘুরে উৎসব দেখি। তারপর মোটরবাইকে ঘুরে ঘুরে সমনবাগ চা বাগানটা দেখি। বাগানটা বেশ বড়। শীতের শেষ বলে বাগানের সব গাছে সবুজ পাতা কম রয়েছে। কিছু কিছু গাছে সবুজ পাতা গজিয়ে। সেই পাতা সংগ্রহ করছেন চা শ্রমিকরা। আবার অনেক স্থানে গাছের পরিচর্যাও করছেন শ্রমিকরা। কথা বলি চা শ্রমিকদের সঙ্গে।

জানি তাদের ফাগুয়া উৎসবের কথা, জীবন-যাপনের কথা।

শেষ বিকালে ফিরি রতুলী বাজার। স্থানীয় হোটেলে খাই দুপুরের খাবার। তারপর গরুর দুধ দিয়ে বানান চা খেয়ে ধরি ঢাকার গাড়ি। নাজমুলরা চলে যায় আজিমগঞ্জ ওদের বাড়ি।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×