গুজব তাণ্ডব

  এম এস আই খান ২৯ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

তাণ্ডব

ভোলায় শুভর পোস্টকে কেন্দ্র করে অশুভ তাণ্ডব

গুজব সমাজের এক চরম ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত এক দশকে গুজবে এত ভয়াবহ ও নৃশংস ঘটনা ঘটেছে যে, গোটা দেশ আলোড়িত হয়েছে। বিদেশি গণমাধ্যমেও নেতিবাচক শিরোনাম হয়েছে বাংলাদেশ। কখনও পুরোটাই গুজব কখনও বা ঘটনাকে বাড়িয়ে প্রচার করে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি কিংবা উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আলোচিত কয়েকটি গুজব নিয়ে লিখেছেন-

চলতি মাসে ভোলায় বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামে স্থানীয় এক ব্যক্তির নামে করা একটি ফেসবুক পোস্টে ইসলাম ধর্মের নবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর নামে কটুক্তি করা হয়। এতে মুসলিমদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তবে বিপ্লব চন্দ্র শুভ তার ফেসবুক আইডি হ্যাকিং করা হয়েছে জানিয়ে থানায় একটি জিডি এন্ট্রি করেন। বিপ্লব চন্দ্র শুভসহ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আরও কয়েকজনকে আটক করে পুলিশ। ‘তৌহিদি জনতা’-এর ব্যানারে ঈদগাহ মাঠে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেয়া হলে স্থানীয় প্রশাসন আয়োজকদের সঙ্গে বৈঠক করে বিচারের আশ্বাস দেন। ফলে ২০ অক্টোবর সমাবেশ না করার বিষয়ে তৌহিদি জনতার নেতারা একমত হন। কিন্তু তা সত্ত্বেও ২০ অক্টোবর সকাল ১০টার দিকে ঈদগাহ মাঠে তৌহিদি জনতার ব্যানারে অসংখ্য মানুষ জড়ো হতে থাকে। সমাবেশে নেতৃত্ব দেয়া আলেমরাসহ সেখানে এসপি, অ্যাডিশনাল ডিআইজি বক্তব্য রাখেন ও মোনাজাতে অংশ নেন। কিন্তু সমাবেশের শেষ মুহূর্তে ঈদগাহের উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে দুটি মিছিল প্রবেশ করা মাত্রই পরিবেশ পাল্টে যেতে শুরু করে। তারা কটুক্তির জন্য বিল্পব চন্দ্র শুভ’র ফাঁসি দাবি করে এবং প্রশাসনের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। হাজারও বিক্ষোভকারীর আক্রমণাত্মক আচরণের কারণে একপর্যায়ে পুলিশ প্রশাসন দৌড়ে ইমাম সাহেবের কক্ষে আশ্রয় নেন। আলেমরা আক্রমণকারী জনতাকে আপ্রাণ নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা করতে পারেননি। একপর্যায়ে পুলিশ কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে গুলি ছুড়তে শুরু করলে চারজনের মৃত্যু হয় এবং পুলিশসহ অর্ধশত মানুষ আহত হয়।

ছেলেধরা গুজবে আতঙ্কিত ছিল বড়রাও

চলতি বছরের সবচেয়ে ভয়ানক ছিল ‘ছেলেধরা’ গুজব। কোনো সেতু বা ব্রিজ নির্মাণে মানুষের মাথা দিতে হয়- এমন গুজব বহুবছর ধরেই গ্রাম-গঞ্জে চলে আসছে। তবে বর্তমানে পদ্মা সেতু নির্মাণাধীন থাকায় এ গুজব সর্বত্র বাতাসের আগে ধেয়ে বেড়াতে থাকে।

ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি দিয়ে খোদ রাজধানীসহ সারা দেশে ৯ জনকে হত্যা করা হয়েছে। আহত করা হয়েছে অন্তত ২৫ জনকে। দেশের বিভিন্ন স্থানে অপরিচিত লোক দেখলেই তাকে ‘ছেলেধরা’ ভেবে নির্মম পিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ১৮ জুলাই নেত্রকোনা জেলা শহরের নিউটাউন পদ্মপুকুর পাড় এলাকায় এক যুবকের ব্যাগ থেকে একটি শিশুর গলাকাটা মাথা উদ্ধার করা হলে ‘ছেলেধরা’ গুজবকে সত্যি বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে সাধারণ মানুষ। আর ওই যুবককে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলা হয়। পরবর্তীতে পুলিশ ঘটনা তদন্ত করে উদ্ধার করে, ওই ঘটনা ছেলেধরাজাতীয় কোনো ঘটনা ছিল না। শিশুটিকে বলাৎকার করার পরে তা প্রকাশ হওয়া ঠেকাতে তার গলা কাটা হয়েছিল। কিন্তু ছেলেধরা গুজব সর্বত্র আতঙ্কের সৃষ্টি করে এবং যাকে তাকে মারধর করা শুরু হয়ে যায়।

দুদিন পর ২০ জুলাই ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে রাজধানীর বাড্ডায় দু’সন্তানের জননী তসলিমা বেগম রেনুকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যার ভিডিও সারা দেশে ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। পরে প্রমাণিত হয়েছে তিনি ছেলেধরা ছিলেন না। নিজের সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য খোঁজ নিতে গিয়েছিলেন। একই দিনে আরও চারজন ভয়াবহ গণপিটুনির শিকার হয়েছেন। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে দাঁড়ায়, বাধ্য হয়ে ওইদিনই পুলিশ সদর দফতর থেকে ছেলেধরা গুজবের বিরুদ্ধে জনগণকে সতর্ক করে দিয়ে একটি বিবৃতি দেয়া হয়। যাতে বলা হয়, এ ধরনের গুজবের ঘটনায় সন্দেহভাজন কাউকে ধরে পুলিশের হাতে না দিয়ে পিটিয়ে হতাহত করা আইনের দৃষ্টিতে মারাত্মক অপরাধ।

রামুতে উত্তমকে কেন্দ্র করে দানবীয় উগ্রতা

উত্তম বড়ুয়া নামে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তির ফেসবুকে কোরআন অবমাননার ছবি ট্যাগ করা হলে তা নিয়ে এক ভয়াবহ তাণ্ডবের সৃষ্টি হয়। সেসময় বাতাসের আগে ছড়িয়ে পড়ে- একটি কম্পিউটারের দোকান থেকে উত্তম বড়ুয়া ফেসবুকে ইসলাম ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ কোরআন ও নবীকে অবমাননা করেছে। সঙ্গে সঙ্গে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি শিকেয় তুলে দৈত্যতাণ্ডব শুরু হয়ে যায়। ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে রামুতে বৌদ্ধ স্থাপনা ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষের বাড়িঘরে ভাংচুর ও আগুন দেয়া হয়। পরে এ সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলাতেও। দুদিনের সহিংস হামলায় রামু ও উখিয়ায় মোট ১৯টি বৌদ্ধবিহার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, রেহাই পায়নি সাধারণ বৌদ্ধদের বাড়িঘরও। মারধরের শিকার হয়েছেন অনেকে, প্রাণ ভয়ে আত্মগোপন করে লুকিয়ে ছিলেন বহুজন। পুড়ে যায় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের শত শত বছরের ইতিহাস। রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের ৩০০ বছরের পুরনো ভবন আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে যায়। পরবর্তীতে সরকার বৌদ্ধদের জন্য নতুন বিহার নির্মাণ করে দেয়। অভিযোগ রয়েছে, বৌদ্ধদের বাড়িঘর ও বৌদ্ধবিহারে আক্রমণের ঘটনায় সব রাজনৈতিক দলের স্থানীয় অনেক নেতাকর্মীর অংশগ্রহণ ছিল। ফলে সাত বছর পেরিয়ে গেলেও ওই ঘটনায় দায়ের করা ১৯টি মামলার কোনোটিতেই এখনও পর্যন্ত কোনো রায় আসেনি।

এক টাকার লাল কয়েন গুজব

২০১০ সালের নভেম্বর মাসে হঠাৎ করেই এক টাকার লাল কয়েন নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। অজানা ও অদ্ভুত কারণেই হু হু করে বাড়তে শুরু করে এক টাকার সোনালি কয়েনের দাম। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, এ ধাতব মুদ্রাটি বিক্রি হতে শুরু করে ৫০-২০০ টাকায়। সারা দেশে বহু সংঘবদ্ধ চক্র এক টাকার সোনালি কয়েন কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ফলে স্থানীয় দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এক টাকার সোনালি কয়েনের চরম সঙ্কট দেখা দেয়। যে যেভাবে সম্ভব এক টাকার লাল কয়েন সংগ্রহ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বিভিন্ন মসজিদ, মন্দির, মাদ্রাসা ও মাজারের দানবাক্স খুলে সংগ্রহ করা হয় এ কয়েন। মাটির ব্যাংক ভেঙে খুঁজতে শুরু করে কোথায় আছে লাল কয়েন। স্কুলপড়ুয়া থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ সবাই যে যার মতো ফোনে ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে সোনালি কয়েন সংগ্রহ করার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। রিকশাওয়ালা ও দোকানিরা ২০-৩০ টাকার ভাড়া কিংবা সওদার পরিবর্তে দাবি করেন এক টাকার লালচে কয়েন। কে বা কারা কী কারণে এ কয়েন সংগ্রহ করছে তা বলতে পারছে না কেউ। তবুও দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে লাল কয়েনের কারিশমা। প্রশাসনও লাল কয়েন দৌরাত্ম্য রুখতে অসহায়! রহস্যের জট খোলার আগেই হাট-বাজার থেকে এক টাকার লাল কয়েন গায়েব। যারা লাল কয়েন বিক্রি করছেন তারাও জানেন না লাল কায়েনের মূল্য কত। লাল কয়েনের ক্রেতারাও জানেন না এ কয়েন সংগ্রহ করে তারা কোথায় বিক্রি করবেন। কয়েন নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু হওয়ার আগে চিলে কান নেয়ার গল্পের মতো করে গুজব রটে যায় সারা দেশে। কানাঘুষা চলতে থাকে, লাল কয়েন দিয়ে স্বর্ণে ভেজাল দেয়া হয়। ফলে স্বর্ণের খাদ হিসেবে লাল কয়েনের চাহিদা তুঙ্গে। তাই মুনাফার লোভে লোকজন যে যেভাবে পারে লাল কয়েন সংগ্রহ করতে শুরু করে দেয়। আর এভাবেই লাল কয়েন সারা দেশে আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়। কিন্তু পুরো ব্যাপারটি ছিল গুজব এবং যারা উচ্চমূল্যে লাল কয়েন সংগ্রহ করেছেন তাদের কেউই তা অন্যত্র বিক্রি করতে পারেননি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×